দামিনীর শ্রীক্ষেত্রে পাইলিন


দারুব্রহ্ম দর্শনদৃপ্ত আঁখি নিমীলনে দামিনী আলুলায়িতা। ব্রা কাপড় কাঁপিতেছিল, হুক খোলা, বায়ুবেগে। ঘুমাইয়া যদ্যপি হ্লাদিনী স্বপ্নোত্থিতান্যায় কতিপয় আসিতেছিল ঘটনাদি। দারুব্রহ্মের পশ্চাতে প্রাকাররুদ্ধ বুদ্ধ। ভূমিস্পর্শমুদ্রা শায়িত। বুদ্ধ-দন্ত ধুম সহযোগে বাদ্যে, গীতে, নৃত্যে শোভিত মুকুন্দদেব রাজা দন্তপুরের শোভাযাত্রা সাজিত। বুদ্ধ, পার্শ্বে বোধিসত্ত্বাদি। জনশ্রুতি ইত্যাদি। পাটলিপুত্রে একদা বিংশতি রথস্থ বুদ্ধ-যাত্রা ফা হিয়েন প্রত্যক্ষে লিপিবদ্ধ। বৌদ্ধ রথযাত্রা জগন্নাথ-সুভদ্রা-বলরাম যাত্রা একদা।

নাভি শিহরিল। স্তনবৃন্তাদি কঠিন। ফল, ফলিত, ফলাভ্যাং! দামিনী নাভিতে উষ্ণ ওষ্ঠ স্পর্শে শিহরিত। ওষ্ঠ নামিল নিম্নে গভীর উপত্যকায়। নিদ্রাচ্ছন্ন দুই হস্তের অঙ্গুলি দিয়া দামিনী কেশ আঁকড়াইল যাহার, তাহার উদ্দেশে পদদ্বয় ঈষৎ ফাঁক করিয়া সাজিল। সমান্তরাল ত্রিভূজাকারে পদদ্বয় উত্তোলনে স্বস্থাপিতা।

“সে স্থানে নাহিক যমদণ্ড-অধিকার।

আমি করি ভালমন্দ বিচার সবার ॥”

কমলাময়ী হান্ডিকা কাষ্ঠাগ্নি দ্বারা তেজঃ কৃত্যে প্রভুপাক করিলেন। দামিনীর শাড়িটি শরীর ছাড়িল। জঘনে হস্তস্পর্শে উত্তাপ, ওষ্ঠ স্ফূরিত হইল ঈষৎ।

“তস্য-অন্নং পাচিতং লক্ষ্যা স্বয়ং ভুক্তাদয়ালুনা।

দত্তং তেন স্বভক্তেভ্যঃ লভ্যতে দেবদুর্লভম্‌ ॥

মহাপ্রসাদ-সংজ্ঞং-চ তৎ পৃষ্ঠং যেদ কেনচিৎ ।

যত্র কুত্রাপি বা নীতম্‌-অবিচারেণ ভুজ্যতে ॥”

লবণাক্ত নীলাচল বীচিমালিকার পার্শ্বস্থ জগন্নাথ অধিষ্ঠান স্থান। লক্ষীদেবী স্বহস্তে পাক করিয়া থাকেন প্রভু ভোগ। মহাপ্রসাদ। দামিনী আনিয়াছিল। দীর্ঘ সারির শেষে মন্দির-গর্ভে আরশোলা পরিবেষ্টিত জগন্নাথ দর্শন কুতুহলী দামিনী তৃপ্ত মহাপ্রসাদ দিয়াছিল ফিরিয়া। যে পাইলো তাহার মন্দির প্রবেশ নিষিদ্ধ।

একদা জগন্নাথধাম আক্রান্ত হইয়াছিল। বাংলার মুঘল সুবেদার সুলেইমান কররানি ওড়িষার গজপতি মুকুন্দদেবের সেনাপতি রাজীব লোচন রায় বশ করিতে চাহিল। তাহাকে আমন্ত্রণ করিয়া কন্যাকে দেখাইলো। প্রেম আসিয়াছিল যুবক-যুবতীর। রাজীব লোচন ইসলাম নিতে স্বীকৃত হয় নাই। সুলেইমান-কন্যাকে চাহিল হিন্দু করিতে। মুকুন্দদেব বাধ সাধিলেন। ধর্মান্তরে হিন্দু হইতে পারা নিষিদ্ধ। ক্রোধ রাজীবকে প্রতিশোধস্পৃহার্থী করিল। ইসলাম ধর্ম লইয়া সে ওড়িষার বহু দেবালয় ভূলুন্ঠিত করিল একে একে। জগন্নাথধামও রেহাই পায় নাই। ইসলামধর্মীয়রা জগন্নাথধামে দর্শনপিপাসু হইলেও অনুমতি মিলিবে না। জনশ্রুতি, ইতিহাস মিশ্রণ।

সাইক্লোন পাইলিন আসিবে কল্য। ঝোড়ো হাওয়া উন্মত্ত হইতেছিল। জগন্নাথমন্দিরে প্রবেশাধিকার পায় নাই দামিনী-বান্ধব। ম্লেচ্ছ, অপবিত্র, অনধিকারী। বৌদ্ধ সিদ্ধ ইন্দ্রভূতি জগন্নাথকে বুদ্ধ সম্বোধন করিয়াছেন দীর্ঘকাল পূর্বে। অজস্র সূত্রাদি এরূপ রহিয়াছে।

দামিনী, ইতিহাস অধ্যাপিকা, মহাপ্রসাদ দিয়াছিল নিষিদ্ধকে। কল্য, সাইক্লোন আসিবার পূর্বে নীলাচলে শ্রীক্ষেত্র বিছাইয়া দিয়াছিল। প্রবিষ্ট হইয়াছিল নিষিদ্ধ।

দামিনী ও কালাপাহাড় ও এইরূপ আচরণ কাহিনীজীবি অথবা পাইলিন।

[প্রকাশিত হয়েছে দলছুট-এ]

Advertisements
Posted in অনুগল্প | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

ভাঁড় ও সম্রাট


শ্রী শম্ভু মিত্র শিশিরকুমারের অভিনয় দেখে মুগ্ধ ছিলেন। শম্ভুবাবু নিজে খুব চিৎকৃত অভিনয়ের পক্ষপাতী ছিলেন বলে শুনিনি। তাহলে নিশ্চই ষাঁড়ের মতন চিৎকার করা অভিনেতাকে দেখে মুগ্ধ হতেন না। অতএব শিশিরবাবু চিৎকারকেই অভিনয় গণ্য করেননি বলেই ধরা যায়। সুক্ষতা যদি আধুনিক মঞ্চ অভিনয়ের অঙ্গ না হয় তাহলে সে অভিনয় দেখে লাভ কি? সুক্ষতা যদি আধুনিক নাট্যের অঙ্গ না হয় তাহলে সে নাটক আমাকে কি দেবে?

কিছুদিন আগে ভাঙা মুক্তাঙ্গনে গেছিলাম ফোর্থ বেল-এর একটি নাটক দেখতে। একটি ছোট্ট ছেলে, নামটি মনে নেই আমারই দোষে, একক অভিনয় করছিল। মঞ্চ সজ্জা থেকে আলো সবই বেশ দুর্বল। ছেলেটির কন্ঠেও স্বরক্ষেপণের দুর্বলতা। কিন্তু তারপরেও ছেলেটির অভিনয় বসে দেখেছিলাম। প্রথমত জ্যোৎস্নাময় ঘোষের নাটকটি ভাষাগতভাবে অনেক বেশী সম্পদপূর্ণ ছিল। ফাঁক ছিল কন্টেন্টে এবং ইডিওলজিতে। কিন্তু ঠাস বুনোটের নাটক। দ্বিতীয়ত ছেলেটি অসম্ভব সৎ অভিনয় করছিল। তার সীমাবদ্ধতা নিয়েই করছিল। সেই সততা বসিয়ে রেখেছিল। নিশ্চই কোনোদিন এই ছেলে নিজের ত্রুটি সামলেসুমলে অভিনেতা হিসেবে আরো বড় হবে।

আর আজ গেছিলাম একটি বড় মঞ্চের বড় প্রযোজনা দেখতে। মিডিয়া যাঁকে প্রায় আধুনিক নটসম্রাট বানিয়ে দিয়েছেন এমন এক অভিনেতা অলঙ্কৃত করে আছেন মুখ্য চরিত্র। বাকী মঞ্চে উপস্থিত বোধকরি জনা বিশ-পঁচিশ হবেন। তাঁরা আসি যাই মাইনে পাই গোছের কাজে নিযুক্ত। থাকলে বা না থাকলে কিছু আসে যায় না। নটসম্রাটটি জমিদারপুত্র মেগালোম্যানিয়াক মদ্য ও মহিলাক্রান্ত শিশির ভাদুড়ির চরিত্র করছেন। এটি সাম্প্রতিক কালে প্রয়াত সুনীল গাঙ্গুলীর উপন্যাস অবলম্বনে। যেমন ভুল তথ্যে সম্বলিত ঐতিহাসিক উপন্যাস সুনীলবাবু লিখতেন এটিও তেমনই। নাট্যরূপও তথৈবচ। প্রভাদেবী চিরকাল শিশিরবাবুকে ‘বাবা’ বলে ডাকতেন শুনেছি। এখানে শুরু করলেন ‘বড়বাবু’ বলে ডাকা। তার কিছুপরে হঠাৎ কথা নেই বার্তা নেই বলে উঠলেন বাবা। দানীবাবুর থেকে শিশিরবাবু-র ম্যাডান থিয়েটারে আসার পরে ‘বড়বাবু’ খেতাব লাভ। প্রভাদেবীকে সন্তানের মতন দেখতেন। যে শিশিরবাবু কোনো কিছুর জন্য কোনোদিন থিয়েটারে শো বন্ধ করেননি সেই শিশিরবাবু প্রভাদেবীর মৃত্যুতে নিজে হাতে বোর্ড লিখে টাঙিয়ে অভিনয় বন্ধ করে দিয়েছিলেন। সেই প্রভাদেবীকে নিয়ে এ ছেলেখেলা কেন? আসলে এ সব নাটকের মুখ্য ছিল না। ছিল অন্য কিছু।

সে কথা বলার আগে অন্য আরেকটা কথা না বলেই পারছি না। এক রঙ্গমঞ্চের যশস্বিনী অভিনেত্রী যিনি এ নাটকে কঙ্কাবতীর চরিত্রে অভিনয় করছেন তিনি হারমোনিয়াম বাজিয়ে দু কলি গাইলেন রবিবাবুর গান। অসম্ভব খারাপ গাইলেন। এ নাটকের শিশিরবাবু অবলীলায় বললেন এমন করে কাউকে তিনি রবীন্দ্রগান গাইতে শোনেননি। সেই একই অভিনেত্রী ‘অব্যক্ত’ শব্দটি উচ্চারণ করলেন ‘অব্‌ব্যাক্ত’ বলে, মানে দুটো ব লাগিয়ে, তারপরেই শিশির চরিত্রের সংলাপ যে এমন অসামান্য উচ্চারণ তিনি এর আগে কখনো শোনেননি।

এ ধাষ্টামো চলছে কেন? খুব সহজ কারণ। সময়টা খুব বিক্ষুব্ধ আসলে। তাই একের পর এক বিক্ষুব্ধ চরিত্র নিয়ে থিয়েটার-সিনেমা হয়ে চলেছে। আমরা দর্শকরা হাতে প্রায় তিল-তুলসী নিয়ে স্ব স্ব ক্ষোভের উদগারার্থে নাট্যাভিনয় দেখতে যাচ্ছি। বাকী অংশ অবশ্যই ক্লাস পিপল। পঞ্চাশোর্ধ, একটি বাজারী পত্রিকার নাট্যসমালোচনা পড়ে ও টিকিটের দাম দেখে নাটক দেখতে যান। তাঁরা পয়সা ভসুল খুব ভাল বোঝেন। তাই ঠিক যেমন ভাবে ওই ক্লাসের আরেকটু কম বয়েসী মানুষরা বজবজের ওপারে তৈরী জিন্সে শো রুমে ব্র্যাণ্ডেড ছাপ দেখলেই কেনেন, নয়তো না, এঁরাও ছাপ না দেখলে হলে যান না। এ সব চরিত্ররা যখন বেঁচে তখন এঁরা এঁদের কাজের দিকে খুব তাকিয়েছেন এমন একদম না। এখন তাকান। ছাপ পড়েছে যে কালের অমূল্য সম্পদ বলে!

অতএব নবনাট্য আন্দোলন এখন ক্ষমতাহীন হাতিবাগানী থিয়েটার। ক্ষমতাহীন বলছি এই কারণে যে এঁরা কেউ আগের কালের মতন মঞ্চ ভাড়া করে সপ্তাহে বৃহষ্পতি, শনি রবির ডাবল শো করার দিকে যাবেন না। গেলে ছটা শো-এর পরে মাছি তাড়াবেন হলে জানেন। তাই গ্রুপ থিয়েটারের এত বছরের মননশীল নাট্যের উপার্জনকে ভাঙিয়ে, গ্রুপ থিয়েটার সার্টিফিকেটের দৌলতে হলে কম ভাড়া দিয়ে, গ্রুপ থিয়েটার করছেন বলে নানা সরকারী গ্র্যান্ট নিয়ে দায়িত্ব সহকারে গ্রুপ থিয়েটারের বারোটা বাজাবেন। প্রচুর বড় বড় কথা বলে অজস্র খ্যাতিলোভী ছেলেমেয়েতে দল ভরিয়ে তাদের মঞ্চের সেট টানার কাজে লাগিয়ে স্টার অভিনেতা নিয়ে ফাটানো নাটকের ঢেঁকুর তুলবেন সর্বত্র।

সাধারণত এই ধরণের প্রযোজনা দেখে দু কলম লিখতেও ইচ্ছে করে না। কিন্তু আজকে যেন রাগটা বড্ড বেশী হচ্ছে। শিশির ভাদুড়ীকে কেউই কিছু দেয়নি। না জাতি না সরকার। শিশির ভাদুড়ি মানেই দেবতা এমনও না। কিন্তু মৃত্যুর এত বছর পরে এই অসম্মানটা সম্মানের ছদ্মবেশে বড় বেশী কটু, বড় বেশী তিক্ত। তাই না লিখে পারলাম না। আমার সামান্য নাট্যজীবনের এঁরা শিক্ষক। শিক্ষকের অসম্মান বড় গায়ে লাগে। ফোর্থ বেলের ওই ছেলেটি তার সব সীমাবদ্ধতা নিয়েও আমার প্রিয়, এই অশালীন নাট্য প্রক্রিয়ার চেয়ে। ওই ছেলেটি তার কর্ম দিয়েই সম্মান জানাচ্ছে গিরিশ থেকে শিশির সকলকে। এঁরা তামাশা করছেন।

সম্রাটের পোষাক পরে ভাঁড়ের তাজ্জব তামাশা
মহামারী সংস্কৃতিতে, ভেদবমি, রক্ত-আমাশা।।

Posted in সমালোচনা | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

অসুখের নন্দনতত্ত্ব – অ্যারিস্টটল থেকে বেকেট


এমন হতেই পারতো

অ্যারিস্টটল একটি গবেষণাগারে কাঁচের বয়ামে খুব মন দিয়ে একটি ছোট্ট কীটকে দেখছেন। কিছুক্ষণ আগেই তাকে আনা হয়েছে। আলেক্সান্ডারের দূত এসেছিল আজ। দূতের ক্যারাভ্যানে ছিল এই কীটটি। আরো অনেকগুলো প্রাণী ও উদ্ভিদ ছিল সঙ্গে। এসব এসেছে তাঁর জন্য। আলেক্সান্ডার আর যাকেই ভুলুক তার গৃহশিক্ষককে ভোলে না। পারস্যের পথে যেতে যেতেও সে পাঠিয়েছে উপহার তাঁর গবেষণার জন্য। গত বেশ কিছুকাল তিনি প্রাণী ও উদ্ভিদতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করছেন। প্রকৃতিকে বুঝতেই হবে। তাঁর গুরু সক্রাটিস তাই শিখিয়েছেন। একটু পরেই তিনি লিখতে বসবেন। নতুন কাজ হাতে নিয়েছেন। একটি নন্দনতত্ত্ব রচনা করছেন গ্রীসের জন্য। নাটক, কবিতা সমস্ত কথাশিল্পকে তিনি বাঁধতে চাইছেন বিশিষ্ট নিয়মে। যা যা চলছে সমকালে এবং যা যা চলেছে অতীতে তার থেকে উপাদান নিয়ে বিবেচনা করে তিনি বানাচ্ছেন এই নন্দনতত্ত্ব। এর নাম হবে ‘আর্স পোয়েটিকা’।

লিখতে বসেই তিনি লিখে ফেললেন এই লাইনগুলোঃ

Again, a beautiful object, whether it be a living organism or any whole composed of parts, must not only have an orderly arrangement of parts, but must also be of a certain magnitude; for beauty depends on magnitude and order. Hence a very small animal organism cannot be beautiful; for the view of it is confused, the object being seen in an almost imperceptible moment of time. Nor, again, can one of vast size be beautiful; for as the eye cannot take it all in at once, the unity and sense of the whole is lost for the spectator; as for instance if there were one a thousand miles long. As, therefore, in the case of animate bodies and organisms a certain magnitude is necessary, and a magnitude which may be easily embraced in one view; so in the plot, a certain length is necessary, and a length which can be easily embraced by the memory. The limit of length in relation to dramatic competition and sensuous presentment is no part of artistic theory. For had it been the rule for a hundred tragedies to compete together, the performance would have been regulated by the water-clock- as indeed we are told was formerly done. But the limit as fixed by the nature of the drama itself is this: the greater the length, the more beautiful will the piece be by reason of its size, provided that the whole be perspicuous. And to define the matter roughly, we may say that the proper magnitude is comprised within such limits, that the sequence of events, according to the law of probability or necessity, will admit of a change from bad fortune to good, or from good fortune to bad.

