
এবার হয়েছে সন্ধ্যা
“পৃথিবীতে ঘটনার ভুল
চিরদিন হবে
এবার সন্ধ্যায় তাকে শুদ্ধ করে নেওয়া কি সম্ভবে?
তুমি ভালোবেসেছিলে সব
বিরহে বিখ্যাত অনুভব
তিলপরিমাণ
স্মৃতির গুঞ্জন – নাকি গান
আমার সর্বাঙ্গ করে ভর?
সারাদিন ভেঙ্গেছো পাথর
পাহাড়ের কোলে
আষাঢ়ের বৃষ্টি শেষ হয়ে গেলো শালের জঙ্গলে
তবু নও ব্যথায় রাতুল
আমার সর্বাংশে হলো ভুল
একে একে শ্রান্তিতে পড়েছি নুয়ে। সকলে বিদ্রূপভরে দ্যাখে।”
—এবার হয়েছে সন্ধ্যা (শক্তি চট্টোপাধ্যায়)
- খাবে কখন?
- এই তো, এই বার!
- ব্যাথা কেমন?
- আছে। হাতটা টনটন করছে।
- আর রাত না করলেই ভাল। এখনি একটা বাজে।
- মেজাজ ঠিক হয়েছে?
- হ্যাঁ! চিন্তা কোরোনা।
- না না। চিন্তা আমি কেন করবো? করবে রাখালের বাবা।
- সে কে?
- গোপালের মেসোমশাই।
- উমমমম, ভাল হবে?
- ভাল লাগছে না পরমা!
- নিজের মেজাজ খারাপ কোরো না। তুমি কি করবে? যা করার তা করা হয়ে গ্যাছে। আর বাকী যা তা যার বিষয় তাকেই করতে হবে। আমি বা তুমি কেউই কিছু করতে পারবো না।
কথাটা জানে বোধি। সত্যি সত্যি জানে। তাদের কিছুই করার নেই। অনেক আগেই যা হবার হয়ে গিয়েছে। স্বাধীনতা অর্জন করতে হয়। তার যেমন দায়িত্ব আছে, তেমন অধিকারও আছে। কারোর জন্যই স্বাধীনতা বিসর্জন দেওয়া যায় না। এই কথাটা বোঝানো সম্ভব না দিয়াদিকে। দিয়া পরমার বড় বোন। পরমার ঠিক উলটো তার প্রকৃতি। পরমা যতটাই স্বাধীনচেতা ততটাই চিন্তা-ভাবনার ঘরে তালা দিয়েছে দিয়া। আসলে দিয়েছে না, কোনোদিনই খোলেনি তালা। দিয়া বাবা-মায়ের ফরমায়েশী ভাল মেয়ে। পরীক্ষার পরে পরীক্ষায় ভাল ফলাফল। চারদিকে খুব একটা তাকানোর বালাই ছিল না তার। শুধু পড়ে গিয়েছে। পড়তে পড়তেই একদিন যখন পি এইচ ডি করতে শুরু করলো অ্যাস্ট্রোফিজিক্স-এর মতন বিষয়ে তখনো দিয়া একই রকম। শুনলে মনে হবে দিয়া খুব একটা গম্ভীর ব্যাপার। কিন্তু আদৌ তা না। দিয়া আসলে এখনো একই রকমের কিশোরী। বোধি অন্তত সেটা খুব বোঝে। তাই যখন তার শ্বাশুড়ী দিয়ার বিয়ের কথা পাকা করে ফেললেন কাগজ থেকে পাত্র খুঁজে তখন সে বারবার চেয়েছিল দিয়ার মত। তখনো তার আর পরমার সম্পর্কটা আইনী কিছু না। কিন্তু সকলেই জানে বা বুঝে গিয়েছে কি হতে চলেছে! সেই জোর থেকেই দিয়াকে ধরেছিল সে। জানতে চেয়েছিল এ বিয়েতে কতটা সম্মতি তার। দিয়ার কাছে কোনো স্পষ্ট উত্তর ছিল না। দিয়ার অনেক সিনিয়র এক দাদা ছিলেন গবেষণার জগতে। তিনি দিয়াকে অনেকদিন ধরেই বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করেন।স্বাভাবিকই। কারণ দিয়ার বাড়িতে কেউ তো আর অ্যাস্ট্রোফিজিক্স নিয়ে গবেষণা করে নি। কাজেই তাকে সাহায্য নিতেই হত। কিন্তু সেই সাহায্য দেওয়াটাই একসময় একরকমের আশ্রয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল সেই মানুষটার। তিনি দিয়াদির চেয়ে বয়সে বড় তো বটেই, তার সঙ্গেই বিবাহিতও বটে। কাজেই সে সম্পর্কের আবারো হিসেব মতন কোনো পরিণতি ছিল না। দিয়াকে কিন্তু বোধি বলেছিল জীবনে কিছু কিছু সময় আসে যখন সোজা দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। দিয়া কি করবে তা দিয়ার একান্ত ভাবনার বিষয়। কেউ কোথাও তার জীবনের দায় নেবেনা, যতই নিয়ম কানুন হাঁকড়াক না কেন! আর নীতি-টিতি নিয়ে যে লোকেরা বেশী হাঁকডাক করে বেড়ায় বাজারে তারাই সবচেয়ে বেশী হারামি দেখা যায় সাধারণ ভাবে। নীতিহীন তারাই সবচেয়ে বেশী। কাজেই কে কি বলছে সে সব পরে হবে, দিয়া কি বলছে সেটাই সবচেয়ে বেশী জরুরী!
পারেনি দিয়াদি। অবস্থানকে শক্ত করতে। সেই পাত্রকে বিয়ে করে চলে গেল একদিন নিউওর্লিয়েন্স। বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই জানা গেল পাত্রের প্রচুর সন্দেহ আছে, আছে নানান শারীরিক সমস্যা। দিয়াদিই জানতে পারলো। মাঝেমাঝে হাতও তোলে গায়ে। কেন? না পাত্রর মানসিক রোগ আছে। সে কিছুকাল ছিল মানসিক চিকিৎসালয়ে। তার সন্দেহ আছে সকলের উপরেই। সকলেই তার শত্রু। সম্ভবত পড়াশোনা নিয়েই থাকা মানুষটা কোনো একটা সময়ে নিজের ছাত্রবন্ধুদের মধ্যেই কিছু বিরোধিতা পেয়েছে, অথবা আত্মীয়সমাজে কিছু ঘটেছে যা তার মনের মধ্যে ছাপ ফেলে গিয়েছে প্রবল। সেই ছাপ এখন সন্দেহের রোগে পরিণত। এমনকি আজ যখন তাদের প্রথম সন্তান হয়েছে তখনও তার মনে হয় সন্তান তাকে পছন্দ করেনা, ভালবাসেনা এবং তার সঙ্গে শত্রুতা করতে চায়। উন্মাদনা তার মনে রয়েছে।
রাত্রে আসা ইনসিওরেন্সের এজেন্ট তথা যৌনকর্মী মেয়েটার সঙ্গে কতটা ফারাক দিয়াদির? মেয়েটিকেও তো বিয়ে দেওয়া হয়েছিল পাত্রর মানসিক সমস্যা লুকিয়ে। মেয়েটির বর একদিন আচমকাই হারিয়ে গিয়েছিল। দিয়াদির হারায়নি। শুধু মারধোর আর ঝগড়া করে যাচ্ছে। পরমা, কলকাতায় একা। বোধির শ্বশুর-শ্বাশুড়ি গিয়েছিলেন মেয়ের কাছে। সেখানে নিজেদের চোখেই দেখে এসেছেন। শোনার পর থেকে বোধি আরও বেশী ঘেঁটে আছে। ভাল লাগছে না তার। সবচেয়ে বেশী খারাপ লাগছে তার শ্বশুর-শ্বাশুড়ির জন্য। দুজনেই ভাল মানুষ। জীবনে জেনেশুনে কারোর ক্ষতি করেন নি। মেয়ের বিয়ে আর পাঁচজন বাঙালির মতই উপার্জনশীল বিদেশ নিবাসী পাত্রের সঙ্গে দিয়ে মেয়ের ভালই করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ভাল চাওয়া আর ভাল করার মধ্যে অনেক ফারাক। সারাজীবন বোধি এটাই দেখে এসেছে। এত এতবার দেখেছে যে তার আর আলাদা করে বুঝতে অসুবিধে হয় না ফারাক কতটা! সেও অনেকবার ভাল করতে গিয়ে মন্দ করে বসেছে। দিয়াদিকে বারবার এটাই বোঝাতে চেয়েছিল সে। মা ভালই চান। বাবা ভালই চান সাধারণভাবে। কিন্তু তাঁদের সব ভাল চাওয়া সত্ত্বেও একটা সত্যি আছে, সেই সত্যিটা হল কোনো মানুষ কখনো জানেনা কোনটা সবচেয়ে ভাল বা মন্দ। রাজনীতি থেকে ব্যাক্তিজীবন সবটাই শুধু মাত্র ট্রায়াল অ্যান্ড এরর, চেষ্টা আর ভুলের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যাওয়া। যতটা যাওয়া যায় ততটাই। সেখানে যে মানুষটার জীবন জড়িত তাকে ভাবতে দিলেই সবচেয়ে ভাল। সে যতই কম বোঝার লোক হোক সেই জানবে তার ভাল বা মন্দ। কম বয়স ছিল যখন বোধির তখন সে ভাবতো একদিন বুঝি সব বদলে যাবে। সব মানুষ একেকজন পবিত্রতম মানুষ হবে। হয়নি। সে নিজেও হয়নি। তারা যে যার লোভ-লালসা-স্বার্থ-দায়-চাহিদার মধ্যে ঘুরপাক খেয়ে চলছে। তখন ভাবতো একদিন বিপ্লব হবে দেশে। সব বদলে যাবে। এই যে চারপাশে চলা নৈরাজ্য, হাহাকার, দারিদ্র, মহাপতনের দিনকাল এসব শেষ হয়ে নতুন এক সূর্য উঠবে। নতুন এক সকাল আসবে। অন্য এক জীবন, এক মহান জীবন তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। মিছিলে মিছিলে হেঁটে, ক্ষোভে-বিক্ষোভে ফেটে পড়েওছে একদিন। পায়ে হেঁটে দেশ জানতে গিয়েছে শহর থেকে গ্রামে। শুনে এসেছে গ্রামপতনের শব্দ। অস্ত্র না কি অস্ত্রহীন লড়াই সেই তর্কে রাতের পর রাত, সন্ধের পর সন্ধে কেটে গিয়েছে। কিন্তু কিচ্ছু হয় নি। কিচ্ছু না। সেইসব দিনগুলো কেমন যেন হাওয়ার মতন মিলিয়ে গিয়েছে। এখনো বেশ কিছু মানুষ লড়ে যাচ্ছেন সেই একই বাসনায়। কিছু হবে কি?
বোধির মনে হয় হওয়ার নেই এইভাবে। যদি সত্যি হওয়ার হত তাহলে এত এত হাজার বছর ধরে মানুষের যে জ্ঞানভান্ডার গড়ে উঠেছে তাতে কম ভাল কথা বা ভাবনা ছিল না, তা দিয়েই হত তো! হল না কেন? ধর্মের মাধ্যমেই হোক, কি বিদ্রোহ, বা শুধু মাত্র দর্শনের স্থান থেকেই কম লোক বলেছেন কম কথা? কজন শুনলো? কেন শুনলো না সব লোক? যাঁরা শুনলেনও তাঁরাও এক সময় নিয়ম করে আবৃত্তি করার মতন সেইসব কথা উগড়ে দিয়ে চলে গিয়েছেন জীবন থেকে। কেন? খুব সামান্য দু-একটা বিষয় বোধহয় আছে এত কিছুর পিছনে। সে হল বোধের প্রসঙ্গ। এই সব মহান কথাও সব মানুষের কাছে পৌঁছয়নি। যাদের কাছে পৌঁছেছেও তাদের যথাযথ শিক্ষালাভের পর পৌঁছয়নি, আগে-ভাগেই চলে গিয়েছে সে সব কথা। শিক্ষা ছাড়া বহু কিছু অনুধাবনই করা যায় না। এই যে এখন ভাবছে সে এসব কথা, এ কথায় লাভ কি? যেখানে মানুষ পেটের ভাত জোগাড় করতেই জীবন শেষ করে ফেলছে সেখানে শিক্ষা আসবে কোথা থেকে? শিক্ষা কি করে প্রাথমিক বিষয় হবে? রাষ্ট্রের সদিচ্ছার যতই অভাব আছে বলা হোক, সে যতটুকুও করছে তাও কি পৌঁছচ্ছে মানুষের কাছে? হাজারো প্রকল্প আছে সরকারের। সেই সব প্রকল্পের সুফল পাচ্ছে কই মানুষ? কাজ থেকে বাসস্থান থেকে শিক্ষা থেকে স্বাস্থ্য সব নিয়েই যতটুকু কাজও এই গণতন্ত্রে করা যায় তা মাঝপথে লুট হয়ে যাচ্ছে। লুট করছে কারা? তারা কি এই দেশেরই মানুষ না? তাহলে কিছুই না আসা একটা সমাজে বোধ আসবে কোথা থেকে? তার নাম তো বোধি, বোধ কি তারই হয়েছে?
এই যে সে সুতনুকার জীবন নির্ধারণ করার কাজে লেগেছে সেটা কি? সুতনুকা তাকে ভালবাসে। সুতনুকার ভালবাসাকে তার চারপাশ বিভিন্ন কারণে বিভিন্ন ভাবে দেখবে। তাকে মানবে না। সুতনুকা কষ্ট পাবে। সুতনুকা অসাধারণ জীবন নিয়ে ভাবিত নয়। সে যেভাবে বেড়েছে সেভাবেই দেখে সব। তার আলাদা কোনো প্রশ্ন নেই। তার জীবনের মানুষটি শুধু তার হবে। তার-ই। এবারে? বোধি এসব জানার পরেও কি করে সুতনুকাকে না এড়িয়ে চলতে পারে? সে তো সুতনুকার ঘোষিত সম্পত্তি হবে না। তাহলে? পরমার এ কথা জানা আছে। জেনেছে পরমা। ধীরে ধীরে বোধির জীবন দেখে দেখে। পরমাও জানে ব্যাক্তির স্বাধীনতার অর্থ কি, জেনেছে তার নিজের জীবন দিয়েই। বোধি তাকে যে জায়গা দিয়েছে সেই জায়গা দেখে। সন্দেহ, অবিশ্বাস কোনো কিছুই নেই তাদের সম্পর্কে। এমনকি সেই অর্থে কোনো ঝগড়াও নেই। যে সব উপাদানগুলো দিয়ে সাধারণভাবে একটা সম্পর্ককে চিনতে শেখানো হয় তার কিছুই নেই। তাহলে? বহু বন্ধু লোক অবাক হন, এমন কি করে হয়? তাহলে কি সেই টান নেই দুজনের? কি বোকা প্রশ্ন একটা! দুজন প্রাপ্তমনস্ক মানুষ, নিজেদের মধ্যেকার সমস্ত কিছুকে বুঝে নিতে পারেন, বিরোধকেও ঠান্ডা যুক্তি-তর্কে ছেঁড়াকাটা করে সামলে নিতে পারেন বলে সেটাতে প্রেম নেই? প্রেম শুধু আছে মারামারি, কাটাকাটি আর দখলে? তাহলে তো দিয়াদির বর যে কাজটা করে সেটাই আদর্শ? কিম্বা সুতনুকার বর রজত যা করেছে সেটাই স্বাভাবিক? কিন্তু এ কথা শুনছে কে? তারা তাদের দুনিয়ার বাইরে কি পা রাখতে চাইছে? একদমই না। বরং আরো বেশী বেশী করে নিজেদের ভ্রান্তিগুলোকে সাজিয়ে রাখে। এক সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে এসেও সেই একই ভ্রান্তি নিয়েই যায় অন্য সম্পর্কের মধ্যে। সুতনুকাও তাই করবে বা করতে চায়। একটি সম্পর্কের মধ্যে সন্দেহ-অবিশ্বাস এমনকি নিশ্বাস-প্রশ্বাসের জায়গা না থাকা থেকে বেরিয়ে এসেও সেই একই রকম ভাবেই চলতে চায়। আরেকটাকেই শুধু আঁকড়ে এবং নিজের করেই বাঁচতে চায়। তার যে প্রক্রিয়া সেই প্রক্রিয়ার মধ্যেই দাঁড়িয়ে থাকতে চায়। তাই তার পারিপার্শ্বকে সেও অতিক্রম করার কথা ভাবলেই ক্রমশঃ সতর্ক হয় আরো। অথচ তার আশেপাশের সব কটা সম্পর্কই তার উপরে নিজেদের দখল নিশ্চিত করার চেষ্টাই করতে চেয়েছে শুধু। ভাল চেয়ে হলেও তাই-ই করছে। না হলে তার বাবা তার পাশে দাঁড়ায় নি কেন?
