RSS

বিভিন্ন কোরাস

20 নভে

যখন জীবন খুব শ্রান্ত হয়ে পড়ে তখন আমাদের মতন সামান্য বাঙালীর নজর পরে ঘরের দিকে। ঘরে রাখা সামান্য কিছু অসামান্যের দিকে। তেমনই কদিন অলীক কুনাট্য রঙ্গে চোখ পচিয়ে পচিয়ে ক্লান্ত হচ্ছিলাম, শ্রান্ত হচ্ছিলাম। হতে হতে কাল একবার ঘুরে দাঁড়াবার কথা ভাবলাম। খবরের জন্যই দুনিয়া নাকি দুনিয়ার জন্য খবর সেটা আজকাল প্রায় তুচ্ছ হয়ে উঠেছে। সেই তুচ্ছতার মাঝেই কিছু খবর ভাবায় তার ভয়ঙ্কর তুচ্ছতা নিয়েই। যেমন বনগাঁ থেকে ছাড়া শিয়ালদহ-বনগাঁ লোকালের ঘটনাটা। বনগাঁ থেকে সকাল ৭ টা ১০-এ ছাড়ার পরে ট্রেনটা থেমেছিল আটটা নাগাদ অশোকনগরে। সেখানে শ’খানেক পুরুষ যাত্রী অবরোধ শুরু করেন মূলত দুটি দাবীতে। এক, তাঁদের ওই ট্রেনে উঠতে দিতে হবে, ধরপাকড় চলবে না। দুই, ট্রেনে একটি সাধারণ কামরা জুড়তে হবে। দুটো দাবী পরস্পরবিরোধী। যদি তাঁদের উঠতেই দেওয়া হয় তাহলে ট্রেনটি মহিলা ট্রেন থাকেনা, সাধারণ ট্রেনে পরিণত হয়। কাজেই সেক্ষেত্রে সাধারণ কামরা জোড়ার দাবীর কোনো মানে হয় না। বনগাঁ থেকে শিয়ালদহমুখী এই ট্রেনের আগের ট্রেন সকাল ৬.৫০-এ, পরের ট্রেন সকাল ৭.৩০-এ। খেয়াল করে দেখুন, অবরোধকারীরা কিন্তু নতুন ট্রেন দাবী করেননি। ওই ট্রেনটাই চাই ওঁদের। যাই হোক, অবরোধ তোলার জন্য পুলিশ আসার পরে মহিলারাও সক্রিয় হন এঁদের বিরোধে এবং অবরোধ উঠে যায়। এই সব জানতে জানতে আমার হঠাৎ মনে পড়ে গেল জীবনানন্দ।
“গ্রন্থকে বিশ্বাস করে প’ড়ে গেছি;
সহধর্মীদের সাথে জীবনের হাফ-আখড়াই, স্বাক্ষরের অক্ষরের কথা
মনে করে নিয়ে ঢের পাপ ক’রে, পাপকথা উচ্চারণ ক’রে,
তবুও বিশ্বাসভ্রষ্ট হ’য়ে গিয়ে জীবনের যৌন একাগ্রতা
হারাইনি; তবুও কোনো প্রীতি নেই এতদিন পরে।”
সংরক্ষণ দিলেই সমস্যার সমাধান হয় না। সংরক্ষণ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যে প্রশাসন, ব্যবস্থা, সমাজ বা রাষ্ট্র সংরক্ষণ দেয় তাকে জানতে হয় কবে সেই সংরক্ষণ শেষ হবে, না হলে বিরোধমুখটি খুলেই থাকে এবং সমস্যা বাড়ে মাত্র। কিন্তু চাকরী বা শিক্ষা বা সামাজিক-শ্রেণীগত কি জাতিগত-ধর্মগত বিভেদে সংরক্ষণ আমাদের দেশে শুধু ভোট সংরক্ষণের অপচেষ্টা। এর মধ্যে চালিকা শক্তিটি এর সমাপ্তি সম্পর্কে অচেতন এবং কখনো কখনো বোধ হয় জানেন যে এর কোনো শেষ নেই। নেই কারণ বিভেদের ফাটলটা বিবিধ রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক নীতিতে আরো চওড়া হচ্ছে শুধু, আর কিছু হচ্ছে না। হচ্ছে না বলে নারী-পুরুষ সংসারের ক্ষেত্রে যাঁরা সহধর্মী তাঁরা জীবনের হাফ-আখড়াই-এর পরে বিশ্বাসভ্রষ্ট দ্বন্দ্বমান হয়ে ঊঠেছেন। সেই দ্বন্দ্ব তাঁদের কোথায় নিয়ে যায়? রাজ্যে নাকি পরিবর্তন এসেছে? সেই পরিবর্তনের ফসল সে কোন চেতনা?
“অবশেষে জাগরূক জনসাধারণ আজ চলে?
রিরংসা, অন্যায়, রক্ত, উৎকোচ, কানাঘুষো, ভয়
চেয়েছে ভাবের ঘরে চুরি বিনে জ্ঞান ও প্রণয়?”
এর কিছু আগেই ওই একই কবিতায় জীবনানন্দ লিখেছিলেন,
“উনিশশো বেয়াল্লিশ সালে ঠেকে পুনরায় নতুন গরিমা
পেতে চায় ধোঁয়া, রক্ত, অন্ধ আধারের খাত বেয়ে,
ঘাসের চেয়েও বেশি মেয়ে;
নদীর চেয়েও বেশী উনিশশো তেতাল্লিশ,চুয়াল্লিশ, উৎক্রান্ত পুরুষের হাল;”