ঘটনাটা হচ্ছে…

দীর্ঘ উদ্ধৃতি দিলাম। লোভ না সামলাতে পেরেই দিলাম। একটা মানুষ কত বিচিত্র বিষয় থেকে আহরণ করেন শিল্পের উপাদান সেটা দেখে বিষ্মিত হতে হয় বৈ কি! নিজেই বারেবারে বলছেন প্রকৃতির কথা। বলছেন প্রকৃতি শিক্ষা দেয়।

‘Nature herself, as we have said, teaches the choice of the proper measure.’
তাহলে ওই ছোট্ট কীটটিকে দেখে ভাবতেও পারতে পারেন যে এর মধ্যে সৌন্দর্য্য যেন ব্যাক্ত হবার অবকাশ পাচ্ছে না। ভাবতে পারেন, কেন না তাঁর বিশ্বটা বেশ মাপে মাপে। তাঁর বিশ্বর শুরু আছে শেষ আছে। তার সবটাই তাঁর জ্ঞানের মধ্যেই আছে। তাঁর আগের দার্শনিক বা বৈজ্ঞানিকদের ক্ষেত্রেও এক জানার নিশ্চিন্তি আছে। যেমন পৃথিবীটা একটা সমতল চৌকোণো ক্ষেত্র আর তার মাথায় আকাশটা ক্যানোপির মতন। তাই সমতল ধরে হাঁটতে থাকলে এক সময়ে পড়ে যেতে হবে। তাঁর বিশ্বের ভূগোলটা বেশ ছোট আজকের মাপে। সেখানে ইউনিকর্ণ আছে, সেখানে এমন একদল মানুষ বা মানুষের মত জীব থাকে যাদের মুখ নেই, শুধু আছে নাক। বিশ্বটি যদি বাড়তো জ্ঞানে তাহলে জানা যেত তখন যে আসলে এরা ভারতের ভূখন্ডে থাকা জৈনদের দল, যাঁরা কাপড়ে মুখগহ্বর ঢেকে রাখেন, পাছে কোনো কীটের নিশ্বাসেও ক্ষতি হয় বা মৃত্যু হয় তাই। আর শ্রীলঙ্কায় কোনো ইউনিকর্ণ নেই। কিন্তু তখন তো এসব জানা ছিল না। যা ছিল তাতে নিশ্চিত এক প্রকারের জ্ঞান নিয়ে শেষ করা যেত নন্দনতত্ত্ব।

তাই চোখের সীমানার মধ্যে থাকতে হবে, কিন্তু খুব ছোট হলে চলবে না এমন প্রাণীতেই সৌন্দর্য্য বোঝা যেতে পারতো। খেয়াল করে দেখলে দেখা যায়, এই ভাবনাটার সঙ্গে ঠিকঠাক খাপ খায় এমন প্রাণীর সংখ্যা খুব বেশী না। আবার সে প্রাণীর শিরোমণি মানুষ। তার মানে আজকে যাকে বলা হয় মানুষকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গী এ তারই প্রাচীন বহিঃপ্রকাশ।

এখানেই শেষ না। এ শুরু। ট্র্যাজেডি, যা অ্যারিস্টটলের প্রিয়তম আঙ্গিক, তাতে বলে দেওয়া হল বিষয়ের শুরু ও শেষ এমন হবে যেন বিষয়কে সম্পূর্ণ বলেই মনে হয়।

“A whole is that which has a beginning, a middle, and an end. A beginning is that which does not itself follow anything by causal necessity, but after which something naturally is or comes to be. An end, on the contrary, is that which itself naturally follows some other thing, either by necessity, or as a rule, but has nothing following it. A middle is that which follows something as some other thing follows it. A well constructed plot, therefore, must neither begin nor end at haphazard, but conform to these principles. ”

এই যে শুরুর কথা বলা হচ্ছে সেই শুরুতে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে সে কোনো কিছুর কার্য-কারণ হিসেবে আসবে না, আর তার পরে স্বাভাবিকভাবেই কিছু আসবে। সত্যিই কি কোনো শুরুর শুরু থাকে না? থাকে তো! আমাদের জ্ঞাত বিশ্বে এমন কিছু নেই যেখানে শুরুর কোনো শুরু নেই। তাহলে? আসলে অ্যারিস্টটল শুরুতেই শিল্পকে একটি মারাত্মক কাজ দিয়ে দিয়েছেন, সেটি হল সে অনুকরণ করবে। অনুকরণ করবে প্রকৃতিকে। সে অনুকারী মাত্র। এর বেশী কিছু সে নয়। সমস্যা হল তা যদি সত্যিই সে না হয় তাহলে আর তাকে নিয়ে এত ভাবনাচিন্তা কেন? অ্যারিস্টটলই বা ভাবছেন কেন এত? শিল্প অবশ্যই অনুকরণের চেয়েও উন্নত। কিন্তু সে কথা মানা অ্যারিস্টটলের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তার পিছনে প্রধান কারণ হল স্বাভাবিকতাবাদের চর্চা তাঁর।

স্বাভাবিকতাবাদ কঠিনভাবে এম্পিরিসিজমের এবং নীরিক্ষামূলক পদ্ধতির সাহায্য নেয়। তার বাইরে তার ভুবন নেই। সেখান থেকে সে নানাবিধ ব্যাখ্যা তৈরী করে। ব্যাখ্যাত হয় বস্তু ও ভাবনা-বিশ্ব। কিন্তু সেই ভাবনা বা পদ্ধতিই শেষ ভাবনা না। এখানে ডারউইনের নিজের কাজের একটি ক্রিটিকের কথা আসে। খুব শান্তভাবে ডারউইন লিখে চলেন। বিজ্ঞানের কতগুলো মূলগত প্রকল্পের মধ্যে একটি হল বিশ্বের বাস্তবতা। বিশ্ব অস্তিত্বমান এটি একটি স্পষ্ট অনুমান এবং আমরা সেই অনুমানের অর্থ বুঝতে পারি। ডারউইন বলেন, যে বুঝতে যদি পারিও তাহলেও একটা কথা থেকে যায়। এভোলিউশন এমন কোনো কারণ দেয় না যার থেকে বলা যায় যে এই অস্তিত্বমান বিশ্বের সঠিক চিত্রটি আমরা মানুষরাই একমাত্র বানাতে সক্ষম বা বানিয়েছি। যদি আমাদের বেঠিক চিত্রটিতেই সারভাইভ করার সুবিধে বেশী থাকে তাহলে সেটাই আমাদের চিত্র হওয়ার কথা।

তাহলে তো আর সেই বিশ্ব সম্পর্কে ভাবনা নিশ্চিত থাকছে না। প্রাচীন প্রাণী ও উদ্ভিদতত্ত্ববিদ অ্যারিস্টটলের নিশ্চিত ভাবনাবিশ্ব ভেঙে যাচ্ছে ডারউইনে এসে। তাহলে যদি ডারউইন একটা পোয়েটিক্স লিখতেন তার ভিত্তি স্বাভাবিকতা হোতো কি? তাছাড়া স্বাভাবিকতা আমাদের ইন্দ্রিয়াদির মাধ্যমে আমাদের বোধগম্য যা তার উপরে নির্ভর করে তৈরী। কিন্তু যা আমাদের বোধগম্য না তার কি হবে? যা আমাদের চোখের নাগালে একবারে আসে না তার সৌন্দর্য্যের কি হবে? কি হবে সেই নন্দনতত্ত্ব?

যত সম্পূর্ণ হবে তত সে ফাঁকা

এইখানে এসে বসলেন স্যামুয়েল বেকেট। একটা চেয়ারে বসলেন যেটার চাকাটা বাইসাইকেলের হলে সুবিধে হত। বসলেন যখন তখন তিনি বুঝে নিয়েছেন তিনি ও জেমস জয়েস কোথায় পৃথক। জয়েস জড়ো করেন। জয়েস জানার চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছতে চান। সেখানে পৌঁছে তিনি নিজের সংগ্রহের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখবেন। অন্যদিকে তিনি না-জানার পক্ষে। জয়েস জড়ো করেন, তিনি বাদ দেন। অ্যারিস্টটলের সম্পূর্ণতা ও জয়েসের সংগ্রহের চূড়ান্ত জ্ঞানের পাশাপাশি বসে নির্বিকার কন্ঠে বলে উঠলেন,
“No, all is a—
(he yawns)—bsolute,
(proudly)
the bigger a man is the fuller he is.
(Pause. Gloomily.)
And the emptier.(He sniffs.)”

‘এন্ড গেম’ শুরু হল।

তিনি বললেন। অথবা হ্যাম বললো। একটু আগে ক্লোভ একটা জানলার কাছে মই নিয়ে দেখছিল। হাসছিলো দেখতে দেখতে। তারপরে মইটার থেকে নেমে অনেক কিছু করেছে। ন্যাগ, নেল- দুজনেরই অ্যাশক্যানের উপর থেকে চাদর সরিয়ে নিয়েছে। হেসেছে। হ্যামের চাদরের ঢাকনাটাও। তারপরে হেসেছে। চলে যেতে গিয়ে ঘুরে এসেছে। কোনো টোন ছাড়াই দর্শকদের বলেছে,
Finished, it’s finished, nearly finished, it must be nearly finished.
(Pause.)
Grain upon grain, one by one, and one day, suddenly, there’s a heap, a little heap, the impossible heap.

দানায় দানায় তৈরী হয়েছে জ্ঞানতত্ত্ব। একটু একটু করে এক অবিশ্বাস্য স্তুপ। বেকেট বললেন, এই স্তুপ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। এই অসম্ভব স্তুপ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। এ এক খবর বটে! কোন যুগের অ্যারিস্টটলের বিশ্বটা এখন এই স্তুপাকৃতি ধারণ করেছে। অসম্ভব সে স্তুপ। জয়েস বসেছেন তার উপরে। তিনি এর থেকে এখন বাদ দেবেন। তিনি non-knower হবেন। কেন না তিনি দেখেছেন যত সম্পূর্ণ হচ্ছে তত সে ফাঁকা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধটা কিছুকাল আগে শেষ হল।

এবার যদি তিনি পাতা ওল্টান তাহলে দেখতে পাবেন তাঁর পাশে রাখা আছে ‘আর্স পোয়েটিকা’। অ্যা

অ্যারিস্টটল বলছেন,

“Of all plots and actions the episodic are the worst. I call a plot ‘episodic’ in which the episodes or acts succeed one another without probable or necessary sequence. Bad poets compose such pieces by their own fault, good poets, to please the players; for, as they write show pieces for competition, they stretch the plot beyond its capacity, and are often forced to break the natural continuity.”

আবার সেই স্বাভাবিকতা! তার কন্টিনিউইটির কথা। বেকেট একটু হেসে সরিয়ে রাখবেন। না, অ্যারিস্টটল হাইসেনবার্গের কথা জানতেন না। অ্যারিস্টটল আইনস্টাইনের কথা জানতেন না। থিওরি অব রিলেটিভিটি থেকে কোয়ান্টাম অব্দি জানা হয়নি তাঁর।

কিন্তু জানা দিয়ে কি হবে? তিনি তো non-knower।

তাই যদি হবে তাহলে এটা কি?

“HAMM: …What time is it?
CLOV: The same as usual.
HAMM (gesture towards window right): Have you looked?
CLOV: Yes.
HAMM: Well?
CLOV: Zero.
HAMM: It’d need to rain.
CLOV: It won’t rain.
(Pause.)
HAMM: Apart from that, how do you feel?
CLOV: I don’t complain.
HAMM: You feel normal?
CLOV (irritably): I tell you I don’t complain.
HAMM: I feel a little strange.
(Pause.)
Clov!
CLOV: Yes.
HAMM: Have you not had enough?
CLOV:Yes!
(Pause.)
Of what?
HAMM: Of this… this… thing.
CLOV: I always had.
(Pause.) Not you?
HAMM (gloomily): Then there’s no reason for it to change.
CLOV: It may end.(Pause.)
All life long the same questions, the same answers.”

হ্যাম জানতে চাইছে কেন? বেকেটের চরিত্র জেনে কি করে? জানলার বাইরে তো শূণ্য হয়ে আছে। অন্য রকম কিছু হবার ছিল যা হয়নি। হয়নি বলে,
এই কথোপকথনেই আছে সেই তীব্র শ্লেষ, সেই ধুসর শ্লেষ। হ্যাম জানতে চাইছে ক্লোভ স্বাভাবিক বোধ করছে কি না! স্বাভাবিক? সে বোধ নিয়ে ক্লোভের কোনো মাথাব্যাথা নেই। সে জানাচ্ছে সে এ জন্য কোনো অভিযোগ করছে না। স্বাভাবিক বা অস্বাভাবিক তা নিয়ে তার কোনো অভিযোগ নেই। তাহলে অ্যারিস্টটলের স্বাভাবিকতার কথার মানে কি? বেশীরভাগ অস্তিত্বই কি ক্লোভের মত না যে স্বাভাবিক না অস্বাভাবিক তা নিয়ে মাথা ঘামাবার অবস্থাতেও থাকে না? বিশেষ করে সেই ব্যাপারের যাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হ্যামকে শব্দ খুঁজতে হয়। খুঁজে খুঁজে শেষে বলতে হয়, ‘Of this… this… thing’।

তবু জানার চেষ্টা। আধুনিক নিয়মতান্ত্রিক বিশ্বের নিয়ম খোঁজার এক অস্বাভাবিক স্বাভাবিক প্রয়াস। তার শেষে থাকে এক ক্লান্ত সংলাপ।

‘All life long the same questions, the same answers.’

নাটকের বা শিল্পের অনুকরণের যে চেহারাটা অ্যারিস্টটল তৈরী করতে চেয়েছিলেন, আলেক্সান্ডারের গুরু অ্যারিস্টটল, যেখানে ব্যবস্থা নিয়মের বাইরে চলবেই না, যেখানে ইরর‍্যাশনালের কোনো স্থান নেই, সেটাকে ভেঙে দিলেন বেকেট। আসলে ভাঙলো এক আধুনিকতা যা নিজেই নিজের কবর খুঁড়েছে কয়েক শতাব্দীর যুক্তিবাদ চর্চার শক্ত কাঠামো বানিয়ে। কাঠামোটাই প্রধান হয়ে উঠেছে, বিষয় নয়।

Nothing is funnier than unhappiness, I grant you that…

“Only a radical inquiry back into subjectivity—and specifically the subjectivity
which ultimately brings about all world-validity, with its content and in all its
prescientific and scientific modes, and into the ‘‘what’’ and the ‘‘how’’ of the
rational accomplishments—can make objective truth comprehensible and
arrive at the ultimate ontic meaning (Seinssinn) of the world. Thus it is not the
being of the world as unquestioned, taken for granted, which is primary in
itself; … rather what is primary in itself is subjectivity, understood as that
¨
which naıvely pregives the being of the world and then rationalizes or (what is
the same thing) objectifies it. (Crisis § 14, p. 69; VI 70)”

হাসের্লস-এর ভাবনা এগুলো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই বলে যাচ্ছেন এইগুলো। ইউরোপে বিজ্ঞানের ক্রাইসিস আলোচনা করতে গিয়ে সাবজেক্ট ও অবজেক্ট-এর প্রশ্নে এসব জানাচ্ছেন। বেকেটের আগে, অ্যারিস্টটলের অনেক পরে হাসের্লস। ক্রিটিকটা চলছিলোই। বিষয়ের খোঁজও চলছিল।

অ্যারিস্টটল কাঠামো গড়তে গিয়ে শিল্পকে যেখানে দাঁড় করিয়েছিলেন সেখান থেকে এ এক ভুবন দূরে। বিষয় সেখানে প্রাধান্য পায়নি তেমন, যত পেয়েছে অ্যারিস্টটলের ‘স্বাভাবিক’ বিশ্বের অনুকরণ। অ্যারিস্টটলের কবির কাজ দেখলেই এটা বোঝা যায়।

“The poet being an imitator, like a painter or any other artist, must of necessity imitate one of three objects- things as they were or are, things as they are said or thought to be, or things as they ought to be. The vehicle of expression is language- either current terms or, it may be, rare words or metaphors.”

এই নাকি কবির কাজ! বেকেট আঁকছেন যখন তখন এর কোনো শর্তই পূর্ণ হচ্ছে না। বরং ভাষা, যে নাকি বাহন, সেই নিজেকে নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে।

“HAMM:Yesterday! What does that mean? Yesterday!

CLOV (violently):That means that bloody awful day, long ago, before this bloody awful day. I use the words you taught me. If they don’t mean anything any more, teach me others. Or let me be silent.”

হয় নতুন ভাষা দাও, নয় আমাকে নিঃশব্দ হতে দাও।

এইটা আসল কথা। যে ভাষা শুধু অনুকরণ করবে সে ভাষা দিয়ে ব্যাপক শূণ্যতার বোধের মধ্যে দাঁড়িয়ে কাজ চলছিল না। অ্যারিস্টটলের যেখানে অ্যাকশন নিয়ে আদ্যন্ত ভাবনা, সেখানে বেকেটের নাটকে অ্যাকশন নেই বললেই চলে প্রায়। ভাষা ক্রমশ গড়িয়েছে মিনিমালিজম-এর দিকে। কিন্তু সময়ের চেহারা ফুটে উঠেছে। অ্যারিস্টটল ট্র্যাজেডি আর মহাকাব্যের তুলনা করতে গিয়ে বলছেন যে ট্র্যাজেডিতে বড্ড বেশী হাত-পা ছুঁড়ে চলতে হয়। যে শিল্প সব কিছুকেই অনুকরণ করে তা খুব পরিশীলিত নয়। অর্থাৎ তিনিও জানেন যে শিল্প শুধু অনুকরণ করে গেলেই চলবে না, তার কাজ আরো কিছুটা বেশী। এবং সেই সূত্রেই বলছেন,

“So we are told that Epic poetry is addressed to a cultivated audience, who do not need gesture; Tragedy, to an inferior public. Being then unrefined, it is evidently the lower of the two.”

কিন্তু আধুনিকতার কঠিন যুক্তিবাদী যান্ত্রিক কাঠামোটি ভেঙে পড়ার মুখে বেকেট দাঁড়িয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন শুরু-মধ্য-শেষ না, অ্যারিস্টটল কথিত কাঠামোতে চরিত্র, প্লট, ডিকশন, সঙ্গীত ও চিন্তা দিয়েও না, জ্ঞানের চেনা কাঠামোটিতে আঘাত করে এক নিপূণ ও ভয়ঙ্কর সঙ্গীত সৃষ্টি করা সম্ভব। সেই সঙ্গীত গড়ে তোলে মানুষের বিচ্ছিন্ন, ক্ষতবিক্ষত ও ক্লান্ত ভুবনকে।

হ্যাম ক্লোভকে বলে তাকে ঠিক কেন্দ্রে এনে দাঁড় করাতে। দাঁড় করানোর প্রক্রিয়ায় সে বলে,

HAMM: I feel a little too far to the left.
(Clov moves chair slightly.)
Now I feel a little too far to the right.
(Clov moves chair slightly.)
I feel a little too far forward.
(Clov moves chair slightly.)
Now I feel a little too far back.
(Clov moves chair slightly.)…

সে বাম, ডান, অগ্র-পশ্চাৎ, উন্নয়ন-অবনয়ন সব কিছু ছুঁয়ে ছুঁয়ে আসে। সে ঠিক প্রভু মানুষের মত কেন্দ্রে যেতে চায়। আর সেই মানুষের জন্য অপেক্ষা করে থাকে এক ভয়ঙ্কর সাদা-মাটা সত্যি। যা ধূসর। যা সূর্য অস্ত যাবার পরেও ধূসর। নেল তার অ্যাশবিনের থেকে মাথা বের করে কিছু আগেই বলে দিয়েছে আসল কথাটা।

“NELL (without lowering her voice): Nothing is funnier than unhappiness, I grant you that. But—
NAGG (shocked): Oh!
NELL: Yes, yes, it’s the most comical thing in the world. And we laugh, we laugh, with a will, in the beginning. But it’s always the same thing. Yes, it’s like the funny story we have heard too often, we still find it funny, but we don’t laugh any more.”

কমেডি আর ট্র্যাজেডির সীমানাটা গুলিয়ে যায়। গুলিয়ে যায় অ্যারিস্টটলের নিশ্চিত সাম্রাজ্য। আলেক্সান্ডারের মতন করেই তিনি ইতিহাসে ঘুমিয়ে পড়েন। জেগে থাকে আধুনিক এক অসুখ। এক অপরিপূর্ণ, অসম্পূর্ণ শূণ্যতা। জেগে থাকেন স্যামুয়েল বেকেট। জেগে ওঠে এক নতুন নন্দনতত্ত্ব মহাকাব্যিক বিস্তারে।

Posted in নাটক, নিবন্ধ | Tagged , , , , , | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

গদারঃ দরজা-ফ্রান্স,বাস্তব-আমেরিকা এবং খোকাবাবু


একদম শেষে কয়েক লাইন বাংলা সিনেমার জন্য রাখবো, হ্যাঁ?

দরজা

শব্দ একটা দরজা। সেই দরজা দিয়ে ঢুকে মানুষের ঘর। এতকালের। সেই ঘর ভাষা।

শব্দ একটা সংকেত। সংকেত যে কোনো ভাষা নির্মাণ করে। সংকেত দিয়েই চেনাচিনি।

সংকেত আছে ছবি আকারে। সোজা, লম্বা, গোল, বাঁকা বিভিন্ন রেখায় আছে। সেই সব জুড়ে জুড়ে শব্দ হয়, ছবি হয়, সিনেমা হয়।

“Words and images intermingle constantly. […] Why are there so many signs everywhere so that I end up wondering what language is about, signs with so many different meanings, that reality becomes obscure when it should stand out clearly from what is imaginary?”- (গদার ১৯৭৫-এ)

ফ্রান্স
এর পরে সিনেমা যা হবে তাই হয়েছে। এর আগে সিনেমা কি হবে কেন হবে অনেক অন্তহীন কথা সব!