এইখানে রয়েছে অরিন্দম। বোধি জানে সে তাকে পছন্দ করছে না। তার অনেকগুলো কারণ আছে। প্রথমতো বোধি অরিন্দমকে সুতনুকার জীবনের অথোরিটি হিসেবে মানে না। সেই কারণে অরিন্দমের নির্ধারিত পন্থাতেই সে হাঁটবে এমন কোনো স্থিরতা নেই। সেটা অরিন্দমও খুব ভাল করে বুঝে গিয়েছে। দ্বিতীয়ত, অরিন্দমের কোথাও কাজ করে কমপ্লেক্স-ও। বোধির পরিচয় এবং সেই অর্থে খ্যাতিও তার চেয়ে বেশী। সুতনুকার বোধিকে নিয়ে, তার লেখাকে ঘিরে মুগ্ধতা অরিন্দমর ভাল লাগেনি। অরিন্দম নিজেই সুতনুকাকে বলেছে একসময়ে তাকে। অরিন্দমের কোথাও একটা ইনসিকিউরিটি তৈরী হয় এতে। সে চায় সে সুতনুকার জীবনের প্রতিটি কণা জানবে। তার অমতে সুতনুকার জীবন চলবেই না। সুতনুকার যে জীবনটা যাপনের ইচ্ছে তার সঙ্গে প্রকৃতিগতভাবে অরিন্দমের বিরোধ আছে। সে নিয়মনিষ্ঠ সংসারের বিশ্বাস রাখা মানুষ। তার ভালমন্দ সব নিয়েই সে চলে এবং নিজের কাছে একটা নীতিগত আচরণ খাড়া করে রাখে। বোধি জানে সেটাও একদিক থেকে বেশ কাঁচা অবস্থান। যেমন একবার সুতনুকা ট্যাক্সিতে তার কর্পোরেশনের একটা ট্যাক্সের মামলারর ফাইল ফেলে নেমে এসেছিল। ট্যাক্সি ড্রাইভার বয়স্ক পাঞ্জাবী। তিনি ওই ফাইলটার মধ্যে সুতনুকার নাম না পেয়ে যে কোম্পানির মামলা সে কোম্পানির কাছে দিয়ে আসেন। কোম্পানি তখন অরিন্দমকে ফোন করে বলে গোটাটা। অরিন্দম জানতেন এটা। কেসটা তিনিই দিয়েছিলেন বলে কোম্পানি ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁকেই ফোন করেছিল। সুতনুকাকে করেনি। সুতনুকাকে বলার আগে অরিন্দম নিজে চলে গেছিলেন ওই কোম্পানিতে। ট্যাক্সি ড্রাইভারকে আলাদা করে ডেকে নিয়ে তাকে টাকা দিয়েছিলেন।

অন্যদিকে বোধিকে ফোন করেছিল সুতনুকা। বোধি শহরের ট্যাক্সি ইউনিয়নগুলোতে তার জানাশোনাদের দিয়ে তখন খোঁজ করাচ্ছিল। লোকটির বর্ণনা দিয়ে দিয়ে খোঁজ চলেছে। ইউনিয়নগুলোর নেতারাও জানে সাংবাদিকদের কাজে লাগে। তাই তারা চেষ্টার কসুর করেনি। বোধি যখন পরের দিন সন্ধেতে সুতনুকাকে নিয়ে ওই ট্যাক্সিওলা অব্দি পৌঁছলো, তখন জানতে পারলো যে ফাইলটা কোম্পানি থেকে নিয়ে গিয়েছেন অরিন্দম। তাকে টাকাও দিয়েছেন। পাঞ্জাবী মানুষটি টাকা নিয়ে খুব সঙ্কুচিত। তিনি টাকা নিতে চাননি, কিন্তু জোর করেই অরিন্দম দিয়েছে তাঁকে। বোধির ভাল লাগেনি বিষয়টা। মানুষ এমন কাজ করবে এটাই স্বাভাবিক। বড়জোর, লোকটির দারিদ্রর জন্য তার ফোন এবং যাতায়াত খরচ দেওয়া যেত। তার বদলে তাকে পুরস্কার দেওয়াটা বোধির ভাল লাগেনি। এভাবেই স্বাভাবিক কাজকে ক্রমশ অস্বাভাবিক করে তোলে একটা সমাজ। শুধু মাত্র ব্যাক্তিস্বার্থ সিদ্ধির যে রাস্তা খুলে দেওয়া হয়েছে এই সমাজে তাতে এটাই নিয়ম হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কিন্তু এমন নিয়ম সভ্যতার নিয়ম না। এর পর থেকে লোকটি প্রতি কাজই যদি এমন পুরস্কারের জন্যে করে তাহলে? সামাজিক বন্ধন বা কর্তব্য বলে কি অবশিষ্ট থাকছে এতে? ধরা যাক একজন দিলেন না। তাহলে তার পরের বার লোকটি এই কাজটা আর করবে না? পুরস্কারের জন্য এই কাজটা তো মানুষটা করেনি। তাকে তার দারিদ্রের জন্য অসন্মান করা কেন? এটা তো স্বাভাবিক কাজ একটা।
অরিন্দমের বক্তব্য আলাদা। তার বক্তব্য কাজটা খুব জরুরী। কারণ ভাল কাজকে পুরস্কার দেওয়া উচিত। তাতে যে ভাল কাজের স্বাভাবিকতা নষ্ট হয় এই যুক্তি মানতে অরিন্দম রাজী নয়। স্বর্গ-পাতাল পুরস্কার বা তিরস্কার হিসেবে রেখে, লোভ দেখিয়েই মানুষকে ভাল করতে হবে এমন অসম্ভব হাস্যকর যুক্তিতে দাঁড়িয়ে যায় অরিন্দম। ঠিক যেখানে দাঁড়িয়ে থাকে ধর্মের খেলাটা। সেখান থেকে কথা ঘুরতে ঘুরতে পৌঁছয় ভাল বা মন্দের আপেক্ষিকতা নিয়ে। সেই আপেক্ষিকতার ক্ষেত্রে আবার এই অরিন্দমেরই বক্তব্য ভাল বা মন্দ সাদা বা কালো শুধু। তার কোনো ধুসর অঞ্চল নেই। কি বৈপরীত্য ভাবনার! এবং সেইটা ধরিয়ে দিলেও অরিন্দমের বিন্দুমাত্র হেলদোল হয় না। বোধি তাকে যখন বলে যে একটা লোক অফিসে প্রচন্ড ঘুষখোর হয়েও বাড়িতে নিজের সন্তানের সবচেয়ে ভাল চাইতে সক্ষম, জীবন এমনই ধুসর। তারা সকলেই জানে যে লোকটা অফিস থেকে ব্যবসা কি রাজনীতিতে চুরি করছে, মিথ্যে বলছে সেই লোকটাই বাড়িতে সন্তানকে পড়াচ্ছে বিদ্যাসাগরের ‘সদা সত্য কথা বলিবে’। অরিন্দমের মনে হয় এটা fuzzy logic। এটাই অরিন্দম। সেই জন্যেই তার করা ভাল কাজগুলোর সম্পর্কেও তখন বোধির ভাবনা আসে। তাহলে যে অরিন্দম অন্যকে পুরস্কার দেয় সেই অরিন্দম নিজে কেন করে সুতনুকার জন্য? কি পুরস্কারের আশায় করে? এখানেই চলে আসে আরেক জটিল ভাষ্য। এই কথাটা অরিন্দমর মানতে খুব কষ্ট হবে। কিন্তু এমন হাজারো বৈপরীত্য দিয়ে অরিন্দম বা অরিন্দমরা তৈরী হয় এবং তারপরেও গলায় যতটা জোর আছে তা দিয়ে প্রমাণ করতে চায় তাদের জীবন ভীষণ নিয়মনিষ্ঠ একটা বিষয়।
না বোধির এমন কোনো নিয়মনিষ্ঠা নেই। নেই কোনো সাদা-কালো জীবন। যা আছে তা শুধু ধুসর অঞ্চল। সেখান থেকে সুতনুকার জীবন নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টাটা একটা ভুল কাজ হয়েছে। ওই ঘটনার পরে সুতনুকা অরিন্দমের সঙ্গে প্রাথমিকভাবে খুব ঝগড়া করে। বোধি বলেছিল ভুলটা সুতনুকার। নিজের কাজ নিজেকেই করতে হয় এবং দায়িত্ব নিতে হয়। না নিলে এইভাবে সমস্যা আরো আসবে। অরিন্দমের উপর কাজের জন্য নির্ভর করতে হবে কেন? কেন সুতনুকা নিজে তার চেম্বার করার কথা ভাবছে না? যোগাযোগ কম নয় তার। চেম্বার করলে এইভাবে ফাইল নিয়ে রাস্তাঘাটে সমস্যা হয় না। সুতনুকা চেম্বার করার মতন ভরসা পায়নি। বোধি তাকে এও বলেছিল যে যতক্ষণ না সে দাঁড়াচ্ছে নিজের পায়ে ততক্ষণ বোধি তাকে প্রয়োজনে আর্থিকভাবে সাহায্য করবে। অরিন্দম কাজ দিয়েছিলেন। সুতনুকা ভুল করেছে। সবটাই সত্যি। কিন্তু এই ভুলটা যে কোনো মানুষের হতে পারে যে কোনো সময়ে। এর জন্য সুতনুকাকে বকা যেতে পারতো, কিন্তু অপমান করা যেতে পারে না। কিন্তু অরিন্দম এসব কিছুই চাননি। তিনি চেয়েছিলেন এই সুযোগে সুতনুকার উপরে তাঁর ঝাল আবার ঝেড়ে নিতে। তাই ফাইলটা পেয়ে সুতনুকাকে জানাননি। কোম্পানিকে বলেছিলেন সুতনুকাকে আর কেস দেবেন না তিনি। এত অপদার্থ এ কথা তিনি জানতেন না। কোম্পানি সুতনুকাকে ফোন করেনি। সুতনুকা যখন ফাইলটা নিয়ে ট্যাক্সিওলার থেকে জানে তখন ফোন করে কোম্পানির প্রোপাইটর আনন্দমোহন সারং-কে। সারং তাকে বলে,
- আপ লোগ কঁহা কঁহা সে ও ডিগ্রী লেকে আযাতে হ্যাঁয় ট্যাক্স কনসালটেন্ট ইয়া ল’ইয়ার বননে কেয়া মালুম। ঘরমে রহিয়ে না! আপকাভি ভালা হোগা, হাম লোগন কা ভি। বেবজা টাইম জারা তো না হোঙ্গে হামারা।
সুতনুকা অপমানিত হয়েও ক্ষমা চেয়েছিল। বোধি সামনে দাঁড়িয়ে শুনছিল সবটা। ক্ষমা চাইলেও সারং বলে,
- ও সব ছোড়িয়ে। ইয়ে সব আপকা বস কা কাম নহী। উয়ো কেস আব আপকা নহী রহা। ও মিত্রা সাবকো দে দিয়া হামনে। অউর দো বারা ফোন মাত কিজিয়েগা।
বলে ফোনটা কেটে দেয়। সুতনুকার মুখ-চোখ লাল হয়ে গেছিল অপমানে। এই লোকটাই তাকে দিনে-রাতে নানান ছুতোয় ফোন করতো। সুন্দরী মহিলা ল’ইয়ার বলে। সুতনুকা একেক সময়ে বিরক্ত হয়ে ফোন ধরতোও না। সেই আজকে তাকে অপমান করছে।
আর অরিন্দমের কাছে সুতনুকা যখন জানতে চায় যে তিনি তাকে জানানোর প্রয়োজন বোধ করেননি কেন, তখন অরিন্দম সুতনুকাকে বলেছিলেন,
- সারাক্ষণ বোধিকে নিয়ে বুঁদ থাকলে আর কাজ করবে কখন? নিজেও করবে না, আর আমার রেপুটেশনও নষ্ট করবে।
সুতনুকা চুপ করে বাড়ি চলে গিয়েছিল। গোটা রাস্তা কথা বলেনি। অরিন্দম দু-একবার কথা বলতে গিয়ে বুঝেছিল যে যে কোথাও এর জন্য তাকেই দায়ী করছে এখন সুতনুকা। নিজের ভুল দেখা সুতনুকার অভ্যাস না। সুতনুকার ভাবনার প্রক্রিয়াটা বোধি রাতে ফিরে এসে ধরার চেষ্টা করছিল। সুতনুকা দীর্ঘ্য দিন অরিন্দমের সঙ্গে আর যোগাযোগ রাখছিল না। সেই রাস্তায় নামিয়ে দিয়ে যাওয়ার পর থেকেই এমন চলছিল। কিন্তু আলাদা চেম্বারটাও করছিল না। আবার বোধির থেকে টাকা নিয়ে কাজের জন্য চেষ্টা চালানোর সময়টাও সে নিতে ইচ্ছুক ছিল না। অতএব একটা জটিল স্থিতাবস্থা চলছিল। তার সঙ্গে বোধির পরমার সঙ্গে সম্পর্ক ভাঙার কোনো কারণ ছিল না। কাজেই সুতনুকার হিসেব মতন তাকে বিয়ে করার উপায় নেই এটাও সুতনুকা বুঝে গিয়েছে। সুতরাং, বোধিকে তার প্রয়োজন কতটুকু তা এবারে নিশ্চই ভাবার চেষ্টা করবে সুতনুকা। আর অন্যদিকে অরিন্দম বা অরিন্দমের মতন মানুষদের কতটা প্রয়োজন সেটাও। বোধিও বুঝতে পারছিল এবারে সুতনুকার যাবার সময় হচ্ছে। সুতনুকা সামাজিক নিয়মের বাইরে যাবার ক্ষমতা রাখেনা। সব চেয়ে বড় কথা চায়ও না। কি চায়? তা সুতনুকার কাছে খুব পরিস্কার কোনোদিনও হবে না। এভাবেই চলবে সে। প্রয়োজন তার কাছে খুব বড় কথা। অভাব প্রয়োজন শেখায় এ কথা বোধিও জানে। তার জীবনেও অভাব ছিল, দারিদ্র ছিল। কিন্তু নিছক প্রয়োজনকে অতিক্রম করতে পেরেছে সে তবুও। সুতনুকা? খুব মুশকিল!