পাঠক, হাল দেখুন আজকের পুরুষের। সালগুলো শুধু বদলে নিন একবার। নিজের অধিকার বৃদ্ধির মানে অন্যের অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করা, এমনই সভ্যতা আজকালও। নিজের বাড়ির মেয়েটি, যে স্ত্রী-কন্যা-মা-বোন বা বান্ধবী বা সম্পর্কিতা আত্মীয়া তার হাত থেকে ট্রেন কেড়ে নিতে কি ব্যাকুল ওই শ’খানেক অবরোধকারী। প্রশ্ন হচ্ছে মানুষ যখন না খেয়ে মরে, যখন খাবারের দাম কালোবাজারীর চোটে বাড়তে বাড়তে দরিদ্রের আকাশ খুনে ভরে দেয়, যখন একটা স্কুলের এবং খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থানের অভাবে হাজারে হাজারে শিশু এই নিত্য অভাগা, জীবনের নিম্নতম মূল্যহীন দেশে ধুঁকে ধুঁকে মরে বুলেট ছাড়াই, যখন এক অকথ্য জেনোসাইড চলে কতিপয় সংখ্যালঘিষ্ঠ বজ্জাত বড়লোকের হাতে তখন এঁদের কোন অবরোধে পাবেন? কোন দাবীতে এঁরা থামিয়ে দেবেন অশিষ্টাচার আর অত্যাচারের সেই চাকা? দেবেন না। কারণ সাধারণ চেতনার অপরিমেয় অভাব এঁদের। আরেকটা ট্রেন দাবী করেননি এঁরা। বিবেচনা করে দেখেছেন সে দাবী রাষ্ট্র মানবে না। রাষ্ট্র দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দেবে যে এমনিতেই রেল পরিবহণ চলে ভর্তুকি দিয়ে, সেখানে আর ভর্তুকি নৈব নৈব চ। রাষ্ট্রকে রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীনেদের পরিচালক বাণিজ্যগোষ্ঠী বলে দিয়েছে যা ভর্তুকি তা তাদের দিতে হবে জনগণের করের টাকা থেকে, বিবিধ শুল্ক মকুব করে, পারলে বিনি পয়সায় জমি, জল এবং বিদ্যুৎ দিয়ে। কিন্তু দেশের নব্বই শতাংশকে দেওয়া যাবে না। রাষ্ট্র বলবেনা স্রেফ লোহার ছাঁটের মাফিয়া ব্যবস্থা বন্ধ করলে, রেলের জেনারেল ম্যানেজার প্রমুখ উচ্চপদস্থদের নির্লজ্জ সামন্ততান্ত্রিক বিলাসিতা বন্ধ করলে কিম্বা রেলের জন্য নানান ক্রয় সরঞ্জামের দুর্নীতি বন্ধ করলে বা পণ্য পরিবহনের শুল্ক আমদানিতে ঘটে চলা বৃহৎ দুর্নীতি ঘটানো দুষ্ট-চক্রকে কড়া হাতে দমন রেল এখনো বহু লাভ করার সম্ভাবনা রাখে। এককালে দেশের বাজেটে রেলের বাজেট থেকে টাকা যেত, এখন উল্টোপুরাণ হয়। অবরোধকারীরা এসব জানার কষ্ট করবেন না এবং এর বিরুদ্ধে আন্দোলন করা তো দূরস্থান। আর যাই হোক, মহিলাদের হাতে রাষ্ট্রের মত বন্দুক নেই না!
“আমরা তো বহুদিন লক্ষ্য চেয়ে নগরীর পথে
হেঁটে গেছি; কাজ ক’রে চ’লে গেছি অর্থভোগ ক’রে;
ভোট দিয়ে মিশে গেছি জনমতামতে।”
এমন অবরোধকারী চেতনা যে দেশের যে জনসমাজের অঙ্গ হয় তার হাল কি হয় তা ব্যাখার কি প্রয়োজন? তবু জীবনানন্দ বলে গিয়েছেন।
“সেই থেকে কলরব, কাড়াকাড়ি, অপমৃত্যু, ভ্রাতৃবিরোধ,
অন্ধকার সংস্কার, ব্যাজস্তুতি, ভয়, নিরাশার জন্ম হয়।
সমুদ্রের পরপার থেকে তাই স্মিতচক্ষু নাবিকেরা আসে;
ঈশ্বরের চেয়ে স্পর্শময়
আক্ষেপে প্রস্তুত হ’য়ে অর্ধনারীশ্বর
তরাইয়ের থেকে লুব্ধ বঙ্গোপসাগরে
সুকুমার ছায়া ফেলে সূর্যিমামার
নাবিকের লিবিডোকে উদ্বোধিত করে।”
আসলে রূপসী বাংলার কবি বলে কথিত জীবনানন্দ ঢের সত্য জানতেন। তাই এখানে অংশ অংশ করে রাখা কবিতাটির নাম দিয়েছিলেন ‘বিভিন্ন কোরাস’। যা সিম্ফোনি বা ঐকতান নয়, যা এমনকি অনৈক্যতান বা ক্যাকোফোনিও না, স্রেফ ধান্দা নির্ভর কিছু কিছু গোষ্ঠীচেতনা যা আজও মহত্তর কিছুর সন্ধান চাইতে শেখেনি।

 

About শুদ্ধ

This is a blog for all creative people.Here we will have expressions from all forms of art.This is a bilingual blog.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

 
Follow

Get every new post delivered to your Inbox.

Join 49 other followers