“The cinema is quite simply becoming a means of expression, just as all the other arts have before it, and in particular painting and the novel. After having been successively a fairground attraction, an amusement analogous to boulevard theatre, or a means of preserving the images of an era, it is gradually becoming a language. By language, I mean a form in which and by which an artist can express his thoughts, however abstract they may be, or translate his obsessions exactly as he does in a contemporary essay or novel. That is why I would like to call this new age of cinema the age of “caméra-stylo”.
-(আলেক্সান্ডার আস্ত্রুক ১৯৪৮-এ)

ভাষা। রেলগাড়িটা স্টেশনে এসে ঢুকলো। দাঁড়ালো। ফিল্ম ক্যামেরা চলছে। ল্যুমিয়েররা ছাপ নিচ্ছে আলোর প্রতিফলনের। আমি দেখলাম। প্রতিদিন আমি দেখেছি এমন হাওড়া স্টেশনে, যে কোনো রেলের স্টেশনে। তাতে কি? কি দেখলাম? রেলগাড়ি? রেলগাড়ির ছায়াচিত্র? লোকগুলো কেমন বর্ণে, ঢঙে ঢেউ হয়ে যাচ্ছে হাঁটা দিয়েই? এই যে বললাম হাঁটা দিয়েই ঢেউ হয়ে যাচ্ছে, মানুষ হয় নাকি এমন ঢেউ? এ কি বাস্তব? অধি বা পরাবাস্তব? বস্তু কি আছে এতে? আমার ইন্টারপ্রিটেশন? আমারই? নাকি আপনারও? যদি আপনার না হয় তা হলে তিনি মেলাবেন কি করে, যিনি মেলাবেন আমাদের মেলাবেন?
মাথার উপরে ফ্যান ঘুরছে। ফ্যান। ব্লেড আছে। খুলে যেতে পারে যে কোনো মুহুর্তে। টেকনিক্যাল ফল্ট! লুই আর তার বৌ যাচ্ছে ঐ! ওদের গিলোটিনে চড়ানো হবে। হুঁশিয়ার রাজাদের দল! গিলোটিনের ধারালো ব্লেড কেটে ফেলবে মুন্ডু। ঘুরন্ত দুরন্ত ফ্যানের ব্লেড-ও পারে। শ্রমিকের হাতের আঙ্গুল কাটে কারখানায় গত কয়েক শতাব্দী ধরে। এখানে আমাকে হাওয়ায় আরাম দিচ্ছে গরমে। কেটে গেলে? বাস্তব কোনটা? আরাম নাকি আমার এই মৃত্যুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বসবাস?

সাউন্ডট্র্যাকে গদারের গলাঃ

But where to begin? But where to begin with what?… We could say that the limits of language are the limits of the world… that the limits of my language are the limits of my world. And in that respect, I limit the world, I decide its boundaries. (Two or three things I know about her-১৯৬৬)

আমেরিকা
“But is France living in the past? Have the French lost their position as artistic leaders of the film world, their cinematic tradition slowly but surely losing its luster?”

“Commercially speaking, the data is unambiguous. In 2004, six out of the 10 highest-grossing films in France were American, slightly down from seven in 2003 and eight in 2002. The single most successful film in France in 2004,”

“Les Choristes, released Jan. 14 in selected American cities as The Chorus and nominated this week for best foreign film and best song Oscars. Its hometown success is significant, as The Chorus is the rare recent French film that has more than held its own against an endless Hollywood invasion.” –(জন ফ্রসচ,২০০৫,ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক,সিনে সমালোচক)

এটা ১৯৪৯-র La Cage aux Rossignols রিমেক। বদ ছেলে-পুলে, সহানুভূতিশীল তন্বী শিক্ষিকা, ছেলেদের পালটে সব দেবদূতে পরিণত হওয়া তার প্রেরণায়। ন্যাকা-বোকা এবং স্রেফ কমার্সিয়াল গ্যাঁজলা।

“The film’s success can be explained away by the presence of an immensely likeable lead actor, Gérard Jugnot, an undemanding storyline fit for viewers of all ages, and an easy-to-swallow message: that inside every surly misfit is a gift waiting to be coaxed out. More bothersome than the film’s self-congratulatory moralism, however, is the bland, manufactured quality of the film-making. One gets the feeling, while watching The Chorus, that it might as well not be a French film at all, that the same movie could have been made by a Hollywood studio.” –(জন ফ্রসচ,২০০৫,ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক,সিনে সমালোচক)

শাহরুখ খান,অমিতাভ বচ্চন এবং গুরুকূলের ‘মহাব্বতে’র উৎপত্তি সিনেমা এই দুটি। সমালোচনার জন্য শুধু বলি ঐ ঐ।
সিনেমার ভাষা এর পরেও আমেরিকায়? কি নেই? গপ্প, অভিনয়, ক্যামেরা, গুচ্ছ টাকা। সিনেমা কই? কেন এই প্রশ্ন?

…………………………খোকাবাবু যায়,লাল জামা গায়.………………………………..

ফ্ল্যাহার্টি নানুক অফ দ্য নর্থ বানিয়েছিলেন। তথ্যচিত্র। আলাস্কার নানুকের জীবন নিয়ে। তত্ত্বের কাজে লাগাতে। নৃতাত্ত্বিক, ব্যবহারগত বৈশিষ্ট্য জানতে।গদারের মতে এটা একধরণের সিনেমা। অন্যটা আইজেনস্টাইন। গ্র্যান্ড থিয়েটার। ওডেসা-র জাহাজ। ব্যাটলশিপ পোটেমকিন। সেই সিঁড়িটা দিয়ে হাজারে হাজারে ওঠা-নামা করে। ধ্বনি, ছবি সব মিশে যায়। তথ্যচিত্র থেকেও যাওয়া যায় থিয়েটারে। থিয়েটার থেকেও আসা যায় তথ্যচিত্রে।

ফল, চরমে অ্যালা রেসনেইস, ক্রিস মার্কে। মাঝখানে গদার। সিনেমাগুলোতে তথ্যচিত্র, কাহিনী, সাংবাদিকতা, মন্তব্য, সমালোচনা, আড্ডা যে যেখানে পেরেছে জুড়ে বসেছে। প্রবন্ধের ধারকে কিছুটা জলরঙে চেপে দিয়ে ছেপে দেওয়া।

“The Americans are good at story-telling, the French are not. Flaubert and Proust can’t tell stories. They do something else” –(গদার,নারবনি)

কি সেটা?

“As a critic, I thought of myself as a film-maker. Today I still think of myself as a critic, and in a sense I am, more than ever before. Instead of writing criticism, I make a film, but the critical dimension is subsumed. I think of myself as an essayist, producing essays in novel form, or novels in essay form: only instead of writing, I film them. Were the cinema to disappear, I would simply accept the inevitable and turn to television; were television to disappear, I would revert to pencil and paper. For there is a clear continuity between all forms of expression. It’s all one. The important thing is to approach it from the side which suits you best” –(গদার,নারবনি)

ঋত্ত্বিক ঘটক। যুক্তি-তক্কো আর গপ্প।

বাস্তব

সমালোচকঃ কেন একটা হিরোশিমা মন আমুর বা একটা লাভেঞ্চুরা হয় না আমেরিকায়?
দার্শনিকঃ “Hiroshima” is inconceivable in America because there is not enough plot, L’Avventura because the plot makes no sense”

অ্যান্ড্রু সারিস-এর ‘মুসমান’ থেকে নিয়ে নিলাম আমার ইচ্ছে মত ঢঙে!

আইডিয়া থেকে আসে ইমেজ। ইমেজ থেকে আইডিয়া না। এম্পিরিক্যাল কালেকশন থেকে তত্ত্ব শুধু না তত্ত্বর ফলিত চেহারাকে দেখার চেষ্টা। আমেরিকায় ইমেজ থেকে আইডিয়া আসতে চায়। সিনেমায় ছবি না শব্দ কোনটা গুরুত্বপূর্ণ এটা একটা বেকার তর্ক। সকলের আগে আইডিয়া। সেই অনুযায়ী যা যা লাগবে তা তা।

তাকে এবারে ধাপে ধাপে রুমাল বের করার কাহিনী বানালে তাই। তাকে ধারালো করে ভাবাতে বাধ্য করলে তাই। লোকে দেখবে বলে শুধু কাহিনী বানালে ভাষা-টাষা নিয়ে কথা বলে লাভ নেই। সিনেমা বানালে এসব নিয়ে কথা হবে-টবে।

“Intelligence is to understand before affirming. It means that when confronted with an idea, one seeks to go beyond it… To find its limits, to find its opposite… […] the essence of the paradox is, in the face of what seems a perfectly self-evident idea, to look for the opposite” (গদার,১৯৭৫)

এই সব জন্ম দেবে দৃশ্যের, কাব্যের, প্রবন্ধের তুখোড় বজ্জাতির। প্যারাডক্সিক্যাল দেখাদেখি হবে। ডিম আগে না মুরগী আগে?

“To keep the natural beauty of real light on the screen, whatever movements Anna Karina and Belmondo may make around the room in “Pierrot le Fou” – that’s the cameraman’s job. That is what Godard was asking for when he said, in his usual hesitant way, “Monsieur, we are going to be simple”. Godard himself isn’t exactly simple. […] He wants to shoot without lights: he’s thinking of a shot in a Lang film which he saw six months ago, and of the left half of a shot by Renoir… he’s no longer sure which one, and he can’t really explain any further, but really it wasn’t at all bad. Then after having told me this, he sends me off the set, me and everyone else, while he thinks about the way he’s going to do it. And when I come back, I find that it’s no longer the same shot. And anyway, he would rather like that very white light which lit up the end of a table in a shot (unhappily a very short shot) from a Griffith film, and he has always wondered whether perhaps that very white light didn’t really come from the developing processes used in the Griffith laboratories, which must have been quite different from any other… and so on, and so on. No, Godard isn’t simple” (রাউল কোতার্দ,গদারের সিনেমাটোগ্রাফার বলছেন অ্যান্ড্রু সারিসকে,মুসমান)

পেডার গ্রোংগার্ড এই সব তুলে এনেছেন তাঁর প্রবন্ধ ‘একটা দুটো জিনিস যা আমি জানি ইউরোপ কিম্বা আমেরিকার সিনেমা সম্পর্কে’ প্রবন্ধে। এই সকল কথা কিছু কিছু ফিল্ম নয়ারের কথা, সিনেমা বিষয়ক সিনেমার কথা এবং কাটাকাটি। বড় বড় দাদা-দিদিরা আমাদের খোকাবাবুদের দিকে চেয়ে থেকেই চোখ নষ্ট করে ফেলেছে। গদারের নষ্ট আখ্যান তাদের কাছে খুব ভারী। ঋত্ত্বিক, সত্যজিত বিগত। মৃণাল এখন কাজের বাইরে। বাকী পাখি সব করে রব, কিন্তু রাতি পোহায়না।

Posted in চলচ্চিত্র, তথ্যচিত্র, নিবন্ধ | Tagged , , | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

গ্রীক দেবতা কৃষ্ণ ও আলেক্সান্ডার তাঁর বংশধারা- একটি রাজনৈতিক পুরাকাহিনী


                                             কৃষ্ণ আসলে গ্রীক দেবতাই

আলেক্সান্ডার তক্ষশীলা দখল করলেন। পুরুকে হারালেন। শুনলেন বন্দী পুরুর উত্তর। রাজার কাছে রাজার মত ব্যবহার চায় সে। শুনেটুনে তাকে বন্ধু করলেন তার সার্বভৌমত্বের বিনিময়ে। এবারে পরিকল্পনা করছেন বাকী দেশটাও জয় করতে হবে। এর আগে অব্দি তাঁদের কাছে হিন্দুদের দেশ ছিল সিন্ধুর অববাহিকা অঞ্চল অব্দিই। এবাব্রে এসে তিনি দেখছেন দেশটা অনেক অনেক বড়। সিন্ধু ছাড়াও আরেকটা বিরাট নদী আছে, যার কাছে সিন্ধুও শিশু মাত্র, সে নদী হল গঙ্গা। তার পাশ দিয়ে গড়ে উঠেছে অজস্র জনপদ। সমৃদ্ধি তাদের কল্পনাতীত। যা বিবরণ শুনছেন তাতে মনে হচ্ছে গোটা পৃথিবীর অর্ধেক সম্পদই রয়েছে সেখানে। এ জয় করা না হলে বৃথা যাবে তাঁর বিশ্ববিজয়ের পরিকল্পনা। তিনিই পৃথিবীর প্রথম সম্রাট যিনি বিশ্ববিজয় করবেন বলেই বেরিয়েছেন। শুধু নিজের প্রান্তসীমা বাড়ানো না, তার চেয়েও বড় উদ্দেশ্য তাঁর আছে। তিনি মহাপন্ডিত অ্যারিস্টটলের ছাত্র। তিনি চান এই পৃথিবীর শেষ দেখতে। জীবন তাঁর কাছে একটা চরম রোমাঞ্চকর বিষয়। কাজেই গঙ্গাতীরের রাজ্যগুলোকে অপরাজিত রেখে তিনি ফিরে যেতে পারেন না। তাঁর আর বাকী দুনিয়া জয়ের মধ্যে পথের কাঁটা শুধু মাত্র মগধ। এই পরিকল্পনা করার সময়েই তিনি জানতে পারলেন তিনিই প্রথম গ্রীক বিজেতা নন যিনি এই ভূখন্ডে এসেছেন। তিনি স্তম্ভিত।

এই অব্দি পড়ার পরে মনে হবে এ বুঝি কোনো কল্পকাহিনীর গল্প! এখান থেকে একটা অপ্রত্যাশিত মোড় চলে আসবে। আলেক্সান্ডারেরও আগে গ্রীক বিজেতা? ইস্কুল বা কলেজ পাঠ্য ইতিহাসে কোনো উল্লেখ নেই। এ কি করে সম্ভব? যাঁদের ইতিহাস একটু পছন্দের বিষয় তাঁরা ঘাঁটতে বসবেন চেনাজানা কিছু সূত্র। কই? কোত্থাও নেই তো! না থাকাটাই স্বাভাবিক। এই খবর মোটেও আমাদের চেনা ইতিহাস্র মোড়কে নেই। তাহলে কি আছে কল্পকাহিনীতেই। আবার ধোঁয়াশা? একদমই না। কেন নয় বলার আগে কয়েকটি অভিযোগের হালকা চালে দ্রুত মীমাংসা করে নিই।

পাশ্চাত্য পন্ডিতদের মতে আমাদের ইতিহাস নেই, আছে পুরাণ। আমাদের প্রাচীন পন্ডিতদের মতে আমাদের আছে ইতিহাস পুরাণ। এইরূপ হয়েছিল বলে শোনা গিয়েছে- এটাই যার ভিত্তি। অর্থাৎ লোকগল্পের ধারা। ইতিহাস তো নির্মাণের বিষয়। প্রতি মুহুর্তে সে নির্মিত হয়। কখনো ব্যাক্তির দ্বারা, কখনো সমষ্টি আবার কখনো রাষ্ট্রের দ্বারা। গত তিনশো বছরে আমরা এই ইতিহাসের নির্মাণ ও ধ্বংস নিয়ে যা যা দেখে ফেললাম এবং এখনো যা যা দেখে চলেছি আমাদের এই উপমহাদেশে তা প্রতিদিন প্রতিমুহুর্তে আমাদের মনে পড়িয়ে দেবার জন্য যথেষ্ট যে এ সকলই নির্মাণ মাত্র। রামের জন্মভূমি কি বাবরি মসজিদ যেটাই হোক না কেন সেখানে ইতিহাসের চেয়ে নির্মাণের চর্চা বেশী হয়ে পড়ে। তার ফল যে বিষময়তা তা আমরা সর্বাঙ্গে বেশ অনুভব করতে পারি, শুধু রোগের উৎসটির ব্যবস্থা করে উঠতে পারিনা। অস্যার্থ, ইতিহাসকে সামলে উঠতে পারিনা। কিন্তু এতো আজকের রোগ নয়, আর শুধু আমাদের রোগও নয়। এ রোগের মূলে যা আছে তা হল অপরিচিতের বা আপাত অপরিচিতের পরিচয় পদ্ধতির গোলোযোগ। সেই গোলোযোগ মানুষকে এতদূর অব্দিও বিক্ষুব্ধ করতে পারে যে বার্নার্ড শ-র মত মানুষও বলে বসেন, “Hegel was right when he said that we learn from history that man can never learn anything from history.” অথবা মার্ক টোয়েনের কথাই শুনুন। “The very ink with which history is written is merely fluid prejudice.”

তাহলে দোষ শুধু ভারতের নয়। দোষ শুধু আমাদের নয়। এ দোষ সর্বত্রই ছিল এবং আছে। আছের কথা আগে বলে নিই। জার্মানরা একদা যে নিজেদের আর্য এবং শ্রেষ্ঠ জাতি বলে ভেবেছিল সে দোষ ইতিহাসের ব্যাখ্যার। তেমনই আবার ইজরায়েলের অস্তিত্ব নিয়ে বিক্ষুব্ধ মধ্যপ্রাচ্যের কিছু ইসলামিক ইতিহাসবিদ এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট যে বলে থাকেন, জার্মানির মারণক্যাম্পগুলোতে ইহুদি নিধনের জেনোসাইড আসলে গল্পকথা সেও একই রকম ইতিহাসবিকৃতির ফসল। আর প্রাচীন দোষ বলতে গ্রীসের বা রোমের ইতিহাসচর্চা। সে কেমন তা এই আলেক্সান্ডারের কাহিনী সূত্রেই বোঝা যাবে।

আমরা ছোটবেলা থেকেই পড়ে এসেছি ভারত ইতিহাসের অন্যতম বৈদেশিক সূত্রগুলোর মধ্যে মেগাস্থেনিসের ‘ইন্ডিকা’ উল্লেখযোগ্য। সেই ‘ইন্ডিকা’ নামের আরো অনেক বিবরণ আছে আরো অনেকের লেখা তা জানতে গেলে ঘাঁটতে হবে ইতিহাস। সে যাই হোক, ‘ইন্ডিকা’-র মধ্যেই পাওয়া যায় এই চমকপ্রদ বৃত্তান্তটি, যে আলেক্সান্ডারের আগে ভারত আক্রমণে এসেছিলেন আরো লোকজন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন ডাওনিসাস এবং হেরাক্লেস। ডাওনিসাস এবং হেরাক্লেস যথাক্রমে গ্রীক পুরাণের অন্যতম দুই নায়ক এবং অর্ধ দেবতা। দুজনেই গ্রীক দেবরাজ জিউসের অবৈধ সন্তান। দুজনের ক্ষেত্রেই জিউস-পত্নী হেরা অন্যতম শত্রুর ভূমিকা পালন করেছেন। শুধু এখানেই যদি আমাদের বিষ্ময় শেষ হয়ে যেত তাহলে কথাই ছিল না। আমরা একে শুধুমাত্র পৌরাণিক গল্প বলে ধরে নিয়ে পড়ে ক্ষান্ত হতে পারতাম এবং আমোদ পেতাম। কিন্তু এ আখ্যান এখানেই থামেনি। এ গল্প শুরু করি হেরাক্লেস-এর কথা দিয়ে।

‘This Heracles, according to Megathenes, ‘was especially worshipped by the Suraseni, an Indian people (the Śūrasenas), where there are two great cities, Methora (Mathurā, Muttra) and Clisbora (Krishnapura), and a navigable river, the Jobanes (Jumnā), flows through their country. The garb worn by this Heracles was the same as that of the Theban Heracles, as the Indians themselves narrate; a great number of male children were born to him in India (for this Heracles also married many women) and one only daughter. Her name was Pandaea, and the country where she was born and which Heracles gave her to rule is called Pandaea after her [the Pāndya kingdom in South India] She had by her father’s gift five hundred elephants, four thousand horsemen, and 130,000 foot-soldiers….and the Indians tell a story that when Heracles knew his end was near, and had no one worthy to whom he might give his daughter in marriage, he wedded her himself, though she was only seven years old, so that a line of Indian kings might be left of their issue. Heracles then bestowed on her miraculous maturity, and from this act it comes that all the race over whom Pandaea ruled, has this characteristic by grace of Heracles.’