যখন প্রথম আলাপ হয়েছিল অরিন্দমের সঙ্গে তখন অরিন্দমও একবার বলেছিল বোধিকে যে বোধিকে প্রয়োজন সুতনুকার কাজে সাহায্য করার জন্য। সুতনুকাকে তার যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে কিছুটা এগিয়ে দেওয়ার জন্য। সবেতেই আজকাল লাগে যোগাযোগ, তাই! তারপরেও যতদিন সম্পর্কটা উপরে উপরে স্বাভাবিক ছিল ততদিন অনেকবার বলেওছে বোধিকে একই কথা। ব্যাস? এই শুধু? তাও অরিন্দম মনেই রাখেনি যে সে আগে চেনে সুতনুকাকে, তারপরে অরিন্দমকে। অরিন্দম তার কাছে সুতনুকাকে নিয়ে আসেনি কাজের সুবিধার জন্য। সুতনুকার সঙ্গে তার পরিচয় অরিন্দমের চৌহোদ্দির বাইরেই। কিন্তু এই টার্ম ডিকটেট করাটা অরিন্দমের কাছে খুব স্বাভাবিক। তার অভ্যাস হয়ে গিয়েছে যেখানে যেমন সুবিধা আছে তেমন সুবিধা ব্যবহার করা, আর মুখে নীতি-নৈতিকতার ভন্ডামি করা। বোধির ভেতরে একটা বিরক্তি জন্মাচ্ছিল। ব্যবহৃত হওয়াটাকে সে বেশ ঘৃণা করে। সে নিজে কাউকে জীবনে ব্যবহার করেনি। সেখানে কেউ তাকে শুধু ব্যবহার করতে চাইছে ভাবলে সেই মানুষটা সম্পর্কে কোনো শ্রদ্ধা তো দূরস্থান, সামান্য সন্মানও অবশিষ্ট থাকে না। কেউ তার কাছে সাহায্য চাইলে সে সানন্দে সাহায্য করবে, কিন্তু ব্যবহার করতে চাইলে সেই মানুষের দিকে আর ফিরে তাকানোরও প্রয়োজনও বোধ করে না। তাছাড়া সুতনুকার ভালর ভাবনা তার খুব কম থাকার কারণ কি? যদি অরিন্দম বুঝেই থাকে তার আর সুতনুকার মধ্যে বিশেষ কিছু স্পেস আছে, তাহলে সেই স্পেসটায় ভালর ভাবনা থাকবে না এমনই বা ভাববে কেন? আসলে ওই যে, সবকিছুকেই নিজের ইচ্ছে বা বিবেচনার মতন চালানোর অভ্যাস, ওইখান থেকেই আসে এই সমস্যা। কোনো এককালে সুতনুকার ভেঙে পড়া জীবনকে অরিন্দম একদিন সহায়তা দিয়েছে। অতএব তার অধিকার জন্মে গিয়েছে সুতনুকার জীবন নির্ধারণ করার। যুক্তিটা খুব সহজ। যেহেতু সে বের করে এনেছে সুতরাং সে একটা অভিপ্সিত লক্ষে পৌঁছে দেবেই সুতনুকাকে। লক্ষটা কার? তার না সুতনুকার? অরিন্দমের কাছে লক্ষটা অনেক বেশী তার নিজস্ব। আর সুতনুকার? জানাই নেই। তার কি লক্ষ তা তার জানার কোনো সম্ভাবনাও নেই তেমন। জীবনে এত জট লেগেছে সে জট এত সহজে ছাড়বে না। আর জট থাকলে তার মধ্যে দাঁড়িয়েই আরো জটিলতা নিয়ে ভাববে এমন যদি সুতনুকা হত তাহলে তার জীবনে এই জটটাই আসতো না। কাজেই সুতনুকা কিছু দূর যাবার পরেই সব ছেড়ে দেবে সময়ের হাতে। তাতে যদি কিছু হয় হবে, না হলে হল না বলে তার দুঃখ করার বিলাস থাকবে।
এটা কি অস্বাভাবিক? নাহ্। এমনি তো এই দেশের একটা বড় অংশের মানুষ। তারা জীবনকে দেখেই ওই ভাগ্যের হাতের খেলনা হিসেবে। আর সবই তাই ছেড়ে দেয় ভাগ্যরে হাতে সমাধানের জন্য। সেই সমাধান যদি মৃত্যু অবধি নিয়ে যায় তাহলে তাই যাবে। কিন্তু নিজে চেষ্টা করে বাঁচবে না। কেউ যদি নিজে বাঁচতে না চায় তাকে যতই স্যালাইন দেওয়া হোক না কেন একটা সময়ে সে মরবেই। কিছুদিন আগেই এমন একজন মানুষকে দেখেছে বোধি। ভদ্রলোক খুব নিরীহ মানুষ। চাকরী করতেন একটি গ্রামীণ ব্যাঙ্কে। খাটিয়ে, প্রাণচঞ্চল মানুষ। কোনো কারণে তাঁর উপরওয়ালা তাঁর ব্যাপারে সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি একদিন খুব অপমানিত হলেন তাঁর ওই উপরওয়ালার কাছে। ব্যাঙ্কের অন্য সব কর্মীরা স্বাক্ষী ছিলেন এই অকারণ অপমানের। মানুষটি গুটিয়ে গেলেন প্রথমে। তারপরে ধীরে ধীরে অসুস্থ হতে থাকলেন। তারপরে শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন। শরীর দুর্বল হয়ে যেতে থাকলো। তিনি কিছুতেই খেতে পারতেন না আর। বহু ডাক্তার দেখলেন তাঁকে। কলকাতা থেকে শুরু করে দক্ষিণভারতের অনেক ডাক্তার দেখলেন। বহু রকমের চিকিৎসা হল। মানসিক, শারীরিক সব রকম। কিন্তু ক্রমশ তিনি একেবারেই খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিলেন। বিছানায় শুয়েই শুধু কাটাতেন দিন। কারোর কথায় সারা দিতেন না। কোনো রকমের চাহিদা ছিল না তাঁর। উপোস করে থাকতেন। জোর করে খাওয়ালে খেতেন। তারপরে সব বমি করে দিতেন। কয়েকদিন অন্তর অন্তরই তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হত। তাঁরই ব্যাঙ্কের সহকর্মীরা তাঁকে নিয়ে যেতেন বিভিন্ন হাসপাতালে। কলকাতার এক নামী বেসরকারী হাসপাতালে থাকাকালীন বোধি তাঁকে দেখতে গেছিল। কাউকেই চেয়ে দেখতেন না মানুষটা। গোটা জীবনপ্রবাহকেই যেন তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। নির্লিপ্ত হয়ে শুয়ে আছেন। কিছুই তাঁকে আর স্পর্শ করছে না। কোনো উচ্চকিত স্বর নেই তাঁর। গোটা জীবনের সুরটিকে যেন এক খাদে বেঁধে নিয়েছেন। এমন এক খাদ যেখানে কন্ঠ নিয়ে যাওয়াই দুস্কর। সেই খাদ থেকে নিরুচ্চারে কিন্তু স্পষ্টতই বলে চলেছেন এই নীচ, অধম দুনিয়াকে তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। স্ত্রী-পুত্র কিছুই তাঁর না। এই সভ্যতাকে যেন তিনি নীরবে কিন্তু কঠিন প্রত্যাখ্যান করেছেন। বোধি বেশীক্ষণ থাকতে পারেনি সেখানে। এমন প্রত্যাখ্যানকে সহ্য করাও মুশকিল। নিজের যাবতীয় অপারগতা, অকর্মণ্যতা যেন তাড়া করতে থাকে এমন কিছুর সামনে দাঁড়ালে। সেই মানুষটি মারা গিয়েছেন কদিন হল। বোধি বনগাঁ আসার কয়েকদিন আগেই তিনি ঘুমের মধ্যেই চলে গিয়েছেন। তিন বছর ধরে সকলের তাঁকে নিয়ে সব লড়াইকে ব্যার্থ করে দিয়ে চলে গিয়েছেন। এখনো বোধি চোখ বুজলে তাঁর মুখটা দেখতে পায়। কি অসম্ভব নির্লিপ্ত একটা মুখ, যাতে জীবনের কোনো ছায়াই আর লেগে নেই। তাই বোধি জানে, কেউ যদি বাঁচতে না চায়…! সেও যদি কোনোদিন এমন প্রত্যাখ্যান করে সব? যদি কোনোদিন তারও মনে হয় বিষের পেয়ালা পূর্ণ? যদি কোনোদিন…!
- এবারে খেয়ে নাও। শরীর তোমার ভীষণ ভাঙছে। এমন করলে কোনো কাজই আর শেষ করতে পারবে না।
পরমা দূরভাষের ওপ্রান্ত থেকে বলে। বোধির মাথার উপরে তারা ঝলকানো আকাশ। পরমার কথা আসলে ওই আকাশের কোনো এক প্রান্তে কোনো এক স্যাটেলাইট হয়ে আসছে তার কাছে। পরমার কথা আকাশ ছুঁয়ে আসছে। সুতনুকার কোনো কথাই আসছে না। বিভূতিভূষণ, স্যাটেলাইট নিয়ে কি বক্তব্য ছিল আপনার? সাহিত্য অকাদেমি থেকে সুনীলকুমার চট্টোপাধ্যায়ের বিভূতিভূষণকে নিয়ে একটি বই আছে। নাম ‘বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়’। অনেকদিন আগে সেখানে বোধি ওনার করা বিভুতিভূষণের ডায়েরীর অনুবাদ পড়েছিল।
“In the company of mysterious evening star, fragrance of the wild flower, the chirping of the birds, I want to be your playmate. You are the eternal wayfaring boy wandering about in the forests with the garland of wild flowers in your neck. But who cares for your message? None. Everybody wants wealth, power, fame. Does anybody care for this enchanting beauty of moonlit night? These eyes that see this beautiful world are your gift. I am prepared to come to this earth with these eyes. You are the great artist. I need your blessings.”
ইছামতীর ধারে চাঁদের রাত দেখে এমন লেখা। বোধিও আবার হাঁটতে হাঁটতে ইছামতীর ধারে। আজকেও চাঁদের রাত।
- কাজ পরমা? আমি তো শুরুই করতে পারলাম না।
- বোধি, আবার সেই?
- আমি অন্ধ পরমা। রঙ আর বেরঙ না জেনে ছবি এঁকে চলেছি। সুর আর বেসুর না জেনে আনাড়ির মতন সেতার বাজিয়ে চলেছি। আমি বধির। আমার সন্ধ্যা হয়ে গেল যে পরমা। আমি তো শুরুই করতে পারলাম না।
ভারী ট্রাকের চাকায় ব্রীজটা দুলে উঠলো। শব্দগুলো হাওয়ায় হারিয়ে গেল, বোধির সাহিত্যের মতনই।

‘বাঁশ কাটিতে যেয়ে রূপাই মারল বাঁশে দা,
তল দিয়ে যায় কাদের মেয়ে—হলদে পাখির ছা!
বাঁশ কাটিতে বাঁশের আগায় লাগল বাঁশের বাড়ি,
চাষী মেয়ের দেখে তার প্রাণ বুঝি যায় ছাড়ি |
লম্বা বাঁশের লম্বা যে ফাঁপ, আগায় বসে টিয়া,
চাষীদের ওই সোনার মেয়ে কে করিবে বিয়া!
বাঁশ কাটিতে এসে রূপাই কাটল বুকের চাম,
বাঁশের গায়ে বসে রূপাই ভুলল নিজের কাম |
ওই মেয়ে ত তাদের গ্রামে বদনা-বিয়ের গানে,
নিয়েছিল প্রাণ কেড়ে তার চিকন সুরের দানে |
“খড়ি কুড়াও সোনার মেয়ে! শুকনো গাছের ডাল,
শুকনো আমার প্রাণ নিয়ে যাও, দিও আখার জ্বাল |
শুকনো খড়ি কুড়াও মেয়ে! কোমল হাতে লাগে,
তোমায় যারা পাঠায় বনে বোঝেনি কেন আগে?”
এমনিতর কত কথাই উঠে রূপার মনে,
লজ্জাতে সে হয় যে রঙিন পাছে বা কেউ শোনে |
মেয়েটিও ডাগর চোখে চেয়ে তাহার পানে,
কি কথা সে ভাবল মনে সেই জানে তার মানে!
এমন সময় পিছন হতে তাহার মায়ে ডাকে,
“ওলো সাজু! আয় দেখি তোর নথ বেঁধে দেই নাকে!
ওমা! ও কে বেগান মানুষ বসে বাঁশের ঝাড়ে!”
মাথায় দিয়ে ঘোমটা টানি দেখছে বারে বারে |’
—নকশী কাঁথার মাঠ (জসিমুদ্দিন)
রুটিটা ঝেড়ে নিচ্ছিল বোধি। খাবার আগে রুটিতে একটু জল ছিটিয়ে নিয়ে গরম করিয়ে নেবে। হোটেলের চৌকিদারের ঘরে একটা স্টোভ আছে। সেই স্টোভ-এই গরম হবে। আজ রাতে এখানেই থাকবে। কাল সকালে ফিরবে বাংলোতে। ততক্ষণ চা ইত্যাদির জন্যেও ওই স্টোভই ভরসা। হোটেলে আলাদা করে রান্না হয় না। বাইরে থেকে আনাতে হয় খাবার। এই রুটিটাও বাইরে থেকে আনা। রুটিটা ঝাড়তে ঝাড়তে দেখছিল সামনের মহিলার নাকে একটা নথ আছে। রূপোরই হবে বোধহয়। নথ নিয়ে বোধির একটা টান আছে। কোথা থেকে এল তা সে বলতে পারবে না। তার মা জীবনে কখনো নথ পরেনি। দুর্গার নাকে একটা নথ ঝোলে দেখেছে ছোটবেলা থেকেই। পরমা নাকে নথ পড়ে না। পরমা কোনো গয়নাই পড়ে না তেমন। খুব কিছু হলে একটা ছোট্ট দুল কানে, ব্যাস্। অনুজা পড়তো। অনুজার থেকেই কি? কে জানে? নথটা চোখে পড়তেই তার জসিমুদ্দিনের কথা মনে পড়লো। লাইনগুলো মনে পড়লো। কম বয়সে যখন সিনেমা নিয়ে খুব একটা হুল্লোড় ছিল জীবনে তখন একবার সঙ্গোপনে হলেও ভেবেছিল ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ -টা সিনেমা করতে পারলে খুব ভাল হয়। কাব্যটার একাংশ সুরে গাওয়া হতে থাকবে। সিনেমাটার মধ্যে থাকবে কথকদের দল। তারা গাইবে, আর তাদের গানের মধ্যে মধ্যে ঘটে যাবে সাজু আর রূপাই-এর গল্পটা। গোটা সিনেমাটা জুড়ে থাকবে পল্লীবাংলা। তার মাঠ-ঘাট-ক্ষেত-বাঁশবন। সে সব কল্পনায় বেশ মজা ছিল। কিন্তু ওই অবধিই। নকশী কাঁথার মাঠ নিয়ে কয়েকবার বসেওছে। তারপরে থেমে গিয়েছে। তার কাজ না এটা। কি জানে সে গ্রামের? পল্লীবাংলার?