– [E.R. Bevan, “India in Early Greek and Latin Literature”, in E.J. Rapson, ed., Ancient India (Cambridge: Cambridge University Press, 1922) p. 423.]

সটান চলে এল কৃষ্ণের সঙ্গে তুলনা। সেই তুলনা শুধু যে কৃষ্ণেই থেমে থাকলো এমন না। সে তুলনা জড়ালো বলরামকেও। বলরামের হাতেই ছিল লাঙল অস্ত্র হিসেবেও। আরো যাকে জড়ালো তার কথায় আসবো পরে। তার আগে দেখে নিই এ তুলনার কোনো বীজ এখনো আছে কি না!

গ্রীক পুরাণ অনুযায়ী দেব হেরাক্লেস, রোমানরা যাঁকে হারকিউলিস হিসেবে চিহ্নিত করায় আমরা ব্রিটিশ কলোনিতে সেই নামেই বেশী চিনেছি সে দেবরাজ জিউসের অবৈধ সন্তান। আলকমেনে এত সুন্দরী ও বুদ্ধিমতী যে কবি হেসিয়ডের কথা অনুযায়ী মৃত্যুশীল মানব গর্ভে এমন আর কেউ জন্মাতেই পারে না। থিবস শহরে যখন সে পৌঁছয় এবং তার বিয়ের কথা হয় অ্যাম্ফিট্রিয়নের সঙ্গে তখন সে বেঁকে বসে। আগে তার ভাইদের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে হবে, তবে সে বিয়ে করবে। চললো অ্যাম্ফিট্রিয়ন টাফিয়ানস ও টেলেবোনসদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তখন। সেই সুযোগ নিলেন দেবরাজ জিউস। তিনি যুদ্ধ থেকে ফেরা অ্যাম্ফিট্রিয়ন সেজে এলেন। আলকমেনের সঙ্গে সহবাস করলেন। এবং কান্ডটা আরো গোলমেলে, কেন না আলকমেন আসলে জিউসেরই পুত্র পারসিউসের সন্তান ইলেকট্রিয়নের কন্যা। জিউস সহবাসের জন্য অ্যাম্ফিট্রিয়নের বিজয় কাহিনী শুনিয়েছিলেন আলকমেনেকে। আর সেদিনই রাত্রে ফিরে আসে আসল অ্যাম্ফিট্রিয়ন। তখন আলকমেনে অবাক হয়ে বলে সে তো একটু আগেই এসেছিল। এবারে জানা যায় জিউসের কান্ড। এবং এর পরে আলকমেনের সঙ্গে সহবাস করে অ্যাম্ফিট্রিয়ন। ফলে সেই রাতেই দুবার গর্ভবতী হয় আলকমেনে।

জিউস অলিম্পাস পর্বতে ফিরে গিয়ে যেদিন জন্ম হবে ওই দুই যমজের সেদিন জানান যে তাঁর ঔরসে এমন এক সন্তান আসছে যে পৃথিবী শাসন করবে ভবিষ্যতে। হেরা তখন খোঁজ নিয়ে সব কান্ড জানতে পারেন এবং জিউসকে দিয়ে শপথ করান যে পারসিউসের বংশধর কোনো সন্তানই একমাত্র পৃথিবীর শাসক হতে পারবে। জিউসের জানা ছিল যে আলকমেনে পারসিউসের বংশধারা। কাজেই তার আপত্তি হয়নি। আলকমেনার গর্ভে যথাসময়ে দুই সন্তানের বীজ জমাট বাঁধলো।একই গর্ভাধান চক্রের সময়কালের এই দুই পৃথক ঔরসের দ্বারা দুই সন্তানের বীজের সম্ভাবনা বা জন্মপ্রক্রিয়ার একটি নাম আছে। তাকে বলে হেটেরোপ্যাটারন্যাল সুপারফেকানডেশন।

জন্মের আগে হেরার খেলা শুরু হল। তিনি অলিম্পাস থেকে নেমে চললেন আর্গোস-এ। সেখানে ইউরিস্থিউসের জন্মের ব্যবস্থা করলেন পারসিউসেরই আরেক পুত্র স্থেনেলাসের স্ত্রী-র গর্ভে।গর্ভধারণের সাতমাসের মধ্যেই হয়ে গেল সেই প্রসব। আর প্রজননের দেবী ইল্লিথিয়াকে দিয়ে আটকালেন হেরক্লেস এবং তার যমজ ভাই ইফিক্লেস-এর জন্ম। ইল্লিথিয়া আড়াআড়ি পা করে বসে রইলেন বলে আলকমেনে জন্ম দিতে পারলেন না হেরাক্লেস-এর। হেরা চেয়েছিলেন এদের জন্মই না হোক। সে প্রচেষ্টা ব্যার্থ করে দিল আলকমেনের দাসী গ্যালান্থেসের বুদ্ধি। গ্যালান্থেস গিয়ে দেবী ইল্লিথিয়াকে বললো যে আলকমেনের সন্তানের জন্ম হয়ে গিয়েছে। শুনে লাফিয়ে উঠলেন ইল্লিথিয়া। ব্যাস- আলকমেনের গর্ভের থেকে হেরাক্লেসদের বেরোনোর রাস্তা গেল খুলে। সেই অপরাধে শাস্তিও হল গ্যালান্থেস-এর। তাকে উইজেল নামের এক ছোট্ট শিকারী স্তন্যপায়ী প্রাণী করে দেওয়া হল। কিন্তু জন্মালো হেরাক্লেস এবং তার সৎ ভাই ইফিক্লেস। পরে এই ইফিক্লেস-এর পুত্রই হবে হেরাক্লেস-এর সারথী।

সে যা হোক সন্তানটির জন্মের সময় থেকেই দেবী হেরা এর ক্ষতি করতে উদ্যত হয়েছিলেন। তিনি হেরাক্লেস-এর মা-র গর্ভে থাকাকালীন যে ক্ষতির শুরুয়াদ করেছিলেন তা জন্মের পরেও অব্যাহত থেকে যায়। যেমন ধরুণ শিশু হেরাক্লেস-এর বিছানায় সাপ পাঠানোর কাহিনীটি। সাপ পাঠানো হয়েছিল। ইফিক্লেস যখন ভয়ে কাঁদছে তখন শিশু হেরালেস অবলীলায় সাপটিকে নিধন করলো হাতের মুঠোয় চেপে। ঐ একই সাপের দমন কৃষ্ণের কালিয়দমন। শুধু সেটা কৃষ্ণের বাল্যলীলার অংশ। এবং সেখানে কৃষ্ণ সাপের মাথায় চড়ে নেচেছিল যমুনা নদীর হ্রদে। আবার হেরাক্লেসের জন্মের পরেই দেবী এথেনা, যিনি হেরার বোন এবং নায়কদের সহায়িকা তিনি তাকে নিয়ে চলে গেলেন হেরার কাছে। হেরার শিশুটিকে দেখে মাতৃস্নেহ প্রবল হল এবং তাকে স্তন্যপান করাতে গেলেন। শক্তিশালী শিশু এমন জোরে স্তন্যপান করলো যে হেরার লাগলো বিষম ব্যাথা। তিনি শিশুটিকে ছাড়িয়ে দিতেই তার মুখ থেকে ছিটকে বেরোলো দুধ। সেই দুধ থেকে জন্মালো মিল্কি ওয়ে নামের ছায়াপথ। এই দুধের কাহিনীই অন্য আকারে আছে পুতনা রাক্ষসীর আখ্যানে। বিষ মাখানো স্তনপান করিয়ে মথুরার অত্যাচারী রাজা কংসের আদেশে কৃষ্ণকে হত্যা করতে এসেছিল পুতনা। কিন্তু শিশু কৃষ্ণ সেই স্তনপানের মাধ্যমেই হত্যা করে পুতনাকে। আবার বলরামের সঙ্গে হেরাক্লেসের মিল শক্তিমতায় এবং হাতের অস্ত্রে। বলরামের ক্ষেত্রে ‘হল’ বা ‘লাঙল’, আর হেরাক্লেসের ক্ষেত্রে সে জায়গায় থাকছে ‘ক্লাব’- একপ্রকার শক্ত ডান্ডা। দুজনেই অমিতবিক্রম। শত্রুর শত্রু এবং মিত্রের প্রাণ। ব্যাস্‌, এইটুকুই তুলনা করার মতন আছে। এর উপরে ভিত্তি করেই হেরাক্লেসের ভারতীয় জন্ম এবং দেবতা হিসেবে পূজিত হবার গল্প চলে এল মেগাস্থেনিসের ‘ইন্ডিকা’-তে।

এবারে ইন্দ্রের পালা

এখানেই শেষ না। এই কৃষ্ণ-বলরামের গল্পের চেয়ে এক ইঞ্চিও কম বিষ্ময়কর নয় হেরাক্লেসকে দেবরাজ ইন্দ্র বানাবার চেষ্টা। যদিও বজ্রাধিপতি ইন্দ্রর সঙ্গে জিউসের তুলনাটা অনেক সহজ ছিল তবুও হেরাক্লেসকে বেছে নেওয়াটার অন্যতম কারণ হল মেগাস্থেনিসের বিবরণ। জিউসের বজ্র, চরিত্রদোষ, সব সময়ে কেউ তার চেয়ে বড় হয়ে উঠবে এই সব আশঙ্কার অনেকাংশে মিল দেখা যায় ইন্দ্রের সঙ্গে। হেরাক্লেস বারেবারেই বিয়ে করেন এবং স্ত্রীদের হেরার ষড়যন্ত্রে উন্মাদ হয়ে হত্যা করার মতন কান্ড থাকে তা ইন্দ্রের একদমই নেই। অথচ হেরাক্লেসকেই আনা হল তুলনায়। সহজ কারণ হল ভারতের সঙ্গে হেরাক্লেসের সম্পর্ক তৈরী হয়েছে মেগাস্থেনিসের মাধ্যমে, সেখানে জিউসের সঙ্গে এমন কোনো যোগ নেই। শুধু এই হেরাক্লেসই যে ইন্দ্র তা প্রমাণ করার জন্য কতদূর অব্দি গিয়েছেন অ্যালান ডাহ্‌লাকুইস্ট সেটাই দেখার।

ya anayat paravata suniti turvasam yadum
Indra sa no yuva sakha||

রিগ্‌বেদের (VI.45.1) এই সুক্তটির এর অনুবাদে তিনি বলছেন যে প্রচলিত অনুবাদটি সঠিক নয়। এখানে হবে তার উলটো মানে। অর্থাৎ যদু ও তুর্বসু ইন্দ্রকে নিয়ে এসেছে হবে, ইন্দ্র এদের নিয়ে এসেছে এই অনুবাদ হবে না। কারণ, এখানে ‘punar’ ও ‘astam’- যার অর্থ ‘আবার’ ও ‘ঘর’ এই শব্দদুটি নেই। সুতরাং ইন্দ্র বিদেশাগত। এই লেখার প্রসঙ্গে ডাহলাকুইস্ট জানিয়েছেন যে তাঁর সুইডিশ পান্ডুলিপি থেকে ইংরেজী অনুবাদের সময়ে তিনি বিশেষ মনোযোগ দিয়েছেন এটা বোঝাতে যে তিনি মেগাস্থেনিসের সমর্থন করছেন না, বা বিরোধও করছেন না। তিনি অন্যদের মত কোনো পূর্বধারণা এবং পক্ষপাতের বশবর্তী হয়ে এ কাজ করছেন না। তিনি শুধু অনুসন্ধান করছেন মাত্র। এখানেও তিনি অধ্যাপক হেমচন্দ্র রায়চৌধুরী কৃত অনুবাদের কথা ধারাই নিয়েছেন। রায়চৌধুরী তাঁর লেখায় বলেছিলেন ভারতীয়রা তাদের প্রাচীন বাসস্থানের স্মৃতি মনে রেখেছিল। রিগ্‌বেদের অন্য একটি সুক্তে I.30.9 তে একজন তাঁর পিতা কথিত ইন্দ্রের কথা বলছেন, যে ইন্দ্র তাঁদের প্রাচীন বাসস্থানের দেব। একটু আগে দেওয়া বৈদিক সুক্তটির কথা উল্লেখ করে তিনি বলছেন যে যদু ও তুর্বসুদের ইন্দ্র নিয়ে এসেছিলেন এ দেশে। আরেকটি সুক্তে ডাহ্‌লাকুইস্ট দেখাচ্ছেন,

Thus indeed he crossed with them now the Indus|
Thus indeed he fought with them now the veda||
[Rigveda, VII.33.33]

নিজেই এর পরে প্রশ্ন তুলেছেন যে ইন্দ্রের এই আগমন (যদিও এখানে ইন্দ্রের কথা স্পষ্ট করে নেই) কি একবারই হয়েছিল? নাকি অনেকবারের মধ্যে একবারের কথা হচ্ছে? এটা কি অন্য স্থান ছেড়ে চলে আসার যাত্রায় পার হওয়া? এমন নানান প্রশ্নের উত্তর এখানে নেই। কিন্তু অন্য কোথাও যদি খোঁজা হয় তাহলে? সে কথার উত্তরে ওনার উল্লিখিত আরেকটি সুক্তের কথা বলেই আমরা চলে আসবো আমাদের কথায়।

The bull has begotten a bull to fight; he the man, is born of a woman. He who as a General leads the men is a mighty warrior, desirous of combat, courageous.
[Rigveda, VII.20.5]

ডাহ্‌লাকুইস্ট বলছেন এখানে ইন্দ্রের কথা স্পষ্ট বলা আছে সেনানায়ক হিসেবে। না, কারো নাম নেই। সিন্ধু পার হওয়ার কথা আছে। বেশ আছে। তাতে কি? তাতে মেগাস্থেনিসের হেরাক্লেস আসে কোথা থেকে? যারা বেদের মধ্যে এত কিছু লিখে রাখলো তারা হেরাক্লেস নামটাকে রাখলো না? কেন? উত্তর নেই তার। কিন্তু যা আছে তার রাস্তাটা সোজা। ইন্দ্র এনেছেন যদু ও তুর্বসুদের। যদুরা ইন্দ্রপূজো করে। সে আমরা পুরাণে কৃষ্ণের গিরি-গোবর্ধন তুলে ইন্দ্রের বিরোধ করার কাহিনীতেই জানি। আবার মেগাস্থেনিস বলছেন সৌরশেনীয়রা হেরাক্লেসের পুজো করে। সৌরশেনীয়রা যদুর বংশ। সুতরাং এখানে ইন্দ্র হয়েছে হেরাক্লেস। এভাবেই চলেছে। এরপরে ডাহ্‌লাকুইস্ট নিয়ে এসেছেন ইন্দ্রের রাজা হবার প্রসঙ্গ এবং শচীর সুক্তটি।শচীর সুক্তে এসেছে ইন্দ্রের কন্যার কাহিনী। শচী তাঁর নিজের কথা বলতে গিয়ে বলছেন এক কন্যার কথা যিনি রাণী হয়েছেন। এর সঙ্গে মেলানো হয়েছে হেরাক্লেসের আপন কন্যা গমনের মেগাস্থেনিস কথিত কাহিনী। আরেক সুক্ত উদ্ধৃত করে ডাহ্‌লাকুইস্ট দেখাচ্ছেন যে ইন্দ্রও কন্যাগমন করেছেন [x 61.5-10]। শুধু তাই না, সেই কন্যা এর পরে পালিয়ে যায় দক্ষিণাত্যে। কথাটা হল যে সুক্তটি ধরে তিনি এটা দেখালেন সেখানে তিনি নিজেও বলছেন যে কোনো নামের উল্লেখ নেই। তাহলে ইন্দ্র কি করে বোঝা গেল?
বোঝা যায় না। ব্রহ্মার সঙ্গে তাঁর কন্যা স্বরস্বতীর যৌন সম্পর্কের কথাও আছে বেদ-এ। এই সুক্তটি সেই অনুসঙ্গেও হতেই পারে। বেদ সম্পর্কে যাঁরা গবেষণা করেন তাঁরা জানেন যে বেদের আখ্যানগুলি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। শুধু তাই নয়, যেহেতু মুখে মুখে তৈরী তাই অনেক সময়েই সেকালের শ্রোতা যে গল্প বা ঘটনা জানেন তার স্বল্প ছোঁয়াতেই সুক্তগুলো শেষ হয়ে যায়। তাই একালে কাহিনীগুলো বোঝা খুব সমস্যার। তার সঙ্গে আছে ভাষার দুর্বোধ্যতা। আছে বহুবার বেদ বিন্যস্ত হবার আখ্যান। বেদ কোনো একজনের লেখাও না। যে কারণে ডুমেজিল বলছেন,

“The authors of the poems who give praise to Indra sometimes make multiple
references to the most diverse parts of this tradition, sometimes exalt one particular point, but they do not trouble themselves to present an episode in full, or to establish, between their allusions to several episodes, a logical or chronological nexus; they do not even confine themselves to one variant…or balk at contradictions in the same hymn: what does it matter, when all the versions of these grand events work together for the glory, the ‘increasing,’ of the god?”

ইন্দ্র রাজা দেবতাদের। হারকিউলিস বা হেরাক্লেস রাজা ছিলেন না। ছিলেন জিউস। আবার হেরাক্লেস-এর মতই ইন্দ্র এক যুদ্ধ দেবতা। কিন্তু জিউস সেই অর্থে কোনো যুদ্ধ দেবতা ছিলেন না। পৃথিবীর প্রতিটি প্রাচীন মিথোলজির ক্ষেত্রে দেখা যায় যুদ্ধ দেবতাদের ছাঁচটা অনেকটা একই রকম। শত্রুদমন, পররাজ্য দখল, সুরাসক্তি এবং নারী আসক্তিতে ভরপুর তাদের আখ্যান। হেরাক্লেস-এর সঙ্গে গিলগামেশের-ও মিল আছে ইন্দ্রের মতন। ফলে গ্রীক ইতিহাস বলে কথিত এই সব পুরাণ ও ইতিহাস নির্ভর আখ্যানমালায় হেরাক্লেস ইরানও জয় করেছিলেন একই রকমভাবে। কাজেই মেগাস্তেনিসের এই বৃত্তান্ত আমাদের আজকের দিনে আমোদ দতে পারে, ইতিহাসের সন্ধান না। কিন্তু কেন এমন বৃত্তান্ত তৈরী হয়ে থাকে? এ প্রশ্নের উত্তর জানার আগে অলে যাব অন্য এক গ্রীক দেবতার আলোচনায়। সে দেবতার নাম ডাওনিসাস।

আলেক্সান্ডার নয়, প্রথম গ্রীক অভিযান ডাওনিসাসের নেতৃত্বে

প্লিনি, সোলানিয়াস, আরিয়ান এই সব গ্রীকোরোমান ইতিহাসবিদরা বলছেন এমন আক্রমণ আলেক্সান্ডারের আগে ঘটেছে এবং সেটার নেতা ছিলেন ডাওনিসাস স্বয়ং।

কে ডাওনিসাস? ইনি গ্রীক পুরাণের এক দেবতা যাঁর জন্ম গ্রীসের বাইরে এবং যিনি সুরা প্রস্তুত করার রহস্য শিখিয়েছিলেন গ্রীকদের। আরো আছে, ইনিই গ্রীসের প্রখ্যাত নাট্যচর্চার প্রাথমিক উদ্দেশ্য। এনার উৎসব উপলক্ষেই হত গ্রীসের নাট্যচর্চা। মুখোশ পড়ে এনার মূর্তি বা প্রতীককে সামনে রেখে এক দীর্ঘ্য শোভাযাত্রা হত গ্রীসে, যা যেত থিয়েটার এরিনা অব্দি যে শোভাযাত্রার মূল আকর্ষণ ছিল ওই এরিনাতে নাচ, গান এবং কোরাসের প্রতিযোগিতা। সেই কোরাসের প্রতিযোগিতার প্রথম বিজয়ী যার নাম জানা যাচ্ছে তিনি হলেন থেসপিস। তাঁরই হাতে প্রথম অনুষ্ঠিত হল দেবতা ডায়োনিসাসের বা অঞ্চলগত উচ্চারণ ভেদে ডায়োনুসাসের উদ্দেশ্যে রচিত ট্র্যাজেডি। সেই ট্র্যাজেডির আগেই অবশ্য তিনি সেরার পুরস্কার পেয়েছিলেন একটি ছাগল। গ্রীক এই দেবতার একটি প্রচলিত রূপ হল ছাগল এবং ট্র্যাজেডি শব্দটার মানে ‘ছাগলের গান’।

এই গোটা অনুষ্ঠানটির নাম ছিল ডায়োনিসিয়া। গ্রামাঞ্চলে একরকম হত, আর শহরে আরেকরকম। অবশ্য গ্রামাঞ্চলেরটাই গ্রীসের সবচাইতে পুরোনো ধারা। শহরেরটা তুলনায় নবীন ও ফলে সংস্কৃত। দেবতাটির সম্পর্কে আরো কিছু কথা বলা খুব জরুরী আমাদের এই আলোচনায় যাওয়ার জন্য। মাইসিনিয়া থেকে শুরু করে গ্রীসের নানাবিধ অঞ্চলে নানাবিধ মত আছে এই দেবতার আগমন সম্পর্কে, কেন না ইনি বহিরাগত। পন্ডিতদের মধ্যেও মতের ছড়াছড়ি। কেউ মনে করেন ইনি এশিয়ার সুদূর পূর্ব থেকে আগত এক দেবতা। আবার কেউ মনে করেন ইনি ফ্রিজিয়া থেকে এসেছেন গ্রীকদের দেবতাসারিতে। কেউ কেউ খুব পুরোনো মিনোয়ান গ্রীকদের মধ্যেও এঁর সদৃশ দেবতার কথা বলেন।

গ্রীক পুরাণের মতে ডাওনিসাস দেবরাজ জিউসের মানবী গর্ভের সন্তান।দেবরাজ জিউসের সঙ্গে মানবী সেমেলে-র সম্পর্কের কথা এক বৃদ্ধা বা ধাত্রীর ছদ্মবেশে জেনে যান দেবরাজ্ঞী হেরা। তিনি সেমেলেকে ওস্কালেন জিউস স্বয়ং এই গর্ভস্থ সন্তানের পিতা কি না তা জানার জন্য। সেমেলে মানবের ছদ্মবেশী জিউসকে যখন বলেন যে এ কথা জানতেই হবে তাকে তখন জিউস বাধ্য হয়ে স্বরূপ ধারণ করেন। সে রূপ বজ্র-বিদ্যুৎ সমন্বিত এক ভয়াবহ রূপ। কোনো মানুষের পক্ষে তা দেখার পরেও আর বাঁচা সম্ভব ছিল না। এবং সেমেলে মারা যান। জিউস তখন গর্ভস্থ ডাওনিসাসকে বের করে নিয়ে নিজের থাই-এর মধ্যে সেলাই করে নিয়েছিলেন। কিছুকাল পরে যখন জন্মের সময় হয় তখন এইজিয়ান সাগরের আইকারিয়া দ্বীপে তাকে নিয়ে যান। সেখানে জন্ম হল ডাওনিসাসের। এবারে গ্রীক ঐতিহাসিক হেরোডোটাসের কথায় শুনুন বাকীটা।
As it is, the Greek story has it that no sooner was Dionysus born than Zeus sewed him up in his thigh and carried him away to Nysa in Ethiopia beyond Egypt; and as for Pan, the Greeks do not know what became of him after his birth. It is therefore plain to me that the Greeks learned the names of these two gods later than the names of all the others, and trace the birth of both to the time when they gained the knowledge.
—Herodotus, Histories 2.146

এবারে এখানে সমস্যা আছে কয়েকটা। ফ্রিজিয়া বা দূর প্রাচ্যের মতনই স্থান নিয়ে বেশ বিরোধ আছে। আবার কখনো দেখা যায় যে সেমেলে না, পাতালের দেবী পার্সিফোনির গর্ভে জন্ম ডাওনিসাসের এবং রাণী হেরা এ খবর পেয়ে টাইটানদের পাঠায় তাকে হত্যা করতে। টাইটানরা তাকে ছিঁড়েখুঁড়ে হত্যা করে, তার হৃদয় ছাড়া সব কিছুই খেয়ে নেয়। দেবী আথেনা, রিয়া এবং ডিমিটার তাকে রক্ষা করেন পর্যায়ক্রমে। দেবরাজ জিউস তার হৃদয়টিকে নিজের থাই-এর মধ্যে নিয়ে তাকে আবার জন্ম দ্যান নতুন করে। কোনো কোনো গল্পে জিউস তাকে দিয়ে দ্যান সেমেলের গর্ভে এবং সেখানে আবার জন্ম হয় ডাওনিসাসের।

এই পূর্বোক্ত অংশটুকুর মধ্যেই দেখা যাচ্ছে ভারতীয় পুরাণের নানা অংশের সঙ্গে দেবতাদের কার্যকারীতার অসম্ভব মিল। থাই-এর থেকে সন্তানের জন্ম দেওয়ার এমন আখ্যান ভারতীয় পুরাণেও আছে। তার মধ্যে একটি বিখ্যাত আখ্যান হল নারদের আখ্যান। নারদকে ব্রহ্মা জন্ম দিয়েছিলেন থাই থেকে। আবার দেখা যাচ্ছে মাতৃগর্ভের বাইরে জন্মের অনেক আখ্যানের মধ্যে দুটি বিখ্যাত আখ্যান হল বলরাম এবং দ্রোণের আখ্যান। দ্রোণের ক্ষেত্রে তাঁর পিতা ভরদ্বাজ তাঁর জন্ম দিয়েছিলেন একটি দ্রোণ বা পাত্রের মধ্যে নিজের বীর্য্য ধারণ করে। সে বীর্য্য অপ্সরা ঘৃতাচিকে দেখে তাঁর উত্তেজনার ফল। আবার বলরামের ক্ষেত্রে জন্ম তাঁর মাতৃগর্ভের বাইরে। দেবকীর সন্তান বলরাম বাসুদেবের আরেক স্ত্রী রোহিণীর গর্ভে স্থানান্তরিত হন। এবারে দেখি ডাওনিসাসের দ্বি-জন্মের কাহিনীর মিল ভারতীয় পুরাণের সঙ্গে কোথায় আছে! প্রথমটি হল জরাসন্ধ। রাজা বৃহদ্রথের দুই পত্নীর গর্ভে ঋষিপ্রদত্ত ফলের দ্বারা জন্ম একটি শিশুর দুটি টুকরোর। সেই টুকরো দুটিকে ফেলে আসা হয়েছিল। তখন জরা রাক্ষসী তাদেরকে জোড়া লাগিয়ে দেওয়ায় জন্মায় একটি শিশু। তার জন্ম জরার দ্বারা এই সন্ধিতে হওয়ায় নাম তার জরাসন্ধ। এমন ভাবেই গান্ধারী যখন কুন্তী প্রথম পান্ডব সন্তানের জন্ম দিয়ে ফেলেছেন এই সংবাদ শোনেন এবং ধৃতরাষ্ট্রের যে আশা ছিল তার পুত্র প্রথম জন্মে কৌরবদের রাজসিংহাসনে বসবে সেই আশা পূর্ণ করতে না পারায় গর্ভের মধ্যে থাকা পিন্ডের পাত ঘটান, তখন ঋষি বেদব্যাস সেই পিন্ডকে ঘিয়ের মধ্যে রেখে আলাদা আলাদা করে জন্ম দ্যান শত সন্তানের। এখানেই বলে রাখা ভাল যে মহাভারতে কুন্তী না গান্ধারী কে আগে জন্ম দেবে সন্তানের এই প্রতিযোগীটার মিল আছে হেরাক্লেস-এর জন্মের আখ্যানের সঙ্গে। আবার একটি আগ্রহোদ্দীপক মিল হল ডাওনিসাসের দ্বি জন্মের সঙ্গে ব্রাহ্মণের দ্বিজত্বের প্রথায়। ব্রাহ্মণ যিনি হন, তিনি যখন উপবীত ধারণ করেন প্রথম সেইটি তাঁর দ্বিতীয় জন্ম।

এমন নানা মিলের মধ্যে শেষ মিলের কথা বলে চলে যাব আরো বড় প্রসঙ্গে। সেই মিলটি হল ডাওনিসাসের জন্মের পরে একটি কাহিনী অনুসারে দেবরাজ জিউস তাকে দিয়ে আসেন ন্যাসা পর্বতে বৃষ্টির দেবী এক নিম্ফের কাছে। সেইখানে নিম্ফেরা তাঁকে প্রতিপালন করেন। এই নিম্ফ হোলো গ্রীক পুরাণের সেই সব যুবতী কন্যারা যাঁরা অপূর্ব সুন্দরী, যাঁদের সামাজিক অর্থে কখনো বিয়ে হয় না, যে কারোর সঙ্গে তাঁদের ইচ্ছেতেন তাঁরা যৌন সংসর্গে লিপ্ত হতে পারেন। সাধারণ ভাবে এঁদের মৃত্যু নেই, তবে এঁরা অমর এমনও না। গীত, বাদ্যাদিতে এঁরা অসম্ভব দক্ষ। খুব সহজেই এঁদের সঙ্গে মেলানো যায় ভারতীয় পুরাণের অপ্সরাদের। এবং সেই মিল দেখলেই দেখা যায় বাঙালির শারদীয় উৎসবে ও একক ভাবেও পূজিত এক দেবতার সঙ্গে ডাওনিসাসের জন্মের পরের মিল। সেই দেবতাটি হলেন কার্তিক, যাঁকে ছয় কৃত্তিকা অপ্সরারা প্রতিপালন করেছিলেন জন্মের পরে। এখানেই বলে রাখি পৃথিবীর উপরে থাকা আকাশের ধারক দন্ড হিসেবে ন্যাসা পর্বতের মতন ভারতীয় পুরাণের কৈলাস পর্বতেরও বেশ খ্যাতি আছে কিন্তু। ল্যাটিনে এই ধারণ করে রাখার ধারণাটির নাম Axis Mundai।

ফিরে আসি কার্তিকের কাহিনীতে। কাহিনীটি সাধারণভাবে হল শিব সতীর দক্ষযজ্ঞে মৃত্যুর পরে দুনিয়া পরিভ্রমণ করে বেড়াচ্ছিলেন। এমন সময় তারকাসুর ব্রহ্মার কাছে বর লাভ করে যে শিবের সন্তান ছাড়া কেউ তাকে বধ করতে পারবে না। সেই সুযোগে মর্ত্য থেকে দেবলোক সব অধিকার করে ফ্যালে। তখন ব্রহ্মার কাছে দেবতারা যান এবং ব্রহ্মা-বিষ্ণুর পরামর্শে কামরাজ মদনকে পাঠানো হয় শিবের সঙ্গে শিবের সাধিকা পার্বতীর মিলন ঘটানোর জন্য। কিন্তু মদন শিবের সাধনাভঙ্গ করায় শিবের তৃতীয় নেত্রদ্বারা ভষ্মীভূত হয়। তখন দেবতারা সকলে এসে অনুরোধ করায় শিব পার্বতীকে বিয়ে করেন। কিন্তু শিবের বীর্য্য ধারণে পার্বতী একা অক্ষম হওয়ায় তাকে দেব অগ্নির কাছে দেওয়া হয়। অগ্নিও পারেন না। তখন দেবনদী গঙ্গার কাছে সে বীর্য্যকে রাখা হয়। সেই বীর্য্য থেকে ছটি সন্তান জন্মায় কালে কালে, যাঁদেরকে পালন করেন কৃত্তিকারা। এবারে পার্বতী সেই ছটি সন্তানকে জুড়ে একটি সন্তানে পরিণত করেন। তিনি দেব কার্তিক। এখানেও আরেকটি খুব কৌতুহলজনক মিল হল এই কৃত্তিকারা গ্রীক পুরাণের প্লেইয়াডেস নামের সাত নিম্ফের মতন যারা আবার ডাওনিসাসের শিক্ষাদাত্রী। এদের প্রসঙ্গ এবারের মত শেষ করে আপাতত ডাওনিসাসের কথাটা হয়ে যাক।

ডাওনিসাসকে যে শিক্ষাই দেওয়া হয়ে থাকুক না কেন তিনি আদতে এক বুনো দেবতা। শোভাযাত্রায় তাঁর রথ টানতো সিংহ জাতীয় কোন হিংস্র পশু। শোভাযাত্রার সামনের সারিতে থাকতো মেইনেডরা, যাঁরা নারী এবং মদিরাপানে উন্মত্তপ্রায়, আর ভাবাবেশে নেচে চলেছেন রাস্তা জুড়ে। তারপরেই থাকতো স্যাটিররা, যাঁদের গ্রীক পুরাণ অনুযায়ী উর্দ্ধাঙ্গ মানুষ, অধোভাগ ছাগলের মতন দেখতে। সেই সাজে সাজতো একদল ভক্ত। অন্যদল নানা বাদ্যযন্ত্র কিম্বা থিয়ারসাস জাতীয় অস্ত্র হাতে অংশ নিত সেই শোভাযাত্রায়। তাই এই ডাওনিসিয়ান রাইটের আরেকটি নাম ছিল থিয়াসাস। এবং সেই থিয়াসাস কালে কালে প্রভাবিত করেছিল রোমান জেনারেলদের বিজয়ের পরে রোমে অনুষ্ঠিত শোভাযাত্রাকেও। সেই প্রভাবের সূত্রে আমরা পেয়ে যাই রোমান কবি নোন্নাসের ‘ডাওনিসিয়াকা’ নামের এক বিপুল কাব্যগ্রন্থকে। এই ‘ডাওনিসিয়াকা’-তে থিয়াসাস-এর চরম উদাহরণ হল দেব ডাওনিসাসের ভারত বিজয়ের পরে গ্রীসে ফেরার শোভাযাত্রা। সেই শোভাযাত্রার বর্ণণা এমনকি প্রভাবিত করেছিল রোমান জেনারেলদের বৈদেশিক বা বড় কোনো বিজয়ের পরে রোমের ফেরার শোভাযাত্রার পদ্ধতিকে। কিন্তু যে দেশের বিজয় অভিযান থেকে ফেরার পরের এমন শোভাযাত্রা সে দেশের সঙ্গে এই দেবতাটির সম্পর্ক ঠিক কেমন তা এবারে জানা দরকার।

প্রাচীন গ্রীক ইতিহাসে ডাওনিসাস ও ভারত সম্পর্ক- যুক্তি, তক্ক আর গপ্পো

গল্পটা মোটামুটি একই রকমের। আলেক্সান্ডারের ভারত আক্রমণের প্রায় ৬৪৫১ বছর ৩ মাস আগে ডাওনিসাস এসেছিলেন ভারত আক্রমণ করতে। আলেক্সান্ডার আসা অব্দি সময়ের মধ্যে এখানে রাজত্ব করেছেন প্রায় ১৫৩ থেকে ১৫৪ জন রাজা- যাদের মধ্যে ডিওনিসাস নামের তিন রাজাও ছিলেন। একথা আমাদের জানাচ্ছেন ডিওডোরাস সিকুলাস (৬০-৩০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ) নামের এক সেকালের গ্রীক ঐতিহাসিক। এই তিন রাজার মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন ডাওনিসাস-ই হলেন আমাদের আলোচ্য দেবতা। তিনি ৫২ বছর রাজত্ব করেছিলেন এবং শেষে বৃদ্ধ বয়সে মারা যান স্বাভাবিক ভাবে। আরেকজন প্রাচীন গ্রীক ঐতিহাসিক মেগাস্থেনিসের বই-এর অংশ তুলে দিচ্ছেন এই আলোচনায়। নীচে সেই অংশটি দেওয়া হল।
“Dionysus founded cities and gave laws to those cities and introduced the use of wine among the Indians as he had done among the Greeks, and taught them to sow land, himself supplying the seeds…”
– Arrian, Indica
কিন্তু ডাওনিসাসের মৃত্যুর বিষয়টি এখানে কিছু জটিলতার সৃষ্টি করছে। সে জটিলতা কাটাতে আছে ডিওডোরাস সিকুলাসের ভাষ্য।
“Then he made a campaign into India, whence he returned to Boeotia in the third year bringing with him a notable quantity of booty, and he was the first man ever to celebrate a triumph seated on an Indian elephant..And the Boeotian and other Greeks and the Thracians, in memory of the campaign in India, have established sacrifices every other year to Dionysus.”
-Diodorous Siculus

কাজে কাজেই গ্রীক সূত্রানুসারে আলেকক্সান্ডারেরও আগে ছিল গ্রীক বিজয়ীরা। চাই কি এভাবেও বলা যেতে পারে যে গ্রীকরাই ভারতে সভ্যতা বলতে যা বোঝায় তার সূত্রপাত করেছিল। মজা হল এই যে এ কথার কোনো মানেই নেই ইতিহাসগত ভাবে। কেন নেই সেটা বোঝার জন্য আমরা প্রথমে ধরি দেবরাজ ইন্দ্রের কাহিনীটি। তাহলেই বেশ কিছুটা সমস্যা পরিস্কার হয়ে যাবে।
কিছু আগে কথা প্রসঙ্গে লিখেছিলাম ইন্দ্রের সঙ্গে ইরাকি নায়ক গিলগামেশেরও যথেষ্ট মিল। আক্কাডিয়ান কিউনিফর্ম অনুযায়ী যিনি গিলগামেশ তিনিই সুমেরিয়ান টেক্সট অনুযায়ী বিলগামেশ। আবার বহুকাল পরে আরবীতে তিনি এক দানব জিলজামিশ। তাঁর প্রসঙ্গে ররাজা অভিধাটি বারেবারে ঘুরে আসে। তিনি উরুক নগরের ধারের এক শক্ত প্রাকার তৈরী করেন যা তাদের রক্ষা করতো বহিঃশত্রুর হাত থেকে। ইন্দ্র-ও এমনি বৃত্রাসুরকে বধ করে তাঁর প্রথম খ্যাতি অর্জন করেন তাঁর গোষ্ঠীর জন্য সূর্য ও জলকে মুক্ত করে। গিলগামেশ এক ঐতিহাসিক চরিত্র বলেই মনে করা হয়। ইন্দ্র পৌরাণিক চরিত্র হলেও এভাবে ভাবাই সম্ভব যে তিনি কোনো প্রাচীন বীরের স্মৃতিতে গঠিত এক দেবতা। যেমন গিলগামেশ এককালে দেবতায় পরিণত হয়েছিলেন।