- খান এবারে।
- হুম?
- বলছি এবারে খান। খেতে শুরু করুন।
গরম করে নিয়ে এসেছেন রুটিটা মহিলা। বোধি অন্য সময় হলে নিজেই খেতে বসে যেত। রুটি ঝাড়া-টাড়া সে জানতোই না। খেতে বসে খাবারগুলোর দিকে চেয়ে তার মনে হল তার খুব অ্যাসিড হবে আজ। তাই সবই সরিয়ে দিচ্ছিল, শুধুমাত্র একটা তরকারী রেখে। মহিলা ওকে জিজ্ঞেস করেন কেন সরাচ্ছে। শুনে, বলেন রুটিটাকে ঝেড়ে নিলেই হবে। তারপরে জল দিয়ে আবার একটু গরম করলে আর অসুবিধা হবে না। বা যদি এক-দু দিন অসুবিধা হয়ও, পরে আর হবে না। নিজেই এখন করে এনে দিলেন। বোধি কথা না বাড়িয়ে খেতে শুরু করলো। মহিলা আর সুমঙ্গলও ভাত খাচ্ছে। ক্লান্ত হয়ে আছে বোধি। রাতে আর কথা বলতে ইচ্ছে করছে না তার। খেতে খেতেই বুঝতে পারছিল শরীরের মধ্যে কোথাও একটা ক্লান্তির বিষ্ফোরণ হয়েছে। বিভূতিভূষণের বাড়ি যাবে আরেকবার। পারলে কালই যাবে।
বন্ধুর বাড়ি আমার বাড়ি
‘বন্ধুর বাড়ি আমার বাড়ি মধ্যে ক্ষীর নদী,/উইড়া যাওয়ার সাধ ছিল, পাঙ্খা দেয় নাই বিধি’।
জসীমুদ্দিন ‘নকশীকাঁথার মাঠ’-এর শুরুতে লিখেছিলেন। ক্ষীর নদীর কথা। আব্বাসউদ্দিনের গলাটা ভেসে আসে গানটায়। কিন্তু লাইনটা যেন অন্য ছিল।
বন্ধুর বাড়ি আমার বাড়ি মধ্যে ক্ষীর নদী
সেই নদীকেই পাইলাম আমি অকূল জলধিরে বন্ধু…
এমনই কিছু ছিল যেন। এখন আর মনে পড়েনা বোধির। বিভূতিভূষণের বাড়ির রাস্তায় বাইক চালাতে চালাতে তার গানটা মনে হচ্ছিল খুব। সেও তো পেরোতে পারছেনা কোনো নদীই। চাকলার দিকের রাস্তাটা ধরে যাচ্ছিল সে। একটু পরেই বিভূতিভূষণের ‘ইছামতী’-কে দেখবে সে। ভেতরটা থেকে কালকের ক্লান্তি যেন ঝরে পড়ছিল, উড়ে যাচ্ছিল পথের ধুলোর মতন। সে যেখানে উঠেছে সেখানেও ইছামতী আছে, কিন্তু সে ইছামতী বিভূতিভূষণের নয়। সামরিক পদ্ধতিতে তৈরী রেলব্রীজের বাঁধনে বাঁধা। নদীটিকে যেন নাচতে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে আসরে, পায়ে ঘুঙুরের বোঝা চাপিয়ে। অনিচ্ছুক নদী কি শ্যামার মতন, খঞ্জনার মত বা ফিঙের মতন নাচতে পারে? পারে কি গাইতে দোয়েলের মতন? হেমাঙ্গ বিশ্বাসের অভিযোগ ছিল নাকি যে নির্মলেন্দু পল্লীর গানকে শহুরে করে দিয়েছেন আসরে গাওয়ার জন্য। দেবব্রত বিশ্বাস বকতেন হেমাঙ্গকে এই অভিযোগ করলে। বলতেন আসরে আসরে গেয়ে খেতে গেলে তাই করা ছাড়া উপায় নেই। আব্বাসউদ্দিন কিন্তু রেকর্ডেও যন্ত্রানুসঙ্গ রচনায় গানকে ধ্বস্ত করেননি শ্রোতার চাহিদা মাথায় রেখে। জসীমুদ্দিন কবিতা প্রকাশের জন্য ‘নকশী কাঁথার মাঠ’-কে ঢেলে নেননি নদীয়ার বাংলা ভাষায়। তৎসম, তদ্ভব-তে ভরিয়ে দেন নি কাব্যের শরীর।
জসীমুদ্দিন আর আব্বাসউদ্দিনের মধ্যেকার সম্পর্কটাও বেশ মজার ছিল। নদীতে মজা দুটো লোক একে অন্যের গভীরতায় স্নান করে যাচ্ছিল। জসীমুদ্দিন ‘স্মৃতির পট’ এ লিখছেন দুজনের সম্পর্কের কথা। কড়েয়া রোড-এ কবি গোলাম মোস্তাফা আর আব্বাসউদ্দিন থাকতেন একসঙ্গে বাড়ি ভাড়া করে। জসীমুদ্দিন মাঝেসাঝেই এসে পড়তেন সেখানে। আব্বাসকে পল্লীগান শেখাতে শুরু করলেন জসীমুদ্দিন। তাঁর সংগ্রহে অসংখ্য গান। আর আব্বাসউদ্দিন নজরুলের থেকে পলকের মধ্যে গান তুলে নিয়ে অবাক করে দেন নজরুলকেও। জসীমুদ্দিন গান শেখান, কিন্তু আব্বাস শেখেন না কিছুতেই। বিরক্ত হয়ে যাচ্ছিলেন জসীমুদ্দিন। তিনি খেটেখুটে গান সংগ্রহ করে নিয়ে আসেন গ্রাম-গ্রামান্তর থেকে। কিন্তু হতাশ করেন আব্বাস। এমনই এক দিনে জসীমুদ্দিন উঠে চলে গিয়েছেন স্নান করতে। স্নান করতে করতে গুণগুণ করছেন একটি সদ্য সংগৃহিত গান। হঠাৎ দরজায় জোর টোকা। স্নান অর্ধসমাপ্ত অবস্থাতেই দরজা খুলে দেখলেন আব্বাসউদ্দিন। সঙ্গে সঙ্গেই আব্বাস গানটা লিখে নেবেন বলে কাগজ-কলম নিয়ে তৈরী। গান লিখলেন। তারপরে তুলে নিলেন সুর প্রায় নিমেষেই। গানটা হল ‘ও রঙ্গিলা নায়ের মাঝি’। গান তোলা হয়ে গেলে জসীমুদ্দিন দিলেন আব্বাসের গায়ে জল ঢেলে। আব্বাসও কম যান না। তিনিও পালটা জল ঢালতে শুরু করলেন জসীমুদ্দিনের গায়ে। উপস্থিত সকলে মজা পেলেন বিস্তর দুই প্রতিভাধরের শিশুসুলভ কান্ড দেখে। আব্বাসের পছন্দ হচ্ছিল না বলে গান তুলছিলেন না তিনি। আর যেই না পছন্দ হল…। এই দুই-এ মিলে যে কটা গান দিয়েছেন বাংলাকে তা তুলনাহীন। ‘নদীর কূল নাই’ থেকে ‘আমার হাড় কালা’ সব জসীমুদ্দিনের লেখা। পল্লীকবি আর পল্লীগীতি গায়ক দূরের বাংলাকে শহরের ঘরে দিলেন পৌঁছে প্রবল প্রতাপে।পৌঁছে দিলেন নদীকে।
নদী খেয়েছিল বিভূতিভূষণকেও বোধহয়। শেষ লেখা ‘ইছামতী’। কিন্তু ভাবনাটা এসেছিল ইছামতী থেকে অনেকদূরে বসেই। কালবালিয়ার জলে ডুব দিতে দিতে ইছামতী ভেসে উঠেছিল তাঁর মনে। শ্যামল দুই তীরে ছোট ছোট গ্রাম, জেলেদের জাল, শিশুদের খেলা, মায়েদের পরিতৃপ্ত মুখ সব ভেসে উঠেছিল। ডায়ারীর পাতায় লিখে রেখেছিলেন সেই সব কথা। সেইখান থেকেই ইছামতীর জন্ম। কয়েকশো বছর ধরে গ্রামবাংলার প্রত্যন্ত প্রান্তের মানবজীবনের মধ্যে দিয়েই বয়ে চলেছে ইছামতী। জন্ম-মৃত্যু, শোক-সুখের আবর্তনের মধ্যে দিয়েই বয়ে চলেছিল। এই নদীর পারে একদিন নীলের দাদন নিয়ে এসেছিল ইংরেজ। শিপটন সাহেবের তেজী ঘোড়াকে রাস্তা ছেড়ে দিয়ে পান বিক্রেতা নালু পাল ধানক্ষেতের মধ্যে লুকিয়ে পড়তো। এমনই হয় তো চিরকাল। তিরিশ বছরের তিলু চাঁদের আলোয় ভিজতে ভিজতে পঞ্চাশ বছরের ভবানীবাবুর কোলে গলে যায় চাঁদ রাতে। ভবানী তার নদীয়ায় শান লাগানো বাংলা নিয়ে যশোরের তিলুর মফস্বলী বাংলায় মজা পায়। বিভূতিভূষণ বিহারের পাহাড়ে পাওয়া শিলালিপি নিয়েও লিখেছিলেন এককালে ছদ্মনামে। ভাষা সম্পর্কে গভীর আগ্রহ তাঁর ছিল। তাই সহজেই এই বাংলার বিভিন্ন বচনের ধরণকে ধরেছেন এবং এনেছেন লেখায়। এইভাবে ছড়িয়ে যেতে থাকে আখ্যান। খুঁটিতে নাটিতে। একদিন সে আখ্যান নালু পালের হাতে সেই শিপটন সাহেবের নীলের কুঠি বন্ধকে চলে আসে। খুব সহজ করেই চলে আসে। আলাদা করে কোনো বিরাট ধর্মযুদ্ধ করতে হয় না বিভূতিভূষণকে। তাঁর সময়ের অন্য অনেকের মতন আলাদা করে ঘোষণা করতে হয় না সমাজমনস্কতা সোচ্চারে। ইছামতী পড়তে পড়তে অনেকবারই সেই সময়ের বিরোধগুলো খুব মনে পড়ে বোধির। একদিকে কম্যুনিজমের প্রভাব। অন্য দিকে এলিয়ট আক্রান্ত বাংলা সাহিত্য। ক্ষয়িষ্ণুতার বিবরণ, যৌনতার সোচ্চার উপস্থিতি। রবীন্দ্রনাথ পুরাতন বলে ধিক্কৃত হতে হতে ‘শেষের কবিতা’-য় নতুন হয়ে দাঁড়ালেন। অনেক আগে তাঁর বিরুদ্ধেও একদা ঘনিষ্ঠ বন্ধু দ্বিজেন্দ্রলাল রায় অভিযোগ এনেছিলেন যৌনতার ছড়াছড়ির। বিশেষ করে পরকীয়ার অভিযোগ ছিল তাঁর গানকে কেন্দ্র করে। তখন ছিল রবিবাবুর গান। দ্বিজেন্দ্রলাল গত হয়েছেন রবীন্দ্রনাথকে চিঠি লেখা অসম্পূর্ণ রেখেই। রবীন্দ্রনাথ ক্রমশ অবশিষ্ট বিশ্বের দরবারে ভারতীয়ত্বের পরিচয় হয়ে গিয়েছেন। কালি-কলম, প্রগতি বিবিধ রাস্তায় বুদ্ধদেব, প্রেমেন্দ্র, অচিন্ত্য, বিষ্ণু কি সমর সেনরা রয়ে যাচ্ছেন ক্ষয়িষ্ণুতা, যৌনতা এবং মতাদর্শগত বিতর্কে। এর ফাঁকেই দাঁড়িয়ে ছিলেন বিভূতিভূষণ। আলাদা করে কোনো অভিযোগ ওঠেনি এ সব নিয়ে তাঁর ক্ষেত্রে। অথচ এই ইছামতীতেই শিপটন সাহেবের রক্ষিতা গয়া মেম থেকে পাড়ার সেই বৌ-টি যে গয়নার লোভে আর শ্বশুরবাড়ির অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে অন্য পুরুষের সঙ্গে বাঁশবনে যায় সবই রয়েছে। কিন্তু সবটাই এত স্বাভাবিকভাবে, এত স্বচ্ছন্দ চলনে, যে নীলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের কথার মতই সে কখনো জীবনের প্রবহমান স্রোত ছাড়িয়ে একাকী উঠে দাঁড়ায়নি। তাছাড়া ছিল তাঁর জীবনযাপন। শহুরে খুব একটা নয়। অনুচ্চকিত এক যাপন। মীর্জাপুর স্ট্রীটের চৌহদ্দিতেই তাঁর বসবাস আর চলাচল থেকে গিয়েছে আজীবন, যতকাল কলকাতায় থেকেছেন বা এসেছেন। অথচ ইনি-ই আবার কলকাতার সীমান্ত পেরিয়ে সুদূরের পিয়াসী। ঘুরে-বেড়াতে তাঁর ক্লান্তি ছিল না। কলকাতা-ব্যারাকপুর-ঘাটশিলার ফাঁকে ফাঁকেই লিখেছেন, লেখার পরিকল্পনা করেছেন।
‘মাসিক বিচিত্রা’-য় বেরোতে শুরু করে তাঁর ‘পথের পাঁচালী’। আষাঢ় ১৩৩৫ থেকে আশ্বিন ১৩৩৬ অবধি চলেছিল ধারাবাহিক। রবীন্দ্রনাথ-এর ‘শেষের কবিতা’ বই হবার পরপরই ১৯২৯-এ বই হয়ে এল ‘পথের পাঁচালি’। রবীন্দ্রনাথ ঠিক যতটাই স্বল্প ডিটেলে তাঁর চরিত্রগুলোকে তাঁর আখ্যানে এনেছেন এবং শহুরে এক সংকটকে ধরেছেন ততটাই স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে ‘পথের পাঁচালী’-তে এসেছে অনুপুঙ্খ ডিটেল এবং চরিত্ররা। যতটাই শহুরে থেকেছেন রবীন্দ্রনাথ উপস্থাপনায় ততটাই গ্রামীণ হয়েছেন বিভূতিভূষণ। কাব্য বিভুতিভূষণেও ছিল। ছিল কল্পনা এবং দেশজ সীমানার গন্ডিকে সহজেই ছাড়িয়ে যাওয়ার ক্ষমতা। এও বোধহয় সেই নদীর প্রবহমানতা। পথের পাঁচালি-তে অপু যেমন ইছামতীর ধারে এসেই আবহমানকে দেখতে পায়। এক চরকের দিনে চলে গিয়েছিল নিশ্চিন্দিপুর ছেড়ে, আরেক চরকে ফিরে আসে কাজলকে নিয়ে চব্বিশ বছরের পর। চরকের আবর্তনে যখন মানুষ নিজেকে বিদ্ধ করে ঘুরছে বাঁশের আগায়, তখন ইছামতীর ধারে অপু ভাবছে তার না জানা অন্য সব জন্মের কথা। অপুর জন্মান্তরের ভাবনা আছে। সেই ভাবনাতে তার এসে দাঁড়াচ্ছে ইজিপ্ট। সূর্যধোয়া নীল নদের ধারে গরীব এক পরিবারে দু-হাজার বছর আগে হয়তো তার জন্ম হয়েছিল। গ্রামের চারপাশে ছিল রীড আর প্যাপিরাসের জঙ্গল। আবার মধ্যযুগে রাইনের ধারে ধনাঢ্য ক্যাসল-এ সুন্দরী পরিবেষ্টিত অন্য এক জন্ম ছিল হয়তো তার। হাজার বছর পরে আবার জন্ম হবে হয়তো, নিশ্চিন্দিপুর আর মনে থাকবেনা তার। এইভাবে বিভুতির অপুর মননে ইছামতী, নীল আর রাইন একাকার হয়ে খেলা করতে থাকে। নদীমাতৃক সভ্যতার নদীচেতনা আচ্ছন্ন করে থাকে তাঁকে। সেই নদীকে দেখবে আজ বোধি। বিভুতিভূষণের চৈতন্যের নদীকে দেখবে।