আবার ইন্দ্রের সঙ্গে অসম্ভব মিল আরেক ইরানীয়ান বীরের। আবেস্তা অনুযায়ী যাঁর নামের সঙ্গে উপাধি হল ‘ভিরিথ্রাঘ্‌ণ’ (Veretraghna)। তিনি অজি দহকা নামের অসুরকে দমন করেছিলেন। আবার বৃত্রাসুরকে দমন করার পরের থেকে ইন্দ্রের উপাধি ‘বৃত্রাহন’ হয়। এই ইরানীয়ান নায়কের নাম থ্রায়েটোনা। আরো অনেক মিল আছে এনার সঙ্গে। ‘অহি’ (শত্রু) যা বৃত্রের অন্য পরিচয় সেই পরিচয়ের সঙ্গে মিল আছে ‘অজি’-র। দুজনের অস্ত্রের নামও কাছাকাছি। ইন্দ্রের অস্ত্র ‘বজ্র’, থ্রায়েটোনার ক্ষেত্রে ‘ভজ্র’ নাম সে অস্ত্রের। আবার ‘ভজ্র’ বা ‘বজ্র’ অনেকটাই হেরাক্লেস-এর ‘ক্লাব’ জাতীয় অস্ত্রের সঙ্গে মিলে যায়।

এখানে একটা ইরানীয়ান পৌরাণিক কাহিনী জানালে ইরানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কটা বোঝানো সহজ হবে। থ্রায়েটোনা তাঁর তিন সন্তান সালম, তোজ আর এর্জি-র মধ্যে পৃথিবী ভাগ করতে বসলেন। প্রথম সন্তান চাইলো সম্পদ, তাই তিনি তাকে দিলেন পশ্চিম অংশ। দ্বিতীয় সন্তান চাইলো বীরত্ব। তিনি তাকে দিলেন পূর্বদিক। আর ছোট ছেলে চাইলো আইন ও শৃঙ্খলা। তাই তিনি তাকে পৃথিবীর সর্বোৎকৃষ্ট অঞ্চল দুটি দিলেন। সেই অঞ্চল দুটি হল ইরান ও ভারত। ইন্দ্র যেমন সোমরসিক, জন্মের কিছু পরেই ইন্দ্র সোমরস পান করতে শুরু করেন এবং বিপুল চেহারা ধারণ করেন সোম পান করলেই, এই থ্রায়েটোনাও পৃথিবীর প্রথম চারজনের মধ্যে একজন যিনি ‘গাওকেনেরা’ গাছের থেকে ‘হাওমা’ তৈরী করেন, যা স্বর্গীয় পানীয়। আবার এই পানীয় সূত্রেই এঁর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ফেলা যায় ডাওনিসাসের।ডাওনিসাস হলেন মদিরার গ্রীক দেবতা। তিনিও দেবতা ও মানবের সংমিশ্রণ। সুতরাং এ পরিচয়গুলো দিয়ে আসলে কিছুই প্রমাণ করা যায় না। তবু এই জাতীয় প্রমাণেড় প্রচেষ্টা বারেবারেই উঠে আসে। তার কারণগুলোকে কিছুটা বোঝার মাধ্যমেই আমরা এই লেখা সমাপনের দিকে যাব।

সভ্যতা, সাম্রাজ্য ও গৌরবগাথা

আলেক্সান্ডার এমন একটা দেশে পৌঁছোলেন যেখানে চাষ হয়, যেখানে সম্পদ সঞ্চিত হয়েছে। যেখানে মানুষ গ্রাম, নগর সব মিলিয়ে এক সভ্যতা গড়ে তুলেছে যা খুব দুর্বল নয়। বহুলাংশে স্বয়ংসম্পূর্ণ। তাঁর নিজের রাজ্য ম্যাসিডোনিয়া তাঁর পিতা ফিলিপের আগে অব্দিও গ্রীক বলেই স্বীকৃতি পেত না বাকী নগর-রাষ্ট্রগুলোর কাছে। এথেনস বা স্পার্টা বা থেবস মনে করতো ম্যাসিডোনিয়ানরা বর্বর। তাদের গণতন্ত্রহীনতা, বংশপরম্পরায় রাজশাসন, রাজার বহুবিবাহ তাদের কৃষিসভ্যতা সমস্ত কিছুই তাদের অ-গ্রীক করে রেখেছিল। কিন্তু ফিলিপস এবং তাঁর নিজের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি এক সময়ে তাঁকে সমস্ত গ্রীসের ‘হেজিমন’ বা একচ্ছত্র অধিপতি করে তুলেছিল।

কিন্তু রাস্তাটা ছিল রক্তাক্ত। পিতা ফিলিপসের প্রবল ভালবাসা থেকে যে যাত্রা শুরু সে যাত্রাপথে পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, মায়ের প্ররোচনায় পিতার অন্য স্ত্রী-র গর্ভের সন্তানের হাতে যাতে ক্ষমতা চলে না যায় তার দিকে সতর্ক থাকা, নিজস্ব সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করা সবই ছিল। এমনকি হয়তো বা পিতাকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করাও আসলে তাঁরই কাজ ছিল শেষত। তাঁর মা ওলিম্পিয়া ছিলেন অতি উচ্চাভিলাষীণি। এতটাই যে, নিজের স্বামীর নিজের দেহরক্ষীদের সর্দারের হাতে গুপ্তহত্যার পরে পরেই স্বামীর অন্য প্রিয়তমা পত্নীকে তার কন্যা সমেত জ্যান্ত পুড়িয়ে ফেলতেও দ্বিধা হয়নি তাঁর। সবটাই, সমস্তটাই ক্ষমতার লোভে।

সে ক্ষমতা হাতে পেলেও এশিয়া অভিযানের আগে অব্দি আলেক্সান্ডার কখনো তার পরিপূর্ণ স্বাদ পাননি। ম্যাসিডোনিয়া রাজাশাসিত রাজ্য হলেও সেখানে রাজা কিন্তু দরবারের সদস্যদের ধরা ছোঁয়ার বাইরের কিছু ছিল না। রাজাকে যে কোনো কাজই করতে হত অভিজাতদের পরামর্শ নিয়ে, যারা জমি জমা এবং দাসেদের মালিক ছিল। এশিয়াতে একের পরে এক রাজ্য জয় করতে করতে দেখলেন এখানে এক রাজতন্ত্র চলে বিভিন্ন জায়গায়, যে রাজতন্ত্রের মূল শক্তির উৎস হল দৈবী ক্ষমতা। রাজারা দেবতার বংশধর। মিশরে বা তখনকার ইজিপ্টে প্রথম এমন এক দৈবী ক্ষমতার সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটলো বিজিত মিশরের পুরোহিতদের তাঁর প্রতি উপাধি বর্ষণের কল্যাণে। এরপরে জেরুসালেম কিম্বা পারস্যেও একই অভিজ্ঞতা হল তাঁর। পারস্যের রাজধানীতে যে আলেক্সান্ডার এসে পৌঁছেছিলেন সেই আলক্সান্ডার শুধুমাত্র আর গ্রীক দার্শনিক অ্যারিস্টটলের ছাত্র নন, সামরিক শক্তি ও বুদ্ধিমত্তায় অতি কৌশলী যোদ্ধা-সেনাপতিই নন, তিনি নিজে এক রাজদর্শনের সূচনা করছেন তখন। পারস্যর রাজাদের মত আলখাল্লা পরা থেকে শাহেনশাহ উপাধি ধারণ, কিম্বা দরবারের হস্ত চুম্বন বা সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাতের প্রথা তখন তাঁর মাথায় ঢুকে গিয়েছে। নিজেকে ঈশ্বর ভাবছেন তিনি। এই ভাবনা তাঁর বিরুদ্ধে তাঁরই ম্যাসিডোনিয়ান সেনাবাহিনী এবং সঙ্গীদের মধ্যে বারেবারে বিক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে।

তার সঙ্গে রয়েছে নতুন নতুন সাম্রজ্যের বিজিত অংশের পুরানো সেবকদের সঙ্গে তাঁর সঙ্গীদের ক্ষমতার বাঁটোয়ারা নিয়ে স্বার্থের লাগাতার দ্বন্দ্ব। নতুন নতুন পদ্ধতির উদ্ভব ঘটাতে চেষ্টা করছেন সেই সব দ্বন্দ্ব সমাধান করতে। তাঁর করা সমাধানের থেকে সূত্র নিয়েই একদিন ভারতের বিজয়ী মুঘল বাদশাহ আকবর ভিন্ন ভিন্ন জাতিতে বিয়ে থেকে শুরু করে, অধীকৃত অঞ্চলের রাজকর্মচারী এবং সেনানায়কদের সাম্রাজ্যের সঙ্গে স্বার্থের সূত্রে বেঁধে ফেলার পদ্ধতি নেবেন নিজের সাম্রাজ্য বাড়াতে ও রক্ষা করতে। আলেক্সান্ডার তো সেকেন্দর শাহ-ও বটে। আকবর তাঁর কাহিনী জানবেন না তা হয় না। অর্থাৎ একদিকে নিজের ভূমিতে পরিচয়ের এবং যথাযথ স্বীকৃতির অভাব, ব্যাক্তিগত দক্ষতার পরিপূর্ণ সম্মাননাপ্রাপ্তির অমিত ইচ্ছে, অন্যদিকে অন্যতর ভূখন্ডের থেকে প্রত্যাশার অধিক প্রাপ্তি- এই দুই-এর সংমিশ্রণ হল আলেক্সান্ডারের রাজনৈতিক দর্শন।

এই দর্শনে ভারতের ঠাঁই-ও হয়েছে। গ্রীকরা ভারতের কথা জেনেছে এশিয়া মাইনরের সূত্রে। জেনেছে পারসিক সাম্রাজ্যের সূত্রে। পারসিকরা যখন গ্রীস জয় করে তখন থেকেই তাদের নানা ভাষা, নানা ধর্মীয় কর্মচারীদের মধ্যে একাংশ গ্রীকও বটে। এছাড়াও ছিল বাণিজ্য সূত্রে জানাও। আক্লেক্সান্ডারও জেনেছিলেন। এই পারসিক আকামেনাইড সাম্রাজ্যের ভারতীয় যোদ্ধারাও সূত্র ছিল যারা গ্রীস আক্রমণেও গেছিলো ৪৮০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ-তে। আবার পারসিক বাহিনীর অন্তর্গত ভারতীয়দের সঙ্গে আলেক্সান্ডারের গ্রীক বাহিনীর যুদ্ধও হয়েছিল ৩৩১ খীঃপূর্বাব্দে। আলেক্সান্ডারের আগের গ্রীক সূত্রগুলো যেমন হেকাটাইওস, হেরোডোটাস কিম্বা পারসিক সম্রাট আর্টেক্সেরেস মেমন-এর ব্যাক্তিগত গ্রীক চিকিৎসক কটেসিয়াস এভবেই জেনেছেন ভারত সম্পর্কে। সে ভারত এক অদ্ভূত দেশ। সে দেশে নানা অদ্ভূত ব্যাপার-স্যাপার ঘটে। আজিব তার জীব-জন্তু-মানুষ। তাদের শক্তি প্রচুর, কিন্ত তারা পররাজ্য দখলে ভারতীয় উপমহাদেশের বাইরে যায় না। এমন ভাবে নানা গল্প-গাথার মাধ্যমে তাদের লেখায় তথ্য সংগৃহীত হয়েছে বলে তাদের ব্যাখ্যান বা বয়ান হয়েছে বিচিত্র। যেমন হেরোডোটাস পারসিক ও বৈদিক ভারতীয়রা উভয়েই পূজো করেন এমন দেবতার কথা বলতে গিয়ে বলছেন মিত্র-র কথা। মিত্র অর্থাৎ সূর্যদেব। কিন্তু হেরোডোটাস তাঁকে দেবী করেছেন, তিনি হয়ে গিয়েছেন মিত্রা। এমন নানা সূত্র থেকে আলেক্সসান্ডারও জেনেছিলেন গ্রীক দেবতা ডাওনিসাসের ভারত আক্রমণের কথা অবশ্যই। সেখান থেকেই তাঁর রাজদর্শনের সূত্রে নতুন অবতার হিসেবে তাঁর আগমনের স্বপ্নও মনের কোণে ঠাঁই নিতে পারতো। সেই স্বপ্ন প্রভাবিত করতে পারতো তাঁর সঙ্গী মেগাস্থেনিসের বিবরণকেও।

কেন এ কথা তার জন্য একটি সুত্র উদ্ধৃত করি এখানে। ই আর বিভান তাঁর ‘ইন্ডিয়া ইন আর্লি গ্রীক অ্যান্ড রোমান লিটারেচার’ লিখছেন,

“One member of Alexander’s suite, his chief usher (είσαγγελεύs), Chares of Mytilene, is quoted as saying the Indians worshipped a god Soaroadeios, whose name being interpreted meant ‘maker of wine’. It is recognized that the Indian name which Chares must have heard was Sūryadeva, ‘Sun-god.’ Some ill-educated interpreter must have been mislead by the resemblance of sūrya ‘sun’ to surā ‘wine.’Even Megasthenes depended, of course, mainly upon his Indian informants for knowledge of the peoples on the borders of the Indian world, and he therefore repeated the fables as to the monstrous races with one leg, with ears reaching to their feet and so on, which had long been current in India and had already been communicated to the Greeks by Scylax and Hacataeus and Ctesias.”

তা সূর্য যদি সুরা হয়ে ওঠে আলেক্সান্ডারের নিজের লোকের কাছে তাহলে ডিওনিসাসের বা হেরাক্লেস-এর পূজো কৃষ্ণ-বলরাম বা শিবের হয়ে উঠতে অসুবিধে কি? বরং আলেক্সান্ডার এবং তাঁর পরবর্তী এশিয়ান হেলেনিয়ান শাসকদের কথা ধরলে তাঁরা নিজেদের দেবতার অংশ বা বংশধর হিসেবেই দেখাতে চাইতেন যখন, তখন এ তো সুবিধেই দেবে। এই সৌরশেনীরা মথুরায় হেরাক্লেস পূজো করে এই কাহিনীটা আরো আরো অনেক জোর পেয়ে যেত যদি আলেক্সান্ডার সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের শাসক হয়ে উঠতে পারতেন। ব্রিটিশ বা ইউরোপিয়ানরা এই উপমহাদেশ দখল করার পর থেকে আর্যরা এসে ভারত সভ্যতার সব উৎকৃষ্ট ফসল ফলিয়েছে এবং তার আগে কিছুই ছিল না, বা এখানকার আগের অধিবাসীদের এতে প্রায় কোনো অংশভাগ নেই জাতীয় যে আখ্যান সিন্ধু সভ্যতায় বেশ কিছুটা মার খায়, তেমনই অল্প-বিস্তর মার খেত- কিন্তু মোটের উপর এটাই বেশ শক্ত মত হয়ে জাঁকিয়ে বসতে পারতো ইন্ডোলজির বাজারে। সাম্রাজ্যের গৌরব, বিজয়ীর গর্বিত বংশধারার প্রতিষ্ঠা এতে সুবিধাজনক হয়। খেয়াল করে দেখলে দেখা যাবে আলেক্সান্ডারের মতনই দীর্ঘ্য ঐতিহাসিক সভ্যতার স্বীকৃতির অভাব ব্রিটিশদেরও ছিল, সেই জন্যেই পালে হাওয়া পেয়েছিল ইন্ডোলজির এরিয়ান তত্ত্ব। আলেক্সান্ডারের দুর্ভাগ্য যে তিনি এই উপমহাদেশ জয় করতে পারেননি। নইলে ওই মার্ক টোয়েনের মতামত ধরেই বলা যায় এই জাতীয় ইতিহাসের ‘প্রেজুডিস’-এর কালিতে ভারতীয় সভ্যতাটার জন্মই হয়তো হয়ে দাঁড়াতো গ্রীক সভ্যতার ছত্রছায়ায়। আলেক্সান্ডার হয়ে দাঁড়াতেন ডাওনিসাসের বংশধর যিনি দেবাদেশে ভারত জয় অরতে এসেছিলেন ভারতীয়দের অধোগতি থেকে রক্ষা করতে।

Posted in প্রবন্ধ, রাজনীতি, সমাজবিজ্ঞান, সমালোচনা | Tagged , , , , , , , , , , , , , , , | 4 টি মন্তব্য

করবী তরুতে সেই আকাঙ্খিত গোলাপ ফোটে নি


কোনো কোনো সময় আসে যখন বিশ্ব বাজারে মন্দা তখন জাহাজ ভাসিয়ে রাখার থেকে তাকে ডকে এনে ভেঙে-টেঙে লোহা করে ফেলা ভাল, স্ক্র্যাপ এমন সব। পড়তায় পোষায় তবু। জাহাজ মালিকরা জানেন এ সব। বাবু কমলকুমার কি বিনয়ের বেঁচে থাকার সময়ে বড্ড দামী জাহাজ ছিল তারা, তাই ঘাটায় এনে ফেলে তাকে ভেঙেছি আমরা।

অন্ধকার, তোমাকে গল্প নয় বলে যে কথা শোনাতে বসি সেই সব অবিনয়ী কথা।

“সুস্থ মৃত্তিকার চেয়ে সমুদ্রেরা কত বেশি বিপদসংকুল
তারো বেশি বিপদের নীলিমায় প্রক্ষালিত বিভিন্ন আকাশ,
এ-সত্য জেনেও তবু আমরা তো সাগরে আকাশে
সঞ্চারিত হ’তে চাই, চিরকাল হ’তে অভিলাষী,
সকল প্রকার জ্বরে মাথা ধোয়া আমাদের ভালো লাগে ব’লে |”

-বিনয় মজুমদার/ ফিরে এসো চাকা

আমরা, ঢ্যামনার দল মাথা ধুতে ভাল বাসি। গু-মুতে মাখামাখি আমরা মাথা ধুয়ে টুয়ে জ্বরের খোঁয়াড়ি টাটিয়ে নিয়ে কাব্যচর্চা বা ভাষার স্পন্দন গুণি যেন হাতের কয়েন। যেন সব হিসেব করা যায়। তারপরে বাংলা ভাষা। বাংলা ভাষা, যা নিয়ে দুই সাহিত্যিক বাজারী পত্রিকায় খুব চব্ব চাটিয়াছেন। বিমল লামা বাংলা উপন্যাস লিখেছেন। ‘নুন চা’- চায়ের দেশে নুনকথা। এ নাকি বাংলা ভাষার সাম্প্রতিক কালের সবচেয়ে ভাল লেখা! সার্টিফিকেট দেবেশের। দেবেশ রায়ের। সুনীল তো দুঃখে মরে যাচ্ছিলেন পাহাড়ে মানে দার্জিলিং পাহাড়ে বাংলা ভাষা থাকবে না আর তাই ভেবে। তাই দেবেশ সার্টিফিকেট সহযোগে দুঃখ লাঘব করেছেন। আহারে! বাংলা ভাষা থাকবে না পাহাড়ে? গোর্খারা সব বাংলা বলবে না? রাজবংশীরা বাংলা বলবে না? বঙ্গভঙ্গ কে ঠেকাবে? এ সুনীল নাকি আবার এই সময় ওই সময় সব লিখেছেন-টিকেছেন। বঙ্গ বলিতে ইতিহাস কাহাকে বুঝায়? দার্জিলিং পাহাড়ে কোন বাঙালিরা থাকতো? সে সব জানা নেই কি ওনার? কি বালখিল্য ন্যাকামো মাইরি! এই সুনীল নাকি কমলকুমারের আগে-পিছে? নাকি চ্যালা? হায় বাবু কমলকুমার! হা বিনয়!

“তবুও কেন যে আজো, হায় হাসি, হায় দেবদারু,
মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়! ”

যাবে না? বিনয় যাবে না? মানুষ মানে তো এই সব। ন্যাকা ন্যাকা বয়ান বানাবে কবিতার। চব্ব ঘটাবে তুমি মরে গেলে! উপন্যাস ঘটাবে বহুতর প্রসবে দীর্ণ, দীর্ণতায় প্রসব। হবে না বিনয় এমন? মানুষের গায়ে বিষ, নিঃশ্বাসে বিষ। হাতটি বাড়ানো যা তাতে হাত না গলা কি চেপে ধরার ইচ্ছে কে জানে?

‘আলো ক্রমে আসিতেছে’।

কোনো মানে হয়? বাবু কমলকুমার আস্ত একটা উপন্যাস শুরু করে দিলেন এইভাবে! আলো নাকি ক্রমে আসিতেছে। পড়তে গিয়ে যদি ফসকে যাও, তাহলে ‘আলো কমে আসিতেছে’ মনে হবে। আলো আমাদের সত্যিই কমে আসছে। আবার উল্টোদিকে দ্যাখো। অন্তর্জলী যাত্রার এই প্রথম লাইনটাতেই আসলে বলে দেওয়া হয়েছে উপন্যাস মানে কি! কমলকুমার মাননীয় মজুমদার উপন্যাস বলতে কি বোঝেন! ‘আলো ক্রমে আসিতেছে’- এই হোলো উপন্যাস। একেবারে আলো এসে যবে না। ক্রমে ক্রমে আসবে। আসবে, আসতেই থাকবে, এমনকি শেষ পাতায় শেষ শব্দেও- না সে কথা এখন থাক।

“এ নভোমন্ডল মুক্তোফলের ছারাবৎ হিম নীলাভ। আর অল্পকাল গত হইলে রক্তিমতা প্রভাব বিস্তার করিবে, পুনর্ব্বার আমরা, প্রাকৃতজনেরা, পুষ্পের উষ্ণতা চিহ্নিত হইব। ক্রমে আলো আসিতেছে।”
– কমলকুমার মজুমদার/ অন্তর্জলী যাত্রা

এই দেখুন, মালের কেমন বিষ! মুক্তোফলের ছায়াবৎ হিম নীলাভ। বিষাক্ত নীল এ। বাবু কমলকুমারের ভাষায় ‘পুষ্পের উষ্ণতা চিহ্নিত হইব’ বলে থেমে যায়। উষ্ণতায় নয়। দেখুন একবার পষ্ট করে। হিম নীলাভ মুক্তাফলের ছায়াবৎ আমাদের হিম ছিল গায়ে, আমরা যারা প্রাকৃত যারা পুষ্প, তারা উষ্ণতা চিহ্নিত হইব। চিহ্নিত কেন? মাথা চুলকোও! কেন চিহ্নিত? বাবু কমলকুমারে কেন সে চিহ্ন আঁকিবার প্রয়াস? আমরা কবিতা কি সকল?

“এরূপ বিরহ ভালো ; কবিতার প্রথম পাঠের
পরবর্তীকাল যদি নিদ্রিতের মতো থাকা যায়,
স্বপ্নাচ্ছন্ন, কাল্পনিক ; দীর্ঘকাল পরে পুনরায়
পাঠের সময় যদি শাশ্বত ফুলের মতো স্মিত,
রূপ, ঘ্রাণ, ঝ’রে পড়ে তাহলে সার্থক সব ব্যথা,
সকল বিরহ, স্বপ্ন … ”

— বিনয় মজুমদার/ ফিরে এসো চাকা

কবিতায় থাকে শাশ্বত ফুলের মত স্মিত, রূপ, ঘ্রাণ। আমাদের মধ্যে পুষ্প সম্ভাবনা কবিতা বিষয়ক একটি চিহ্নযুক্তি? ভাষায় একটি অন্তঃস্থ অ বাদ দিয়ে আমাদের কবিতা করে তোলা?

“অনতিদূরে উদার বিশাল প্রবাহিণী গঙ্গা, তরল মাতৃমূর্ত্তি যথা, মধ্যে মধ্যে বায়ু অনর্গল উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠে; এইস্থানে, বেলাতটে, বিবশকারী উদ্বিগ্নতা ক্ষুদ্র একটি জনমন্ডলীকে আশ্রয় করিয়া আছে। কোথাও কারণের বিকার মাত্র নাই, প্রতিবিম্ব নাই, কোথাও স্বপন পর্য্যন্ত নাই; এ কারণে যে, একটি মুহুর্ত্তের সকল কিছুকে বাস্তব করত স্মরণীয় করিয়া একের যে নাম ভিন্ন ক্রমাগতই অপ্রাকৃতিক পার্থিব, তাহারই প্রাণবায়ু নিষ্ক্রান্ত হইবে এবং তাই মানুষমাত্রই নিশ্চল, ম্রিয়মাণ, বিমূঢ়।… কেননা চির অসূর্য্যস্পশ্যা জীবন এই প্রথম আলোকের শরণাপন্ন, কেননা শূন্যতা লবণাক্ত এবং মহাআকাশ অগ্নিময় হইবে।”
-কমলকুমার মজুমদার/ অন্তর্জলী যাত্রা

তাই না আমাদের পুষ্পের উষ্ণতা চিহ্নিত হইবে! উষ্ণতা খোদাই করবে আমাদের গায়ে সব অপ্রাকৃত সূর্যালোক। যে সব কাহিনী শেষ হলে সূর্যালোক শেষ হলে আবার মিলিয়েও যাবে। ১৯৬১-এ বিনয়ের ‘ফিরে এসো চাকা’। ১৯৬২-তে কমলকুমার মজুমদারের ‘অন্তর্জলী যাত্রা’- কত কাছাকাছি দুজনে। কত দূরে দুজনে। কমলকুমার একটি কালাতিক্রমকারী গদ্যে এক ট্র্যাজেডী লিখছেন। দূরগামী মহাসমুদ্ররের মত যার ঢেউ পাড়ে আছড়ে পড়ছে আর যে গম্ভীর শব্দ তুলছে তা ভাষায় ধরছেন কমলকুমার। বিনয় কাছে বসে আছেন। নদীর মতন চলে চলেছেন কর্তব্যের মত, অনুদাসীন। এরূপ বিরহ ভাল বলে শুরু করছেন আমাদের স্বান্তনাতীত যে জীবন কমল আঁকছেন সে জীবনের কথা ও কাহিনীর সংক্ষিপ্তসার। কমল চিহ্নে চিহ্নে ধরছেন বিপুলকে। বিনয় সম্পৃক্ত করে নিচ্ছেন চিহ্নকে দর্শনের এক ছোট্ট গন্ডীতে।

“…মদিরার বুদ্বুদের মতো
মৃদু শব্দে সমাচ্ছন্ন, কবিতা, তোমার অপ্রণয়।”

এভাবে রাখুন দেখি, -“যদি নিদ্রিতের মতো থাকা যায়, স্বপ্নাচ্ছন্ন, কাল্পনিক” আর ” কোথাও কারণের বিকার মাত্র নাই, প্রতিবিম্ব নাই, কোথাও স্বপন পর্য্যন্ত নাই”। উ

উল্টো উল্টো ছবি। কিন্তু এক বিষয়কে নানা প্রকাশের খেলা। কেন না ‘যদি’ আছে। ‘যদি’ মানে অমনটি ঠিক নয় বাস্তব। প্রকাশের সময়কাল দেখুন। সমসাময়িক বাংলাতে অপার সম্ভাবনা খুলে দেওয়া দেখুন। বাবু কমলকুমারের ‘অন্তর্জলী যাত্রা’র শেষ দেখুন। ওই যে হিম নীলাভ কোথায় নিয়ে গেলো আমাদের? শেষ করে গেল সব?

” একটি মাত্র চোখ, হেমলকে প্রতিবিম্বিত চক্ষুসদৃশ, তাঁহার দিকেই, মিলন অভিলাষিণী নববধূর দিকে চাহিয়াছিল। যে চক্ষু কাঠের, কারণ নৌকাগাত্রে অঙ্কিত, তাহা সিন্দুর অঙ্কিত এবং ক্রমাগত জলোচ্ছাসে তাহা সিক্ত, অশ্রুপাতক্ষম, ফলে কোথাও এখনও মায়া রহিয়া গেল।”
-কমলকুমার মজুমদার/ অন্তর্জলী যাত্রা

আলো ক্রমে এসেছিল। চলে যাবার কালে চলে যায় নাই। মায়া রহিয়া গেল। হিম নীল, যে বিষের অনুসঙ্গ সেই বিষের নাম হেমলক। তাতে প্রতিবিম্বিত চক্ষু সদৃশ একটি মাত্র চোখ চাহিয়া রহিল। আহা, বিষ পান করার চোখ না, বিষ অনুধ্যান করার চোখ। এক মানুষ বিষ খায়, এক মানুষ বিষ অনুধ্যান করে। বিষ বোঝে। যে কাঠের গায়ে আঁকা। যে চিত্র, যে সিন্দুরের লাল রঙে আঁকা গো! যে চিত্রশিল্প। এবং অশ্রুপাতক্ষম। যে শিল্প তার মায়া থাকিয়া যায়। উপন্যাস শেষ হয়, অথচ হয় না।

শিল্প হয় কি দিয়ে?

“হাসির মতন তুমি মিলিয়ে গিয়েছো সিন্ধুপারে।
এখন অপেক্ষা করি, বালিকাকে বিদায় দেবার
বহু পরে পুনরায় দর্শনের অপেক্ষার মতো-
হয়তো সর্বস্ব তার ভ’রে গেছে চমকে চমকে।
অভিভূত প্রত্যাশায় এরূপ বিরহব্যথা ভালো।।”

-বিনয় মজুমদার/ ফিরে এসো চাকা

থাকে বিরহব্যাথা। কবিতার পরেও।

আর ভাষা? দু চার কথা চু কিতকিত সেখানেও হয়ে যাক। বিনয়ের একটি কবিতাকে ভেঙে দেখাই।

২৯ জুন ১৯৬২-এ লেখা হয়েছিল কবিতাটি। একে আমি গদ্যের মতন করে সাজিয়ে দিচ্ছি।

“কবিতা বুঝিনি আমি ; অন্ধকারে একটি জোনাকি যত্সামান্য আলো দেয়, নিরুত্তাপ, কোমল আলোক | এই অন্ধকারে এই দৃষ্টিগম্য আকাশের পারে অধিক নীলাভ সেই প্রকৃত আকাশ প’ড়ে আছে—এই বোধ সুগভীরে কখন আকৃষ্ট ক’রে নিয়ে যুগ যুগ আমাদের অগ্রসর হয়ে যেতে বলে, তারকা, জোনাকি—সব ; লম্বিত গভীর হয়ে গেলে না-দেখা গহ্বর যেন অন্ধকার হৃদয় অবধি পথ ক’রে দিতে পারে ; প্রচেষ্টায় প্রচেষ্টায় ; যেন অমল আয়ত্তাধীন অবশেষে ক’রে দিতে পারে অধরা জ্যোত্স্নাকে ; তাকে উদগ্রীব মুষ্টিতে ধ’রে নিয়ে বিছানায় শুয়ে শুয়ে আকাশের, অন্তরের সার পেতে পারি | এই অজ্ঞানতা এই কবিতায়, রক্তে মিশে আছে মৃদু লবণের মতো, প্রশান্তির আহ্বানের মতো |”
– বিনয় মজুমদার/ ফিরে এসো চাকা

খুব দূরের শোনাচ্ছে নাকি বিনয় থেকে কমলকুমারকে? শিল্প হয় যা দিয়ে তা হল অনুভব। অনির্বচনীয়কে বচনীয় করে তোলার অমোঘ এক আকর্ষণ, এক রক্তের টান মারা খেলা দিয়ে। দুজনেই খেলেছেন। দুজনেই মায়ায় মায়ায়…।

“ভালো লাগা বোঝাতে কবি বললেন, “পাষাণ মিলায়ে যায় গায়ের বাতাসে’।

বললেন, “ঢল ঢল কাঁচা অঙ্গের লাবণি অবনি বাহিয়া যায়’।

এখানে কথাগুলোর ঠিক মানে নিলে পাগলামি হয়ে দাঁড়াবে। কথাগুলো যদি বিজ্ঞানের বইয়ে থাকত তা হলে বুঝতুম, বিজ্ঞানী নতুন আবিষ্কার করেছেন এমন একটি দৈহিক হাওয়া যার রাসায়নিক ক্রিয়ায় পাথর কঠিন থাকতে পারে না, গ্যাস রূপে হয় অদৃশ্য। কিংবা কোনো মানুষের শরীরে এমন একটি রশ্মি পাওয়া গেছে যার নাম দেওয়া হয়েছে লাবণি, পৃথিবীর টানে যার বিকিরণ মাটির উপর দিয়ে ছড়িয়ে যেতে থাকে। শব্দের অর্থকে একান্ত বিশ্বাস করলে এইরকম একটা ব্যাখ্যা ছাড়া উপায় থাকে না। কিন্তু এ-যে প্রাকৃত ঘটনার কথা নয়, এ-যে মনে-হয়-যেন’র কথা। শব্দ তৈরি হয়েছে ঠিকটা-কী জানাবার জন্যে; সেইজন্যে ঠিক-যেন-কী বলতে গেলে তার অর্থকে বাড়াতে হয়, বাঁকাতে হয়। ঠিক-যেন-কী’র ভাষা অভিধানে বেঁধে দেওয়া নেই, তাই সাধারণ ভাষা দিয়েই কবিকে কৌশলে কাজ চালাতে হয়। তাকেই বলা যায় কবিত্ব। বস্তুত কবিত্ব এত বড়ো জায়গা পেয়েছে তার প্রধান কারণ, ভাষার শব্দ কেবল আপন সাদা অর্থ দিয়ে সব ভাব প্রকাশ করতে পারে না। তাই কবি লাবণ্য শব্দের যথার্থ সংজ্ঞা ত্যাগ ক’রে বানিয়ে বললেন, যেন লাবণ্য একটা ঝরনা, শরীর থেকে ঝ’রে পড়ে মাটিতে। কথার অর্থটাকে সম্পূর্ণ নষ্ট ক’রে দিয়ে এ হল ব্যাকুলতা; এতে বলার সঙ্গে সঙ্গেই বলা হচ্ছে “বলতে পারছি নে’।

এই অনির্বচনীয়তার সুযোগ নিয়ে নানা কবি নানারকম অত্যুক্তির চেষ্টা করে। সুযোগ নয় তো কী; যাকে বলা যায় না তাকে বলবার সুযোগই কবির সৌভাগ্য। এই সুযোগেই কেউ লাবণ্যকে ফুলের গন্ধের সঙ্গে তুলনা করতে পারে, কেউ বা নিঃশব্দ বীণাধ্বনির সঙ্গে– অসংগতিকে আরও বহু দূরে টেনে নিয়ে গিয়ে। লাবণ্যকে কবি যে লাবণি বলেছেন সেও একটা অধীরতা। প্রচলিত শব্দকে অপ্রচলিতের চেহারা দিয়ে ভাষার আভিধানিক সীমানাকে অনির্দিষ্ট ভাবে বাড়িয়ে দেওয়া হল।

হৃদয়াবেগে যার সীমা পাওয়া যায় না তাকে প্রকাশ করতে গেলে সীমাবদ্ধ ভাষার বেড়া ভেঙে দিতে হয়। কবিত্বে আছে সেই বেড়া ভাঙার কাজ। এইজন্যেই মা তার সন্তানকে যা নয় তাই ব’লে এককে আর ক’রে জানায়। বলে চাঁদ, বলে মানিক, বলে সোনা। এক দিকে ভাষা স্পষ্ট কথার বাহন, আর-এক দিকে অস্পষ্ট কথারও। এক দিকে বিজ্ঞান চলেছে ভাষার সিঁড়ি বেয়ে ভাষাসীমার প্রত্যন্তে, ঠেকেছে গিয়ে ভাষাতীত সংকেতচিহ্নে; আর-এক দিকে কাব্যও ভাষার ধাপে ধাপে ভাবনার দূরপ্রান্তে পৌঁছিয়ে অবশেষে আপন বাঁধা অর্থের অন্যথা ক’রেই ভাবের ইশারা তৈরি করতে বসেছে।”
– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর/ বাংলাভাষা পরিচয়

অনেককাল আগে ‘বাংলাভাষা পরিচয়’ লিখতে বসে উপরের কথাগুলো রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন। আমরা থোড়ি না শুনেছি। পাহাড়ে বাংলা থাকবে কি না ভেবে ভেবে চুল চিত্তির করেছি, সার্টিফিকেট দিয়ে টিকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করেছি, যা করিনি তা হল বাংলা ভাষাকে সাহিত্যের মধ্যে দিয়ে ক্রমাগত উন্নত করার চেষ্টা। সে চেষ্টা করতে হলে কাব্য আর গদ্যের ভাষার একটি মিলনক্ষেত্র প্রয়োজন হয়। সেই মিলনক্ষেত্রকে তৈরী করতে পারেন এমন কব্জির জোরের দরকার হয়। কদিন আগে পুরুলিয়ায় গেছিলাম। সেখানের ছেলেরা দেখলাম তাদের মুখের ভাষায় সাহিত্য রচনা করছে না। তারা মুখে যে ভাষা বলছে সে ভাষা লেখায় আসছে না। লেখায় আসছে নবদ্বীপের বাংলা। সে বাংলায় লেখকের সংখ্যা বাড়াচ্ছে, কিন্তু তার নিত্যদিনের ভাষাকে সমৃদ্ধ করছে না। মাহাতো পরিচয়ে পরিচিত একটি ছেলেকেই দেখলাম সগর্বে নিজের ভাষায় লিখছে। বাংলা হরফ ব্যবহার করছে। কালে কালে তার হরফ আলাদা হলে হোক, কিন্তু সে নিজের ভাষাতেই লিখুক। বাংলাতে লিখলে সাদর আমন্ত্রণ থাক, কিন্তু বাংলাতেই যেন না লেখে এমন আমি অন্তত চাইবো। নইলে তার ভাষার উন্নতি সাধন হবে না। তার উন্নতি হবে না। এবং তার উন্নতি না ঘটলে যোগাযোগে বাংলারও উন্নতি হবে না।

কমলকুমার আর বিনয়ের যোগাযোগ ঘটছে যে ভাষার মিলনক্ষেত্রে সে বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছে। বিনয়ের অবদান এখনো অনেকাংশেই উপেক্ষিত। আর কমলকুমার এতটাই গদ্যের সাম্রাজ্যে একক যে তাঁকে ধরার বুকের পাটা বাজারের কারবারীদের নেই। তাই তিনিও আসলেই উপেক্ষিত। কিন্তু এমনভাবে গদ্য আর কাব্য ভাষা যখন কাছাকাছি আসে, তখন সেখানের থেকে তা চলে আসে মুখের ভাষার দিকেও। সে ভাষাও উন্নত হয়। কেন? সে কথার জবাব দিয়ে শেষ করবো এ লেখা।

“একটা ঘটনা আমার মনে পড়ল। ইস্কুলে-পড়া একটি ছোটো মেয়ের কাছে আমার নামতার অজ্ঞতা প্রমাণ করবার জন্যে পরিহাস ক’রে বলেছিলুম, তিন-পাঁচে পঁচিশ।