বাইকটা রেখে বাড়িটার সামনে দাঁড়াল যখন তখন তার সবটা আচ্ছন্ন হয়ে ছিল। এখনো বাড়িটার আশেপাশে গাছ আর গাছ। এখনো রাস্তাটা লাল ইঁটের। একবার গুজব উঠেছিল জোর বিভুতিভূষণ নোবেল পেতে পারেন। কিন্তু তেমন অনুবাদ আর ছিল কই তখন? প্রমথ চৌধুরী নাকি ইতালিয়ানে অনুবাদ করার কথা ভেবেছিলেন। সুনীতি চট্টোপাধ্যায় ইংরেজী করার কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু হয়নি কিছুই। তবে ১৯৪৩-এই লন্ডনে স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড অ্যাফ্রিকান স্টাডিজ-এ বিভুতিভূষণের কথা উঠেছিল। এডোয়ার্ড থম্পসন, কলকাতার অ্যালবার্ট হল-এ যে মুগ্ধতা নিয়ে ‘পথের পাঁচালি’-র অবিমিশ্র প্রশংসা করেছিলেন এবং বিশ্বের দরবারে এর মাহাত্ম্যের উপস্থাপনের কথা বলেছিলেন, সেই মুগ্ধতা নিয়েই সেদিনও ছিলেন সেখানে। বক্তৃতা করেছিলেন শিশিরকুমার মুখোপাধ্যায়। তবুও, তারপরেও, সত্যজিৎ রায়-এর সিনেমাটা না হলে এভাবে চেনা যেত না বোধহয় বিভুতিভূষণকে।
লাল ইঁটের সরু রাস্তাটা দিয়ে বাইক চালাতে চালাতে সে ভাবছিল যদি কেউ দেখতে আসেন বাড়িটা বর্ষাকালে তাহলে কি দশা হবে তাঁর? কয়েকদিন আগে মাত্র সংস্কার হল বাড়িটার। ঢোকার মুখের বসার ঘরটা, যেটা মফস্বল শহরের বারান্দার মতনই ঘেরা গ্রীল দিয়ে সেখানে একটা বোর্ড রাখা। তাতে লেখা সেখানে থাকা আরামকেদারায় বসে বিভুতিভূষণ কি অমর সৃষ্টি করেছিলেন তার নাম। কিন্তু সবচেয়ে অবাক করার মতন কান্ড হল আরাম কেদারাটাই নেই। বোধি বাড়িতে যখন লেখে তখন একটা আরাম কেদারায় বসেই লেখে। কম্পিউটারে লেখে সে। কিন্তু আরামকেদারাটায় তার ভাল লাগে বসতে। তার মনে হচ্ছিল সে চলে গেলে তার আরামকেদারাটাও চলে যাবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বিভুতিভূষণ চলে গেলে তার আরামকেদারার মূল্য বেড়ে যাওয়া উচিত ছিল। বাংলা সাহিত্যে অমন আরেকটি লেখকও নেই যে! কিন্তু কোথায় কি, ভেতরের ঘরে ঢুকে আরো চমক। এক ঘরে একটা খাট। তাতে বসে বিভুতিভূষণের এক আত্মীয়া। তিনিই বাড়ির দেখভাল করেন। বাইরের বারান্দায় বসে থাকা গামছা পড়া মধ্যবয়স্ক লোকটা ক্রমাগতই মোবাইল-এ কথা বলে চলেছে। আর ইনি, কত কষ্টে সাংবাদিকদের ধরে ধরে বাড়িটা নিয়ে লিখিয়েছেন তার কথা বলে চলেছেন। তাই না মাথার ছাতটা পাকা হয়েছে। অথচ বোধি জানে কবি বিভাস রায়চৌধুরী এবং তাঁর কিছু বন্ধু-বান্ধব, যাঁরাও কবি বা লেখক তাঁরা দীর্ঘ্যকাল ধরে লড়ে গিয়েছেন এই বাড়িটার সংস্কারের জন্য। ঘরের ছাত এবং দেওয়ালের সদ্য করা গোলাপি রং-এর দিকে চোখ বোলাতে বোলাতেই শুনছিল সে। দূরদর্শন থেকে এসেছিল তথ্যচিত্র বানানোর কাজে। সেখান থেকে মহিলা চলে গেলেন তিনি রাম ঠাকুরের ভাই-এর ঘরের বৌ না কি যেন, এই সবে। সত্যি, বিভুতিভূষণের বাড়িতে এমনই মানায় বোধহয়। এটাই যদি অন্য দেশ হত, অন্য কোনো জাতি হত, তাহলে এই বাড়িকেই এমন এক সংগ্রহশালা করে তুলতো দেখে তাক লেগে যেত। গবেষক থেকে দর্শক সকলের জন্য ব্যবস্থা থাকতো তেমন। বাড়ির বারান্দাতে এসেই দেখতে হত না এক মধ্যবয়স্ক খালি গায়ে ভুঁড়ি উথলে, গামছা পরে মোবাইলে বকে চলেছেন। বা এ মহিলা কত করিতকর্মা এসব শুনতে হত না। সবশেষে পাশের ঘরটিতে, যেখানে বেশীরভাগ লেখালিখি করতেন লেখক সেখানে বেশ কিছু খারাপ মানের বিভুতিভূষণ আর তারাদাসের পোট্রেট এবং লেখকের বিভিন্ন বই-এর সম্পর্কে দেওয়াল ভর্তি কিছু হাতে কুৎসিত আঁকা সস্তা কার্ডবোর্ড দেখতে হত না। কিন্তু এমনই তার দেশ বোধি জানে। রবীন্দ্রনাথ ছাড়া তেমন করে কোন্ লেখক বা শিল্পীর জীবনের বা কাজের সংরক্ষণ হল? তাও নেহাত নোবেল পেয়েছিলেন আর শান্তিনিকেতন-শ্রীনিকেতন নিজের কষ্টে গড়ে গেছিলেন বলে, নইলে তাও হত কিনা যথেষ্ট সন্দেহ আছে তার। সারাজীবন যে মানুষটা দেশ গড়বেন বলে এত কষ্ট করলেন, তাঁর জোড়াসাঁকোর বাড়ি থেকে তাঁরই নামাঙ্কিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিল্পশিক্ষার কেন্দ্র তুলে নিয়ে যাওয়া হল কোথায়, না বি টি রোডে। অন্য হাজার শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া হল একে। কি কারণে? জোড়াসাঁকোর ভিতরের যে পরিবেশ তা কোথায় বি টি রোডে? কোথায় রবীন্দ্রনাথ? যে বাড়ির প্রতিটি ধুলিকণায় মানুষটার স্মৃতি জড়িয়ে আছে সেই বাড়ির থেকে জীবন্ত শিল্পচর্চাকেন্দ্র আর কোথায় হতে পারে?
লাভ নেই এসব ভেবে বোধি জানে। এই যে সে এখানে এসেছে, কদিন আগেই এখান থেকে ঘুরে গিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এঁরা সব। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত হবে পেট্রাপোল। তার জন্যেই এঁদের আসা। অনেক অনেক বাণিজ্য হবে এখান দিয়ে। বহুকাল ধরেই পরিকল্পনা চলছে এ নিয়ে। ভারত-বাংলাদেশ-নেপাল-ভূটান-পাকিস্তান-আফঘানিস্তান-শ্রীলঙ্কা-মায়ানমার সব মিলিয়েই এক বিপুল বাণিজ্য অঞ্চল গড়ে উঠবে। অনেকটা ইউরোপীয় ইউনিয়নের ধাঁচে। বহুকাল ধরেই এই অঞ্চলের বিপুল জনসংখ্যার দিকে সকলের চোখ আছে। বোধির মনে পড়লো এই বছরের জুলাই মাসেই তাকে এমন একটি সার্ক অধিবেশনের খবর করতে হয়েছিল। আনিসুল হক, সার্কের চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির (সি সি আই) প্রেসিডেন্ট, সার্ক সি সি আই আর ফেডারেশন অব চেম্বার্স অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিস অফ শ্রীলঙ্কা (এফ সি সি আই এস এল)-এর যৌথ উদ্যোগের একটা সেমিনারে বক্তব্য রাখছিলেন। বলছিলেন ২০১০-২০২০ কে ‘আঞ্চলিক যোগাযোগের দশক’ বানানোর কথা। সার্কভুক্ত দেশগুলোর ব্যবসায়ী সংস্থাদের অভিযোগ আছে দেশগুলোর পরিকাঠামো নিয়ে। পারস্পরিক অবিশ্বাস-সন্দেহ এসব নিয়েই আসিয়ান (ASEAN) ভুক্ত দেশগুলোর মতন হতে পারছে না সার্ক। এসব বদলাতে হবে। এ নিয়ে তিনি দশটি অ্যাজেন্ডা দিয়েছিলেন। মনে আছে সেগুলো বোধির। নোটেও আছে।
1) The implementation of transit trade on a reciprocal basis under GATT Article V and SAFTA provisions along with the finalisation of agreements regarding motor vehicles, railways and inland water transport and shipping.
(2) Strengthening of cross border infrastructure, money, finance, trade and investment. Huq stressed that the gradation of the Petropol-Benepole corridor, the development of Bagdogra Airport, the improvement of Wagha-Lahore rail links and the Colombo Port Expansion are key areas to benefit considerably from further infrastructure development.
(3) The standardisation of customs documents and procedures across the region.
(4) The provision of a green fast-track multi-modal transport channels and corridors to facilitate efficient regional supply chains.
(5) The improvement of sub-regional land and inland water connectivity to and from the north eastern part of the subcontinent.
(6) The implementation of transit trade agreements between Bangladesh and India, as well as Afghanistan, India and Pakistan.
(7) Jointly promoting the development of Afghanistan, Pakistan, India, Bangladesh and Myanmar (APIBM) transport corridor through the Asian highway and Trans-Asian railway.
(8) One open sky policy regime to be implemented.
(9) In addition to the suggested use of one SIM for all phones in South Asia
(10) One energy bank for South Asia.
সুতরাং পেট্রোপোল-বেনাপোল নিয়ে সরকারের মাথাব্যাথা বোঝাই যায়। সঙ্গে বোঝাই যায় তিস্তার জলবন্টন নিয়ে কেন এত মাথাব্যাথা। সবই শর্তের অঙ্গ তাই। যেখানে দেশের মাথারা বেনিয়া বা বেনিয়ার সাকরেদ হতে ব্যাস্ত সেখানে কে মাথা ঘামায় কৃষিজীবি গেরামের কথক বিভুতিভূষণ নিয়ে? সরকার পরিকাঠামো বানিয়ে দেবে আর সেই পরিকাঠামো ব্যবহার করবে ব্যবসায়ীরা। সরকার বানাবে মানে হল জনগণের করের টাকা এবং ধারের টাকা মিলিয়ে তৈরী হবে রাস্তা, ব্রীজ, রেলপথ এই সব। সেই সব রাস্তায় যেতে হলে টোল ট্যাক্স দিতে হবে। সেই ট্যাক্স সরকার সব পাবে না। পাবে বিভিন্ন বিদেশী সংস্থা। তারা রাস্তা বা ব্রীজ বানিয়ে দিয়েছে আসলে। আবার সে রাস্তা দিয়ে তারাই করবে ব্যবসা। কয়লা থেকে তেল সব আস্তে আস্তে চলে যাবে দেশী-বিদেশী পুঁজিপতিদের হাতে। তারাই সবের নিয়ন্তা। ইচ্ছে মতন দাম তারা বাড়াবে। ইচ্ছে মতন খনিজ সম্পদ তারা বিদেশে বিক্রি করবে, মানুষ হাঁ করে দেখবে শুধু বাবুদের কত্ত উঁচু বাড়ি, কি সব চকচকে গাড়ি!কার বাইশ তলা বাড়ি হবে যাতে সত্তর তলা ঢুকে যায়, কার ছেলে-মেয়ের বিয়ে হবে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল ভাড়া করে, সে সব তামাশায় তারা মত্ত থাকবে।
অন্ধকার থেকে যাবে দেশ এবং এই সব সীমান্ত অঞ্চল। বোধির খুব জানতে ইচ্ছে করে দেশভাগকে কি চোখে দেখেছিলেন বিভুতিভূষণ? ইছামতী যখন প্রকাশ হল তখন দেশভাগ হয়ে গিয়েছে। বাংলাদেশ তখনো না জন্মালেও পাকিস্তান আর ভারত দুটি আলাদা দেশ। তাঁর ইছামতীর নায়ক ভবানীবাবুর তিলু যে যশোরের ভাষায় কথা বলতো সেই যশোর তখন পূর্ব পাকিস্তানে। কেমন লেগেছিল বিভুতিভূষণের, তার খুব জানতে ইচ্ছে করে। জানতে ইচ্ছে করে ভবানীবাবুর সন্তানের জন্য এই খন্ডিত দেশ কেমন লাগতো তাঁর? একসময়, দেশভাগের আগে অবধি বনগাঁ ছিল যশোরের একটি মহকুমা। বিভুতিভূষন, যে বারাকপুর গ্রামে থেকেছেন তাও ছিল এই যশোরের। যশোরের ইতিহাস সমৃদ্ধির ইতিহাস। সেই সমৃদ্ধির মধ্যে থাকা বনগাঁ একসময় ছিল গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যের কেন্দ্র। এখনো পেট্রাপোল-বেনাপোল এশিয়ার বৃহত্তম স্থল-বন্দর। যেদিন দেশভাগ হল সেদিন, মানে ১৫ই অগাষ্ট-ও বনগাঁ ছিল পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভূক্ত। তারও দু দিন না তিনদিন পরে বনগাঁ আলাদা হল দুটি থানা নিয়ে। চলে এল ভারতের মধ্যে। অন্য দিকে থেকে গেল যশোর, কপোতাক্ষের পাশে মধুসূদনকে নিয়ে, আলাদা হয়ে গেল। যশোরের বার লাইব্রেরীর মোড়টা একসময় ছিল বনগাঁ মোড়। সেই মোড়ের দিন চলে গেল। নাম মুছে গেল ইতিহাস থেকে। নীলের বিদ্রোহ উঠে এসেছিল ইছামতীর পাতায়। এসেছিল ছোটলাটের গঙ্গাবক্ষে আগমন। সেই সব ওই নীলের আমলে। যশোরের বিষ্ণু বিশ্বাস, দিগম্বর বিশ্বাস যখন রুখে দাঁড়ানো চাষীদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তখনকার কথা। সেই যশোর যখন আলাদা হয়ে গেল কেমন লেগেছিল ইতিহাস সম্পৃক্ত বিভুতিভূষণের?
ভাবতে ভাবতে ফিরে আসে বোধি। বাংলোয় তার জন্য অপেক্ষা করছে একজন। সে তাকে নিয়ে যাবে আবার সীমান্তে। কালকের মহিলা যা বলে গিয়েছিলেন তার কিছু চাক্ষুস নমুনা দেখাতে। তাছাড়া দু-একটা বাচ্চার সঙ্গেও দেখা করাবে কথা আছে। বাচ্চাগুলো স্কুলে যাবার বদলে সীমান্ত পেরিয়ে চোরাচালানের কাজে যুক্ত থাকে। ধরা পড়ে গেলে গেল। খুব ভাল অফিসার হলে মাল কেড়ে নিয়ে ছেড়ে দেয়। দু একটা ক্ষেত্রে অফিসারেরা নিজেরা উদ্যোগ নিয়ে স্কুলে ভর্তি করিয়েছে বাচ্চাদের এমন নজীরও আছে। তারপরে তাদের পড়াশোনার খরচ দিয়েছে অন্তত বড় হওয়া অব্দি। কিন্তু সে খুবই ব্যাতিক্রমী ঘটনা। স্কুলে ভর্তি করা অব্দি যাবার ইচ্ছে বা উপায় সকলের থাকে না। আবার ভর্তি করালেও বাচ্চাগুলো স্কুলে থাকেনা বেশীদিন। তাদের পরিবারও থাকতে দেয় না। ঘরে ভাত নেই তো স্কুল! কাজেই স্কুল ছেড়ে আবার কাঁটাতার টপকানোর খেলা। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই শোনা যায় জওয়ান বা অফিসারেদের যৌন হেনস্থার শিকার হয় বাচ্চা ছেলেরাও। পায়ুকামের শিকার হয়। যৌন হিংসার শিকার হয়। বহু জওয়ান কাশ্মীর বা উত্তর-পূর্বে কিছুকাল পোস্টেড থাকার পরে আসে এখানে। তারা বহুক্ষেত্রেই অসম্ভব নির্মম হয়। হিংস্রও। আসলে ওই সব জায়গায় এমন পরিস্থিতি তৈরী হয়ে আছে যে মৃত্যু এদের নিত্যসঙ্গী। অথচ ঘোষিত কোনো যুদ্ধ চলছে না। শত্রুও শুধু বহিরাগত নয়। যে কোনো সময়েই, যে কোনো রাস্তার মোড়ে আচমকাই এসে দাঁড়াতে পারে করমর্দনের জন্য। কাজেই আশেপাশের মানুষকে অবিশ্বাস করা, তাদের ঘৃণা করা তেমন তেমন ক্ষেত্রে, এসব এদের পদ্ধতিতে চলে আসে। তাই কাশ্মীরে বা উত্তর-পূর্বে এত এত অভিযোগ ওঠে মানবাধিকার লঙ্ঘণের। কথায় কথায় গুলি চালিয়ে দেওয়া বা ধর্ষণ করা এদের কাছে জলভাত হয়ে যায়। যুগাতীত কাল ধরে যে কোনো সংগঠিত জহ্লাদ বাহিনী অত্যাচার করেই ভয় দেখায়। কোনো রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী কি পুলিশ বাহিনীর ম্যানুয়ালে সেই সন্ত্রাসের পদ্ধতি শেখানোর খুব ব্যাত্যয় হয় না। এদের বিরোধীরাও তেমনই। তারাও মনে করে সন্ত্রাস দিয়েই শুধুমাত্র কথা বলা যায় বা বলা উচিত। যে যাকে দখলকারী মনে করে সে নিজেকে ভাবে মুক্তিযোদ্ধা, আর দখলকারী যাকে মনে করছে সে তাকে পাল্টা মনে করেছে সন্ত্রাসবাদী। তার বা তার নিয়োগকর্তার সিদ্ধ অধিকারের পথে কাঁটা। যুদ্ধ ঘোষিত হোক কি অঘোষিত সে শুধু বর্বরই হয় তাই। এই মানসিকতায় যারা অভ্যস্ত হয়ে যায় তাদের মধ্যে কোথাও একটা স্যাডিজম কাজ করে। এই বাচ্চাদের তাদের হাতে ধরা পড়ার পরের অবস্থাটা সহজেই অনুমেয় তাই।
‘ইছামতী’-তে ভবানী বাঁড়ুজ্যের সন্তান, যাকে নিয়ে ভবানী এবং তিলু-বিলু-নীলুদের আবেগের শেষ নেই, তার শিশুমুখ মন কেড়েছে হলা পেকের মতন ডাকাতেরও। যে লোকটা কথায় কথায় মানুষ খুন করে, দলের লোক মরণাপন্ন হলে তাকে ব্যার্থ ডাকাতির পরে ফেলে আসার সময়ে এক কোপে তার মুন্ডু নামিয়ে দেয়, যাতে কেউ তাদের চিনতে না পারে, সেই হলা পেকে শিশুমুখের মায়ায় জগত ভুলে যায়। সোনার বালা নিয়ে আসে। এসে বলে এ তার অসৎ পথের টাকায় করা না, যাতে তিলু বা ভবানীবাবু তাকে এবারে আর প্রত্যাখ্যান না করে। বোধির মনে পড়ে যায় চরিত্রটা। বিভুতিভূষণ চেয়েছিলেন ‘ইছামতী’-র তিন খন্ড লিখতে। অতীত থেকে শুরু করে তার বর্তমান অবধি। ‘ইছামতী’ তাঁর মৃত্যুর পরে প্রকাশিত এবং তার শেষ উপন্যাস। বেঁচে থাকলে এবং ভাবনাটা সত্যি সত্যি থাকলে কি লিখতেন এই বাচ্চাদের নিয়ে কে জানে? এদের শৈশব চুরি হয়ে গ্যাছে, কৈশোর বেমালুম রংরুট। যৌবন অবধি টিকবে কিনা এরা কে জানে! শুধুমাত্র একটা দেশকে কয়েকটা লোক টেবিলে বসে একটা লাইন টেনে ভাগ করে দিল বলে এরা সকলে প্রতিদিন কাঁটাতারের বেড়া পেরোয় বা পেরোতে চায়। পেরোতে গিয়ে অনেক সময়েই জীবন-মৃত্যুর সীমানাও পেরিয়ে যায়। সহজেই। একটা বুলেট, ব্যাস। কেউ খবর জানবে না, কেউ খোঁজ নেবে না। বাড়ীর লোক থানায় এমনকি একটা মিসিং ডায়ারীও করবে না। বোধির মনে হয়, ওই অত্যাচারী জওয়ানরা না, আসলে বর্বর তারা যারা এদের চালায়।
ফেরার পথে বাইকটা একবার দাঁড় করিয়েছিল বোধি। রাস্তার ধারের একটা চায়ের দোকানে দাঁড়িয়েছিল। সুতনুকার এস এম এস এসেছে। খুব তীব্র একটা অভিমানভরা লেখা। অসুস্থ বোধির বেরিয়ে আসাটা তার ভাল লাগেনি। আর-ও ভাল লাগেনি বোধির বেরিয়ে আসার সময়ের কাজটা। বোধি সুতনুকাকে লিখেছিল সুতনুকার মন অন্য কোথাও গিয়েছে। অন্য কারোর প্রতি। তাই সে সময় দিতে চায়না বোধিকে আর। একদিন সুতনুকাই তাকে ডেকে এনেছিল এই সম্পর্কে। নাছোড়বান্দার মতন টেনেছিল বোধিকে। আজ যখন বোধি নিজের সবটা দিয়ে বসেছে তখন তার মনে হল এভাবে সম্ভব না চলা। অথচ পরমার কথা শুরু থেকেই জানতো। জানতো পরমা বোধির জীবনের অংশ। কখনো পরমাকে ছেড়ে বেরোনো সম্ভব না তার পক্ষে। যত যাই হোক না কেন, পরমাকে সে ভালবাসে। এবং তা অমূল্য। আসলে সবটাই খেলা ছিল সুতনুকার। তাই আজ পরমার দোহাই দিয়ে চলে যাবার সুযোগ খুঁজছে। কিন্তু কেন? এই খেলাটা না খেললেই হত না?
বোধিও জানে সে সব ঠিক লিখছে না। কিন্তু এ ছাড়া রাস্তা ছিল না তার। সুতনুকা কষ্ট পাবে আরো এভাবে তার সঙ্গে থাকলে। তাদের পৃথিবী আলাদা আলাদা। এই সুতনুকা কোনোদিন তার সঙ্গে থাকার জন্য ভয়ঙ্কর ঝড়-ঝাপটা সামলাবে না। সামলাতে পারবে না। তার জীবন অনেকের অনেক কিছুর উপর নির্ভরশীল। বোধির মতন নয়। বোধির জীবন তার নিজের হাতে অনেকটা। সে কারোর দিকে চেয়ে নেই। সেটা পরমাও জানে। জানে বলেই বোধির স্বাধীনতার মধ্যে কোনোদিন এসে দাঁড়ায়নি। এমনকি পরমা যখন জেনেছে সুতনুকার কথা তখনো না। পরমার এই গোটা রাস্তাটা হেঁটে আসা খুব সহজ পথ ছিল না। সুতনুকা এই কষ্টটা নিতে চাইবে না। বরং সুতনুকা এই কষ্টটা এড়াতে গিয়ে আরো ভুলভুলাইয়ার মধ্যে ঢুকে যেতে পারে। তাছাড়া তার জীবনের সুতোটা তার নিজের হাতেই নেই। আছে অন্যদের হাতে। এটা পরমার ছিল না কখনো। তাছাড়া পরমা বোঝে মানুষের বহু মন। বোঝে বোধিকে। বোধির ভালবাসার ধরণকে। তা বলে কি কখনো কষ্ট পায় নি পরমা? পেয়েছে। সুতনুকার কথা যখন প্রথম শুনলো বোধির কাছে তখন কষ্ট পেয়েছে। ভেবেছে সে সুতনুকা আর বোধির মাঝে আড়াল হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সুতনুকাকে বোধি ভালবাসে আর তার জন্যই পারছে না সুতনুকাকে কাছে ডাকতে। বোধি তার ভুল ভেঙ্গেছে। যদি ভালবাসার মানে শুধু দখল হয়, শুধু দাগ দিয়ে দেওয়া সম্পর্ক হয় তাহলে সে সম্পর্কে বোধির কোনো আস্থা নেই। ভালবাসা মানুষকে বড় করার বদলে ক্রমশ ছোট আর গন্ডীবদ্ধ করে চলেছে। হাজার হাজার বছর ধরে। বোধিও যেদিন পরমাকে প্রথমবার হারিয়েছিল, পরমা যখন চলে গেছিল দিল্লীতে তখন অসম্ভব কষ্ট পেয়েছিল। কিন্তু তার জন্য অন্য কাউকে চলে যেতে বলেনি। বোধি জানতো তার মন ক্রমশ পরমার দিকে যাচ্ছে। তাও কোনোদিন অন্যকে সরিয়ে যায়গা নেবার কথা ভাবে নি। যতটুকু ছোঁয়া থাকতো পরমার ততটুকুতেই নিজেকে ভরাতো। সে কাউকে কেড়ে নেওয়ার খেলায় যেতে ইচ্ছুক ছিল না। সে খেলায় গেলে আর তার সম্পর্কের দখল নিয়ে প্রশ্ন তোলার মানে কি? পারলে সকলকে নিয়ে বাঁচাই ভাল। কিন্তু তা হয়নি। তারা দুজনেই কষ্ট পেয়েছে। কষ্ট দিয়েই দুজন দুজনকে বুঝেছে, ভালবেসেছে। সঙ্গ নিয়েছে পরস্পরের। পরমার জীবন পরমারই হাতে ছিল বলে দুজন সমান স্বাধীন মানুষের মধ্যে কথা হতে পেরেছিল। বোঝাবুঝি হতে পেরেছিল। সুতনুকার সঙ্গে সেই কথা বলতে চাইলেও সুতনুকা এড়িয়ে যায়। বা গিয়েছে বলাই ভাল। অথচ এমন না যে সুতনুকার মতন যে আসবে তারই জন্য বোধি এমন করে দরজা খুলে দাঁড়াবে। সুতনুকা, সুতনুকার জীবন সবই টেনেছে বোধিকে। টেনেছে সুতনুকার মধ্যেকার অসহায় মানুষটি। কিন্তু এমন করে হাজারো সম্পর্কে সে জড়িয়ে যেতে পারে না একথা সেও জানে। তাই সুতনুকাতেই সে থেমে যাবে। কিন্তু সুতনুকার বিশ্বাস হয়নি এই সব। তার মনে হয়েছে বোধি এভাবেই চলবে। আজ সুতনুকা যেমন করে এসেছে তেমন করে কাল অন্য কেউ আবার আসবে। পরমা থাকতেও সুতনুকা যখন আসতে পেরেছে তাহলে কাল কেন অন্য কেউ পারবে না? একদিক দিয়ে অঙ্কটা সঠিক। কিন্তু জীবনতো অঙ্ক নয়। সুতনুকা এমন করে এসে পড়বে তা সে ভাবেনি। এসে পড়েছে যখন তখন কেড়ে নিয়েছে তার মন। সেই মন কি দাওয়াতখানা, যে সকলের জন্য আমন্ত্রণ বিছানো থাকবে? সুতনুকা আসবে বোধি জানতো না। পরমা এসেছিল। পরমাকে ভালবেসেও সুতনুকাকে ভালবাসা তার অকুলান হয়নি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে সারাজীবন এমন করেই চলবে সে। এই দুটি মানুষকে সব দিতে দিতেই তার জীবন শেষ হয়ে যাবে বোধি জানে। আর অন্য দেওয়ার কথা সে ভাবতেও পারে না। কিন্তু যুক্তি তো তা বলে না। বলে একে একে দুই।
ইম্পালস এবং ইন্ট্লেক্ট-কে একসঙ্গে বাঁধা যায় কি? যায়নি এতদিন। গেলে বোঝা যেত যে শুধু কোনো একটাই জীবনের সব না। দুটোকে মাপমতন মেশাতে পারলে জীবন স্বার্থক। স্বপ্ন স্বার্থক। বোধি জানে। সুতনুকা জানে না। সে যে অঙ্ক কষছে তা বোধির না। বোধি এবারে থামতে চায়। পারলে সে সুতনুকাকে উপেক্ষা করেই থামতো। শুধুমাত্র এই নরনারীর সম্পর্ক ছাড়াও অনেক কিছুই আছে জীবনে। সেই সব কাজে থাকতে চায়। এই দুটি মানুষকে নিয়েই তার ছোট্ট বিশ্বটা সাজাতে চায়। কিন্তু হবে না। সুতনুকার মগজে রয়েছে অন্য বাসনা। সেখানে ভাগ বা ভাগীদারের জায়গা নেই। তাকে ভুল বলাও যায় না। এমনই রীতি জগতের। তাকে মিথ্যেও বলা যায় না। সুতরাং, সব হিসেবের শেষে হাতে থাকবে পেন্সিল। মাননীয় সুকুমার রায়, মহান মানুষ আপনি। হিসেবের সার বুঝিয়ে দিয়ে গিয়েছেন। আমরা বুঝিনি, কিন্তু এটাই সত্যি। এই লুকোচুরি আর ভাল লাগছে না তার। অল্প জীবন বাকী। অর্ধেকের বেশী বাঁচা হয়ে গিয়েছে। এবারে স্পষ্ট দিক নির্দেশ চাই। না হলে সময়, জীবন সব বয়ে যাবে। মানে তৈরী করা যাবে না কোনো। এমনিতেই মানুষের জীবনের কোনো মানে নেই। সে যেমন মানে দেয় তাই মানে তার। সেই মানে দেওয়ার উপরেই নির্ভর করে তার মনুষ্যত্ব থেকে সৃষ্টি সব। সেই মানে দিতে গেলে স্থির হতে হবে। শান্ত হতে হবে। এভাবে এমন ঝড়ের মধ্যে চলবে না। অন্তত নিজেদের জানাজানিকে সত্যি হতে হবে। জানতে হবে একটা জীবন তারা পরস্পরের সঙ্গে সত্যি সত্যি কাটাবে। যাই হয়ে যাক না কেন সে ভাবনার নড়চড় হবে না। তাই এই রাস্তা নিয়েছিল বোধি। হয় সুতনুকা পারবে, না হয় পারবে না। সুতনুকা তার এস এম এস-এর উত্তরে লিখেছে,
- You are a sick!!! tomak emon bhabteo parini. amari vul. I HATE YOU NOW.
এই এস এম এস-টা সুতনুকার যাওয়ার সূচনা। সুতনুকা এবারে চলে যাবার পথে। চায়ের কাপটা বিস্বাদে ভরিয়ে দেয় মুখের ভেতরটা। আচমকাই বোধির বুকের ভেতরে একটা তীব্র ধাক্কা লাগে। একটা চিরচিরে কষ্ট হচ্ছে। তার নিশ্বাস নিতে অসুবিধে হচ্ছে। বাইকটার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে বসে পড়ে। দাঁড়াতে ভাল লাগছে না। সুমঙ্গল ছুটে আসছে। বোধির মনে হচ্ছে বুকে কেউ খুব জোরে জোরে ঘুঁষি মারছে। বুকটা চেপে নিশ্বাস নেবার চেষ্টা করে বোধি। খুব লাগছে বুকে। ক্ষীর নদী অনেক বড়…অনেক বড়…পার হওয়া যায় না। পার হওয়া যায় না?
“ও সুজন নাইয়ারে, আমি নদীর কূল পাইলাম না…”।
শ্রান্ত হে
আর কয়েকটা দিন মাত্র,রাত আকন্ঠ মাতালের-
ক্ষয়ের পরম-প্রীতি সর্বাঙ্গে চাদর করে জড়ালে,
কাল বুঝি কুয়াশার তিথি? শ্রান্ত হে, গোলাপের
মালা দোলাবে গলায়, কে সে মালিনী আড়ালে?
তুমি কি মৃত্যু? অথবা নির্মম দুরধিগম্য শীতল?
তুমি কি ঘৃণার হাত? তাই বুঝি ছিঁড়ে নিলে ডানা?
চারিধারে বছরের শিশির পড়ছে কান্না অবিকল,
হরিধ্বনিতে কে যায় ফুলমালায়? কেউ চেনাজানা?
যাবার দিনে যাব, সব বুকে দাগ রেখে যাব।
যে কবিতাটি বৃথাই দিয়েছে প্রেম ডেকে ডেকে
তাকেও মিলিয়ে নিতে বলছি, এবার নীরবে হব
বাঙ্ময়! যাব, ফুল ফোটাবো পাথরেরও বুকে।
আমারই শব্দের নদী ছুটবে পাথরে পাথারে,
বিপুল তরঙ্গে রঙ্গ দেখাবে অবহেলার সমুদ্র,
পাহাড়ের পথে যে নির্জনতা নামে অবসরে
বেদনার ধ্যানে আমারই চৈতন্যে সেও রুদ্র;
আর কয়েকটা দিন মাত্র, রাত আকন্ঠ মাতালের
ক্ষয়ের পরম-প্রীতি সর্বাঙ্গে চাদর করে জড়ালে,
কাল বুঝি কুয়াশার তিথি? শ্রান্ত হে, গোলাপের
মালা দুলিয়ে গলায়, আজীবন বেদনা সাজালে?
একটা হাল্কা স্ট্রোক হয়েছিল। সুমঙ্গল বাইক ওই চায়ের দোকানে রেখেই তাকে নিয়ে চলে আসে বনগাঁয়। অন্য একটা বনগামুখী অ্যামবাস্যাডার রাস্তায় থামিয়ে তাকে তুলেছিল। সোজা বনগাঁ হাসপাতালে। ভর্তি করেছিল তাকে। কিন্তু দুপুরটা ঘুমোনোর পরে তার শরীর ততটা খারাপ লাগছিল না আর। ওষুধ-পত্রও পড়েছে যথাসময়ে। সুমঙ্গলকে দিয়ে জোর করেই বন্ড লিখিয়ে বেরিয়ে এসেছিল বোধি। বাংলোতে রাত্রিটা কেটেছে বিশ্রামেই। পরমা যখন ফোন করেছিল তখন গলার স্বর শুনে সন্দেহ করেছিল। পরমার চোখ-কান বোধির বিষয়ে অসম্ভব সতর্ক। কিছুই এড়ানো যায় না। বোধি উড়িয়ে দিয়েছিল। বলেছিল সে খুব ক্লান্ত। সারাদিনের ধকল গিয়েছে, তার উপর লেখার স্ট্রেনটাও আছে। তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়েছিল। ঘুম আসেনি। একটা অ্যালজোলাম ব্যবস্থা করিয়ে রেখেছিল। ডাক্তার মিত্র সদাশয় মানুষ। চল্লিশ হয়েছে সবে। তিনি পরের দিন রাতে এসেছিলেন। বোধি যেতে পারেনি বাইরে। শরীর সত্যিই দুর্বল তার। ভদ্রলোক নিজের উদ্যোগেই এসেছিলেন। দেখে বললেন বিশ্রাম নিলেই ঠিক থাকবে বোধি।
বোধির মনে পড়ছিল কিছুকাল আগে সে একটা লেখা লিখেছিল এই হার্ট অ্যাটাক নিয়ে। হাসি পেল তার একটু। লেখার একটা অংশ তার মনে পড়ছে। সে কোট করেছিল একটি স্টাডি থেকে।
“It has been reported that Indians are at greater risk of heart disease because of a genetic mutation that affects one in 25 people in India. The mutation almost guarantees the development of the disease and Indians suffer heart attacks at an earlier age, often without prior symptoms or warning. Now researchers say India, a country with more than one billion people, will likely account for 60 per cent of heart disease patients worldwide, by 2010. A study among Asian Indian men showed that half of all heart attacks in this population occur under the age of 50 years and 25 percent under the age of 40, according to the Indian organization, Medwin Heart Foundation. But although this genetic mutation increases the risk of heart disease, you don’t get a heart attack unless the arteries are clogged. Therefore, for Indians it is particularly important to avoid arterial plaque and the best way to do this is to keep levels of homocysteine low.”
ডাক্তার মিত্র বললেন প্রতিদিন এমন অজস্র অ্যাটাক হয়ে চলেছে বেশীরভাগ মানুষের। সব অ্যাটাক কেউ টেরই পান না। কিছু কিছু পান। কিন্তু যখন পান তখন সতর্ক হবার সময়। একবার হয়েছে যখন তখন আবার হবার সম্ভাবনা থাকেই। অনেকটা পুরোনো প্রেমের মতন। এসব শুনতে শুনতে সুমঙ্গলকে চা আনার ব্যবস্থা করতে বললো বোধি। ডাক্তার মিত্র একটা সিগারেট ধরালেন। বোধির মাথার মধ্যে একটা গান বাজছে।
“দেহতরীর গো মান কৈরো না,
তরীতে লেগেছে নোনা,
………………………
………………………
তরী অচল যেদিন হয়,
তরীর মাল্লা ছেড়ে যায়,
সেদিন হাঁ কইর্যা পইর্যা রবে
ঘিন্নাতে কেউ ছোঁবে না…।”
ডাক্তার মিত্র চেয়ে রয়েছেন তাঁর দিকে। বোধির খেয়াল হল হঠাৎ। উঠে বসলো। মাথার মধ্যে এখন এসব ঢুকে যাচ্ছে। এভাবে হবে না। বোধি কলকাতা থেকে বাইক চালিয়েই এসেছে এখানে। কিছুটা জেদ করেই এসেছে। তার রোগের সার্জারি করা ছাড়া অন্য রাস্তা নেই। ওষুধ হয় না এই রোগের কোনো। সার্জারি হলেই সেরে যাবে এমন নাও হতে পারে। আবার জন্মাতে পারে এই মেদ। শরীরের উপরের দিকের যে কোনো অংশে। ডাক্তার কলকাতায় বলেছেন যতক্ষণ না ফোলাটা আরো বাড়ে ততক্ষণ সার্জারি করা যাবে না। বাইক নিয়েই এসেছে বোধি। কিলোমিটারের পর কিলোমিটার ভাঙাচোড়া যশোর রোড দিয়ে চালাতে চালাতে একসময় খুব কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু দাঁতে দাঁত চেপে চালিয়ে গ্যাছে। ব্যাথাটা বাড়ার চেয়েও ফোলাটা বাড়া খুব দরকার। তাহলেই একমাত্র সম্ভব সার্জারি করা। তার আজকাল অফিস করাও কঠিন হয়ে পড়ছে। নিয়মিত অফিস করার ক্ষেত্রে এই ব্যাথা বেশ একটা বাধা। তাছাড়া এখন বেশীরভাগ লেখালিখিটাই কম্প্যুটারে হওয়ার ফলে আরো অসুবিধে হয় তার। ব্যাথা বাড়লে কোনো রকমে বাঁ হাতটাকে কি বোর্ডে ঠেসে রেখে লেখা চালিয়ে যায়। কিন্তু এমন করে লেখা খুব কঠিন। কোনো কারণে যদি মনটা ব্যাথার দিকে চলে যায় তাহলেই সর্বনাশ। মুহুর্তে লেখার খেই যায় হারিয়ে। এভাবে হবে না। হতে পারে না।
- আপনি একটা কথা বলুন তো-
বোধি আবার তাকালো ডাক্তার মিত্রের দিকে।
- আপনি কি মানসিক ভাবে কিছু নিয়ে খুব বিচলিত?
বোধি ভাবছিল কি বলা যায় ওনাকে! উনি তার নিয়মিত চিকিৎসা করবেন না। আজ আছে বোধি এখানে, আর দু-একদিনে চলেও যাবে। কাজেই খুব বেশী বলে লাভ কি? হাসপাতালে গেছিল যখন তখন লাইপোম্যাটোসিস নিয়েও খুব একটা কথা বলেনি বোধি। শুধু একবার জানিয়েছিল যে এই রোগটা ধরা পড়েছে তার সম্প্রতি। এই রোগটা এমনই যে খুব বেশী ডাক্তারও জানেন না এর কথা। এর মধ্যে আবার মানসিক জটিলতার কথা আসছে কেন?
- না আসলে, অনেক রোগ আমাদের মনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে, তাই জানতে চাইছিলাম। সুমঙ্গল আমার অনেক উপকার করেছে। তাই কাল একবার ওকে ফোন করেছিলাম আপনার খবর নিতে। শুনলাম আপনার বয়সে, বাইক চালাচ্ছেন, কলকাতা থেকে এত কিলোমিটার এসেছেন, এমনকি শুনলাম আপনি মাজদিয়াও গিয়েছেন ইছামতীর উৎস দেখতে, তাহলে যথেষ্ট উদ্যম আছে আপনার। সেই আপনার এমন করে হার্ট অ্যাটাক হল কেন? আপনি খুব মদ খান বলে মনে হয় না তো! বলতে পারেন ডাক্তার হিসেবেই ভাবছিলাম। তারপরে কিছুটা ব্যাক্তিগতও ভাবনা এল। আমারও একটু আধটু লেখার অভ্যাস আছে। আপনি বিভুতিভূষণের বাড়ি থেকে ফিরছিলেন শুনলাম। তখন মনে হল সংবেদনশীল মানুষদের মন নিয়ে কিছু জটিলতা থাকতে পারে।- মানে আমার কথা ভুল বুঝবেন না।
লোকটা বন্ধুর মতন করে কথা বলছে। বোধি শুনছিল। একটু ইন্টারেস্ট লাগছে তার এবারে।
- কাল পারিনি আর। আজ একটু তাড়াতাড়ি হাসপাতাল থেকে কাজ শেষ করে বেরিয়ে প্রথমে গেলাম ইন্টারনেট খুঁজতে। এখানে একটাই আছে কাফে। সেখানে বসে পড়লাম কিছুক্ষণ। সবটা পরিস্কার না। কিছু ক্ষেত্রে কনট্রাডিকট্রারিও বটে। সেখান থেকেই আমার এক অধ্যাপককে ফোন করলাম। আপনি চেনেন হয়তো, ড ঃ অরুণেশ বিশ্বাস। উনি বললেন অনেক কিছুই। আমি মূলত মেডিসিনের ডাক্তার। এটা সম্পর্কে সত্যি বলতে কি তেমন জানতামও না। তাজ্জব হয়ে গেলাম শুনে-টুনে। এবং আমার মনে হচ্ছে, মানে ওনার সঙ্গে কথা-টথা বলে যে আপনার ডায়াগোনিসিস ঠিক হয়নি। এটা অবশ্যই আমার মনে হওয়া, তার বেশী কিছু না।
- আপনার কি মনে হচ্ছে?
- মনে হচ্ছে এটা সম্ভবত লাইপোম্যাটোসিস ডলোরোসা। বিশেষ করে আপনার এই হার্ট অ্যাটাকটার থেকে মনে হচ্ছে। এটা কিন্তু ফ্যাটাল হতে পারে। So, don’t take any risk, right? আপনি তেমন হলে বাইকটা অন্যভাবে পাঠানোর ব্যবস্থা করে গাড়িতে ফিরে যান কলকাতায়। যে পরিমাণ ফ্যাট জমেছে তাতে আপনার সার্জারিটাও তাড়াতাড়ি হওয়া দরকার। শুধু Lidocaine জাতীয় Antiarrhythmic drug দিয়ে হবে না বেশীদিন। গোদা বাংলায় বলি, মানসিক অশান্তি হলেই মেদটা বাড়বে বলেই মনে হয়। নার্ভাস সিস্টেমকে, হার্টকে ধাক্কা দিতে পারে ক্রমাগত। আপনি ক্রমশ ভালনারেবল হয়ে উঠছেন বোধিবাবু।
বোধি উঠে বসলো আরেকটু। নাহ্, লোকটাকে সত্যি এবারে তার খুব মন দিয়ে দেখতে হচ্ছে। থ্যাবড়া নাক, চওড়া কপাল, মোটা পুরু ঠোঁটের, আর কুতকুতে দুটো চোখের দিকে তাকালে কিন্তু খুব একটা ইম্প্রেসিভ মনে হয় না লোকটাকে। অন্তত প্রথম দর্শনে। কিন্তু এখন লোকটাকে খুব শান্ত এবং বুদ্ধিমান মনে হচ্ছে।
- আপনি, মানে আমার সাজেশন, কলকাতায় ফিরে আমার প্রফেসরকে একবার দেখান। নিউরোলজির লোক বলেই না, আপনিও হয়তো জানবেন উনি এশিয়ার অন্যতম সেরা ডাক্তার এই ফিল্ডে। কিন্তু আমি বলছি অন্য কারণে। এই রোগটা অনেকের অজানা, আর ডাক্তারদের আমি জানি। না জানলেও রোগী রাখার জন্য অনেক কিছুই করতে পারে। আবার কখনো কখনো ইগো থেকেও ঝামেলা বাড়িয়েই চলে। উনি তেমন না। খুব মন দিয়ে শুনবেন কথা, আর যা দরকার তা করবেন। খুব ট্রান্সপারেন্ট মানুষ। দরকার হলে আপনার জন্য জার্নাল নিয়ে বসে যাবেন, ভুলভাল বলবেন না বা করবেন না।
সুমঙ্গল কেয়ারটেকারকে দিয়ে চা আনিয়েছে। চা ঢুকলো। সেও সঙ্গে সঙ্গে ঢুকলো। হাতে ফোন। তার মানে বাইরে ফোন করছিল। ভদ্রলোক চা খেয়ে উঠলেন। বোধি ওনার সঙ্গে বাংলোর বাইরে অব্দি গেল। ফিরে দেখলো আরেকটা এস এম এস।
“onekbaar bhablaam…keno bolle tumi e kotha? tarpore mone holo bujhlaam…asole tumi nije tomar-amar omil ke manate parchona…ami konodin tomake ondho bhabe mene cholini, tomar kothar juktike menechi…beshirbahg ei tumi thik chile bole mone hoyeche tai menechi…biye ityadi niye bhabina ar, ami ekai thakbo…jani tumio asolei eka…amra sokolei eka…
eta shoththee je amar shathe tomar hishab milchhe na….aar na miliye cholar lok tumi nao….ami tao cholte pari…kintu manage kore chola tomar pokhkhe ashombhob…..tai ei besh bhalo holo…..anek kichhu eRano galo…chollam…this is my last sms…bhalo theko…poroma keo bhalo rekho…”
বোধি মোবাইলটা রাখে। তার একবার মনে হয় সে ফোন করে এক্ষুণি। তারপরে রাখে। রেখে দেয় মোবাইলটা। ফোন করলে শুধু বেজে যাবে, ওপারের কেউ ধরবে না। গতদিনের পর থেকে আর কোনো এস এম এস আসেনি, ফোন তো নয়ই। এই এস এম এস-টার জন্যেই তো সে লিখেছিল সুতনুকাকে। তাহলে এখন এত ফাঁকা ফাঁকা লাগছে কেন তার? সুমঙ্গল ঘরে ঢুকেছে।
- দাদা, গাড়ির ব্যবস্থা করলাম। এই অবস্থায় তোমাকে একা যেতে দেব না। বাইক পরে পাঠানোর ব্যবস্থা করছি।
বোধির কানে কিছুই ঢুকছে না। সুমঙ্গল বলতে বলতে খেয়াল করলো বোধি শুনছে না তার কথা। একটা শূন্যতার দিকে চেয়ে আছে। সে ডাকলো,
- দাদা?
সাড়া দিল না বোধি। তার কানে কিছু যাচ্ছে না আর। এখন কেন কষ্ট হচ্ছে বোধি? এই তো চেয়েছিলে তুমি? তাহলে? পরমাও তাকে বলেছিল সুতনুকাকে এভাবে ধাক্কা না দিতে। দিলে হয়তো তার প্রতিক্রিয়া ভুল হতে পারে। বোধি শোনেনি। তার জেদ চেপে গেছিল। সুতনুকার এই স্থিতিশীলতা সে ভাঙবে। জীবনে সময় নষ্ট করার মতন সময় নেই। যদি সুতনুকাকে অন্য বাঁচা বাঁচতে হয় তাহলে এ ছাড়া রাস্তা নেই। তাকে এখনো অনেক অনেক কিছু জানতে হবে, বুঝতে হবে, শিখতে হবে। তবেই পারবে সে জীবনের কঠিন যুদ্ধে সত্যি সত্যি উঠে দাঁড়াতে। একা, প্রত্যয়ী, উজ্জ্বল।
“ei besh bhalo holo”
এই ভাল হল সুতনুকা? সে শুধু দূরেই সরাতে চেয়েছিল? কাছে টানতে চায়নি? কাছে রাখতে চায়নি?
- দাদা, শরীর কি আবার খারাপ লাগছে?
বোধি এবারে ঘাড় নাড়ে। সুমঙ্গলকে একটু থামানো দরকার। এখন কোনো শব্দ ভাল লাগছে না তার। বুকের মধ্যে কি চাপ বাড়ছে? মেদটা কি এবারে আবার ধাক্কা দেবে হৃদয়কে? দিলে কি সেই হৃদয় থেমে যাবে? থামলে পরমার কি হবে? পরমাও যে তাকে গভীর ভালবাসে, তার কি হবে?
- আমি কি ডাক্তারকে আবার ডাকবো একবার? দরকারে গাড়িতে নিয়ে চলে আসছি।
- এখানে এককালে মোতি উঠতো।
- অ্যাঁ?
- এখানে ইচ্ছে মাফিক মোতি উঠতো। মানে মুক্তো। কেউ কেউ আবার বলে ‘ইচ্ছে’ বলতে আসলে চিংড়ি মাছের কথা বলা হয়। কিন্তু তা আমার মনে হয় না।
এসব কি বলছে বোধি? কেন বলছে? নিজেই অবাক হয়ে যায় সে।
- দাদা, তুমি এখন আর এসব নিয়ে কথা বল না। তুমি শুয়ে থাক না একটু। আমি বলছি এবারে খাবার দিতে।
- মোতির জন্যে নামডাক ছিল এই নদীর। জাহাজ আসতো তখন এই নদীতেই। আজ যেখানে দেখছি শুধু পানা জন্মে আছে, যেখানে যেখানে চর পরে আছে, একদিন সে সবে ছিল গভীর জল। টলটলে। স্রোতস্বিনী নদী। ছুটে যেত সাগরে মিলতে। বিভুতিভূষণ খুব ভালবাসতেন ওই নদীধারায় স্নান করতে। ভবানী বাঁড়ুজ্যে পাড়ার লোকের টীকা-টিপ্পনির পরোয়া না করে তিলুকে নিয়ে স্নান করতেন নদীতে। তিলু সাঁতার দিত। একসঙ্গে ঘাটে মেয়ে-মরদ স্নান করছে এ পাড়াগাঁয়ে, সে যুগে, ভাবা যায় না। কিন্তু ভালবাসা সব পারে, সব। এই নদী যুগ যুগ ধরে পলি ফেলে ফেলে তৈরী করেছে জমি। ভালবেসে। তাতে ফসল ফলে। আমরা খাই। জানিস কি করে নদী জমি বানায়?
- দাদা, তুমি-
- জানিস, কিন্তু বুঝিস না। একটু একটু করে, যাকে বলে তিল তিল করে জমি বানায় নদী। পলি এনে এনে হাজার হাজার বছর ধরে জমি বানায়। তবে না কৃষক চাষ করে?
কেন এসব বলছে বোধি?
- আবার চাষাকেও জমিতে নিড়েন দিয়ে, তাকে ফাল করে, বর্ষার জল না পেলে সেঁচে জল দিয়ে, বীজ দিয়ে অপেক্ষা করতে হয় ফসলের। বড় ধৈর্য্য লাগে, ধৈর্য্য লাগে সবেতেই। ধৈর্য্যের অভাবে সব ডুবছে কি তাহলে? আবার দেখ, তোরা ইছামতীর পাশে থাকিস, কিন্তু ইছামতী বছরের পর বছর, দশকের পর দশক মজতে থাকলেও দেখিস না। ধৈর্য্য ধরে বসে থাকিস কবে কোন সরকার কি করে দেবে তার জন্য। তার মধ্যেই বন্যা হয়। ঘরবাড়ি ভেসে যায়। তারমধ্যেই জলের স্তর চলে যায় নীচে, আরো নীচে। নদীর পাশে পাশে ইঁটভাটা হয়। পাটের চাষ হয়। ইঁটভাটার থেকে মাটিও পরে নদীতে। পাট পচানোর জন্য মাটি দিয়ে ইছামতীর জলেই ডুবিয়ে রাখিস। পচে গেলে পাট তুলে নিস, মাটি থেকে যায়। নদী ক্রমশ বুড়িয়ে যেতে থাকে নাব্যতা ছাড়া। একদিন- একদিন আর জল পাওয়া যাবে না। একদিন আর বৃষ্টি ছাড়া কোনো রাস্তা থাকবে না সেচের। আর যদি বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলেও বসেই থাকবি। অন্যদিকে নদী মরে যাবে একটু একটু করে। স্বরস্বতীর মতই ইতিহাসের নদী হয়ে যাবে ইছামতী। তোরা তবু ধৈর্য্য ধরেই বসে থাকবি। নালু পাল, গয়া মেম, ভবানী-তিলুর সন্তানেরা নির্বাসিত হবে। নদীর ধারে ধৈর্য্য ধরে থেকে থেকেই মরে যাবে একদিন। কিন্তু নদী বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়বে না। দেখ কান্ড। একহাতে ধৈর্য্য না ধরলে বিপদ, অন্যহাতে ধৈর্য্য ধরলেও বিপদ। মানুষ কোথায় যায় তবে?
- দাদা, তুমি কি বলছ কিছু বুঝছি না তা না, কিন্তু কেন বলছো তা-। আচ্ছা ডাক্তারবাবু কিছু বললেন কি?
হাসে বোধি। ক্লান্ত হাসি। ছেলেটা খুব ভাল। সহজ, সুন্দর।
- আমি ঠিক আছি। একটু ঘুরে আসি বাইরে থেকে।
- দাদা, আরেকটা কথা। তুমি রাগ কোরো না প্লিজ। তোমার রাগকে আমি বড় ভয় পাই।
- বল্।
- আমি দিদিকে বলে দিয়েছি। তুমি বারণ করেছিলে। কিন্তু দিদিকে না বললে দিদি কষ্ট পাবে খুব। আমি দিদিকে কষ্ট দিতে চাইনা। দিদি তোমাকে তাড়াতাড়ি নিয়ে যেতে বলছে। আসতে চাইছিল। কিন্তু আমি বারণ করলাম। আসতে আসতে দেরী হয়ে যাবে। আমি নিয়ে যাব তোমাকে।
একটানা অনেকগুলো কথা বলে হাঁফাচ্ছে সুমঙ্গল। বোধি কিছু বলে না। দীর্ঘ্যশ্বাস পড়ে আলগা। পরমা উৎকন্ঠায় বসে থাকবে সে যতক্ষণ না যায়। তার পরম বন্দরটি তার অপেক্ষায় থাকবে। কিন্তু নদীগুলো যে মরে যাচ্ছে একে একে? তাহলে? জাহাজ চলবে কোথা দিয়ে? হাঁটতে হাঁটতে আবার রেলব্রীজে এসে দাঁড়ায়। ইচ্ছে মতন মোতি তোলা যায় না আর নদীর বুক থেকে। হায় নদী! নাম এখন তোমাকে ব্যাঙ্গ করছে শুধু। তাকেও ব্যাঙ্গ করছে নাম। বোধির বোধ কই? জীবনানন্দের মত বোধ তার হল না তো!
তবুও সাধনা ছিল একদিন — এই ভালোবাসা;
আমি তার উপেক্ষার ভাষা
আমি তার ঘৃণার আক্রোশ
অবহেলা করে গেছি; যে নক্ষত্র — নক্ষত্রের দোষে
আমার প্রেমের পথে বারবার দিয়ে গেছে বাধা
আমি তা ভুলিয়া গেছি;
তবু এই ভালোবাসা — ধুলো আর কাদা — ।
-বোধ, জীবনানন্দ দাশ
তার তো ভালবাসা ভোলা হয় না। বুকের ভিতরে বাসা বেঁধে থাকে এক অসুখের মতন। তীব্র, সংকটময়। সে তো ভালই বেসেছে শুধু, খুন করেনি, ধর্ষণ করেনি, চুরি-ডাকাতি-রাহাজানি -জালিয়াতি কিছুই করেনি। তবুও কেন? বোধি ভিতরে ভিতরে কাঞাল এক। বিচিত্র তার কাঞালপনা। মানুষকে ভালবাসার আর ভালবাসা পাবার। সুতনুকা সে কাঞালকে চিনলোই না। তাই ঝুলি ভরতে তার এত কষ্ট হল বুঝি?
“আধেক রাতে নিষুত পাড়া ঘুমেল ঘোরে
সুখ নিয়ে যায় হৃদয় থেকে সিঁধেল চোরে,
গান নিয়ে যায় কন্ঠ থেকে যে বেদনা
তুমি কি তার আভাস পেলে অন্যমনা?
দুলছে বিপুল তরঙ্গ তোর পায়ের নীচেই,
পথের ঘোরে ওই দিওয়ানা দিল বিবাগী
মাতাল নদী হয়েছে আমার ঝাঁপ-সোহাগী,
ব্রিজের থেকে ঝাঁপ দেব কি, মরণ বেছেই?
দিয়ে দিলাম পাথর যত কবরে সার
গুলবাহারে ফুল ফুটেছেও বিষণ্ণতার
যতেক গন্ধ উতল মাতাল শূন্য পানে
ভোরের পথে ভুলকো তারার ভুলই আনে?
আধেক রাতে নিঝুম পাড়া ঘুমেল ঘোরে
সুখ গিয়েছে ঘর-বারান্দা শূন্য করে,
রাতের রাগে গান ধরেছে যে বেদনা
আমি তারই নাম রেখেছি কাঙালপনা।।”
জল আজ-ও স্থির হয়ে আছে নদীর। আজও একই রকম ক্লান্ত, শ্রান্ত। ইছামতীর চলার ইচ্ছা কই? অথবা মানুষ বদলালো না বলে ইছামতী বদলে গেল। তার চলমান জলধারা নিয়ে সে শুধু লুকিয়ে পড়ছে মাটির গভীরে। অন্য সব জলের মতন। ভূভাগকে সেও জলদান করবে, কিন্তু পরিচয় দেবে না। হয়তো এই তার প্রগাঢ় অভিমানের ফসল, এই তার ইচ্ছে। তার অশ্রু থেকে আর কোনো মুক্ত জন্ম নেবে না। লোভী মানুষ, স্বার্থপর মানুষ, মুক্তো নেবার বেলায় হাত পেতে থাকে, কিন্তু দুঃখ নেবার বেলায় সরে যায় পাশ থেকে। ইছামতী এমন মানুষের জন্য নয়। ইছামতী এমন সব মানুষদের জন্য ছিল না কখনো।
————–সমাপ্ত———-