চোখদুটো এত বড়ো ক’রে সে বললে, “আপনি কি জানেন না তিন-পাঁচে পনেরো?’ আমি বললুম, “কেমন করে জানব বলো, সব তিনই কি এক মাপের। তিনটে হাতিকে পাঁচগুণ করলেও পনেরো, তিনটে টিকটিকিকেও?’ শুনে তার মনে বিষম ধিক্কার উপস্থিত হল, বললে, “তিন যে তিনটে একক, হাতি-টিকটিকির কথা তোলেন কেন।’ শুনে আমার আশ্চর্য বোধ হল। যে একক সরুও নয় মোটাও নয়, ভারিও নয় হাল্কাও নয়, যে আছে কেবল ভাষা আঁকড়িয়ে, সেই নির্গুণ একক ওর কাছে এত সহজ হয়ে গেছে যে, আস্ত হাতি-টিকটিকিকেও বাদ দিয়ে ফেলতে তার বাধে না। এই তো ভাষার গুণ।

‘সাদা’ কথাটাও এইরকম সৃষ্টিছাড়া। সে একটা বিশেষণ, বিশেষ্য নইলে একেবারে নিরর্থক। সাদা বস্তু থেকে তাকে ছাড়িয়ে নিলে জগতে কোথাও তাকে রাখবার জায়গা পাওয়া যায় না, এক ঐ ভাষার শব্দটাতে ছাড়া। এই তো গেল গুণের কথা, এখন বস্তুর কথা।

মনে আছে আমার বয়স যখন অল্প আমার একজন মাস্টার বলেছিলেন, এই টেবিলের গুণগুলি সব বাদ দিলে হয়ে যাবে শূন্য। শুনে মন মানতেই চাইল না। টেবিলের গায়ে যেমন বার্নিশ লাগানো হয় তেমনি টেবিলের সঙ্গে তার গুণগুলো লেগে থাকে, এই রকমের একটা ধারণা বোধ করি আমার মনে ছিল। যেন টেবিলটাকে বাদ দিতে গেলে মুটে ডাকার দরকার, কিন্তু গুণগুলো ধুয়ে মুছে ফেলা সহজ। সেদিন এই কথা নিয়েক হাঁ করে অনেকক্ষণ ভেবেছিলুম। অথচ মানুষের ভাষা গুণহীনকে নিয়ে অনেক বড়ো বড়ো কারবার করেছে। একাট দৃষ্টান্ত দিই।

আমাদের ভাষায় একটা সরকারি শব্দ আছে, “পদার্থ’।

বলা বাহুল্য, জগতে পদার্থ ব’লে কোনো জিনিস নেই; জল মাটি পাথর লোহা আছে। এমনতরো অনির্দিষ্ট ভাবনাকে মানুষ তার ভাষায় বাঁধে কেন। জরুরি দরকার আছে বলেই বাঁধে।

বিজ্ঞানের গোড়াতেই এ কথাটা বলা চাই যে, পদার্থ মাত্রই কিছু না কিছু জায়গা জোড়ে। ঐ একটা শব্দ দিয়ে কোটি কোটি শব্দ বাঁচানো গেল। অভ্যাস হয়ে গেছে ব’লে এ সৃষ্টির মূল্য ভুলে আছি। কিন্তু ভাষার মধ্যে এই-সব অভাবনীয়কে ধরা মানুষের একটা মস্ত কীর্তি।

বোঝা-হাল্কা-করা এই-সব সরকারি শব্দ দিয়ে বিজ্ঞান দর্শন ভরা। সাহিত্যেও তার কমতি নেই। এই মনে করো, “হৃদয়’ শব্দটা বলি অত্যন্ত সহজেই। কারও হৃদয় আছে বা হৃদয় নেই, যত সহজে বলি তত সহজে ব্যাখ্যা করতে পারি নে। কারও “মনুষ্যত্ব’ আছে বলতে কী আছে তা সমস্তটা স্পষ্ট করে বলা অসাধ্য। এ ক্ষেত্রে ধ্বনির প্রতীক না দিয়ে অন্যরকম প্রতীকও দেওয়া যেতে পারে। মনুষ্যত্ব ব’লে একটা আকারহীন পদার্থকে কোনো-একটা মূর্তি দিয়ে বলাও চলে। কিন্তু মূর্তিতে জায়গা জোড়ে, তার ভার আছে, তাকে বয়ে নিয়ে যেতে হয়। এ ছাড়া তাকে বৈচিত্র্য দেওয়া যায় না। শব্দের প্রতীক আমাদের মনের সঙ্গে মিলিয়ে থাকে, অভিজ্ঞতার সঙ্গে সঙ্গে তার অর্থের বিস্তার হতেও বাধা ঘটে না।

এ কথাটা জেনে রাখা ভালো যে, এই-সব ভার-লাঘব-করা সরকারি অর্থের শব্দগুলিকে ইংরেজিতে বলে অ্যাব্‌স্ট্রাক্ট্‌ শব্দ। বাংলায়, এর একটা নতুন প্রতিশব্দের দরকার। বোধ করি “নির্বস্তুক’ বললে কাজ চলতে পারে। বস্তু থেকে গুণকে নিষ্ক্রান্ত করে নেওয়া যে ভাবমাত্র তাকে বলবার ও বোঝাবার জন্যে নির্বস্তুক শব্দটা হয়তো ব্যবহারের যোগ্য। এই অ্যাব্‌স্ট্রাক্ট্‌ শব্দগুলোকে আশ্রয় করে মানুষের মন এত দূরে চলে যেতে পেরেছে যত দূরে তার ইন্দ্রিয়শক্তি যেতে পারে না, যত দূরে তার কোনো যানবাহন পৌঁছয় না।”

-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর/ বাংলাভাষা পরিচয়

এই কথাগুলো খুব জরুরী। হাটে-বাজারে যে শব্দ যে ভাষা প্রতিদিন চলে তার কাজ স্পষ্টতা নিয়ে। সে দরকারী কাজ। কিন্তু শুধু তাতেই ভাষার প্রয়োজন মেটে না। কেন না যা অদরকারী সে কাজের বা অকাজের মধ্যে দিয়েই ভাষা সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। শব্দের নানা প্রয়োগে তার নানা মানের সীমানা ক্রমশ প্রসারিত হয়। সেই মানেগুলোরও মধ্যে যা যথাযথ তা থাকে, যা নয় তা খসে পড়ে যায়। কিন্তু সে সম্প্রসারণের কাজ কার? শুধুই কি নতুন নতুনকে চেনাতে অন্যান্য ভাষা থেকে শব্দ নিলে হবে? সংযোগ বাড়াতে বা বানাতে হবে না? ‘হিম নীলাভ’ সংস্কৃতায়িত আর ‘হেমলক’ গ্রীক কারণে চেনা শব্দের যোজনা রচনা করতে হবে না?

কিন্তু মজার বিষয় হল আমাদের মান্যগণ্যরা বাংলা ভাষা সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি বা খন্ডায়ণ নিয়ে এতটাই ব্যাস্ত যে ভাষা সমৃদ্ধি নিয়ে কাজের সময় নেই। সেই বিনয়ের লাইন মনে পড়ে যায়।

“করবী তরুতে সেই আকাঙ্খিত গোলাপ ফোটে নি |
এই শোকে ক্ষিপ্ত আমি ; নাকি ভ্রান্তি হয়েছে কোথাও?”

ভ্রান্তি হয়েছে কি না তা বোধহয় আর ভাবার মতন মনটাও এঁদের নেই আর। ভাষা ছেড়ে ভাষা সাম্রাজ্য নিয়ে তাই মাতামাতি। ব্যবসাবুদ্ধি যাকে বলে আর কি! তাই বাকী ভাষাকর্মীদের উপরেই তাই ভরসা রাখা ভাল। যদি হয়, যদি কিছু হয়।

Posted in প্রবন্ধ, সমালোচনা | Tagged , , , , , | 11 টি মন্তব্য

অনিকেত পুরুলিয়া


 

অরুণদা,অনাময় কালিন্দী, মুজিবর আনসারি

 

“সামনের খেজুর গাছটা এখনও বাঁকা

সোজা হবার সম্ভাবনা নেই

কোন ভুলে এমন সাজা?

আসলে ট্রেনের জানলাটা অনেক ছোট”

লিখেছিল আতুড় বাউড়ি। আমার সামনেই বসে আছে কালো রোগা ছেলেটা। একটু পরেই জানতে চাইবে আমার কাছে ভারতীয় দর্শন আর পাশ্চাত্য দর্শনের মধ্যে ফারাক। ‘অহিরা’ পত্রিকায় ওর লেখাটা বেরিয়েছে। পত্রিকা থেকে বের করে পড়ছিলো লেখাটা। সঙ্গে আরো সব সাঙ্গোপাঙ্গো। ওদের মধ্যে অনেকেই কবিতা লেখে। কবিতা লেখে না কি কবিতাকে লেখার জন্য এই লাল মাটির দেশে জীবনপাত করে? অনেক প্রশ্ন ওদের, অনেক কথা। কলকাতা থেকে আসা লোকজনরা সবাই বসে আছি। মদের বোতল, গেলাস সব বসে আছে। সময় কিন্তু থমকে নেই। দোতলার ছোট্ট ঘরটা বড্ড ছোট। এই ঘরটা বড় নির্মল হালদারের। ওহ্‌, নির্মল হালদার অন্য যে কোনো নির্মল হালদারের মতন নয়। নির্মল হালদার কবিতার ফকির। নির্মল হালদার ওই কালো ছেলেটাকে নাম দিয়েছে আতুড় বাউড়ি। ছেলেটার নাম ওটা না। ও সকলের কাছে বিশু। কবিতা বা গদ্যের লেখক হিসেবে ওর নাম আতুড় বাউড়ি। পুরুলিয়াতে এই ছোট্ট বাড়িটা, যেটার কাছে আসতে গেলে একটা সাবেকী জমিদারবাড়ির মধ্যে দিয়ে আসতে হয়। সেটা আবার এখন কোনো এক রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যাঙ্কের অফিস। রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যাঙ্কেরা মনে রাখবেন দেশের সমস্ত বড় বড় প্রাসাদ ইত্যাদির বেশীটারই মালিক। আর সঙ্গে রেলওয়ে। সে সব সম্পত্তির অর্থমূল্য আমাদের কল্পনার বাইরে। সেই ব্যাঙ্কের পাশ দিয়ে একই কম্পাউন্ডের গেট দিয়ে যখন নির্মল হালদারের বাড়িতে আপনি পৌঁছবেন তখন জানবেন সেটা ব্যাঙ্কের আনুকূল্য বর্জিত। নির্মল হালদার ব্যাঙ্কে টাকা রাখার মত টাকা করেনি কোনোদিন। কবিতা করেছে। বোকা লোকের মতন দেখতে নয় তা বলে। সাদা দাড়ি, কাঁচাপাকা চুলের মধ্যে দিয়ে করোটির যে ছাঁচটা আপনি দেখতে পাবেন সেটার সঙ্গে সিন্ধু সভ্যতার মানুষদের যদি করোটির মিল পান অবাক হবেন না। নিম্ন লোথালের অনেক মানুষ এদিক-ওদিক ছড়িয়ে পড়েছিল তো! তাদেরই কেউ একজন নির্মল হালদারের বংশ হতেও পারে। তারা জানতো নগর বানাতে, নির্মল হালদার-ও জানতো। কিন্তু কবিতায় নগর উঠে আসেনি। উঠে এসেছে নাগরিকতার শোক।

“যে জল পড়ছে

ঘরের চালা থেকে, আমি সেই জলে

ভাসতে ভাসতে, না-গেলাম নদীতে

না – সাগরে

শুধু ধাক্কা খেতে খেতে

আমি ছেঁড়া খোঁড়া

আমি অচ্ছুৎ”…

নগর থেকে গ্রামেও যায়নি নির্মল হালদার। গিয়েছে ঠোঁটের তিলের কাছে। যা সযত্নে রাখা আছে তার কাছে। গাছতলাতে শুয়ে পড়ে।

“তেঁতুল পাতা চিবিয়ে খাই

আমি নির্ভরতা পাই, থানকুনির কাছে”

এই জন্য নির্মল হালদার গ্রামেরও না শহরেরও না। নির্মল হালদারের সঙ্গে সিন্ধুর মানুষের মিল পেলে জানবেন সেই মানুষেরা যারা সমস্ত নগরের অধিবাসীর ধান একটি গোলায় জমা রাখতো, যারা নগরের কাছেভিতে চাষাবাদ করতো তাদের সেই যৌথ খামার একরকম নির্মল হালদারের মধ্যে বাসা বেঁধেছে। ওই দুটি তলার দুটি ঘরে নানা সময়ে যত যত মানুষ জড় হয়, দিনে ও রাতে-ও থাকে, তত মানুষ সামনের ব্যাঙ্কেও প্রতিদিন আসে না- এ আমি হলফ করে বলতে পারি। অথচ নির্মলের ব্যাঙ্ক নেই। তাই কলকাতার এক জ্যেষ্ঠ কবি নির্মলকে ফোনে বলেন,

– দুশ্চিন্তা থেকে যক্ষা হয়। শঙ্খদার (ঘোষ) হয়েছে, আমার হবে, আর তোমার হবে দারিদ্র থেকে।

অথচ নির্মল, গরীব নির্মল, কত কত দিন পুরুলিয়া, বাঁকুড়ার কত কত ছেলের মাথার উপরে ছাত হয়ে ঝুলছেন। তারা থাকে, খায়, সকলে মিলেই যা জোটে, যখন যার পয়সায় যা জোটে তাই খায়, কত কত দিন তাদের লেখা, তাদের জীবন উঠে আসে কলকাতার বড়লোক মানুষদের কাছে- শিল্পী-সাহিত্যিক-সাংবাদিকদের কাছে। ছেলেরা কেউ শিল্পী হয়, কেউ কবি হয়, কেউ সাংবাদিক। নির্মল হয়ে ওঠেন ওদের মধ্যে দিয়ে।

“এমন হাওয়ার দেশে ভেসে এলে

আমরা ঠিক উঠে পড়ব রাতে

যতই মধুর হোক, তিক্ত হোক

আমাদের স্বপ্ন ভেঙে যাবে ঠিক”

সেই যে স্বল্পবাক কবি লিখেছিল সেই মুজিবর আনসারি, যাকে নিয়ে কলকাতার এক মহাকবি ক-কথা ভাল লিখেছেন বলে কলকাতার মহাকবি বিদ্বেষীরা খেপে লাল, সেই কবিকে নিয়ে কলকাতা এসেছিল নির্মল হালদার। কবিতাপাঠের এক আসরে, সেখানে মহাকবিকে জ্যেষ্ঠ কবির সম্মান জানাতে বই দেয় মুজিবর। সেই বই পড়ে নিজেই লেখেন সেই মহাকবি। তাতেও নির্মলের শত্রু বাড়ে। অথচ মহাকবি কাউকে ঠিক সময়েই মনে করিয়ে দ্যান নির্মল হালদার ঠিক তাঁর বন্ধু নন। আবার নির্মলের সঙ্গে সম্পর্কের জেরেই কলকাতা থেকে বিভাস রায়চৌধুরী কি রাহুল পুরকায়স্থ জোটে পুরুলিয়াতে। আরেক সন্ধায় নিজেদের কবিতার পাশাপাশি শোনে অনামী-অখ্যাতদের কবিতা। সেই দোতলা বাড়ির একতলা ঘরে বসে। বিভাসের কলমে বেরিয়ে আসে,

“মাথাখারাপ আলোটির মতো জেগে আছে তোমার শরীর,

যার পিপাসা সম্পূর্ণ আলাদা”

রাহুলের কলম বলে ওঠে ‘অরন্ধন’ পত্রিকায়,

‘আজই

রক্তবাতাসের কাছে যাও

বলো, প্রেম দূরাগত

পক্ষিপ্রাণ যথা”

অরন্ধন, অহিরা, মারাংবুরু, সারেং, মাছরাঙা, ডুংরি-তে ছড়িয়ে থাকে রাজীব চৌধুরী, সোমেন মুখোপাধ্যায়, নিবিড় রায়-রা। ওদের কলম চলে। ওদের কলম ফসল ফলায়। নির্মল হালদার দেখে যান। হাসেন, কাঁদেন, রেগে যান, গালাগাল করেন- কেন মানুষ দূরে সরে যায়? কেন মানুষের গর্বে পা পড়ে না মেদিনীতে, যে মানুষ নাকি ধরিত্রীপুত্র তার এত অহঙ্কার কেন? কেন কাছের যারা তারা এক এক করে দূরে সরে যায় কাল থেকে কালান্তরে? কেন খামার আরো আরো বড় হয়ে ওঠে না, যৌথতা বাড়ে না? ছেলেরাও হাসে-কাঁদে-উত্তেজিত হয়। রাস্তা খোঁজে। কবিরা আগে মানুষ না আগে কবি? মানুষ না হলে কবি হওয়া যায় নাকি? তারা যা দ্যাখে-শোনে তার থেকে প্রশ্ন করে, জটলা করে, বুঝতে চায়, মাথা নাড়ায়, কষ্ট পায়, কষ্ট দেয়, আনন্দ খোঁজে, জীবন খোঁজে। স্বার্থের অন্বেষণ কবিতার দেশে লালমাটির দেশে বড় হয়ে ওঠে কেন? এই সব প্রশ্নগুলো থেকে একেক জনের কলমে একেক কথাচিত্র আসে। যেমন রাজীব লেখেন,

“ছুটে যায় যে যার পন্ডশ্রমের দিকে

ধুলো ওড়ে…ছাই ওড়ে…”

নিবিড় রায় লিখে ফ্যালেন,

“আজ বৃষ্টি নেই

সকাল থেকেই পাখিদের হাহাকার ছড়াচ্ছে”

তবু তো লাল পাহাড়ির দেশ। ‘লাল পাহাড়ির দ্যাশে যা’ লেখা, গাছ বাঁচাও আন্দোলনের লোক অরুণ বন্দোপাধ্যায় পুরুলিয়ার সঙ্গে আত্মিক সম্পর্কের কথা বলতে নির্মলের উঠোনে এসে দাঁড়ান। ‘অনিকেত’ নামে যে গোষ্ঠী এত এত সব পত্রিকার জনক, বন্ধু, পৃষ্ঠপোষক সেই গোষ্ঠীর তরফ থেকে হাতে হাতে উঠে আসে দুটি পত্রিকা। ওঁদের বার্ষিক অনুষ্ঠানে এমন করেই পত্রিকা,বই উঠে আসে প্রতিবার। ‘অহিরা’ যার প্রথম বছর, আর ‘অরন্ধন’ যার এবারে এগারো বছর বয়স হল। অরুণ চট্টোপাধ্যায় গলার কষ্ট নিয়েও গেয়ে ওঠেন ‘হবিগঞ্জের জলালী কইতর’, হেমাঙ্গ বিশ্বাসের সেই শহরবিরূপ আখ্যান। ‘পতরে পিরিতির ফুল ফোটে’ বলে যে গান গেয়ে চলছে শিলাজিৎ তার সুরকার সেই একই অনুষ্ঠানে গেয়ে ওঠেন

বঁধু কি পান খাওয়ালি তুই আমার ঠোঁটটি লালে লা

একা একা সিরজন মেলায় যাওয়াই হইল কাল…

এখন যারা এই সৃজনের মেলায় গিয়েছে তাদের যতই কাল হোক না কেন এ মেলা যত বছর তত বছর যেতেই হবে তাদের। ফকির কবি নির্মল হালদার আর তার ‘অনিকেত’ গোষ্ঠীর আমন্ত্রণে। ‘অনিকেত’ এত এত প্রশ্নের মধ্যেও বাঁচার গন্ধ পায়। তাই না নিবিড় রায় তাঁর কবিতার নাম রাখেন, ‘বাঁচার গন্ধ পাই’। নিবিড়

নিবিড় ফিরে আসার আগের শেষ রাতে আমার কাছে জানতে চেয়েছিলেন ‘যৌথতা’ ঠিক কাকে বলে, আলোচনা করতে চেয়েছিলেন। বাঁচতে চান বলেই না!

Posted in জীবন চর্চ্চা, রম্যরচনা, সমালোচনা | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান