RSS

তো?

-তো?
যে যাই বলুক এমন করে তাকে থামিয়ে দেওয়া যায়। অন্তত কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ করাতো যায় বটেই। আমি স্যাকারিনের কথা জানি না, আনা ক্যারেনিনাকে চিনিনা, ধ্রুপদ এবং ধামারকে আলাদা করে বুঝতে পেরেছি এমন বললে অধর্ম হবে, যদিও ধর্ম কি তা নিয়ে সখারাম গনেশ দেউস্করের চেয়ে আমার বেশী ভাবনা আছে এ কথা কেউই বলবেনা।

এতটা লিখতে গিয়ে হাঁফ ধরে যাচ্ছে। আজ বইমেলা গেছিলাম। অনেক বই দেখলাম না। অনেক লোক দেখলাম না। আমি দৃঢ় হয়ে দেখার মতন আজ শক্ত ছিলাম না। আমাদের দেখাগুলোকে আমি দেখার পর্যায়ে ফেলে দেখার মতন কারণ খুঁজে পাইনি বলেই এই সব কথাবার্তা। বইমেলাতে বই থাকে। বইমেলাতে খাবারের স্টল থাকে। ভারী ও নানান মাপের স্তন, নিতম্ব, জঘন থাকে। লোকেদের বই-বই ভাব করে ঘুরে বেড়ানো থাকে। আমার সে সব কিছুই দেখার ছিল না। আনুপূর্বিক বৃত্তান্ত এসব সময়কালের এবং আমার জানা। আমি এমন কিছু কম বছর যাচ্ছি না বইমেলা। এখন আমাকে কেউ যদি বলে,

-আপনি সাহিত্য-ফাহিত্য নিয়েই থাকেন না?

তাকে আমি তো বলেই উড়িয়ে দিতে পারি। তো বলেই থামিয়ে দিতে পারি। তো বলেই ধমকে দিতে পারি।

অনেককাল ধরে এসব শুনছি। সাহিত্য-ফাহিত্য, নাটক-ফাটক, ফিল্ম-টিল্ম- এই সব কথাগুলো ভদ্দরলোকজনেরা খুব বলে থাকেন। এঁরা ডাক্তার,এঞ্জিনীয়ার,ব্যাঙ্কার,আমলা,ব্যবসায়ী এমন নানানটা। এঁদের কেউ ফাক্তার-টেঞ্জিনীয়ার-ট্যাঙ্কার-টামলা-ট্যাবসায়ী বলে না। মানে বলতে সাহস করে না। ভারিক্কি লোক এরা। ভারিক্কি ভাবে চলেন। দেশ চালান। দেশ চোরা চালানেও এঁদের জগদ্ব্যাপী হাতযশ।

এঁদের দেখলে বেশ একটা সমীহ জাগার কথা। আমার ক্ষেত্রেও ব্যাতিক্রম হয় না। অন্তত বেশীরভাগ সময়ে। আজকে আমার একটু কেমন যেন হল। আজকে আমার খেলা করতে ইচ্ছে হল। আমি আসলে তখন কিছুই দেখছিলাম না। আমি আমার মধ্যে বসবাস করছিলাম। কথা বলছিল যখন কেউ আসলে আমি কথা খুঁজছিলাম। আমি কথা হাতড়াচ্ছিলাম। কোনো আলাপকে খুব জোরেজোরে টেনে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছিলাম। করতে করতে ক্লান্ত হচ্ছিলাম যখন তখন চোখ সরু করে অন্য দিকে তাকিয়ে নিচ্ছিলাম, যেন আমি সভ্যতার আদিকাল থেকে কথা বলার জন্য শব্দ চয়ন করে নিয়ে আসছি। যেন আমি শব্দকে একটু আগে জন্ম দিয়ে গম্ভীর মুখে পাউন্ডে তার ওজন মাপছি। আসলে আমি ভন্ডামি করছিলাম। মানুষকে আমি খুব ঠকাচ্ছিলাম। এবং বেশী ঠকাবো না বলতে গিয়ে নিজেকেই ঠেকাচ্ছিলাম।

আজকাল এমন খুব হয়। আমি যখন কথা বলি তখন আমি কথা বলি না, যখন কথা বলি না তখন কথা বলি। খুব কথা বলি নিজের পায়খানার ভিতরে। খুব কথা বলি পায়খানা করার মধ্যবর্তী সময়ে। ওই সময়ে নিজেকে সবচেয়ে পবিত্র বোধকরি। নিজেকে আশ্লেষাসিক্ত মনে করি, জীবন সম্পর্কে, কেননা আমি তখন বর্জন করছি। আমি তখন গ্রহণ করছি না। এবং তখন আমার খুব সৎ হবার সময়। অপালা আমাকে ছেড়ে গিয়েছে যখন থেকে তখন থেকেই আমি বর্জনকে ভালবাসি। বর্জনের সবকিছুকে ভালবাসি। এ অনেকটা শিশুর গু খাওয়ার মতন। স্বাদ নিয়ে বুঝে নেবার চেষ্টা। একবার বর্জিত হবার স্বাদ পেলে অর্জিত সব কিছু বর্জন করতে ইচ্ছে হয়। আমি পায়খানায় বসে ঠাটিয়ে ক্লিন্ট ইস্টুডের মত ডায়ালগ দিতে ভালবাসি। না, ভুল,বললাম, আমি মার্লোন ব্র্যান্ডোর মতন ডায়ালগ দিয়ে থাকি। ক্লিন্ট ইস্টুডের বার্ধ্যক্যের তবুও নায়ক ভাবটা টেনে রাখি। বর্জিত হবার পর থেকে এটাই আমাকে আত্মবিশ্বাস যোগায়। সেই আত্মবিশ্বাসের বলে আমি সকালের কাগজ দেবার ছোকরাকে ভারী গলায় বলার চেষ্টা করে দেখেছি,

- দেশের খবর তুমি বয়ে নিয়ে আস, কিন্তু দেশের খবর পড় কি?

সে আমাকে কাগজ দিয়ে চলে যাবার ফাঁকে খানিকক্ষণ বাঁকা চোখে দেখে নিয়ে চলে যায়। তাকে কাজ করতে হবে। ফালতো সময় নেই তার। সে চলে গেলে আমি এক কাপ চা খেয়ে নিয়ম মতন ঢুকে যাই পায়খানায়। আমার প্রজাতন্ত্র দিবস প্রতিদিন। পায়খানায় আমি স্বাধীন। পায়খানায় আমি কথা বলতে ভালবাসি। তার চার দেওয়ালের মধ্যে আমি নিজের স্বরকে উপভোগ করি, অনেকটাই আত্মরতির মতন, অনেকটা প্রতিবর্তক্রিয়ার মতন আমার ভিতরে সাফল্য জন্ম নেয়। সেই সাফল্য থেকে বাকী সারাদিন আমি কথা বলে চলি, আমি খুব জানি সকালে বা রাত্রে যখনই হোক সব আমি পায়খানায় বর্জন করে আসবো। অপালার মতন আমিও প্রচুর বড় বড় কথা বলে সব বেমালুম বর্জন করে যেতে শিখেছি। ও বর্জনের পাশে পাশে খেলা করতে শিখেছি। আমি ভদ্দরলোকদের দেখলে এই খেলাটা না করলেও আজ খেলা করতে ইচ্ছে করেছিল।

লোকটা যখন আমাকে বলছিল, সঙ্গে তার বউ ছিল এবং সে আমার লেখা পড়তে ভালবাসে এ কথা জানার পরেই লোকটা বলছিলো,

- আপনি সাহিত্য-ফাহিত্য নিয়েই থাকেন না?

আমি বলেছিলাম,

-তো?

আমি লোকটাকে চড়ও মারিনি, গুলিও করিনি, মুখে তার থুতুও দিইনি। কিন্তু ওই একটা শব্দে তার সমস্তটাই কেমন বেসামাল হয়ে গেল। সে আর আমি একই রিং-এ খেলছিলাম। সে খুব অবহেলার সঙ্গে এতক্ষণ যেন আমার সমস্ত পাঞ্চগুলোকে এড়াচ্ছিল। মাঝে মাঝে আমাকে টুকরো-টাকরা জ্যাব করে ক্লান্ত করে দিচ্ছিল। আমার বডিকেই সে আক্রমণ করছিল। আর নিজের মুখটাকে খুলে রেখেছিল। সে যেন জানতোই আমি তার মুখে আঘাত করতে চাইবো। আর সেটা করতে গিয়ে আমি তাকে হাঁফিয়ে গিয়ে সুযোগ করে দেব অতর্কিতে আমার মুখে একটা নক আউট পাঞ্চ বসিয়ে দেবার। লোকটার সারা শরীর থেকে খুব কৃতবিদ্যের মতন এক আলো ঠিকরোচ্ছিল ততক্ষণ। কিন্তু আমার শব্দটা ওকে খেয়ে ফেললো। ও সেই বক্সারের মতন যে নিজের অজান্তে নিজেরই চালে জড়িয়ে গিয়েছে। আমি আমার পায়ের ওজন যে হালকা রেখেছিলাম তা ও বোঝেনি। বোঝেনি বলেই সর্বশক্তি দিয়ে যখন ও পাঞ্চটা করতে গেল আমার থেকে বেশী উচ্চতার থেকে তখন আমি একটু শরীরের ভার সরিয়ে ওকে বেসামাল করে দিলাম। এরপরে একটা আপার কাট, আর ওর কেল্লা ফতে।

ওর বউ আমার দিকে চেয়ে আছে। ও আমার দিকে চেয়ে আছে। ওর বউ এখন ওকেও দেখছে। একটা আদ্যন্ত জমজমাট খেলা। কে কি করবে দুজনের কেউই বুঝে উঠতে পারছে না। ওর বউ আমার লেখা পছন্দ করে। কিন্তু ওর অর্থে ভরণপোষণ। পেটমোটা সুখী মধ্যবিত্তর মতই তার হাবভাব। ওর উপর নির্ভরতা ছেড়ে নিজের পায়ে দাঁড়াবে এমন সম্ভাবনা কম। নেই বলাই ভাল। বরেরে আড়ালে যদি একটু লুকোচুরি ছোঁয়াছুঁয়ি হয় তা হলে সে অন্য কথা। সে হল জমা টাকার উপরে সুদ। কিন্তু সরাসরি বিনিয়োগ করে পণ্য উৎপাদনের ঝুঁকি নেওয়া চাট্টিখানি কথা না। এই কারণেই অপালা থাকেনি। ঝুঁকি নেবার সাহস তার ছিল না। লুকিয়ে-চুরিয়ে খেলা তার পোষাবে, কিন্তু সরাসরি এমন কারবার যেখানে লোকসান হতে পারে তাতে সে যাবে না। হিসেব বড়ই পাকা।

আমি উপভোগ করছি ব্যাপারটা। একটা লেখা লেখার কষ্ট অনেক। একটা লেখা কেউ পড়তে চাইতেও পারে, নাও চাইতে পারে। তাছাড়া চাইবে তখনই যখন লেখাটা কোথাও পড়তে পাবে। সে কম হ্যাপা নাকি! লেখা ছাপার নানান জায়গা। খুব সস্তার জায়গা হল বন্ধুদের সাহিত্য-সাহিত্য খেলা যা এদানীং লিটলম্যাগ আড়ম্বর বা বেশী হল ইন্টারনেট গ্রুপ। নিজেরাই লেখি, নিজেরাই পড়ি, নিজেরাই সুখে ঘুমোতে যাই তারপরে। সাকুল্যে ছত্তিশজন থাকে। সকলেই সকলের পিঠ চাপড়ে নিজেদের চোখ ঠারা দিয়ে চলেন। নাহলে কিঞ্চিত ঝগড়া-ঝগড়ি করে এসব যে একটা গম্ভীর বিষয় সে সব প্রতিষ্ঠা করে সাহিত্য-গভভোপাত করেন। ছত্তিশের এই বখেড়া থেকে বেরিয়ে যদি নয় লাখে যেতে হয় তখন বেশ বড় হ্যাপা। সেখানে পলিসি আছে। সেখানে মালিক আছে। মালিকের অসুবিধা সাহিত্যেও চলবেনা। কাজেই ফড়ের হাতের নাগাল পেরিয়ে মালিকের দেরাজে যাওয়া চাড্ডিখানি বাত নয়। তাছাড়া সে সব জায়গা আখেরে ওই ভদ্বরজনেদের কেনা। তাঁরাই ঠিক করে দেন দেশের পক্ষে কি ভাল, কি মন্দ! বাবু বঙ্কিমের মতন বাবু তাঁরা। প্রশাসনিক-সাহিত্যিক। দেশোদ্ধারের মহান কাজ। নিজেই সেন্সর নিজের। সেখানে খড়কুটোর রক্তবমন অবক্ষয় বা নিদেনপক্ষে শব্দের অপচয়।

তা এই সব ঝুট-ঝামেলার মধ্যে দাঁড়িয়ে আমরা যারা সাহিত্যচর্চা করি, তাদের টিকেতে আগুণ দেওয়া সব সময়েই সোজা। অনেকটা বস্তিতে আগুণ লাগার মতন। বেয়াইনি দখলদার যত্ত, না তুলতে পারলে আগুণ লাগিয়ে দাও। কে জানতে চাইছে কিভাবে লাগলো আগুণ? তদন্ত হবে বলে দেওয়া যাবে খুব বেশী হলে। তদন্তের ফল? ধুঃ মহাই। চারদিন মিডিয়া কাঁদবে, তারপরেই ফুস। সেই মতন আমাদেরও যে কোনো সময়েই টিকিয়ে দেওয়া যায়। দেওয়া হয়েছে, হচ্ছে বা হবে। এটাই ইতিহাস।

আর ইতিহাস আমাদের কাছে বিস্তর রসিক ভাবনা। আমরা ইতিহাস লিখিনা, লিখতে লিখতে ইতিহাস হয়ে যাই। বেশীরভাগের পরিণতি ব্যাক্তিগত ইতিহাসের তামাদি দলিল, অনেকটা ওই নিয়মিত ধোপার হিসেব রাখার খাতা যা জামা-কাপড়ের মালিক অশক্ত হলেই সোজা বিস্মরণে। কয়েকজন কোনো ফাঁকতাল গলে সমষ্টির ইতিহাসে। কিন্তু সিট বড্ড কম। এমনকি রিজার্ভ বেঞ্চেও ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই। তারপরেও চাড্ডি শব্দ সম্বল করে আমরা যারা মেছোহাটায় বড় অর্ণবপোতের খবর নিয়ে ফিরি, তারা যে দোকানদারি করি তা বারোয়ারি, মনোহারি ইত্যাকার নানান ট্যাগের পরে শুধু নির্ভরশীল নয়, আমাদের স্বপ্নের সওদাগরি সে। আমাদের কলজে যতই দুর্বল ধুকপুকে হোক না কেন আদতে আমাদের কাজ ডাকাতি। নৌ বাহিনীর নয়, আমরা আসলে পাইরেটদের গোত্র।

জ্বালাইয়া তারারও বাতি, করে ডাকাতিও

গুরু তোমারই নামে…

-তো?

শব্দ নিয়ে, ভাবনা নিয়ে বসবাস করতে করতে শব্দ আমাদের সুনিপূণ কৃপাণ। লোকটা আমার দিকে চেয়েছিল। লোকটার বউ-ও। আমি সামান্য হাসি চোখের তারায় ফুটিয়ে বলতে শুরু করলাম। আসলে পায়খানায় বলে বলে এমন অভ্যাস করেছি যে আমার এখন অতি সহজেই আসে এসব। তখন ঐ যে বইমেলায় বলছি তাকে আমার পায়খানাই মনে হয়। তাই আরো সুবিধা।

- আমাদের ছোটবেলায় ভয় কাটানোর জন্য একটা খেলা খেলতাম। বড়দের ভয় কাটানোর জন্য এটা অব্যর্থ খেলা। বড়রা যখন বকাবকি করতো, বা জ্ঞান দিত বা আমাদের কেলাবে কেলাবে এমন একটা ভাবে এসে যেত, আমরা তখন মনে করতাম যে যতই বড় হোক, যে যতই গম্ভীর হোক, যে যতই শক্তিমান হোক যখন সে দাঁড়িয়ে কথা বলে তখন ঠিক তার দু-পায়ের ফাঁকে তার বিচিদুটো দুলতে থাকে। আর দুলতে দুলতে উরুর সঙ্গে ধাক্কা খায়। আর শব্দ হয়, থ্যাত থ্যাত। ধীরে ধীরে আমাদের হাসি পেয়ে যেত। গা গুলিয়ে অসম্ভব হাসি। তখন ভারী কথা, তুমুল কেলানিও আর কিছুতেই কাজে দিত না। আমরা উড়ে যেতাম আমাদের ছোট করার সমস্ত চেষ্টার থেকে। আপনিও খেলবেন কালকে। অফিসে গিয়ে যখন আপনার বস আপনাকে কাল খুব কড়কাবে বা পেশেন্ট পার্টি বা ম্যানেজমেন্ট তখন আপনিও ভাববেন। দেখবেন ক্রাইসিস থাকছে না। বুঝলেন?

লোকটা আমার দিকে তাকিয়েই ছিল। আমার কথাটায় কতটা অফেন্স নেবে ভাবছিল বোধহয়। বউ-টা তাকিয়েই ছিল। ভাবল কিনা কিছু তাতে আমার বয়েই গেল। ও আমার গল্পের নায়িকা নয় যে আমি ওকে নিয়ে এতটাও ভাবতে যাব। যতটুকু ভেবেছিলাম এককালে সে সব অপালাকে নিয়ে। তারপর থেকে আমি বেকার ভাবনা খরচ করিনা। নায়কদের নিয়ে নায়িকারা ভাবে না আমার গপ্পে, নায়িকাদের নিয়ে নায়করা ভাবে না আমার গপ্পে, আদতে আমার কোনো নায়ক-নায়িকাই নেই। শুধু আছি বলতে আমি। আর নেই বলতেও আমি।

- বাড়ি গিয়ে ভাবলে কিছুটা বুঝবেন। আমি সাহিত্য-ফাহিত্য করি না, আমি লিটারেচর গুরু। ইল্লিটারেটদের শিক্ষা দিয়ে থাকি। আমি ও সক্রেটিস একই প্রজাতি।

 
Leave a comment

Posted by চালু করুন জানুয়ারি 27, 2012 in গল্প

 

Tags: , , ,

বিভিন্ন কোরাস

যখন জীবন খুব শ্রান্ত হয়ে পড়ে তখন আমাদের মতন সামান্য বাঙালীর নজর পরে ঘরের দিকে। ঘরে রাখা সামান্য কিছু অসামান্যের দিকে। তেমনই কদিন অলীক কুনাট্য রঙ্গে চোখ পচিয়ে পচিয়ে ক্লান্ত হচ্ছিলাম, শ্রান্ত হচ্ছিলাম। হতে হতে কাল একবার ঘুরে দাঁড়াবার কথা ভাবলাম। খবরের জন্যই দুনিয়া নাকি দুনিয়ার জন্য খবর সেটা আজকাল প্রায় তুচ্ছ হয়ে উঠেছে। সেই তুচ্ছতার মাঝেই কিছু খবর ভাবায় তার ভয়ঙ্কর তুচ্ছতা নিয়েই। যেমন বনগাঁ থেকে ছাড়া শিয়ালদহ-বনগাঁ লোকালের ঘটনাটা। বনগাঁ থেকে সকাল ৭ টা ১০-এ ছাড়ার পরে ট্রেনটা থেমেছিল আটটা নাগাদ অশোকনগরে। সেখানে শ’খানেক পুরুষ যাত্রী অবরোধ শুরু করেন মূলত দুটি দাবীতে। এক, তাঁদের ওই ট্রেনে উঠতে দিতে হবে, ধরপাকড় চলবে না। দুই, ট্রেনে একটি সাধারণ কামরা জুড়তে হবে। দুটো দাবী পরস্পরবিরোধী। যদি তাঁদের উঠতেই দেওয়া হয় তাহলে ট্রেনটি মহিলা ট্রেন থাকেনা, সাধারণ ট্রেনে পরিণত হয়। কাজেই সেক্ষেত্রে সাধারণ কামরা জোড়ার দাবীর কোনো মানে হয় না। বনগাঁ থেকে শিয়ালদহমুখী এই ট্রেনের আগের ট্রেন সকাল ৬.৫০-এ, পরের ট্রেন সকাল ৭.৩০-এ। খেয়াল করে দেখুন, অবরোধকারীরা কিন্তু নতুন ট্রেন দাবী করেননি। ওই ট্রেনটাই চাই ওঁদের। যাই হোক, অবরোধ তোলার জন্য পুলিশ আসার পরে মহিলারাও সক্রিয় হন এঁদের বিরোধে এবং অবরোধ উঠে যায়। এই সব জানতে জানতে আমার হঠাৎ মনে পড়ে গেল জীবনানন্দ।
“গ্রন্থকে বিশ্বাস করে প’ড়ে গেছি;
সহধর্মীদের সাথে জীবনের হাফ-আখড়াই, স্বাক্ষরের অক্ষরের কথা
মনে করে নিয়ে ঢের পাপ ক’রে, পাপকথা উচ্চারণ ক’রে,
তবুও বিশ্বাসভ্রষ্ট হ’য়ে গিয়ে জীবনের যৌন একাগ্রতা
হারাইনি; তবুও কোনো প্রীতি নেই এতদিন পরে।”
সংরক্ষণ দিলেই সমস্যার সমাধান হয় না। সংরক্ষণ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যে প্রশাসন, ব্যবস্থা, সমাজ বা রাষ্ট্র সংরক্ষণ দেয় তাকে জানতে হয় কবে সেই সংরক্ষণ শেষ হবে, না হলে বিরোধমুখটি খুলেই থাকে এবং সমস্যা বাড়ে মাত্র। কিন্তু চাকরী বা শিক্ষা বা সামাজিক-শ্রেণীগত কি জাতিগত-ধর্মগত বিভেদে সংরক্ষণ আমাদের দেশে শুধু ভোট সংরক্ষণের অপচেষ্টা। এর মধ্যে চালিকা শক্তিটি এর সমাপ্তি সম্পর্কে অচেতন এবং কখনো কখনো বোধ হয় জানেন যে এর কোনো শেষ নেই। নেই কারণ বিভেদের ফাটলটা বিবিধ রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক নীতিতে আরো চওড়া হচ্ছে শুধু, আর কিছু হচ্ছে না। হচ্ছে না বলে নারী-পুরুষ সংসারের ক্ষেত্রে যাঁরা সহধর্মী তাঁরা জীবনের হাফ-আখড়াই-এর পরে বিশ্বাসভ্রষ্ট দ্বন্দ্বমান হয়ে ঊঠেছেন। সেই দ্বন্দ্ব তাঁদের কোথায় নিয়ে যায়? রাজ্যে নাকি পরিবর্তন এসেছে? সেই পরিবর্তনের ফসল সে কোন চেতনা?
“অবশেষে জাগরূক জনসাধারণ আজ চলে?
রিরংসা, অন্যায়, রক্ত, উৎকোচ, কানাঘুষো, ভয়
চেয়েছে ভাবের ঘরে চুরি বিনে জ্ঞান ও প্রণয়?”
এর কিছু আগেই ওই একই কবিতায় জীবনানন্দ লিখেছিলেন,
“উনিশশো বেয়াল্লিশ সালে ঠেকে পুনরায় নতুন গরিমা
পেতে চায় ধোঁয়া, রক্ত, অন্ধ আধারের খাত বেয়ে,
ঘাসের চেয়েও বেশি মেয়ে;
নদীর চেয়েও বেশী উনিশশো তেতাল্লিশ,চুয়াল্লিশ, উৎক্রান্ত পুরুষের হাল;”
পাঠক, হাল দেখুন আজকের পুরুষের। সালগুলো শুধু বদলে নিন একবার। নিজের অধিকার বৃদ্ধির মানে অন্যের অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করা, এমনই সভ্যতা আজকালও। নিজের বাড়ির মেয়েটি, যে স্ত্রী-কন্যা-মা-বোন বা বান্ধবী বা সম্পর্কিতা আত্মীয়া তার হাত থেকে ট্রেন কেড়ে নিতে কি ব্যাকুল ওই শ’খানেক অবরোধকারী। প্রশ্ন হচ্ছে মানুষ যখন না খেয়ে মরে, যখন খাবারের দাম কালোবাজারীর চোটে বাড়তে বাড়তে দরিদ্রের আকাশ খুনে ভরে দেয়, যখন একটা স্কুলের এবং খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থানের অভাবে হাজারে হাজারে শিশু এই নিত্য অভাগা, জীবনের নিম্নতম মূল্যহীন দেশে ধুঁকে ধুঁকে মরে বুলেট ছাড়াই, যখন এক অকথ্য জেনোসাইড চলে কতিপয় সংখ্যালঘিষ্ঠ বজ্জাত বড়লোকের হাতে তখন এঁদের কোন অবরোধে পাবেন? কোন দাবীতে এঁরা থামিয়ে দেবেন অশিষ্টাচার আর অত্যাচারের সেই চাকা? দেবেন না। কারণ সাধারণ চেতনার অপরিমেয় অভাব এঁদের। আরেকটা ট্রেন দাবী করেননি এঁরা। বিবেচনা করে দেখেছেন সে দাবী রাষ্ট্র মানবে না। রাষ্ট্র দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দেবে যে এমনিতেই রেল পরিবহণ চলে ভর্তুকি দিয়ে, সেখানে আর ভর্তুকি নৈব নৈব চ। রাষ্ট্রকে রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীনেদের পরিচালক বাণিজ্যগোষ্ঠী বলে দিয়েছে যা ভর্তুকি তা তাদের দিতে হবে জনগণের করের টাকা থেকে, বিবিধ শুল্ক মকুব করে, পারলে বিনি পয়সায় জমি, জল এবং বিদ্যুৎ দিয়ে। কিন্তু দেশের নব্বই শতাংশকে দেওয়া যাবে না। রাষ্ট্র বলবেনা স্রেফ লোহার ছাঁটের মাফিয়া ব্যবস্থা বন্ধ করলে, রেলের জেনারেল ম্যানেজার প্রমুখ উচ্চপদস্থদের নির্লজ্জ সামন্ততান্ত্রিক বিলাসিতা বন্ধ করলে কিম্বা রেলের জন্য নানান ক্রয় সরঞ্জামের দুর্নীতি বন্ধ করলে বা পণ্য পরিবহনের শুল্ক আমদানিতে ঘটে চলা বৃহৎ দুর্নীতি ঘটানো দুষ্ট-চক্রকে কড়া হাতে দমন রেল এখনো বহু লাভ করার সম্ভাবনা রাখে। এককালে দেশের বাজেটে রেলের বাজেট থেকে টাকা যেত, এখন উল্টোপুরাণ হয়। অবরোধকারীরা এসব জানার কষ্ট করবেন না এবং এর বিরুদ্ধে আন্দোলন করা তো দূরস্থান। আর যাই হোক, মহিলাদের হাতে রাষ্ট্রের মত বন্দুক নেই না!
“আমরা তো বহুদিন লক্ষ্য চেয়ে নগরীর পথে
হেঁটে গেছি; কাজ ক’রে চ’লে গেছি অর্থভোগ ক’রে;
ভোট দিয়ে মিশে গেছি জনমতামতে।”
এমন অবরোধকারী চেতনা যে দেশের যে জনসমাজের অঙ্গ হয় তার হাল কি হয় তা ব্যাখার কি প্রয়োজন? তবু জীবনানন্দ বলে গিয়েছেন।
“সেই থেকে কলরব, কাড়াকাড়ি, অপমৃত্যু, ভ্রাতৃবিরোধ,
অন্ধকার সংস্কার, ব্যাজস্তুতি, ভয়, নিরাশার জন্ম হয়।
সমুদ্রের পরপার থেকে তাই স্মিতচক্ষু নাবিকেরা আসে;
ঈশ্বরের চেয়ে স্পর্শময়
আক্ষেপে প্রস্তুত হ’য়ে অর্ধনারীশ্বর
তরাইয়ের থেকে লুব্ধ বঙ্গোপসাগরে
সুকুমার ছায়া ফেলে সূর্যিমামার
নাবিকের লিবিডোকে উদ্বোধিত করে।”
আসলে রূপসী বাংলার কবি বলে কথিত জীবনানন্দ ঢের সত্য জানতেন। তাই এখানে অংশ অংশ করে রাখা কবিতাটির নাম দিয়েছিলেন ‘বিভিন্ন কোরাস’। যা সিম্ফোনি বা ঐকতান নয়, যা এমনকি অনৈক্যতান বা ক্যাকোফোনিও না, স্রেফ ধান্দা নির্ভর কিছু কিছু গোষ্ঠীচেতনা যা আজও মহত্তর কিছুর সন্ধান চাইতে শেখেনি।

 

ইচ্ছামতী (শেষ অংশ)

প্রচ্ছদ
এবার হয়েছে সন্ধ্যা
“পৃথিবীতে ঘটনার ভুল
চিরদিন হবে
এবার সন্ধ্যায় তাকে শুদ্ধ করে নেওয়া কি সম্ভবে?
তুমি ভালোবেসেছিলে সব
বিরহে বিখ্যাত অনুভব
তিলপরিমাণ
স্মৃতির গুঞ্জন – নাকি গান
আমার সর্বাঙ্গ করে ভর?
সারাদিন ভেঙ্গেছো পাথর
পাহাড়ের কোলে
আষাঢ়ের বৃষ্টি শেষ হয়ে গেলো শালের জঙ্গলে
তবু নও ব্যথায় রাতুল
আমার সর্বাংশে হলো ভুল
একে একে শ্রান্তিতে পড়েছি নুয়ে। সকলে বিদ্রূপভরে দ্যাখে।”
—এবার হয়েছে সন্ধ্যা (শক্তি চট্টোপাধ্যায়)
- খাবে কখন?
- এই তো, এই বার!
- ব্যাথা কেমন?
- আছে। হাতটা টনটন করছে।
- আর রাত না করলেই ভাল। এখনি একটা বাজে।
- মেজাজ ঠিক হয়েছে?
- হ্যাঁ! চিন্তা কোরোনা।
- না না। চিন্তা আমি কেন করবো? করবে রাখালের বাবা।
- সে কে?
- গোপালের মেসোমশাই।
- উমমমম, ভাল হবে?
- ভাল লাগছে না পরমা!
- নিজের মেজাজ খারাপ কোরো না। তুমি কি করবে? যা করার তা করা হয়ে গ্যাছে। আর বাকী যা তা যার বিষয় তাকেই করতে হবে। আমি বা তুমি কেউই কিছু করতে পারবো না।
কথাটা জানে বোধি। সত্যি সত্যি জানে। তাদের কিছুই করার নেই। অনেক আগেই যা হবার হয়ে গিয়েছে। স্বাধীনতা অর্জন করতে হয়। তার যেমন দায়িত্ব আছে, তেমন অধিকারও আছে। কারোর জন্যই স্বাধীনতা বিসর্জন দেওয়া যায় না। এই কথাটা বোঝানো সম্ভব না দিয়াদিকে। দিয়া পরমার বড় বোন। পরমার ঠিক উলটো তার প্রকৃতি। পরমা যতটাই স্বাধীনচেতা ততটাই চিন্তা-ভাবনার ঘরে তালা দিয়েছে দিয়া। আসলে দিয়েছে না, কোনোদিনই খোলেনি তালা। দিয়া বাবা-মায়ের ফরমায়েশী ভাল মেয়ে। পরীক্ষার পরে পরীক্ষায় ভাল ফলাফল। চারদিকে খুব একটা তাকানোর বালাই ছিল না তার। শুধু পড়ে গিয়েছে। পড়তে পড়তেই একদিন যখন পি এইচ ডি করতে শুরু করলো অ্যাস্ট্রোফিজিক্স-এর মতন বিষয়ে তখনো দিয়া একই রকম। শুনলে মনে হবে দিয়া খুব একটা গম্ভীর ব্যাপার। কিন্তু আদৌ তা না। দিয়া আসলে এখনো একই রকমের কিশোরী। বোধি অন্তত সেটা খুব বোঝে। তাই যখন তার শ্বাশুড়ী দিয়ার বিয়ের কথা পাকা করে ফেললেন কাগজ থেকে পাত্র খুঁজে তখন সে বারবার চেয়েছিল দিয়ার মত। তখনো তার আর পরমার সম্পর্কটা আইনী কিছু না। কিন্তু সকলেই জানে বা বুঝে গিয়েছে কি হতে চলেছে! সেই জোর থেকেই দিয়াকে ধরেছিল সে। জানতে চেয়েছিল এ বিয়েতে কতটা সম্মতি তার। দিয়ার কাছে কোনো স্পষ্ট উত্তর ছিল না। দিয়ার অনেক সিনিয়র এক দাদা ছিলেন গবেষণার জগতে। তিনি দিয়াকে অনেকদিন ধরেই বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করেন।স্বাভাবিকই। কারণ দিয়ার বাড়িতে কেউ তো আর অ্যাস্ট্রোফিজিক্স নিয়ে গবেষণা করে নি। কাজেই তাকে সাহায্য নিতেই হত। কিন্তু সেই সাহায্য দেওয়াটাই একসময় একরকমের আশ্রয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল সেই মানুষটার। তিনি দিয়াদির চেয়ে বয়সে বড় তো বটেই, তার সঙ্গেই বিবাহিতও বটে। কাজেই সে সম্পর্কের আবারো হিসেব মতন কোনো পরিণতি ছিল না। দিয়াকে কিন্তু বোধি বলেছিল জীবনে কিছু কিছু সময় আসে যখন সোজা দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। দিয়া কি করবে তা দিয়ার একান্ত ভাবনার বিষয়। কেউ কোথাও তার জীবনের দায় নেবেনা, যতই নিয়ম কানুন হাঁকড়াক না কেন! আর নীতি-টিতি নিয়ে যে লোকেরা বেশী হাঁকডাক করে বেড়ায় বাজারে তারাই সবচেয়ে বেশী হারামি দেখা যায় সাধারণ ভাবে। নীতিহীন তারাই সবচেয়ে বেশী। কাজেই কে কি বলছে সে সব পরে হবে, দিয়া কি বলছে সেটাই সবচেয়ে বেশী জরুরী!
পারেনি দিয়াদি। অবস্থানকে শক্ত করতে। সেই পাত্রকে বিয়ে করে চলে গেল একদিন নিউওর্লিয়েন্স। বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই জানা গেল পাত্রের প্রচুর সন্দেহ আছে, আছে নানান শারীরিক সমস্যা। দিয়াদিই জানতে পারলো। মাঝেমাঝে হাতও তোলে গায়ে। কেন? না পাত্রর মানসিক রোগ আছে। সে কিছুকাল ছিল মানসিক চিকিৎসালয়ে। তার সন্দেহ আছে সকলের উপরেই। সকলেই তার শত্রু। সম্ভবত পড়াশোনা নিয়েই থাকা মানুষটা কোনো একটা সময়ে নিজের ছাত্রবন্ধুদের মধ্যেই কিছু বিরোধিতা পেয়েছে, অথবা আত্মীয়সমাজে কিছু ঘটেছে যা তার মনের মধ্যে ছাপ ফেলে গিয়েছে প্রবল। সেই ছাপ এখন সন্দেহের রোগে পরিণত। এমনকি আজ যখন তাদের প্রথম সন্তান হয়েছে তখনও তার মনে হয় সন্তান তাকে পছন্দ করেনা, ভালবাসেনা এবং তার সঙ্গে শত্রুতা করতে চায়। উন্মাদনা তার মনে রয়েছে।
রাত্রে আসা ইনসিওরেন্সের এজেন্ট তথা যৌনকর্মী মেয়েটার সঙ্গে কতটা ফারাক দিয়াদির? মেয়েটিকেও তো বিয়ে দেওয়া হয়েছিল পাত্রর মানসিক সমস্যা লুকিয়ে। মেয়েটির বর একদিন আচমকাই হারিয়ে গিয়েছিল। দিয়াদির হারায়নি। শুধু মারধোর আর ঝগড়া করে যাচ্ছে। পরমা, কলকাতায় একা। বোধির শ্বশুর-শ্বাশুড়ি গিয়েছিলেন মেয়ের কাছে। সেখানে নিজেদের চোখেই দেখে এসেছেন। শোনার পর থেকে বোধি আরও বেশী ঘেঁটে আছে। ভাল লাগছে না তার। সবচেয়ে বেশী খারাপ লাগছে তার শ্বশুর-শ্বাশুড়ির জন্য। দুজনেই ভাল মানুষ। জীবনে জেনেশুনে কারোর ক্ষতি করেন নি। মেয়ের বিয়ে আর পাঁচজন বাঙালির মতই উপার্জনশীল বিদেশ নিবাসী পাত্রের সঙ্গে দিয়ে মেয়ের ভালই করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ভাল চাওয়া আর ভাল করার মধ্যে অনেক ফারাক। সারাজীবন বোধি এটাই দেখে এসেছে। এত এতবার দেখেছে যে তার আর আলাদা করে বুঝতে অসুবিধে হয় না ফারাক কতটা! সেও অনেকবার ভাল করতে গিয়ে মন্দ করে বসেছে। দিয়াদিকে বারবার এটাই বোঝাতে চেয়েছিল সে। মা ভালই চান। বাবা ভালই চান সাধারণভাবে। কিন্তু তাঁদের সব ভাল চাওয়া সত্ত্বেও একটা সত্যি আছে, সেই সত্যিটা হল কোনো মানুষ কখনো জানেনা কোনটা সবচেয়ে ভাল বা মন্দ। রাজনীতি থেকে ব্যাক্তিজীবন সবটাই শুধু মাত্র ট্রায়াল অ্যান্ড এরর, চেষ্টা আর ভুলের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যাওয়া। যতটা যাওয়া যায় ততটাই। সেখানে যে মানুষটার জীবন জড়িত তাকে ভাবতে দিলেই সবচেয়ে ভাল। সে যতই কম বোঝার লোক হোক সেই জানবে তার ভাল বা মন্দ। কম বয়স ছিল যখন বোধির তখন সে ভাবতো একদিন বুঝি সব বদলে যাবে। সব মানুষ একেকজন পবিত্রতম মানুষ হবে। হয়নি। সে নিজেও হয়নি। তারা যে যার লোভ-লালসা-স্বার্থ-দায়-চাহিদার মধ্যে ঘুরপাক খেয়ে চলছে। তখন ভাবতো একদিন বিপ্লব হবে দেশে। সব বদলে যাবে। এই যে চারপাশে চলা নৈরাজ্য, হাহাকার, দারিদ্র, মহাপতনের দিনকাল এসব শেষ হয়ে নতুন এক সূর্য উঠবে। নতুন এক সকাল আসবে। অন্য এক জীবন, এক মহান জীবন তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। মিছিলে মিছিলে হেঁটে, ক্ষোভে-বিক্ষোভে ফেটে পড়েওছে একদিন। পায়ে হেঁটে দেশ জানতে গিয়েছে শহর থেকে গ্রামে। শুনে এসেছে গ্রামপতনের শব্দ। অস্ত্র না কি অস্ত্রহীন লড়াই সেই তর্কে রাতের পর রাত, সন্ধের পর সন্ধে কেটে গিয়েছে। কিন্তু কিচ্ছু হয় নি। কিচ্ছু না। সেইসব দিনগুলো কেমন যেন হাওয়ার মতন মিলিয়ে গিয়েছে। এখনো বেশ কিছু মানুষ লড়ে যাচ্ছেন সেই একই বাসনায়। কিছু হবে কি?
বোধির মনে হয় হওয়ার নেই এইভাবে। যদি সত্যি হওয়ার হত তাহলে এত এত হাজার বছর ধরে মানুষের যে জ্ঞানভান্ডার গড়ে উঠেছে তাতে কম ভাল কথা বা ভাবনা ছিল না, তা দিয়েই হত তো! হল না কেন? ধর্মের মাধ্যমেই হোক, কি বিদ্রোহ, বা শুধু মাত্র দর্শনের স্থান থেকেই কম লোক বলেছেন কম কথা? কজন শুনলো? কেন শুনলো না সব লোক? যাঁরা শুনলেনও তাঁরাও এক সময় নিয়ম করে আবৃত্তি করার মতন সেইসব কথা উগড়ে দিয়ে চলে গিয়েছেন জীবন থেকে। কেন? খুব সামান্য দু-একটা বিষয় বোধহয় আছে এত কিছুর পিছনে। সে হল বোধের প্রসঙ্গ। এই সব মহান কথাও সব মানুষের কাছে পৌঁছয়নি। যাদের কাছে পৌঁছেছেও তাদের যথাযথ শিক্ষালাভের পর পৌঁছয়নি, আগে-ভাগেই চলে গিয়েছে সে সব কথা। শিক্ষা ছাড়া বহু কিছু অনুধাবনই করা যায় না। এই যে এখন ভাবছে সে এসব কথা, এ কথায় লাভ কি? যেখানে মানুষ পেটের ভাত জোগাড় করতেই জীবন শেষ করে ফেলছে সেখানে শিক্ষা আসবে কোথা থেকে? শিক্ষা কি করে প্রাথমিক বিষয় হবে? রাষ্ট্রের সদিচ্ছার যতই অভাব আছে বলা হোক, সে যতটুকুও করছে তাও কি পৌঁছচ্ছে মানুষের কাছে? হাজারো প্রকল্প আছে সরকারের। সেই সব প্রকল্পের সুফল পাচ্ছে কই মানুষ? কাজ থেকে বাসস্থান থেকে শিক্ষা থেকে স্বাস্থ্য সব নিয়েই যতটুকু কাজও এই গণতন্ত্রে করা যায় তা মাঝপথে লুট হয়ে যাচ্ছে। লুট করছে কারা? তারা কি এই দেশেরই মানুষ না? তাহলে কিছুই না আসা একটা সমাজে বোধ আসবে কোথা থেকে? তার নাম তো বোধি, বোধ কি তারই হয়েছে?
এই যে সে সুতনুকার জীবন নির্ধারণ করার কাজে লেগেছে সেটা কি? সুতনুকা তাকে ভালবাসে। সুতনুকার ভালবাসাকে তার চারপাশ বিভিন্ন কারণে বিভিন্ন ভাবে দেখবে। তাকে মানবে না। সুতনুকা কষ্ট পাবে। সুতনুকা অসাধারণ জীবন নিয়ে ভাবিত নয়। সে যেভাবে বেড়েছে সেভাবেই দেখে সব। তার আলাদা কোনো প্রশ্ন নেই। তার জীবনের মানুষটি শুধু তার হবে। তার-ই। এবারে? বোধি এসব জানার পরেও কি করে সুতনুকাকে না এড়িয়ে চলতে পারে? সে তো সুতনুকার ঘোষিত সম্পত্তি হবে না। তাহলে? পরমার এ কথা জানা আছে। জেনেছে পরমা। ধীরে ধীরে বোধির জীবন দেখে দেখে। পরমাও জানে ব্যাক্তির স্বাধীনতার অর্থ কি, জেনেছে তার নিজের জীবন দিয়েই। বোধি তাকে যে জায়গা দিয়েছে সেই জায়গা দেখে। সন্দেহ, অবিশ্বাস কোনো কিছুই নেই তাদের সম্পর্কে। এমনকি সেই অর্থে কোনো ঝগড়াও নেই। যে সব উপাদানগুলো দিয়ে সাধারণভাবে একটা সম্পর্ককে চিনতে শেখানো হয় তার কিছুই নেই। তাহলে? বহু বন্ধু লোক অবাক হন, এমন কি করে হয়? তাহলে কি সেই টান নেই দুজনের? কি বোকা প্রশ্ন একটা! দুজন প্রাপ্তমনস্ক মানুষ, নিজেদের মধ্যেকার সমস্ত কিছুকে বুঝে নিতে পারেন, বিরোধকেও ঠান্ডা যুক্তি-তর্কে ছেঁড়াকাটা করে সামলে নিতে পারেন বলে সেটাতে প্রেম নেই? প্রেম শুধু আছে মারামারি, কাটাকাটি আর দখলে? তাহলে তো দিয়াদির বর যে কাজটা করে সেটাই আদর্শ? কিম্বা সুতনুকার বর রজত যা করেছে সেটাই স্বাভাবিক? কিন্তু এ কথা শুনছে কে? তারা তাদের দুনিয়ার বাইরে কি পা রাখতে চাইছে? একদমই না। বরং আরো বেশী বেশী করে নিজেদের ভ্রান্তিগুলোকে সাজিয়ে রাখে। এক সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে এসেও সেই একই ভ্রান্তি নিয়েই যায় অন্য সম্পর্কের মধ্যে। সুতনুকাও তাই করবে বা করতে চায়। একটি সম্পর্কের মধ্যে সন্দেহ-অবিশ্বাস এমনকি নিশ্বাস-প্রশ্বাসের জায়গা না থাকা থেকে বেরিয়ে এসেও সেই একই রকম ভাবেই চলতে চায়। আরেকটাকেই শুধু আঁকড়ে এবং নিজের করেই বাঁচতে চায়। তার যে প্রক্রিয়া সেই প্রক্রিয়ার মধ্যেই দাঁড়িয়ে থাকতে চায়। তাই তার পারিপার্শ্বকে সেও অতিক্রম করার কথা ভাবলেই ক্রমশঃ সতর্ক হয় আরো। অথচ তার আশেপাশের সব কটা সম্পর্কই তার উপরে নিজেদের দখল নিশ্চিত করার চেষ্টাই করতে চেয়েছে শুধু। ভাল চেয়ে হলেও তাই-ই করছে। না হলে তার বাবা তার পাশে দাঁড়ায় নি কেন?
এইখানে রয়েছে অরিন্দম। বোধি জানে সে তাকে পছন্দ করছে না। তার অনেকগুলো কারণ আছে। প্রথমতো বোধি অরিন্দমকে সুতনুকার জীবনের অথোরিটি হিসেবে মানে না। সেই কারণে অরিন্দমের নির্ধারিত পন্থাতেই সে হাঁটবে এমন কোনো স্থিরতা নেই। সেটা অরিন্দমও খুব ভাল করে বুঝে গিয়েছে। দ্বিতীয়ত, অরিন্দমের কোথাও কাজ করে কমপ্লেক্স-ও। বোধির পরিচয় এবং সেই অর্থে খ্যাতিও তার চেয়ে বেশী। সুতনুকার বোধিকে নিয়ে, তার লেখাকে ঘিরে মুগ্ধতা অরিন্দমর ভাল লাগেনি। অরিন্দম নিজেই সুতনুকাকে বলেছে একসময়ে তাকে। অরিন্দমের কোথাও একটা ইনসিকিউরিটি তৈরী হয় এতে। সে চায় সে সুতনুকার জীবনের প্রতিটি কণা জানবে। তার অমতে সুতনুকার জীবন চলবেই না। সুতনুকার যে জীবনটা যাপনের ইচ্ছে তার সঙ্গে প্রকৃতিগতভাবে অরিন্দমের বিরোধ আছে। সে নিয়মনিষ্ঠ সংসারের বিশ্বাস রাখা মানুষ। তার ভালমন্দ সব নিয়েই সে চলে এবং নিজের কাছে একটা নীতিগত আচরণ খাড়া করে রাখে। বোধি জানে সেটাও একদিক থেকে বেশ কাঁচা অবস্থান। যেমন একবার সুতনুকা ট্যাক্সিতে তার কর্পোরেশনের একটা ট্যাক্সের মামলারর ফাইল ফেলে নেমে এসেছিল। ট্যাক্সি ড্রাইভার বয়স্ক পাঞ্জাবী। তিনি ওই ফাইলটার মধ্যে সুতনুকার নাম না পেয়ে যে কোম্পানির মামলা সে কোম্পানির কাছে দিয়ে আসেন। কোম্পানি তখন অরিন্দমকে ফোন করে বলে গোটাটা। অরিন্দম জানতেন এটা। কেসটা তিনিই দিয়েছিলেন বলে কোম্পানি ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁকেই ফোন করেছিল। সুতনুকাকে করেনি। সুতনুকাকে বলার আগে অরিন্দম নিজে চলে গেছিলেন ওই কোম্পানিতে। ট্যাক্সি ড্রাইভারকে আলাদা করে ডেকে নিয়ে তাকে টাকা দিয়েছিলেন।

অন্যদিকে বোধিকে ফোন করেছিল সুতনুকা। বোধি শহরের ট্যাক্সি ইউনিয়নগুলোতে তার জানাশোনাদের দিয়ে তখন খোঁজ করাচ্ছিল। লোকটির বর্ণনা দিয়ে দিয়ে খোঁজ চলেছে। ইউনিয়নগুলোর নেতারাও জানে সাংবাদিকদের কাজে লাগে। তাই তারা চেষ্টার কসুর করেনি। বোধি যখন পরের দিন সন্ধেতে সুতনুকাকে নিয়ে ওই ট্যাক্সিওলা অব্দি পৌঁছলো, তখন জানতে পারলো যে ফাইলটা কোম্পানি থেকে নিয়ে গিয়েছেন অরিন্দম। তাকে টাকাও দিয়েছেন। পাঞ্জাবী মানুষটি টাকা নিয়ে খুব সঙ্কুচিত। তিনি টাকা নিতে চাননি, কিন্তু জোর করেই অরিন্দম দিয়েছে তাঁকে। বোধির ভাল লাগেনি বিষয়টা। মানুষ এমন কাজ করবে এটাই স্বাভাবিক। বড়জোর, লোকটির দারিদ্রর জন্য তার ফোন এবং যাতায়াত খরচ দেওয়া যেত। তার বদলে তাকে পুরস্কার দেওয়াটা বোধির ভাল লাগেনি। এভাবেই স্বাভাবিক কাজকে ক্রমশ অস্বাভাবিক করে তোলে একটা সমাজ। শুধু মাত্র ব্যাক্তিস্বার্থ সিদ্ধির যে রাস্তা খুলে দেওয়া হয়েছে এই সমাজে তাতে এটাই নিয়ম হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কিন্তু এমন নিয়ম সভ্যতার নিয়ম না। এর পর থেকে লোকটি প্রতি কাজই যদি এমন পুরস্কারের জন্যে করে তাহলে? সামাজিক বন্ধন বা কর্তব্য বলে কি অবশিষ্ট থাকছে এতে? ধরা যাক একজন দিলেন না। তাহলে তার পরের বার লোকটি এই কাজটা আর করবে না? পুরস্কারের জন্য এই কাজটা তো মানুষটা করেনি। তাকে তার দারিদ্রের জন্য অসন্মান করা কেন? এটা তো স্বাভাবিক কাজ একটা।
অরিন্দমের বক্তব্য আলাদা। তার বক্তব্য কাজটা খুব জরুরী। কারণ ভাল কাজকে পুরস্কার দেওয়া উচিত। তাতে যে ভাল কাজের স্বাভাবিকতা নষ্ট হয় এই যুক্তি মানতে অরিন্দম রাজী নয়। স্বর্গ-পাতাল পুরস্কার বা তিরস্কার হিসেবে রেখে, লোভ দেখিয়েই মানুষকে ভাল করতে হবে এমন অসম্ভব হাস্যকর যুক্তিতে দাঁড়িয়ে যায় অরিন্দম। ঠিক যেখানে দাঁড়িয়ে থাকে ধর্মের খেলাটা। সেখান থেকে কথা ঘুরতে ঘুরতে পৌঁছয় ভাল বা মন্দের আপেক্ষিকতা নিয়ে। সেই আপেক্ষিকতার ক্ষেত্রে আবার এই অরিন্দমেরই বক্তব্য ভাল বা মন্দ সাদা বা কালো শুধু। তার কোনো ধুসর অঞ্চল নেই। কি বৈপরীত্য ভাবনার! এবং সেইটা ধরিয়ে দিলেও অরিন্দমের বিন্দুমাত্র হেলদোল হয় না। বোধি তাকে যখন বলে যে একটা লোক অফিসে প্রচন্ড ঘুষখোর হয়েও বাড়িতে নিজের সন্তানের সবচেয়ে ভাল চাইতে সক্ষম, জীবন এমনই ধুসর। তারা সকলেই জানে যে লোকটা অফিস থেকে ব্যবসা কি রাজনীতিতে চুরি করছে, মিথ্যে বলছে সেই লোকটাই বাড়িতে সন্তানকে পড়াচ্ছে বিদ্যাসাগরের ‘সদা সত্য কথা বলিবে’। অরিন্দমের মনে হয় এটা fuzzy logic। এটাই অরিন্দম। সেই জন্যেই তার করা ভাল কাজগুলোর সম্পর্কেও তখন বোধির ভাবনা আসে। তাহলে যে অরিন্দম অন্যকে পুরস্কার দেয় সেই অরিন্দম নিজে কেন করে সুতনুকার জন্য? কি পুরস্কারের আশায় করে? এখানেই চলে আসে আরেক জটিল ভাষ্য। এই কথাটা অরিন্দমর মানতে খুব কষ্ট হবে। কিন্তু এমন হাজারো বৈপরীত্য দিয়ে অরিন্দম বা অরিন্দমরা তৈরী হয় এবং তারপরেও গলায় যতটা জোর আছে তা দিয়ে প্রমাণ করতে চায় তাদের জীবন ভীষণ নিয়মনিষ্ঠ একটা বিষয়।
না বোধির এমন কোনো নিয়মনিষ্ঠা নেই। নেই কোনো সাদা-কালো জীবন। যা আছে তা শুধু ধুসর অঞ্চল। সেখান থেকে সুতনুকার জীবন নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টাটা একটা ভুল কাজ হয়েছে। ওই ঘটনার পরে সুতনুকা অরিন্দমের সঙ্গে প্রাথমিকভাবে খুব ঝগড়া করে। বোধি বলেছিল ভুলটা সুতনুকার। নিজের কাজ নিজেকেই করতে হয় এবং দায়িত্ব নিতে হয়। না নিলে এইভাবে সমস্যা আরো আসবে। অরিন্দমের উপর কাজের জন্য নির্ভর করতে হবে কেন? কেন সুতনুকা নিজে তার চেম্বার করার কথা ভাবছে না? যোগাযোগ কম নয় তার। চেম্বার করলে এইভাবে ফাইল নিয়ে রাস্তাঘাটে সমস্যা হয় না। সুতনুকা চেম্বার করার মতন ভরসা পায়নি। বোধি তাকে এও বলেছিল যে যতক্ষণ না সে দাঁড়াচ্ছে নিজের পায়ে ততক্ষণ বোধি তাকে প্রয়োজনে আর্থিকভাবে সাহায্য করবে। অরিন্দম কাজ দিয়েছিলেন। সুতনুকা ভুল করেছে। সবটাই সত্যি। কিন্তু এই ভুলটা যে কোনো মানুষের হতে পারে যে কোনো সময়ে। এর জন্য সুতনুকাকে বকা যেতে পারতো, কিন্তু অপমান করা যেতে পারে না। কিন্তু অরিন্দম এসব কিছুই চাননি। তিনি চেয়েছিলেন এই সুযোগে সুতনুকার উপরে তাঁর ঝাল আবার ঝেড়ে নিতে। তাই ফাইলটা পেয়ে সুতনুকাকে জানাননি। কোম্পানিকে বলেছিলেন সুতনুকাকে আর কেস দেবেন না তিনি। এত অপদার্থ এ কথা তিনি জানতেন না। কোম্পানি সুতনুকাকে ফোন করেনি। সুতনুকা যখন ফাইলটা নিয়ে ট্যাক্সিওলার থেকে জানে তখন ফোন করে কোম্পানির প্রোপাইটর আনন্দমোহন সারং-কে। সারং তাকে বলে,
- আপ লোগ কঁহা কঁহা সে ও ডিগ্রী লেকে আযাতে হ্যাঁয় ট্যাক্স কনসালটেন্ট ইয়া ল’ইয়ার বননে কেয়া মালুম। ঘরমে রহিয়ে না! আপকাভি ভালা হোগা, হাম লোগন কা ভি। বেবজা টাইম জারা তো না হোঙ্গে হামারা।
সুতনুকা অপমানিত হয়েও ক্ষমা চেয়েছিল। বোধি সামনে দাঁড়িয়ে শুনছিল সবটা। ক্ষমা চাইলেও সারং বলে,
- ও সব ছোড়িয়ে। ইয়ে সব আপকা বস কা কাম নহী। উয়ো কেস আব আপকা নহী রহা। ও মিত্রা সাবকো দে দিয়া হামনে। অউর দো বারা ফোন মাত কিজিয়েগা।
বলে ফোনটা কেটে দেয়। সুতনুকার মুখ-চোখ লাল হয়ে গেছিল অপমানে। এই লোকটাই তাকে দিনে-রাতে নানান ছুতোয় ফোন করতো। সুন্দরী মহিলা ল’ইয়ার বলে। সুতনুকা একেক সময়ে বিরক্ত হয়ে ফোন ধরতোও না। সেই আজকে তাকে অপমান করছে।
আর অরিন্দমের কাছে সুতনুকা যখন জানতে চায় যে তিনি তাকে জানানোর প্রয়োজন বোধ করেননি কেন, তখন অরিন্দম সুতনুকাকে বলেছিলেন,
- সারাক্ষণ বোধিকে নিয়ে বুঁদ থাকলে আর কাজ করবে কখন? নিজেও করবে না, আর আমার রেপুটেশনও নষ্ট করবে।
সুতনুকা চুপ করে বাড়ি চলে গিয়েছিল। গোটা রাস্তা কথা বলেনি। অরিন্দম দু-একবার কথা বলতে গিয়ে বুঝেছিল যে যে কোথাও এর জন্য তাকেই দায়ী করছে এখন সুতনুকা। নিজের ভুল দেখা সুতনুকার অভ্যাস না। সুতনুকার ভাবনার প্রক্রিয়াটা বোধি রাতে ফিরে এসে ধরার চেষ্টা করছিল। সুতনুকা দীর্ঘ্য দিন অরিন্দমের সঙ্গে আর যোগাযোগ রাখছিল না। সেই রাস্তায় নামিয়ে দিয়ে যাওয়ার পর থেকেই এমন চলছিল। কিন্তু আলাদা চেম্বারটাও করছিল না। আবার বোধির থেকে টাকা নিয়ে কাজের জন্য চেষ্টা চালানোর সময়টাও সে নিতে ইচ্ছুক ছিল না। অতএব একটা জটিল স্থিতাবস্থা চলছিল। তার সঙ্গে বোধির পরমার সঙ্গে সম্পর্ক ভাঙার কোনো কারণ ছিল না। কাজেই সুতনুকার হিসেব মতন তাকে বিয়ে করার উপায় নেই এটাও সুতনুকা বুঝে গিয়েছে। সুতরাং, বোধিকে তার প্রয়োজন কতটুকু তা এবারে নিশ্চই ভাবার চেষ্টা করবে সুতনুকা। আর অন্যদিকে অরিন্দম বা অরিন্দমের মতন মানুষদের কতটা প্রয়োজন সেটাও। বোধিও বুঝতে পারছিল এবারে সুতনুকার যাবার সময় হচ্ছে। সুতনুকা সামাজিক নিয়মের বাইরে যাবার ক্ষমতা রাখেনা। সব চেয়ে বড় কথা চায়ও না। কি চায়? তা সুতনুকার কাছে খুব পরিস্কার কোনোদিনও হবে না। এভাবেই চলবে সে। প্রয়োজন তার কাছে খুব বড় কথা। অভাব প্রয়োজন শেখায় এ কথা বোধিও জানে। তার জীবনেও অভাব ছিল, দারিদ্র ছিল। কিন্তু নিছক প্রয়োজনকে অতিক্রম করতে পেরেছে সে তবুও। সুতনুকা? খুব মুশকিল!
যখন প্রথম আলাপ হয়েছিল অরিন্দমের সঙ্গে তখন অরিন্দমও একবার বলেছিল বোধিকে যে বোধিকে প্রয়োজন সুতনুকার কাজে সাহায্য করার জন্য। সুতনুকাকে তার যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে কিছুটা এগিয়ে দেওয়ার জন্য। সবেতেই আজকাল লাগে যোগাযোগ, তাই! তারপরেও যতদিন সম্পর্কটা উপরে উপরে স্বাভাবিক ছিল ততদিন অনেকবার বলেওছে বোধিকে একই কথা। ব্যাস? এই শুধু? তাও অরিন্দম মনেই রাখেনি যে সে আগে চেনে সুতনুকাকে, তারপরে অরিন্দমকে। অরিন্দম তার কাছে সুতনুকাকে নিয়ে আসেনি কাজের সুবিধার জন্য। সুতনুকার সঙ্গে তার পরিচয় অরিন্দমের চৌহোদ্দির বাইরেই। কিন্তু এই টার্ম ডিকটেট করাটা অরিন্দমের কাছে খুব স্বাভাবিক। তার অভ্যাস হয়ে গিয়েছে যেখানে যেমন সুবিধা আছে তেমন সুবিধা ব্যবহার করা, আর মুখে নীতি-নৈতিকতার ভন্ডামি করা। বোধির ভেতরে একটা বিরক্তি জন্মাচ্ছিল। ব্যবহৃত হওয়াটাকে সে বেশ ঘৃণা করে। সে নিজে কাউকে জীবনে ব্যবহার করেনি। সেখানে কেউ তাকে শুধু ব্যবহার করতে চাইছে ভাবলে সেই মানুষটা সম্পর্কে কোনো শ্রদ্ধা তো দূরস্থান, সামান্য সন্মানও অবশিষ্ট থাকে না। কেউ তার কাছে সাহায্য চাইলে সে সানন্দে সাহায্য করবে, কিন্তু ব্যবহার করতে চাইলে সেই মানুষের দিকে আর ফিরে তাকানোরও প্রয়োজনও বোধ করে না। তাছাড়া সুতনুকার ভালর ভাবনা তার খুব কম থাকার কারণ কি? যদি অরিন্দম বুঝেই থাকে তার আর সুতনুকার মধ্যে বিশেষ কিছু স্পেস আছে, তাহলে সেই স্পেসটায় ভালর ভাবনা থাকবে না এমনই বা ভাববে কেন? আসলে ওই যে, সবকিছুকেই নিজের ইচ্ছে বা বিবেচনার মতন চালানোর অভ্যাস, ওইখান থেকেই আসে এই সমস্যা। কোনো এককালে সুতনুকার ভেঙে পড়া জীবনকে অরিন্দম একদিন সহায়তা দিয়েছে। অতএব তার অধিকার জন্মে গিয়েছে সুতনুকার জীবন নির্ধারণ করার। যুক্তিটা খুব সহজ। যেহেতু সে বের করে এনেছে সুতরাং সে একটা অভিপ্সিত লক্ষে পৌঁছে দেবেই সুতনুকাকে। লক্ষটা কার? তার না সুতনুকার? অরিন্দমের কাছে লক্ষটা অনেক বেশী তার নিজস্ব। আর সুতনুকার? জানাই নেই। তার কি লক্ষ তা তার জানার কোনো সম্ভাবনাও নেই তেমন। জীবনে এত জট লেগেছে সে জট এত সহজে ছাড়বে না। আর জট থাকলে তার মধ্যে দাঁড়িয়েই আরো জটিলতা নিয়ে ভাববে এমন যদি সুতনুকা হত তাহলে তার জীবনে এই জটটাই আসতো না। কাজেই সুতনুকা কিছু দূর যাবার পরেই সব ছেড়ে দেবে সময়ের হাতে। তাতে যদি কিছু হয় হবে, না হলে হল না বলে তার দুঃখ করার বিলাস থাকবে।
এটা কি অস্বাভাবিক? নাহ্‌। এমনি তো এই দেশের একটা বড় অংশের মানুষ। তারা জীবনকে দেখেই ওই ভাগ্যের হাতের খেলনা হিসেবে। আর সবই তাই ছেড়ে দেয় ভাগ্যরে হাতে সমাধানের জন্য। সেই সমাধান যদি মৃত্যু অবধি নিয়ে যায় তাহলে তাই যাবে। কিন্তু নিজে চেষ্টা করে বাঁচবে না। কেউ যদি নিজে বাঁচতে না চায় তাকে যতই স্যালাইন দেওয়া হোক না কেন একটা সময়ে সে মরবেই। কিছুদিন আগেই এমন একজন মানুষকে দেখেছে বোধি। ভদ্রলোক খুব নিরীহ মানুষ। চাকরী করতেন একটি গ্রামীণ ব্যাঙ্কে। খাটিয়ে, প্রাণচঞ্চল মানুষ। কোনো কারণে তাঁর উপরওয়ালা তাঁর ব্যাপারে সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি একদিন খুব অপমানিত হলেন তাঁর ওই উপরওয়ালার কাছে। ব্যাঙ্কের অন্য সব কর্মীরা স্বাক্ষী ছিলেন এই অকারণ অপমানের। মানুষটি গুটিয়ে গেলেন প্রথমে। তারপরে ধীরে ধীরে অসুস্থ হতে থাকলেন। তারপরে শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন। শরীর দুর্বল হয়ে যেতে থাকলো। তিনি কিছুতেই খেতে পারতেন না আর। বহু ডাক্তার দেখলেন তাঁকে। কলকাতা থেকে শুরু করে দক্ষিণভারতের অনেক ডাক্তার দেখলেন। বহু রকমের চিকিৎসা হল। মানসিক, শারীরিক সব রকম। কিন্তু ক্রমশ তিনি একেবারেই খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিলেন। বিছানায় শুয়েই শুধু কাটাতেন দিন। কারোর কথায় সারা দিতেন না। কোনো রকমের চাহিদা ছিল না তাঁর। উপোস করে থাকতেন। জোর করে খাওয়ালে খেতেন। তারপরে সব বমি করে দিতেন। কয়েকদিন অন্তর অন্তরই তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হত। তাঁরই ব্যাঙ্কের সহকর্মীরা তাঁকে নিয়ে যেতেন বিভিন্ন হাসপাতালে। কলকাতার এক নামী বেসরকারী হাসপাতালে থাকাকালীন বোধি তাঁকে দেখতে গেছিল। কাউকেই চেয়ে দেখতেন না মানুষটা। গোটা জীবনপ্রবাহকেই যেন তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। নির্লিপ্ত হয়ে শুয়ে আছেন। কিছুই তাঁকে আর স্পর্শ করছে না। কোনো উচ্চকিত স্বর নেই তাঁর। গোটা জীবনের সুরটিকে যেন এক খাদে বেঁধে নিয়েছেন। এমন এক খাদ যেখানে কন্ঠ নিয়ে যাওয়াই দুস্কর। সেই খাদ থেকে নিরুচ্চারে কিন্তু স্পষ্টতই বলে চলেছেন এই নীচ, অধম দুনিয়াকে তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। স্ত্রী-পুত্র কিছুই তাঁর না। এই সভ্যতাকে যেন তিনি নীরবে কিন্তু কঠিন প্রত্যাখ্যান করেছেন। বোধি বেশীক্ষণ থাকতে পারেনি সেখানে। এমন প্রত্যাখ্যানকে সহ্য করাও মুশকিল। নিজের যাবতীয় অপারগতা, অকর্মণ্যতা যেন তাড়া করতে থাকে এমন কিছুর সামনে দাঁড়ালে। সেই মানুষটি মারা গিয়েছেন কদিন হল। বোধি বনগাঁ আসার কয়েকদিন আগেই তিনি ঘুমের মধ্যেই চলে গিয়েছেন। তিন বছর ধরে সকলের তাঁকে নিয়ে সব লড়াইকে ব্যার্থ করে দিয়ে চলে গিয়েছেন। এখনো বোধি চোখ বুজলে তাঁর মুখটা দেখতে পায়। কি অসম্ভব নির্লিপ্ত একটা মুখ, যাতে জীবনের কোনো ছায়াই আর লেগে নেই। তাই বোধি জানে, কেউ যদি বাঁচতে না চায়…! সেও যদি কোনোদিন এমন প্রত্যাখ্যান করে সব? যদি কোনোদিন তারও মনে হয় বিষের পেয়ালা পূর্ণ? যদি কোনোদিন…!

- এবারে খেয়ে নাও। শরীর তোমার ভীষণ ভাঙছে। এমন করলে কোনো কাজই আর শেষ করতে পারবে না।
পরমা দূরভাষের ওপ্রান্ত থেকে বলে। বোধির মাথার উপরে তারা ঝলকানো আকাশ। পরমার কথা আসলে ওই আকাশের কোনো এক প্রান্তে কোনো এক স্যাটেলাইট হয়ে আসছে তার কাছে। পরমার কথা আকাশ ছুঁয়ে আসছে। সুতনুকার কোনো কথাই আসছে না। বিভূতিভূষণ, স্যাটেলাইট নিয়ে কি বক্তব্য ছিল আপনার? সাহিত্য অকাদেমি থেকে সুনীলকুমার চট্টোপাধ্যায়ের বিভূতিভূষণকে নিয়ে একটি বই আছে। নাম ‘বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়’। অনেকদিন আগে সেখানে বোধি ওনার করা বিভুতিভূষণের ডায়েরীর অনুবাদ পড়েছিল।
“In the company of mysterious evening star, fragrance of the wild flower, the chirping of the birds, I want to be your playmate. You are the eternal wayfaring boy wandering about in the forests with the garland of wild flowers in your neck. But who cares for your message? None. Everybody wants wealth, power, fame. Does anybody care for this enchanting beauty of moonlit night? These eyes that see this beautiful world are your gift. I am prepared to come to this earth with these eyes. You are the great artist. I need your blessings.”

ইছামতীর ধারে চাঁদের রাত দেখে এমন লেখা। বোধিও আবার হাঁটতে হাঁটতে ইছামতীর ধারে। আজকেও চাঁদের রাত।
- কাজ পরমা? আমি তো শুরুই করতে পারলাম না।
- বোধি, আবার সেই?
- আমি অন্ধ পরমা। রঙ আর বেরঙ না জেনে ছবি এঁকে চলেছি। সুর আর বেসুর না জেনে আনাড়ির মতন সেতার বাজিয়ে চলেছি। আমি বধির। আমার সন্ধ্যা হয়ে গেল যে পরমা। আমি তো শুরুই করতে পারলাম না।
ভারী ট্রাকের চাকায় ব্রীজটা দুলে উঠলো। শব্দগুলো হাওয়ায় হারিয়ে গেল, বোধির সাহিত্যের মতনই।


‘বাঁশ কাটিতে যেয়ে রূপাই মারল বাঁশে দা,
তল দিয়ে যায় কাদের মেয়ে—হলদে পাখির ছা!
বাঁশ কাটিতে বাঁশের আগায় লাগল বাঁশের বাড়ি,
চাষী মেয়ের দেখে তার প্রাণ বুঝি যায় ছাড়ি |
লম্বা বাঁশের লম্বা যে ফাঁপ, আগায় বসে টিয়া,
চাষীদের ওই সোনার মেয়ে কে করিবে বিয়া!
বাঁশ কাটিতে এসে রূপাই কাটল বুকের চাম,
বাঁশের গায়ে বসে রূপাই ভুলল নিজের কাম |
ওই মেয়ে ত তাদের গ্রামে বদনা-বিয়ের গানে,
নিয়েছিল প্রাণ কেড়ে তার চিকন সুরের দানে |
“খড়ি কুড়াও সোনার মেয়ে! শুকনো গাছের ডাল,
শুকনো আমার প্রাণ নিয়ে যাও, দিও আখার জ্বাল |
শুকনো খড়ি কুড়াও মেয়ে! কোমল হাতে লাগে,
তোমায় যারা পাঠায় বনে বোঝেনি কেন আগে?”
এমনিতর কত কথাই উঠে রূপার মনে,
লজ্জাতে সে হয় যে রঙিন পাছে বা কেউ শোনে |
মেয়েটিও ডাগর চোখে চেয়ে তাহার পানে,
কি কথা সে ভাবল মনে সেই জানে তার মানে!
এমন সময় পিছন হতে তাহার মায়ে ডাকে,
“ওলো সাজু! আয় দেখি তোর নথ বেঁধে দেই নাকে!
ওমা! ও কে বেগান মানুষ বসে বাঁশের ঝাড়ে!”
মাথায় দিয়ে ঘোমটা টানি দেখছে বারে বারে |’
—নকশী কাঁথার মাঠ (জসিমুদ্দিন)
রুটিটা ঝেড়ে নিচ্ছিল বোধি। খাবার আগে রুটিতে একটু জল ছিটিয়ে নিয়ে গরম করিয়ে নেবে। হোটেলের চৌকিদারের ঘরে একটা স্টোভ আছে। সেই স্টোভ-এই গরম হবে। আজ রাতে এখানেই থাকবে। কাল সকালে ফিরবে বাংলোতে। ততক্ষণ চা ইত্যাদির জন্যেও ওই স্টোভই ভরসা। হোটেলে আলাদা করে রান্না হয় না। বাইরে থেকে আনাতে হয় খাবার। এই রুটিটাও বাইরে থেকে আনা। রুটিটা ঝাড়তে ঝাড়তে দেখছিল সামনের মহিলার নাকে একটা নথ আছে। রূপোরই হবে বোধহয়। নথ নিয়ে বোধির একটা টান আছে। কোথা থেকে এল তা সে বলতে পারবে না। তার মা জীবনে কখনো নথ পরেনি। দুর্গার নাকে একটা নথ ঝোলে দেখেছে ছোটবেলা থেকেই। পরমা নাকে নথ পড়ে না। পরমা কোনো গয়নাই পড়ে না তেমন। খুব কিছু হলে একটা ছোট্ট দুল কানে, ব্যাস্‌। অনুজা পড়তো। অনুজার থেকেই কি? কে জানে? নথটা চোখে পড়তেই তার জসিমুদ্দিনের কথা মনে পড়লো। লাইনগুলো মনে পড়লো। কম বয়সে যখন সিনেমা নিয়ে খুব একটা হুল্লোড় ছিল জীবনে তখন একবার সঙ্গোপনে হলেও ভেবেছিল ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ -টা সিনেমা করতে পারলে খুব ভাল হয়। কাব্যটার একাংশ সুরে গাওয়া হতে থাকবে। সিনেমাটার মধ্যে থাকবে কথকদের দল। তারা গাইবে, আর তাদের গানের মধ্যে মধ্যে ঘটে যাবে সাজু আর রূপাই-এর গল্পটা। গোটা সিনেমাটা জুড়ে থাকবে পল্লীবাংলা। তার মাঠ-ঘাট-ক্ষেত-বাঁশবন। সে সব কল্পনায় বেশ মজা ছিল। কিন্তু ওই অবধিই। নকশী কাঁথার মাঠ নিয়ে কয়েকবার বসেওছে। তারপরে থেমে গিয়েছে। তার কাজ না এটা। কি জানে সে গ্রামের? পল্লীবাংলার?
- খান এবারে।
- হুম?
- বলছি এবারে খান। খেতে শুরু করুন।
গরম করে নিয়ে এসেছেন রুটিটা মহিলা। বোধি অন্য সময় হলে নিজেই খেতে বসে যেত। রুটি ঝাড়া-টাড়া সে জানতোই না। খেতে বসে খাবারগুলোর দিকে চেয়ে তার মনে হল তার খুব অ্যাসিড হবে আজ। তাই সবই সরিয়ে দিচ্ছিল, শুধুমাত্র একটা তরকারী রেখে। মহিলা ওকে জিজ্ঞেস করেন কেন সরাচ্ছে। শুনে, বলেন রুটিটাকে ঝেড়ে নিলেই হবে। তারপরে জল দিয়ে আবার একটু গরম করলে আর অসুবিধা হবে না। বা যদি এক-দু দিন অসুবিধা হয়ও, পরে আর হবে না। নিজেই এখন করে এনে দিলেন। বোধি কথা না বাড়িয়ে খেতে শুরু করলো। মহিলা আর সুমঙ্গলও ভাত খাচ্ছে। ক্লান্ত হয়ে আছে বোধি। রাতে আর কথা বলতে ইচ্ছে করছে না তার। খেতে খেতেই বুঝতে পারছিল শরীরের মধ্যে কোথাও একটা ক্লান্তির বিষ্ফোরণ হয়েছে। বিভূতিভূষণের বাড়ি যাবে আরেকবার। পারলে কালই যাবে।

বন্ধুর বাড়ি আমার বাড়ি
‘বন্ধুর বাড়ি আমার বাড়ি মধ্যে ক্ষীর নদী,/উইড়া যাওয়ার সাধ ছিল, পাঙ্খা দেয় নাই বিধি’।
জসীমুদ্দিন ‘নকশীকাঁথার মাঠ’-এর শুরুতে লিখেছিলেন। ক্ষীর নদীর কথা। আব্বাসউদ্দিনের গলাটা ভেসে আসে গানটায়। কিন্তু লাইনটা যেন অন্য ছিল।
বন্ধুর বাড়ি আমার বাড়ি মধ্যে ক্ষীর নদী
সেই নদীকেই পাইলাম আমি অকূল জলধিরে বন্ধু…
এমনই কিছু ছিল যেন। এখন আর মনে পড়েনা বোধির। বিভূতিভূষণের বাড়ির রাস্তায় বাইক চালাতে চালাতে তার গানটা মনে হচ্ছিল খুব। সেও তো পেরোতে পারছেনা কোনো নদীই। চাকলার দিকের রাস্তাটা ধরে যাচ্ছিল সে। একটু পরেই বিভূতিভূষণের ‘ইছামতী’-কে দেখবে সে। ভেতরটা থেকে কালকের ক্লান্তি যেন ঝরে পড়ছিল, উড়ে যাচ্ছিল পথের ধুলোর মতন। সে যেখানে উঠেছে সেখানেও ইছামতী আছে, কিন্তু সে ইছামতী বিভূতিভূষণের নয়। সামরিক পদ্ধতিতে তৈরী রেলব্রীজের বাঁধনে বাঁধা। নদীটিকে যেন নাচতে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে আসরে, পায়ে ঘুঙুরের বোঝা চাপিয়ে। অনিচ্ছুক নদী কি শ্যামার মতন, খঞ্জনার মত বা ফিঙের মতন নাচতে পারে? পারে কি গাইতে দোয়েলের মতন? হেমাঙ্গ বিশ্বাসের অভিযোগ ছিল নাকি যে নির্মলেন্দু পল্লীর গানকে শহুরে করে দিয়েছেন আসরে গাওয়ার জন্য। দেবব্রত বিশ্বাস বকতেন হেমাঙ্গকে এই অভিযোগ করলে। বলতেন আসরে আসরে গেয়ে খেতে গেলে তাই করা ছাড়া উপায় নেই। আব্বাসউদ্দিন কিন্তু রেকর্ডেও যন্ত্রানুসঙ্গ রচনায় গানকে ধ্বস্ত করেননি শ্রোতার চাহিদা মাথায় রেখে। জসীমুদ্দিন কবিতা প্রকাশের জন্য ‘নকশী কাঁথার মাঠ’-কে ঢেলে নেননি নদীয়ার বাংলা ভাষায়। তৎসম, তদ্ভব-তে ভরিয়ে দেন নি কাব্যের শরীর।
জসীমুদ্দিন আর আব্বাসউদ্দিনের মধ্যেকার সম্পর্কটাও বেশ মজার ছিল। নদীতে মজা দুটো লোক একে অন্যের গভীরতায় স্নান করে যাচ্ছিল। জসীমুদ্দিন ‘স্মৃতির পট’ এ লিখছেন দুজনের সম্পর্কের কথা। কড়েয়া রোড-এ কবি গোলাম মোস্তাফা আর আব্বাসউদ্দিন থাকতেন একসঙ্গে বাড়ি ভাড়া করে। জসীমুদ্দিন মাঝেসাঝেই এসে পড়তেন সেখানে। আব্বাসকে পল্লীগান শেখাতে শুরু করলেন জসীমুদ্দিন। তাঁর সংগ্রহে অসংখ্য গান। আর আব্বাসউদ্দিন নজরুলের থেকে পলকের মধ্যে গান তুলে নিয়ে অবাক করে দেন নজরুলকেও। জসীমুদ্দিন গান শেখান, কিন্তু আব্বাস শেখেন না কিছুতেই। বিরক্ত হয়ে যাচ্ছিলেন জসীমুদ্দিন। তিনি খেটেখুটে গান সংগ্রহ করে নিয়ে আসেন গ্রাম-গ্রামান্তর থেকে। কিন্তু হতাশ করেন আব্বাস। এমনই এক দিনে জসীমুদ্দিন উঠে চলে গিয়েছেন স্নান করতে। স্নান করতে করতে গুণগুণ করছেন একটি সদ্য সংগৃহিত গান। হঠাৎ দরজায় জোর টোকা। স্নান অর্ধসমাপ্ত অবস্থাতেই দরজা খুলে দেখলেন আব্বাসউদ্দিন। সঙ্গে সঙ্গেই আব্বাস গানটা লিখে নেবেন বলে কাগজ-কলম নিয়ে তৈরী। গান লিখলেন। তারপরে তুলে নিলেন সুর প্রায় নিমেষেই। গানটা হল ‘ও রঙ্গিলা নায়ের মাঝি’। গান তোলা হয়ে গেলে জসীমুদ্দিন দিলেন আব্বাসের গায়ে জল ঢেলে। আব্বাসও কম যান না। তিনিও পালটা জল ঢালতে শুরু করলেন জসীমুদ্দিনের গায়ে। উপস্থিত সকলে মজা পেলেন বিস্তর দুই প্রতিভাধরের শিশুসুলভ কান্ড দেখে। আব্বাসের পছন্দ হচ্ছিল না বলে গান তুলছিলেন না তিনি। আর যেই না পছন্দ হল…। এই দুই-এ মিলে যে কটা গান দিয়েছেন বাংলাকে তা তুলনাহীন। ‘নদীর কূল নাই’ থেকে ‘আমার হাড় কালা’ সব জসীমুদ্দিনের লেখা। পল্লীকবি আর পল্লীগীতি গায়ক দূরের বাংলাকে শহরের ঘরে দিলেন পৌঁছে প্রবল প্রতাপে।পৌঁছে দিলেন নদীকে।
নদী খেয়েছিল বিভূতিভূষণকেও বোধহয়। শেষ লেখা ‘ইছামতী’। কিন্তু ভাবনাটা এসেছিল ইছামতী থেকে অনেকদূরে বসেই। কালবালিয়ার জলে ডুব দিতে দিতে ইছামতী ভেসে উঠেছিল তাঁর মনে। শ্যামল দুই তীরে ছোট ছোট গ্রাম, জেলেদের জাল, শিশুদের খেলা, মায়েদের পরিতৃপ্ত মুখ সব ভেসে উঠেছিল। ডায়ারীর পাতায় লিখে রেখেছিলেন সেই সব কথা। সেইখান থেকেই ইছামতীর জন্ম। কয়েকশো বছর ধরে গ্রামবাংলার প্রত্যন্ত প্রান্তের মানবজীবনের মধ্যে দিয়েই বয়ে চলেছে ইছামতী। জন্ম-মৃত্যু, শোক-সুখের আবর্তনের মধ্যে দিয়েই বয়ে চলেছিল। এই নদীর পারে একদিন নীলের দাদন নিয়ে এসেছিল ইংরেজ। শিপটন সাহেবের তেজী ঘোড়াকে রাস্তা ছেড়ে দিয়ে পান বিক্রেতা নালু পাল ধানক্ষেতের মধ্যে লুকিয়ে পড়তো। এমনই হয় তো চিরকাল। তিরিশ বছরের তিলু চাঁদের আলোয় ভিজতে ভিজতে পঞ্চাশ বছরের ভবানীবাবুর কোলে গলে যায় চাঁদ রাতে। ভবানী তার নদীয়ায় শান লাগানো বাংলা নিয়ে যশোরের তিলুর মফস্বলী বাংলায় মজা পায়। বিভূতিভূষণ বিহারের পাহাড়ে পাওয়া শিলালিপি নিয়েও লিখেছিলেন এককালে ছদ্মনামে। ভাষা সম্পর্কে গভীর আগ্রহ তাঁর ছিল। তাই সহজেই এই বাংলার বিভিন্ন বচনের ধরণকে ধরেছেন এবং এনেছেন লেখায়। এইভাবে ছড়িয়ে যেতে থাকে আখ্যান। খুঁটিতে নাটিতে। একদিন সে আখ্যান নালু পালের হাতে সেই শিপটন সাহেবের নীলের কুঠি বন্ধকে চলে আসে। খুব সহজ করেই চলে আসে। আলাদা করে কোনো বিরাট ধর্মযুদ্ধ করতে হয় না বিভূতিভূষণকে। তাঁর সময়ের অন্য অনেকের মতন আলাদা করে ঘোষণা করতে হয় না সমাজমনস্কতা সোচ্চারে। ইছামতী পড়তে পড়তে অনেকবারই সেই সময়ের বিরোধগুলো খুব মনে পড়ে বোধির। একদিকে কম্যুনিজমের প্রভাব। অন্য দিকে এলিয়ট আক্রান্ত বাংলা সাহিত্য। ক্ষয়িষ্ণুতার বিবরণ, যৌনতার সোচ্চার উপস্থিতি। রবীন্দ্রনাথ পুরাতন বলে ধিক্কৃত হতে হতে ‘শেষের কবিতা’-য় নতুন হয়ে দাঁড়ালেন। অনেক আগে তাঁর বিরুদ্ধেও একদা ঘনিষ্ঠ বন্ধু দ্বিজেন্দ্রলাল রায় অভিযোগ এনেছিলেন যৌনতার ছড়াছড়ির। বিশেষ করে পরকীয়ার অভিযোগ ছিল তাঁর গানকে কেন্দ্র করে। তখন ছিল রবিবাবুর গান। দ্বিজেন্দ্রলাল গত হয়েছেন রবীন্দ্রনাথকে চিঠি লেখা অসম্পূর্ণ রেখেই। রবীন্দ্রনাথ ক্রমশ অবশিষ্ট বিশ্বের দরবারে ভারতীয়ত্বের পরিচয় হয়ে গিয়েছেন। কালি-কলম, প্রগতি বিবিধ রাস্তায় বুদ্ধদেব, প্রেমেন্দ্র, অচিন্ত্য, বিষ্ণু কি সমর সেনরা রয়ে যাচ্ছেন ক্ষয়িষ্ণুতা, যৌনতা এবং মতাদর্শগত বিতর্কে। এর ফাঁকেই দাঁড়িয়ে ছিলেন বিভূতিভূষণ। আলাদা করে কোনো অভিযোগ ওঠেনি এ সব নিয়ে তাঁর ক্ষেত্রে। অথচ এই ইছামতীতেই শিপটন সাহেবের রক্ষিতা গয়া মেম থেকে পাড়ার সেই বৌ-টি যে গয়নার লোভে আর শ্বশুরবাড়ির অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে অন্য পুরুষের সঙ্গে বাঁশবনে যায় সবই রয়েছে। কিন্তু সবটাই এত স্বাভাবিকভাবে, এত স্বচ্ছন্দ চলনে, যে নীলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের কথার মতই সে কখনো জীবনের প্রবহমান স্রোত ছাড়িয়ে একাকী উঠে দাঁড়ায়নি। তাছাড়া ছিল তাঁর জীবনযাপন। শহুরে খুব একটা নয়। অনুচ্চকিত এক যাপন। মীর্জাপুর স্ট্রীটের চৌহদ্দিতেই তাঁর বসবাস আর চলাচল থেকে গিয়েছে আজীবন, যতকাল কলকাতায় থেকেছেন বা এসেছেন। অথচ ইনি-ই আবার কলকাতার সীমান্ত পেরিয়ে সুদূরের পিয়াসী। ঘুরে-বেড়াতে তাঁর ক্লান্তি ছিল না। কলকাতা-ব্যারাকপুর-ঘাটশিলার ফাঁকে ফাঁকেই লিখেছেন, লেখার পরিকল্পনা করেছেন।
‘মাসিক বিচিত্রা’-য় বেরোতে শুরু করে তাঁর ‘পথের পাঁচালী’। আষাঢ় ১৩৩৫ থেকে আশ্বিন ১৩৩৬ অবধি চলেছিল ধারাবাহিক। রবীন্দ্রনাথ-এর ‘শেষের কবিতা’ বই হবার পরপরই ১৯২৯-এ বই হয়ে এল ‘পথের পাঁচালি’। রবীন্দ্রনাথ ঠিক যতটাই স্বল্প ডিটেলে তাঁর চরিত্রগুলোকে তাঁর আখ্যানে এনেছেন এবং শহুরে এক সংকটকে ধরেছেন ততটাই স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে ‘পথের পাঁচালী’-তে এসেছে অনুপুঙ্খ ডিটেল এবং চরিত্ররা। যতটাই শহুরে থেকেছেন রবীন্দ্রনাথ উপস্থাপনায় ততটাই গ্রামীণ হয়েছেন বিভূতিভূষণ। কাব্য বিভুতিভূষণেও ছিল। ছিল কল্পনা এবং দেশজ সীমানার গন্ডিকে সহজেই ছাড়িয়ে যাওয়ার ক্ষমতা। এও বোধহয় সেই নদীর প্রবহমানতা। পথের পাঁচালি-তে অপু যেমন ইছামতীর ধারে এসেই আবহমানকে দেখতে পায়। এক চরকের দিনে চলে গিয়েছিল নিশ্চিন্দিপুর ছেড়ে, আরেক চরকে ফিরে আসে কাজলকে নিয়ে চব্বিশ বছরের পর। চরকের আবর্তনে যখন মানুষ নিজেকে বিদ্ধ করে ঘুরছে বাঁশের আগায়, তখন ইছামতীর ধারে অপু ভাবছে তার না জানা অন্য সব জন্মের কথা। অপুর জন্মান্তরের ভাবনা আছে। সেই ভাবনাতে তার এসে দাঁড়াচ্ছে ইজিপ্ট। সূর্যধোয়া নীল নদের ধারে গরীব এক পরিবারে দু-হাজার বছর আগে হয়তো তার জন্ম হয়েছিল। গ্রামের চারপাশে ছিল রীড আর প্যাপিরাসের জঙ্গল। আবার মধ্যযুগে রাইনের ধারে ধনাঢ্য ক্যাসল-এ সুন্দরী পরিবেষ্টিত অন্য এক জন্ম ছিল হয়তো তার। হাজার বছর পরে আবার জন্ম হবে হয়তো, নিশ্চিন্দিপুর আর মনে থাকবেনা তার। এইভাবে বিভুতির অপুর মননে ইছামতী, নীল আর রাইন একাকার হয়ে খেলা করতে থাকে। নদীমাতৃক সভ্যতার নদীচেতনা আচ্ছন্ন করে থাকে তাঁকে। সেই নদীকে দেখবে আজ বোধি। বিভুতিভূষণের চৈতন্যের নদীকে দেখবে।
বাইকটা রেখে বাড়িটার সামনে দাঁড়াল যখন তখন তার সবটা আচ্ছন্ন হয়ে ছিল। এখনো বাড়িটার আশেপাশে গাছ আর গাছ। এখনো রাস্তাটা লাল ইঁটের। একবার গুজব উঠেছিল জোর বিভুতিভূষণ নোবেল পেতে পারেন। কিন্তু তেমন অনুবাদ আর ছিল কই তখন? প্রমথ চৌধুরী নাকি ইতালিয়ানে অনুবাদ করার কথা ভেবেছিলেন। সুনীতি চট্টোপাধ্যায় ইংরেজী করার কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু হয়নি কিছুই। তবে ১৯৪৩-এই লন্ডনে স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড অ্যাফ্রিকান স্টাডিজ-এ বিভুতিভূষণের কথা উঠেছিল। এডোয়ার্ড থম্পসন, কলকাতার অ্যালবার্ট হল-এ যে মুগ্ধতা নিয়ে ‘পথের পাঁচালি’-র অবিমিশ্র প্রশংসা করেছিলেন এবং বিশ্বের দরবারে এর মাহাত্ম্যের উপস্থাপনের কথা বলেছিলেন, সেই মুগ্ধতা নিয়েই সেদিনও ছিলেন সেখানে। বক্তৃতা করেছিলেন শিশিরকুমার মুখোপাধ্যায়। তবুও, তারপরেও, সত্যজিৎ রায়-এর সিনেমাটা না হলে এভাবে চেনা যেত না বোধহয় বিভুতিভূষণকে।
লাল ইঁটের সরু রাস্তাটা দিয়ে বাইক চালাতে চালাতে সে ভাবছিল যদি কেউ দেখতে আসেন বাড়িটা বর্ষাকালে তাহলে কি দশা হবে তাঁর? কয়েকদিন আগে মাত্র সংস্কার হল বাড়িটার। ঢোকার মুখের বসার ঘরটা, যেটা মফস্বল শহরের বারান্দার মতনই ঘেরা গ্রীল দিয়ে সেখানে একটা বোর্ড রাখা। তাতে লেখা সেখানে থাকা আরামকেদারায় বসে বিভুতিভূষণ কি অমর সৃষ্টি করেছিলেন তার নাম। কিন্তু সবচেয়ে অবাক করার মতন কান্ড হল আরাম কেদারাটাই নেই। বোধি বাড়িতে যখন লেখে তখন একটা আরাম কেদারায় বসেই লেখে। কম্পিউটারে লেখে সে। কিন্তু আরামকেদারাটায় তার ভাল লাগে বসতে। তার মনে হচ্ছিল সে চলে গেলে তার আরামকেদারাটাও চলে যাবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বিভুতিভূষণ চলে গেলে তার আরামকেদারার মূল্য বেড়ে যাওয়া উচিত ছিল। বাংলা সাহিত্যে অমন আরেকটি লেখকও নেই যে! কিন্তু কোথায় কি, ভেতরের ঘরে ঢুকে আরো চমক। এক ঘরে একটা খাট। তাতে বসে বিভুতিভূষণের এক আত্মীয়া। তিনিই বাড়ির দেখভাল করেন। বাইরের বারান্দায় বসে থাকা গামছা পড়া মধ্যবয়স্ক লোকটা ক্রমাগতই মোবাইল-এ কথা বলে চলেছে। আর ইনি, কত কষ্টে সাংবাদিকদের ধরে ধরে বাড়িটা নিয়ে লিখিয়েছেন তার কথা বলে চলেছেন। তাই না মাথার ছাতটা পাকা হয়েছে। অথচ বোধি জানে কবি বিভাস রায়চৌধুরী এবং তাঁর কিছু বন্ধু-বান্ধব, যাঁরাও কবি বা লেখক তাঁরা দীর্ঘ্যকাল ধরে লড়ে গিয়েছেন এই বাড়িটার সংস্কারের জন্য। ঘরের ছাত এবং দেওয়ালের সদ্য করা গোলাপি রং-এর দিকে চোখ বোলাতে বোলাতেই শুনছিল সে। দূরদর্শন থেকে এসেছিল তথ্যচিত্র বানানোর কাজে। সেখান থেকে মহিলা চলে গেলেন তিনি রাম ঠাকুরের ভাই-এর ঘরের বৌ না কি যেন, এই সবে। সত্যি, বিভুতিভূষণের বাড়িতে এমনই মানায় বোধহয়। এটাই যদি অন্য দেশ হত, অন্য কোনো জাতি হত, তাহলে এই বাড়িকেই এমন এক সংগ্রহশালা করে তুলতো দেখে তাক লেগে যেত। গবেষক থেকে দর্শক সকলের জন্য ব্যবস্থা থাকতো তেমন। বাড়ির বারান্দাতে এসেই দেখতে হত না এক মধ্যবয়স্ক খালি গায়ে ভুঁড়ি উথলে, গামছা পরে মোবাইলে বকে চলেছেন। বা এ মহিলা কত করিতকর্মা এসব শুনতে হত না। সবশেষে পাশের ঘরটিতে, যেখানে বেশীরভাগ লেখালিখি করতেন লেখক সেখানে বেশ কিছু খারাপ মানের বিভুতিভূষণ আর তারাদাসের পোট্রেট এবং লেখকের বিভিন্ন বই-এর সম্পর্কে দেওয়াল ভর্তি কিছু হাতে কুৎসিত আঁকা সস্তা কার্ডবোর্ড দেখতে হত না। কিন্তু এমনই তার দেশ বোধি জানে। রবীন্দ্রনাথ ছাড়া তেমন করে কোন্‌ লেখক বা শিল্পীর জীবনের বা কাজের সংরক্ষণ হল? তাও নেহাত নোবেল পেয়েছিলেন আর শান্তিনিকেতন-শ্রীনিকেতন নিজের কষ্টে গড়ে গেছিলেন বলে, নইলে তাও হত কিনা যথেষ্ট সন্দেহ আছে তার। সারাজীবন যে মানুষটা দেশ গড়বেন বলে এত কষ্ট করলেন, তাঁর জোড়াসাঁকোর বাড়ি থেকে তাঁরই নামাঙ্কিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিল্পশিক্ষার কেন্দ্র তুলে নিয়ে যাওয়া হল কোথায়, না বি টি রোডে। অন্য হাজার শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া হল একে। কি কারণে? জোড়াসাঁকোর ভিতরের যে পরিবেশ তা কোথায় বি টি রোডে? কোথায় রবীন্দ্রনাথ? যে বাড়ির প্রতিটি ধুলিকণায় মানুষটার স্মৃতি জড়িয়ে আছে সেই বাড়ির থেকে জীবন্ত শিল্পচর্চাকেন্দ্র আর কোথায় হতে পারে?
লাভ নেই এসব ভেবে বোধি জানে। এই যে সে এখানে এসেছে, কদিন আগেই এখান থেকে ঘুরে গিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এঁরা সব। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত হবে পেট্রাপোল। তার জন্যেই এঁদের আসা। অনেক অনেক বাণিজ্য হবে এখান দিয়ে। বহুকাল ধরেই পরিকল্পনা চলছে এ নিয়ে। ভারত-বাংলাদেশ-নেপাল-ভূটান-পাকিস্তান-আফঘানিস্তান-শ্রীলঙ্কা-মায়ানমার সব মিলিয়েই এক বিপুল বাণিজ্য অঞ্চল গড়ে উঠবে। অনেকটা ইউরোপীয় ইউনিয়নের ধাঁচে। বহুকাল ধরেই এই অঞ্চলের বিপুল জনসংখ্যার দিকে সকলের চোখ আছে। বোধির মনে পড়লো এই বছরের জুলাই মাসেই তাকে এমন একটি সার্ক অধিবেশনের খবর করতে হয়েছিল। আনিসুল হক, সার্কের চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির (সি সি আই) প্রেসিডেন্ট, সার্ক সি সি আই আর ফেডারেশন অব চেম্বার্স অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিস অফ শ্রীলঙ্কা (এফ সি সি আই এস এল)-এর যৌথ উদ্যোগের একটা সেমিনারে বক্তব্য রাখছিলেন। বলছিলেন ২০১০-২০২০ কে ‘আঞ্চলিক যোগাযোগের দশক’ বানানোর কথা। সার্কভুক্ত দেশগুলোর ব্যবসায়ী সংস্থাদের অভিযোগ আছে দেশগুলোর পরিকাঠামো নিয়ে। পারস্পরিক অবিশ্বাস-সন্দেহ এসব নিয়েই আসিয়ান (ASEAN) ভুক্ত দেশগুলোর মতন হতে পারছে না সার্ক। এসব বদলাতে হবে। এ নিয়ে তিনি দশটি অ্যাজেন্ডা দিয়েছিলেন। মনে আছে সেগুলো বোধির। নোটেও আছে।
1) The implementation of transit trade on a reciprocal basis under GATT Article V and SAFTA provisions along with the finalisation of agreements regarding motor vehicles, railways and inland water transport and shipping.
(2) Strengthening of cross border infrastructure, money, finance, trade and investment. Huq stressed that the gradation of the Petropol-Benepole corridor, the development of Bagdogra Airport, the improvement of Wagha-Lahore rail links and the Colombo Port Expansion are key areas to benefit considerably from further infrastructure development.
(3) The standardisation of customs documents and procedures across the region.
(4) The provision of a green fast-track multi-modal transport channels and corridors to facilitate efficient regional supply chains.
(5) The improvement of sub-regional land and inland water connectivity to and from the north eastern part of the subcontinent.
(6) The implementation of transit trade agreements between Bangladesh and India, as well as Afghanistan, India and Pakistan.
(7) Jointly promoting the development of Afghanistan, Pakistan, India, Bangladesh and Myanmar (APIBM) transport corridor through the Asian highway and Trans-Asian railway.
(8) One open sky policy regime to be implemented.
(9) In addition to the suggested use of one SIM for all phones in South Asia
(10) One energy bank for South Asia.
সুতরাং পেট্রোপোল-বেনাপোল নিয়ে সরকারের মাথাব্যাথা বোঝাই যায়। সঙ্গে বোঝাই যায় তিস্তার জলবন্টন নিয়ে কেন এত মাথাব্যাথা। সবই শর্তের অঙ্গ তাই। যেখানে দেশের মাথারা বেনিয়া বা বেনিয়ার সাকরেদ হতে ব্যাস্ত সেখানে কে মাথা ঘামায় কৃষিজীবি গেরামের কথক বিভুতিভূষণ নিয়ে? সরকার পরিকাঠামো বানিয়ে দেবে আর সেই পরিকাঠামো ব্যবহার করবে ব্যবসায়ীরা। সরকার বানাবে মানে হল জনগণের করের টাকা এবং ধারের টাকা মিলিয়ে তৈরী হবে রাস্তা, ব্রীজ, রেলপথ এই সব। সেই সব রাস্তায় যেতে হলে টোল ট্যাক্স দিতে হবে। সেই ট্যাক্স সরকার সব পাবে না। পাবে বিভিন্ন বিদেশী সংস্থা। তারা রাস্তা বা ব্রীজ বানিয়ে দিয়েছে আসলে। আবার সে রাস্তা দিয়ে তারাই করবে ব্যবসা। কয়লা থেকে তেল সব আস্তে আস্তে চলে যাবে দেশী-বিদেশী পুঁজিপতিদের হাতে। তারাই সবের নিয়ন্তা। ইচ্ছে মতন দাম তারা বাড়াবে। ইচ্ছে মতন খনিজ সম্পদ তারা বিদেশে বিক্রি করবে, মানুষ হাঁ করে দেখবে শুধু বাবুদের কত্ত উঁচু বাড়ি, কি সব চকচকে গাড়ি!কার বাইশ তলা বাড়ি হবে যাতে সত্তর তলা ঢুকে যায়, কার ছেলে-মেয়ের বিয়ে হবে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল ভাড়া করে, সে সব তামাশায় তারা মত্ত থাকবে।
অন্ধকার থেকে যাবে দেশ এবং এই সব সীমান্ত অঞ্চল। বোধির খুব জানতে ইচ্ছে করে দেশভাগকে কি চোখে দেখেছিলেন বিভুতিভূষণ? ইছামতী যখন প্রকাশ হল তখন দেশভাগ হয়ে গিয়েছে। বাংলাদেশ তখনো না জন্মালেও পাকিস্তান আর ভারত দুটি আলাদা দেশ। তাঁর ইছামতীর নায়ক ভবানীবাবুর তিলু যে যশোরের ভাষায় কথা বলতো সেই যশোর তখন পূর্ব পাকিস্তানে। কেমন লেগেছিল বিভুতিভূষণের, তার খুব জানতে ইচ্ছে করে। জানতে ইচ্ছে করে ভবানীবাবুর সন্তানের জন্য এই খন্ডিত দেশ কেমন লাগতো তাঁর? একসময়, দেশভাগের আগে অবধি বনগাঁ ছিল যশোরের একটি মহকুমা। বিভুতিভূষন, যে বারাকপুর গ্রামে থেকেছেন তাও ছিল এই যশোরের। যশোরের ইতিহাস সমৃদ্ধির ইতিহাস। সেই সমৃদ্ধির মধ্যে থাকা বনগাঁ একসময় ছিল গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যের কেন্দ্র। এখনো পেট্রাপোল-বেনাপোল এশিয়ার বৃহত্তম স্থল-বন্দর। যেদিন দেশভাগ হল সেদিন, মানে ১৫ই অগাষ্ট-ও বনগাঁ ছিল পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভূক্ত। তারও দু দিন না তিনদিন পরে বনগাঁ আলাদা হল দুটি থানা নিয়ে। চলে এল ভারতের মধ্যে। অন্য দিকে থেকে গেল যশোর, কপোতাক্ষের পাশে মধুসূদনকে নিয়ে, আলাদা হয়ে গেল। যশোরের বার লাইব্রেরীর মোড়টা একসময় ছিল বনগাঁ মোড়। সেই মোড়ের দিন চলে গেল। নাম মুছে গেল ইতিহাস থেকে। নীলের বিদ্রোহ উঠে এসেছিল ইছামতীর পাতায়। এসেছিল ছোটলাটের গঙ্গাবক্ষে আগমন। সেই সব ওই নীলের আমলে। যশোরের বিষ্ণু বিশ্বাস, দিগম্বর বিশ্বাস যখন রুখে দাঁড়ানো চাষীদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তখনকার কথা। সেই যশোর যখন আলাদা হয়ে গেল কেমন লেগেছিল ইতিহাস সম্পৃক্ত বিভুতিভূষণের?
ভাবতে ভাবতে ফিরে আসে বোধি। বাংলোয় তার জন্য অপেক্ষা করছে একজন। সে তাকে নিয়ে যাবে আবার সীমান্তে। কালকের মহিলা যা বলে গিয়েছিলেন তার কিছু চাক্ষুস নমুনা দেখাতে। তাছাড়া দু-একটা বাচ্চার সঙ্গেও দেখা করাবে কথা আছে। বাচ্চাগুলো স্কুলে যাবার বদলে সীমান্ত পেরিয়ে চোরাচালানের কাজে যুক্ত থাকে। ধরা পড়ে গেলে গেল। খুব ভাল অফিসার হলে মাল কেড়ে নিয়ে ছেড়ে দেয়। দু একটা ক্ষেত্রে অফিসারেরা নিজেরা উদ্যোগ নিয়ে স্কুলে ভর্তি করিয়েছে বাচ্চাদের এমন নজীরও আছে। তারপরে তাদের পড়াশোনার খরচ দিয়েছে অন্তত বড় হওয়া অব্দি। কিন্তু সে খুবই ব্যাতিক্রমী ঘটনা। স্কুলে ভর্তি করা অব্দি যাবার ইচ্ছে বা উপায় সকলের থাকে না। আবার ভর্তি করালেও বাচ্চাগুলো স্কুলে থাকেনা বেশীদিন। তাদের পরিবারও থাকতে দেয় না। ঘরে ভাত নেই তো স্কুল! কাজেই স্কুল ছেড়ে আবার কাঁটাতার টপকানোর খেলা। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই শোনা যায় জওয়ান বা অফিসারেদের যৌন হেনস্থার শিকার হয় বাচ্চা ছেলেরাও। পায়ুকামের শিকার হয়। যৌন হিংসার শিকার হয়। বহু জওয়ান কাশ্মীর বা উত্তর-পূর্বে কিছুকাল পোস্টেড থাকার পরে আসে এখানে। তারা বহুক্ষেত্রেই অসম্ভব নির্মম হয়। হিংস্রও। আসলে ওই সব জায়গায় এমন পরিস্থিতি তৈরী হয়ে আছে যে মৃত্যু এদের নিত্যসঙ্গী। অথচ ঘোষিত কোনো যুদ্ধ চলছে না। শত্রুও শুধু বহিরাগত নয়। যে কোনো সময়েই, যে কোনো রাস্তার মোড়ে আচমকাই এসে দাঁড়াতে পারে করমর্দনের জন্য। কাজেই আশেপাশের মানুষকে অবিশ্বাস করা, তাদের ঘৃণা করা তেমন তেমন ক্ষেত্রে, এসব এদের পদ্ধতিতে চলে আসে। তাই কাশ্মীরে বা উত্তর-পূর্বে এত এত অভিযোগ ওঠে মানবাধিকার লঙ্ঘণের। কথায় কথায় গুলি চালিয়ে দেওয়া বা ধর্ষণ করা এদের কাছে জলভাত হয়ে যায়। যুগাতীত কাল ধরে যে কোনো সংগঠিত জহ্লাদ বাহিনী অত্যাচার করেই ভয় দেখায়। কোনো রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী কি পুলিশ বাহিনীর ম্যানুয়ালে সেই সন্ত্রাসের পদ্ধতি শেখানোর খুব ব্যাত্যয় হয় না। এদের বিরোধীরাও তেমনই। তারাও মনে করে সন্ত্রাস দিয়েই শুধুমাত্র কথা বলা যায় বা বলা উচিত। যে যাকে দখলকারী মনে করে সে নিজেকে ভাবে মুক্তিযোদ্ধা, আর দখলকারী যাকে মনে করছে সে তাকে পাল্টা মনে করেছে সন্ত্রাসবাদী। তার বা তার নিয়োগকর্তার সিদ্ধ অধিকারের পথে কাঁটা। যুদ্ধ ঘোষিত হোক কি অঘোষিত সে শুধু বর্বরই হয় তাই। এই মানসিকতায় যারা অভ্যস্ত হয়ে যায় তাদের মধ্যে কোথাও একটা স্যাডিজম কাজ করে। এই বাচ্চাদের তাদের হাতে ধরা পড়ার পরের অবস্থাটা সহজেই অনুমেয় তাই।
‘ইছামতী’-তে ভবানী বাঁড়ুজ্যের সন্তান, যাকে নিয়ে ভবানী এবং তিলু-বিলু-নীলুদের আবেগের শেষ নেই, তার শিশুমুখ মন কেড়েছে হলা পেকের মতন ডাকাতেরও। যে লোকটা কথায় কথায় মানুষ খুন করে, দলের লোক মরণাপন্ন হলে তাকে ব্যার্থ ডাকাতির পরে ফেলে আসার সময়ে এক কোপে তার মুন্ডু নামিয়ে দেয়, যাতে কেউ তাদের চিনতে না পারে, সেই হলা পেকে শিশুমুখের মায়ায় জগত ভুলে যায়। সোনার বালা নিয়ে আসে। এসে বলে এ তার অসৎ পথের টাকায় করা না, যাতে তিলু বা ভবানীবাবু তাকে এবারে আর প্রত্যাখ্যান না করে। বোধির মনে পড়ে যায় চরিত্রটা। বিভুতিভূষণ চেয়েছিলেন ‘ইছামতী’-র তিন খন্ড লিখতে। অতীত থেকে শুরু করে তার বর্তমান অবধি। ‘ইছামতী’ তাঁর মৃত্যুর পরে প্রকাশিত এবং তার শেষ উপন্যাস। বেঁচে থাকলে এবং ভাবনাটা সত্যি সত্যি থাকলে কি লিখতেন এই বাচ্চাদের নিয়ে কে জানে? এদের শৈশব চুরি হয়ে গ্যাছে, কৈশোর বেমালুম রংরুট। যৌবন অবধি টিকবে কিনা এরা কে জানে! শুধুমাত্র একটা দেশকে কয়েকটা লোক টেবিলে বসে একটা লাইন টেনে ভাগ করে দিল বলে এরা সকলে প্রতিদিন কাঁটাতারের বেড়া পেরোয় বা পেরোতে চায়। পেরোতে গিয়ে অনেক সময়েই জীবন-মৃত্যুর সীমানাও পেরিয়ে যায়। সহজেই। একটা বুলেট, ব্যাস। কেউ খবর জানবে না, কেউ খোঁজ নেবে না। বাড়ীর লোক থানায় এমনকি একটা মিসিং ডায়ারীও করবে না। বোধির মনে হয়, ওই অত্যাচারী জওয়ানরা না, আসলে বর্বর তারা যারা এদের চালায়।
ফেরার পথে বাইকটা একবার দাঁড় করিয়েছিল বোধি। রাস্তার ধারের একটা চায়ের দোকানে দাঁড়িয়েছিল। সুতনুকার এস এম এস এসেছে। খুব তীব্র একটা অভিমানভরা লেখা। অসুস্থ বোধির বেরিয়ে আসাটা তার ভাল লাগেনি। আর-ও ভাল লাগেনি বোধির বেরিয়ে আসার সময়ের কাজটা। বোধি সুতনুকাকে লিখেছিল সুতনুকার মন অন্য কোথাও গিয়েছে। অন্য কারোর প্রতি। তাই সে সময় দিতে চায়না বোধিকে আর। একদিন সুতনুকাই তাকে ডেকে এনেছিল এই সম্পর্কে। নাছোড়বান্দার মতন টেনেছিল বোধিকে। আজ যখন বোধি নিজের সবটা দিয়ে বসেছে তখন তার মনে হল এভাবে সম্ভব না চলা। অথচ পরমার কথা শুরু থেকেই জানতো। জানতো পরমা বোধির জীবনের অংশ। কখনো পরমাকে ছেড়ে বেরোনো সম্ভব না তার পক্ষে। যত যাই হোক না কেন, পরমাকে সে ভালবাসে। এবং তা অমূল্য। আসলে সবটাই খেলা ছিল সুতনুকার। তাই আজ পরমার দোহাই দিয়ে চলে যাবার সুযোগ খুঁজছে। কিন্তু কেন? এই খেলাটা না খেললেই হত না?
বোধিও জানে সে সব ঠিক লিখছে না। কিন্তু এ ছাড়া রাস্তা ছিল না তার। সুতনুকা কষ্ট পাবে আরো এভাবে তার সঙ্গে থাকলে। তাদের পৃথিবী আলাদা আলাদা। এই সুতনুকা কোনোদিন তার সঙ্গে থাকার জন্য ভয়ঙ্কর ঝড়-ঝাপটা সামলাবে না। সামলাতে পারবে না। তার জীবন অনেকের অনেক কিছুর উপর নির্ভরশীল। বোধির মতন নয়। বোধির জীবন তার নিজের হাতে অনেকটা। সে কারোর দিকে চেয়ে নেই। সেটা পরমাও জানে। জানে বলেই বোধির স্বাধীনতার মধ্যে কোনোদিন এসে দাঁড়ায়নি। এমনকি পরমা যখন জেনেছে সুতনুকার কথা তখনো না। পরমার এই গোটা রাস্তাটা হেঁটে আসা খুব সহজ পথ ছিল না। সুতনুকা এই কষ্টটা নিতে চাইবে না। বরং সুতনুকা এই কষ্টটা এড়াতে গিয়ে আরো ভুলভুলাইয়ার মধ্যে ঢুকে যেতে পারে। তাছাড়া তার জীবনের সুতোটা তার নিজের হাতেই নেই। আছে অন্যদের হাতে। এটা পরমার ছিল না কখনো। তাছাড়া পরমা বোঝে মানুষের বহু মন। বোঝে বোধিকে। বোধির ভালবাসার ধরণকে। তা বলে কি কখনো কষ্ট পায় নি পরমা? পেয়েছে। সুতনুকার কথা যখন প্রথম শুনলো বোধির কাছে তখন কষ্ট পেয়েছে। ভেবেছে সে সুতনুকা আর বোধির মাঝে আড়াল হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সুতনুকাকে বোধি ভালবাসে আর তার জন্যই পারছে না সুতনুকাকে কাছে ডাকতে। বোধি তার ভুল ভেঙ্গেছে। যদি ভালবাসার মানে শুধু দখল হয়, শুধু দাগ দিয়ে দেওয়া সম্পর্ক হয় তাহলে সে সম্পর্কে বোধির কোনো আস্থা নেই। ভালবাসা মানুষকে বড় করার বদলে ক্রমশ ছোট আর গন্ডীবদ্ধ করে চলেছে। হাজার হাজার বছর ধরে। বোধিও যেদিন পরমাকে প্রথমবার হারিয়েছিল, পরমা যখন চলে গেছিল দিল্লীতে তখন অসম্ভব কষ্ট পেয়েছিল। কিন্তু তার জন্য অন্য কাউকে চলে যেতে বলেনি। বোধি জানতো তার মন ক্রমশ পরমার দিকে যাচ্ছে। তাও কোনোদিন অন্যকে সরিয়ে যায়গা নেবার কথা ভাবে নি। যতটুকু ছোঁয়া থাকতো পরমার ততটুকুতেই নিজেকে ভরাতো। সে কাউকে কেড়ে নেওয়ার খেলায় যেতে ইচ্ছুক ছিল না। সে খেলায় গেলে আর তার সম্পর্কের দখল নিয়ে প্রশ্ন তোলার মানে কি? পারলে সকলকে নিয়ে বাঁচাই ভাল। কিন্তু তা হয়নি। তারা দুজনেই কষ্ট পেয়েছে। কষ্ট দিয়েই দুজন দুজনকে বুঝেছে, ভালবেসেছে। সঙ্গ নিয়েছে পরস্পরের। পরমার জীবন পরমারই হাতে ছিল বলে দুজন সমান স্বাধীন মানুষের মধ্যে কথা হতে পেরেছিল। বোঝাবুঝি হতে পেরেছিল। সুতনুকার সঙ্গে সেই কথা বলতে চাইলেও সুতনুকা এড়িয়ে যায়। বা গিয়েছে বলাই ভাল। অথচ এমন না যে সুতনুকার মতন যে আসবে তারই জন্য বোধি এমন করে দরজা খুলে দাঁড়াবে। সুতনুকা, সুতনুকার জীবন সবই টেনেছে বোধিকে। টেনেছে সুতনুকার মধ্যেকার অসহায় মানুষটি। কিন্তু এমন করে হাজারো সম্পর্কে সে জড়িয়ে যেতে পারে না একথা সেও জানে। তাই সুতনুকাতেই সে থেমে যাবে। কিন্তু সুতনুকার বিশ্বাস হয়নি এই সব। তার মনে হয়েছে বোধি এভাবেই চলবে। আজ সুতনুকা যেমন করে এসেছে তেমন করে কাল অন্য কেউ আবার আসবে। পরমা থাকতেও সুতনুকা যখন আসতে পেরেছে তাহলে কাল কেন অন্য কেউ পারবে না? একদিক দিয়ে অঙ্কটা সঠিক। কিন্তু জীবনতো অঙ্ক নয়। সুতনুকা এমন করে এসে পড়বে তা সে ভাবেনি। এসে পড়েছে যখন তখন কেড়ে নিয়েছে তার মন। সেই মন কি দাওয়াতখানা, যে সকলের জন্য আমন্ত্রণ বিছানো থাকবে? সুতনুকা আসবে বোধি জানতো না। পরমা এসেছিল। পরমাকে ভালবেসেও সুতনুকাকে ভালবাসা তার অকুলান হয়নি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে সারাজীবন এমন করেই চলবে সে। এই দুটি মানুষকে সব দিতে দিতেই তার জীবন শেষ হয়ে যাবে বোধি জানে। আর অন্য দেওয়ার কথা সে ভাবতেও পারে না। কিন্তু যুক্তি তো তা বলে না। বলে একে একে দুই।
ইম্পালস এবং ইন্ট্‌লেক্ট-কে একসঙ্গে বাঁধা যায় কি? যায়নি এতদিন। গেলে বোঝা যেত যে শুধু কোনো একটাই জীবনের সব না। দুটোকে মাপমতন মেশাতে পারলে জীবন স্বার্থক। স্বপ্ন স্বার্থক। বোধি জানে। সুতনুকা জানে না। সে যে অঙ্ক কষছে তা বোধির না। বোধি এবারে থামতে চায়। পারলে সে সুতনুকাকে উপেক্ষা করেই থামতো। শুধুমাত্র এই নরনারীর সম্পর্ক ছাড়াও অনেক কিছুই আছে জীবনে। সেই সব কাজে থাকতে চায়। এই দুটি মানুষকে নিয়েই তার ছোট্ট বিশ্বটা সাজাতে চায়। কিন্তু হবে না। সুতনুকার মগজে রয়েছে অন্য বাসনা। সেখানে ভাগ বা ভাগীদারের জায়গা নেই। তাকে ভুল বলাও যায় না। এমনই রীতি জগতের। তাকে মিথ্যেও বলা যায় না। সুতরাং, সব হিসেবের শেষে হাতে থাকবে পেন্সিল। মাননীয় সুকুমার রায়, মহান মানুষ আপনি। হিসেবের সার বুঝিয়ে দিয়ে গিয়েছেন। আমরা বুঝিনি, কিন্তু এটাই সত্যি। এই লুকোচুরি আর ভাল লাগছে না তার। অল্প জীবন বাকী। অর্ধেকের বেশী বাঁচা হয়ে গিয়েছে। এবারে স্পষ্ট দিক নির্দেশ চাই। না হলে সময়, জীবন সব বয়ে যাবে। মানে তৈরী করা যাবে না কোনো। এমনিতেই মানুষের জীবনের কোনো মানে নেই। সে যেমন মানে দেয় তাই মানে তার। সেই মানে দেওয়ার উপরেই নির্ভর করে তার মনুষ্যত্ব থেকে সৃষ্টি সব। সেই মানে দিতে গেলে স্থির হতে হবে। শান্ত হতে হবে। এভাবে এমন ঝড়ের মধ্যে চলবে না। অন্তত নিজেদের জানাজানিকে সত্যি হতে হবে। জানতে হবে একটা জীবন তারা পরস্পরের সঙ্গে সত্যি সত্যি কাটাবে। যাই হয়ে যাক না কেন সে ভাবনার নড়চড় হবে না। তাই এই রাস্তা নিয়েছিল বোধি। হয় সুতনুকা পারবে, না হয় পারবে না। সুতনুকা তার এস এম এস-এর উত্তরে লিখেছে,
- You are a sick!!! tomak emon bhabteo parini. amari vul. I HATE YOU NOW.
এই এস এম এস-টা সুতনুকার যাওয়ার সূচনা। সুতনুকা এবারে চলে যাবার পথে। চায়ের কাপটা বিস্বাদে ভরিয়ে দেয় মুখের ভেতরটা। আচমকাই বোধির বুকের ভেতরে একটা তীব্র ধাক্কা লাগে। একটা চিরচিরে কষ্ট হচ্ছে। তার নিশ্বাস নিতে অসুবিধে হচ্ছে। বাইকটার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে বসে পড়ে। দাঁড়াতে ভাল লাগছে না। সুমঙ্গল ছুটে আসছে। বোধির মনে হচ্ছে বুকে কেউ খুব জোরে জোরে ঘুঁষি মারছে। বুকটা চেপে নিশ্বাস নেবার চেষ্টা করে বোধি। খুব লাগছে বুকে। ক্ষীর নদী অনেক বড়…অনেক বড়…পার হওয়া যায় না। পার হওয়া যায় না?
“ও সুজন নাইয়ারে, আমি নদীর কূল পাইলাম না…”।

শ্রান্ত হে
আর কয়েকটা দিন মাত্র,রাত আকন্ঠ মাতালের-
ক্ষয়ের পরম-প্রীতি সর্বাঙ্গে চাদর করে জড়ালে,
কাল বুঝি কুয়াশার তিথি? শ্রান্ত হে, গোলাপের
মালা দোলাবে গলায়, কে সে মালিনী আড়ালে?
তুমি কি মৃত্যু? অথবা নির্মম দুরধিগম্য শীতল?
তুমি কি ঘৃণার হাত? তাই বুঝি ছিঁড়ে নিলে ডানা?
চারিধারে বছরের শিশির পড়ছে কান্না অবিকল,
হরিধ্বনিতে কে যায় ফুলমালায়? কেউ চেনাজানা?
যাবার দিনে যাব, সব বুকে দাগ রেখে যাব।
যে কবিতাটি বৃথাই দিয়েছে প্রেম ডেকে ডেকে
তাকেও মিলিয়ে নিতে বলছি, এবার নীরবে হব
বাঙ্ময়! যাব, ফুল ফোটাবো পাথরেরও বুকে।
আমারই শব্দের নদী ছুটবে পাথরে পাথারে,
বিপুল তরঙ্গে রঙ্গ দেখাবে অবহেলার সমুদ্র,
পাহাড়ের পথে যে নির্জনতা নামে অবসরে
বেদনার ধ্যানে আমারই চৈতন্যে সেও রুদ্র;
আর কয়েকটা দিন মাত্র, রাত আকন্ঠ মাতালের
ক্ষয়ের পরম-প্রীতি সর্বাঙ্গে চাদর করে জড়ালে,
কাল বুঝি কুয়াশার তিথি? শ্রান্ত হে, গোলাপের
মালা দুলিয়ে গলায়, আজীবন বেদনা সাজালে?
একটা হাল্কা স্ট্রোক হয়েছিল। সুমঙ্গল বাইক ওই চায়ের দোকানে রেখেই তাকে নিয়ে চলে আসে বনগাঁয়। অন্য একটা বনগামুখী অ্যামবাস্যাডার রাস্তায় থামিয়ে তাকে তুলেছিল। সোজা বনগাঁ হাসপাতালে। ভর্তি করেছিল তাকে। কিন্তু দুপুরটা ঘুমোনোর পরে তার শরীর ততটা খারাপ লাগছিল না আর। ওষুধ-পত্রও পড়েছে যথাসময়ে। সুমঙ্গলকে দিয়ে জোর করেই বন্ড লিখিয়ে বেরিয়ে এসেছিল বোধি। বাংলোতে রাত্রিটা কেটেছে বিশ্রামেই। পরমা যখন ফোন করেছিল তখন গলার স্বর শুনে সন্দেহ করেছিল। পরমার চোখ-কান বোধির বিষয়ে অসম্ভব সতর্ক। কিছুই এড়ানো যায় না। বোধি উড়িয়ে দিয়েছিল। বলেছিল সে খুব ক্লান্ত। সারাদিনের ধকল গিয়েছে, তার উপর লেখার স্ট্রেনটাও আছে। তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়েছিল। ঘুম আসেনি। একটা অ্যালজোলাম ব্যবস্থা করিয়ে রেখেছিল। ডাক্তার মিত্র সদাশয় মানুষ। চল্লিশ হয়েছে সবে। তিনি পরের দিন রাতে এসেছিলেন। বোধি যেতে পারেনি বাইরে। শরীর সত্যিই দুর্বল তার। ভদ্রলোক নিজের উদ্যোগেই এসেছিলেন। দেখে বললেন বিশ্রাম নিলেই ঠিক থাকবে বোধি।
বোধির মনে পড়ছিল কিছুকাল আগে সে একটা লেখা লিখেছিল এই হার্ট অ্যাটাক নিয়ে। হাসি পেল তার একটু। লেখার একটা অংশ তার মনে পড়ছে। সে কোট করেছিল একটি স্টাডি থেকে।
“It has been reported that Indians are at greater risk of heart disease because of a genetic mutation that affects one in 25 people in India. The mutation almost guarantees the development of the disease and Indians suffer heart attacks at an earlier age, often without prior symptoms or warning. Now researchers say India, a country with more than one billion people, will likely account for 60 per cent of heart disease patients worldwide, by 2010. A study among Asian Indian men showed that half of all heart attacks in this population occur under the age of 50 years and 25 percent under the age of 40, according to the Indian organization, Medwin Heart Foundation. But although this genetic mutation increases the risk of heart disease, you don’t get a heart attack unless the arteries are clogged. Therefore, for Indians it is particularly important to avoid arterial plaque and the best way to do this is to keep levels of homocysteine low.”
ডাক্তার মিত্র বললেন প্রতিদিন এমন অজস্র অ্যাটাক হয়ে চলেছে বেশীরভাগ মানুষের। সব অ্যাটাক কেউ টেরই পান না। কিছু কিছু পান। কিন্তু যখন পান তখন সতর্ক হবার সময়। একবার হয়েছে যখন তখন আবার হবার সম্ভাবনা থাকেই। অনেকটা পুরোনো প্রেমের মতন। এসব শুনতে শুনতে সুমঙ্গলকে চা আনার ব্যবস্থা করতে বললো বোধি। ডাক্তার মিত্র একটা সিগারেট ধরালেন। বোধির মাথার মধ্যে একটা গান বাজছে।
“দেহতরীর গো মান কৈরো না,
তরীতে লেগেছে নোনা,
………………………
………………………
তরী অচল যেদিন হয়,
তরীর মাল্লা ছেড়ে যায়,
সেদিন হাঁ কইর‍্যা পইর‍্যা রবে
ঘিন্নাতে কেউ ছোঁবে না…।”
ডাক্তার মিত্র চেয়ে রয়েছেন তাঁর দিকে। বোধির খেয়াল হল হঠাৎ। উঠে বসলো। মাথার মধ্যে এখন এসব ঢুকে যাচ্ছে। এভাবে হবে না। বোধি কলকাতা থেকে বাইক চালিয়েই এসেছে এখানে। কিছুটা জেদ করেই এসেছে। তার রোগের সার্জারি করা ছাড়া অন্য রাস্তা নেই। ওষুধ হয় না এই রোগের কোনো। সার্জারি হলেই সেরে যাবে এমন নাও হতে পারে। আবার জন্মাতে পারে এই মেদ। শরীরের উপরের দিকের যে কোনো অংশে। ডাক্তার কলকাতায় বলেছেন যতক্ষণ না ফোলাটা আরো বাড়ে ততক্ষণ সার্জারি করা যাবে না। বাইক নিয়েই এসেছে বোধি। কিলোমিটারের পর কিলোমিটার ভাঙাচোড়া যশোর রোড দিয়ে চালাতে চালাতে একসময় খুব কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু দাঁতে দাঁত চেপে চালিয়ে গ্যাছে। ব্যাথাটা বাড়ার চেয়েও ফোলাটা বাড়া খুব দরকার। তাহলেই একমাত্র সম্ভব সার্জারি করা। তার আজকাল অফিস করাও কঠিন হয়ে পড়ছে। নিয়মিত অফিস করার ক্ষেত্রে এই ব্যাথা বেশ একটা বাধা। তাছাড়া এখন বেশীরভাগ লেখালিখিটাই কম্প্যুটারে হওয়ার ফলে আরো অসুবিধে হয় তার। ব্যাথা বাড়লে কোনো রকমে বাঁ হাতটাকে কি বোর্ডে ঠেসে রেখে লেখা চালিয়ে যায়। কিন্তু এমন করে লেখা খুব কঠিন। কোনো কারণে যদি মনটা ব্যাথার দিকে চলে যায় তাহলেই সর্বনাশ। মুহুর্তে লেখার খেই যায় হারিয়ে। এভাবে হবে না। হতে পারে না।
- আপনি একটা কথা বলুন তো-
বোধি আবার তাকালো ডাক্তার মিত্রের দিকে।
- আপনি কি মানসিক ভাবে কিছু নিয়ে খুব বিচলিত?
বোধি ভাবছিল কি বলা যায় ওনাকে! উনি তার নিয়মিত চিকিৎসা করবেন না। আজ আছে বোধি এখানে, আর দু-একদিনে চলেও যাবে। কাজেই খুব বেশী বলে লাভ কি? হাসপাতালে গেছিল যখন তখন লাইপোম্যাটোসিস নিয়েও খুব একটা কথা বলেনি বোধি। শুধু একবার জানিয়েছিল যে এই রোগটা ধরা পড়েছে তার সম্প্রতি। এই রোগটা এমনই যে খুব বেশী ডাক্তারও জানেন না এর কথা। এর মধ্যে আবার মানসিক জটিলতার কথা আসছে কেন?
- না আসলে, অনেক রোগ আমাদের মনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে, তাই জানতে চাইছিলাম। সুমঙ্গল আমার অনেক উপকার করেছে। তাই কাল একবার ওকে ফোন করেছিলাম আপনার খবর নিতে। শুনলাম আপনার বয়সে, বাইক চালাচ্ছেন, কলকাতা থেকে এত কিলোমিটার এসেছেন, এমনকি শুনলাম আপনি মাজদিয়াও গিয়েছেন ইছামতীর উৎস দেখতে, তাহলে যথেষ্ট উদ্যম আছে আপনার। সেই আপনার এমন করে হার্ট অ্যাটাক হল কেন? আপনি খুব মদ খান বলে মনে হয় না তো! বলতে পারেন ডাক্তার হিসেবেই ভাবছিলাম। তারপরে কিছুটা ব্যাক্তিগতও ভাবনা এল। আমারও একটু আধটু লেখার অভ্যাস আছে। আপনি বিভুতিভূষণের বাড়ি থেকে ফিরছিলেন শুনলাম। তখন মনে হল সংবেদনশীল মানুষদের মন নিয়ে কিছু জটিলতা থাকতে পারে।- মানে আমার কথা ভুল বুঝবেন না।
লোকটা বন্ধুর মতন করে কথা বলছে। বোধি শুনছিল। একটু ইন্টারেস্ট লাগছে তার এবারে।
- কাল পারিনি আর। আজ একটু তাড়াতাড়ি হাসপাতাল থেকে কাজ শেষ করে বেরিয়ে প্রথমে গেলাম ইন্টারনেট খুঁজতে। এখানে একটাই আছে কাফে। সেখানে বসে পড়লাম কিছুক্ষণ। সবটা পরিস্কার না। কিছু ক্ষেত্রে কনট্রাডিকট্রারিও বটে। সেখান থেকেই আমার এক অধ্যাপককে ফোন করলাম। আপনি চেনেন হয়তো, ড ঃ অরুণেশ বিশ্বাস। উনি বললেন অনেক কিছুই। আমি মূলত মেডিসিনের ডাক্তার। এটা সম্পর্কে সত্যি বলতে কি তেমন জানতামও না। তাজ্জব হয়ে গেলাম শুনে-টুনে। এবং আমার মনে হচ্ছে, মানে ওনার সঙ্গে কথা-টথা বলে যে আপনার ডায়াগোনিসিস ঠিক হয়নি। এটা অবশ্যই আমার মনে হওয়া, তার বেশী কিছু না।
- আপনার কি মনে হচ্ছে?
- মনে হচ্ছে এটা সম্ভবত লাইপোম্যাটোসিস ডলোরোসা। বিশেষ করে আপনার এই হার্ট অ্যাটাকটার থেকে মনে হচ্ছে। এটা কিন্তু ফ্যাটাল হতে পারে। So, don’t take any risk, right? আপনি তেমন হলে বাইকটা অন্যভাবে পাঠানোর ব্যবস্থা করে গাড়িতে ফিরে যান কলকাতায়। যে পরিমাণ ফ্যাট জমেছে তাতে আপনার সার্জারিটাও তাড়াতাড়ি হওয়া দরকার। শুধু Lidocaine জাতীয় Antiarrhythmic drug দিয়ে হবে না বেশীদিন। গোদা বাংলায় বলি, মানসিক অশান্তি হলেই মেদটা বাড়বে বলেই মনে হয়। নার্ভাস সিস্টেমকে, হার্টকে ধাক্কা দিতে পারে ক্রমাগত। আপনি ক্রমশ ভালনারেবল হয়ে উঠছেন বোধিবাবু।
বোধি উঠে বসলো আরেকটু। নাহ্‌, লোকটাকে সত্যি এবারে তার খুব মন দিয়ে দেখতে হচ্ছে। থ্যাবড়া নাক, চওড়া কপাল, মোটা পুরু ঠোঁটের, আর কুতকুতে দুটো চোখের দিকে তাকালে কিন্তু খুব একটা ইম্প্রেসিভ মনে হয় না লোকটাকে। অন্তত প্রথম দর্শনে। কিন্তু এখন লোকটাকে খুব শান্ত এবং বুদ্ধিমান মনে হচ্ছে।
- আপনি, মানে আমার সাজেশন, কলকাতায় ফিরে আমার প্রফেসরকে একবার দেখান। নিউরোলজির লোক বলেই না, আপনিও হয়তো জানবেন উনি এশিয়ার অন্যতম সেরা ডাক্তার এই ফিল্ডে। কিন্তু আমি বলছি অন্য কারণে। এই রোগটা অনেকের অজানা, আর ডাক্তারদের আমি জানি। না জানলেও রোগী রাখার জন্য অনেক কিছুই করতে পারে। আবার কখনো কখনো ইগো থেকেও ঝামেলা বাড়িয়েই চলে। উনি তেমন না। খুব মন দিয়ে শুনবেন কথা, আর যা দরকার তা করবেন। খুব ট্রান্সপারেন্ট মানুষ। দরকার হলে আপনার জন্য জার্নাল নিয়ে বসে যাবেন, ভুলভাল বলবেন না বা করবেন না।
সুমঙ্গল কেয়ারটেকারকে দিয়ে চা আনিয়েছে। চা ঢুকলো। সেও সঙ্গে সঙ্গে ঢুকলো। হাতে ফোন। তার মানে বাইরে ফোন করছিল। ভদ্রলোক চা খেয়ে উঠলেন। বোধি ওনার সঙ্গে বাংলোর বাইরে অব্দি গেল। ফিরে দেখলো আরেকটা এস এম এস।
“onekbaar bhablaam…keno bolle tumi e kotha? tarpore mone holo bujhlaam…asole tumi nije tomar-amar omil ke manate parchona…ami konodin tomake ondho bhabe mene cholini, tomar kothar juktike menechi…beshirbahg ei tumi thik chile bole mone hoyeche tai menechi…biye ityadi niye bhabina ar, ami ekai thakbo…jani tumio asolei eka…amra sokolei eka…
eta shoththee je amar shathe tomar hishab milchhe na….aar na miliye cholar lok tumi nao….ami tao cholte pari…kintu manage kore chola tomar pokhkhe ashombhob…..tai ei besh bhalo holo…..anek kichhu eRano galo…chollam…this is my last sms…bhalo theko…poroma keo bhalo rekho…”
বোধি মোবাইলটা রাখে। তার একবার মনে হয় সে ফোন করে এক্ষুণি। তারপরে রাখে। রেখে দেয় মোবাইলটা। ফোন করলে শুধু বেজে যাবে, ওপারের কেউ ধরবে না। গতদিনের পর থেকে আর কোনো এস এম এস আসেনি, ফোন তো নয়ই। এই এস এম এস-টার জন্যেই তো সে লিখেছিল সুতনুকাকে। তাহলে এখন এত ফাঁকা ফাঁকা লাগছে কেন তার? সুমঙ্গল ঘরে ঢুকেছে।
- দাদা, গাড়ির ব্যবস্থা করলাম। এই অবস্থায় তোমাকে একা যেতে দেব না। বাইক পরে পাঠানোর ব্যবস্থা করছি।
বোধির কানে কিছুই ঢুকছে না। সুমঙ্গল বলতে বলতে খেয়াল করলো বোধি শুনছে না তার কথা। একটা শূন্যতার দিকে চেয়ে আছে। সে ডাকলো,
- দাদা?
সাড়া দিল না বোধি। তার কানে কিছু যাচ্ছে না আর। এখন কেন কষ্ট হচ্ছে বোধি? এই তো চেয়েছিলে তুমি? তাহলে? পরমাও তাকে বলেছিল সুতনুকাকে এভাবে ধাক্কা না দিতে। দিলে হয়তো তার প্রতিক্রিয়া ভুল হতে পারে। বোধি শোনেনি। তার জেদ চেপে গেছিল। সুতনুকার এই স্থিতিশীলতা সে ভাঙবে। জীবনে সময় নষ্ট করার মতন সময় নেই। যদি সুতনুকাকে অন্য বাঁচা বাঁচতে হয় তাহলে এ ছাড়া রাস্তা নেই। তাকে এখনো অনেক অনেক কিছু জানতে হবে, বুঝতে হবে, শিখতে হবে। তবেই পারবে সে জীবনের কঠিন যুদ্ধে সত্যি সত্যি উঠে দাঁড়াতে। একা, প্রত্যয়ী, উজ্জ্বল।
“ei besh bhalo holo”
এই ভাল হল সুতনুকা? সে শুধু দূরেই সরাতে চেয়েছিল? কাছে টানতে চায়নি? কাছে রাখতে চায়নি?
- দাদা, শরীর কি আবার খারাপ লাগছে?
বোধি এবারে ঘাড় নাড়ে। সুমঙ্গলকে একটু থামানো দরকার। এখন কোনো শব্দ ভাল লাগছে না তার। বুকের মধ্যে কি চাপ বাড়ছে? মেদটা কি এবারে আবার ধাক্কা দেবে হৃদয়কে? দিলে কি সেই হৃদয় থেমে যাবে? থামলে পরমার কি হবে? পরমাও যে তাকে গভীর ভালবাসে, তার কি হবে?
- আমি কি ডাক্তারকে আবার ডাকবো একবার? দরকারে গাড়িতে নিয়ে চলে আসছি।
- এখানে এককালে মোতি উঠতো।
- অ্যাঁ?
- এখানে ইচ্ছে মাফিক মোতি উঠতো। মানে মুক্তো। কেউ কেউ আবার বলে ‘ইচ্ছে’ বলতে আসলে চিংড়ি মাছের কথা বলা হয়। কিন্তু তা আমার মনে হয় না।
এসব কি বলছে বোধি? কেন বলছে? নিজেই অবাক হয়ে যায় সে।
- দাদা, তুমি এখন আর এসব নিয়ে কথা বল না। তুমি শুয়ে থাক না একটু। আমি বলছি এবারে খাবার দিতে।
- মোতির জন্যে নামডাক ছিল এই নদীর। জাহাজ আসতো তখন এই নদীতেই। আজ যেখানে দেখছি শুধু পানা জন্মে আছে, যেখানে যেখানে চর পরে আছে, একদিন সে সবে ছিল গভীর জল। টলটলে। স্রোতস্বিনী নদী। ছুটে যেত সাগরে মিলতে। বিভুতিভূষণ খুব ভালবাসতেন ওই নদীধারায় স্নান করতে। ভবানী বাঁড়ুজ্যে পাড়ার লোকের টীকা-টিপ্পনির পরোয়া না করে তিলুকে নিয়ে স্নান করতেন নদীতে। তিলু সাঁতার দিত। একসঙ্গে ঘাটে মেয়ে-মরদ স্নান করছে এ পাড়াগাঁয়ে, সে যুগে, ভাবা যায় না। কিন্তু ভালবাসা সব পারে, সব। এই নদী যুগ যুগ ধরে পলি ফেলে ফেলে তৈরী করেছে জমি। ভালবেসে। তাতে ফসল ফলে। আমরা খাই। জানিস কি করে নদী জমি বানায়?
- দাদা, তুমি-
- জানিস, কিন্তু বুঝিস না। একটু একটু করে, যাকে বলে তিল তিল করে জমি বানায় নদী। পলি এনে এনে হাজার হাজার বছর ধরে জমি বানায়। তবে না কৃষক চাষ করে?
কেন এসব বলছে বোধি?
- আবার চাষাকেও জমিতে নিড়েন দিয়ে, তাকে ফাল করে, বর্ষার জল না পেলে সেঁচে জল দিয়ে, বীজ দিয়ে অপেক্ষা করতে হয় ফসলের। বড় ধৈর্য্য লাগে, ধৈর্য্য লাগে সবেতেই। ধৈর্য্যের অভাবে সব ডুবছে কি তাহলে? আবার দেখ, তোরা ইছামতীর পাশে থাকিস, কিন্তু ইছামতী বছরের পর বছর, দশকের পর দশক মজতে থাকলেও দেখিস না। ধৈর্য্য ধরে বসে থাকিস কবে কোন সরকার কি করে দেবে তার জন্য। তার মধ্যেই বন্যা হয়। ঘরবাড়ি ভেসে যায়। তারমধ্যেই জলের স্তর চলে যায় নীচে, আরো নীচে। নদীর পাশে পাশে ইঁটভাটা হয়। পাটের চাষ হয়। ইঁটভাটার থেকে মাটিও পরে নদীতে। পাট পচানোর জন্য মাটি দিয়ে ইছামতীর জলেই ডুবিয়ে রাখিস। পচে গেলে পাট তুলে নিস, মাটি থেকে যায়। নদী ক্রমশ বুড়িয়ে যেতে থাকে নাব্যতা ছাড়া। একদিন- একদিন আর জল পাওয়া যাবে না। একদিন আর বৃষ্টি ছাড়া কোনো রাস্তা থাকবে না সেচের। আর যদি বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলেও বসেই থাকবি। অন্যদিকে নদী মরে যাবে একটু একটু করে। স্বরস্বতীর মতই ইতিহাসের নদী হয়ে যাবে ইছামতী। তোরা তবু ধৈর্য্য ধরেই বসে থাকবি। নালু পাল, গয়া মেম, ভবানী-তিলুর সন্তানেরা নির্বাসিত হবে। নদীর ধারে ধৈর্য্য ধরে থেকে থেকেই মরে যাবে একদিন। কিন্তু নদী বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়বে না। দেখ কান্ড। একহাতে ধৈর্য্য না ধরলে বিপদ, অন্যহাতে ধৈর্য্য ধরলেও বিপদ। মানুষ কোথায় যায় তবে?
- দাদা, তুমি কি বলছ কিছু বুঝছি না তা না, কিন্তু কেন বলছো তা-। আচ্ছা ডাক্তারবাবু কিছু বললেন কি?
হাসে বোধি। ক্লান্ত হাসি। ছেলেটা খুব ভাল। সহজ, সুন্দর।
- আমি ঠিক আছি। একটু ঘুরে আসি বাইরে থেকে।
- দাদা, আরেকটা কথা। তুমি রাগ কোরো না প্লিজ। তোমার রাগকে আমি বড় ভয় পাই।
- বল্‌।
- আমি দিদিকে বলে দিয়েছি। তুমি বারণ করেছিলে। কিন্তু দিদিকে না বললে দিদি কষ্ট পাবে খুব। আমি দিদিকে কষ্ট দিতে চাইনা। দিদি তোমাকে তাড়াতাড়ি নিয়ে যেতে বলছে। আসতে চাইছিল। কিন্তু আমি বারণ করলাম। আসতে আসতে দেরী হয়ে যাবে। আমি নিয়ে যাব তোমাকে।
একটানা অনেকগুলো কথা বলে হাঁফাচ্ছে সুমঙ্গল। বোধি কিছু বলে না। দীর্ঘ্যশ্বাস পড়ে আলগা। পরমা উৎকন্ঠায় বসে থাকবে সে যতক্ষণ না যায়। তার পরম বন্দরটি তার অপেক্ষায় থাকবে। কিন্তু নদীগুলো যে মরে যাচ্ছে একে একে? তাহলে? জাহাজ চলবে কোথা দিয়ে? হাঁটতে হাঁটতে আবার রেলব্রীজে এসে দাঁড়ায়। ইচ্ছে মতন মোতি তোলা যায় না আর নদীর বুক থেকে। হায় নদী! নাম এখন তোমাকে ব্যাঙ্গ করছে শুধু। তাকেও ব্যাঙ্গ করছে নাম। বোধির বোধ কই? জীবনানন্দের মত বোধ তার হল না তো!

তবুও সাধনা ছিল একদিন — এই ভালোবাসা;
আমি তার উপেক্ষার ভাষা
আমি তার ঘৃণার আক্রোশ
অবহেলা করে গেছি; যে নক্ষত্র — নক্ষত্রের দোষে
আমার প্রেমের পথে বারবার দিয়ে গেছে বাধা
আমি তা ভুলিয়া গেছি;
তবু এই ভালোবাসা — ধুলো আর কাদা — ।
-বোধ, জীবনানন্দ দাশ
তার তো ভালবাসা ভোলা হয় না। বুকের ভিতরে বাসা বেঁধে থাকে এক অসুখের মতন। তীব্র, সংকটময়। সে তো ভালই বেসেছে শুধু, খুন করেনি, ধর্ষণ করেনি, চুরি-ডাকাতি-রাহাজানি -জালিয়াতি কিছুই করেনি। তবুও কেন? বোধি ভিতরে ভিতরে কাঞাল এক। বিচিত্র তার কাঞালপনা। মানুষকে ভালবাসার আর ভালবাসা পাবার। সুতনুকা সে কাঞালকে চিনলোই না। তাই ঝুলি ভরতে তার এত কষ্ট হল বুঝি?

“আধেক রাতে নিষুত পাড়া ঘুমেল ঘোরে
সুখ নিয়ে যায় হৃদয় থেকে সিঁধেল চোরে,
গান নিয়ে যায় কন্ঠ থেকে যে বেদনা
তুমি কি তার আভাস পেলে অন্যমনা?
দুলছে বিপুল তরঙ্গ তোর পায়ের নীচেই,
পথের ঘোরে ওই দিওয়ানা দিল বিবাগী
মাতাল নদী হয়েছে আমার ঝাঁপ-সোহাগী,
ব্রিজের থেকে ঝাঁপ দেব কি, মরণ বেছেই?
দিয়ে দিলাম পাথর যত কবরে সার
গুলবাহারে ফুল ফুটেছেও বিষণ্ণতার
যতেক গন্ধ উতল মাতাল শূন্য পানে
ভোরের পথে ভুলকো তারার ভুলই আনে?
আধেক রাতে নিঝুম পাড়া ঘুমেল ঘোরে
সুখ গিয়েছে ঘর-বারান্দা শূন্য করে,
রাতের রাগে গান ধরেছে যে বেদনা
আমি তারই নাম রেখেছি কাঙালপনা।।”
জল আজ-ও স্থির হয়ে আছে নদীর। আজও একই রকম ক্লান্ত, শ্রান্ত। ইছামতীর চলার ইচ্ছা কই? অথবা মানুষ বদলালো না বলে ইছামতী বদলে গেল। তার চলমান জলধারা নিয়ে সে শুধু লুকিয়ে পড়ছে মাটির গভীরে। অন্য সব জলের মতন। ভূভাগকে সেও জলদান করবে, কিন্তু পরিচয় দেবে না। হয়তো এই তার প্রগাঢ় অভিমানের ফসল, এই তার ইচ্ছে। তার অশ্রু থেকে আর কোনো মুক্ত জন্ম নেবে না। লোভী মানুষ, স্বার্থপর মানুষ, মুক্তো নেবার বেলায় হাত পেতে থাকে, কিন্তু দুঃখ নেবার বেলায় সরে যায় পাশ থেকে। ইছামতী এমন মানুষের জন্য নয়। ইছামতী এমন সব মানুষদের জন্য ছিল না কখনো।

মধ্যে ক্ষীর নদী...


————–সমাপ্ত———-

 
Leave a comment

Posted by চালু করুন অক্টোবর 22, 2011 in উপন্যাস, ধারাবাহিক

 

Tags: , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , ,

ইচ্ছামতী (তৃতীয়াংশ)

প্রচ্ছদ

 রক্ষা করো দুটি চোখ

বোধির ক্লান্ত লাগছিলমহিলাটি বলে চলেছেনদালাল লোকটার কাছ থেকে নিয়েছিল আড়াই হাজারওকে দিয়েছিল হাজারও লোকটাকে বলে দিয়েছিলতারপরে লোকটা দালালের সঙ্গে…! বোধির ক্লান্ত লাগছিলকাল রাতে সে গিয়েছিল সীমান্তেসুমঙ্গল তাকে নিয়ে যেতে চায়নিকিন্তু তার জেদ ছিলযাবেইরাতে সীমান্ত এমন একটা জায়গা যেখানে কোনো আইন নেইকেউ কাউকে চেনে নাশুধু চেনে বন্দুকশুধু চেনে টাকাযে কোনো সময়ে খুন হয়ে যেতে পারে যে কেউসে তো কোন ছাড়, প্রধানমন্ত্রীও নিরাপদ নয় একলা এলেসীমান্ত পাহারা-টাহারা তখন শুধু গল্প যুদ্ধের সময় হলে হয়তো অন্য কিছু হতকিন্তু এত শান্তির সময়অঢেল শান্তির সময়ট্রাকের পর ট্রাক এসে থামেমাল খালাস হয়তারপরে অন্য লরিতে উঠে চলে যায় দেশের ভিতরেকোন লরিটা ভারতে ঢুকছে, কোনটা বাংলাদেশে এটা বড় কথা না বড় কথা হল এভাবেই চলে সব কিছুমাল কাস্টমসে লেখা হয় নাঅনেক টাকার সম্পদ এভাবেই চলাচল করেরাষ্ট্র করের টাকা হারায়সংবাদ মাধ্যমে খবর হয় নাহতে পারে নাবোধিও ক্যামেরা-ট্যামেরা নিয়ে যেতে পারেনিতাকে যে অফিসার নিয়ে গেছিল তিনি নিতে দেননিএখানে কেউ কথা বলেনা, সোজাসুজি গুলি চালিয়ে দেয় দরকারে পরেও মারতে পারেওই যে কিছুদিন আগে যেমন মেরে দিল জ্যোতির্ময় দে- কে, মুম্বাইতেভদ্রলোক ছিলেন তদন্তমূলক সাংবাদিকতার লোককারোর চাকে ঢিল মেরে দিয়েছিলেন নিশ্চই, তাই মেরে দিলকে মেরেছে আর কে ধরা পড়বে কে জানে? বোধির ভয়-ডর কম হলেও সেই অফিসার চাননি এর জন্য কোনো সমস্যায় পড়তেতাঁর এখনো ওখানেই পোস্টিং বেশ কিছুদিনতাছাড়া সঙ্গে পরিবার আছেতাদের নিরাপত্তা আছেনিরাপত্তা? কিসের? কার? কে জানে? অবশ্য পরমাও খুব পরিস্কার করে জানেনা সে ঠিক কি কাজে এসেছেসুতনুকাও জানেনাজানলে দুজনেই হয়তো ভয় পেত, বাঁধা দিতবোধি চায়নি এমন হোকসে এসেছে যখন তখন সত্যটা সে জেনেই যাবেএই অফিসার তাকে সাহায্য করবে সে কাজে

সকল অফিসার খারাপ হয় না সর্বত্রসে এটা জানেকলকাতা থেকেই ব্যবস্থা করে এসেছিলএই অফিসার তাকে নিয়ে গিয়েছিলসুমঙ্গলকে রেখেই গিয়েছিল সেযাতে সুমঙ্গলকে কোনো সমস্যায় না পরতে হয় পরেদেখে এসেছে সেঅচেনা লোক দেখে চোখ তোলার উপায়ও ছিল না চোরাচালানকারীদেরকারন তারা নির্দিষ্ট রাস্তায় যায়নি নির্দিষ্ট ভাবেও যায়নিঅনেক প্রস্তুতি নিয়েই গেছিল তারাসব নজরদারী এড়িয়ে গেছিলকিন্তু ডকুমেন্ট করার উপায় কমশুধু দেখে এসেছেযে অফিসারটির বদান্যতায় সে যেতে পেরেছে তিনি মালদহের লোকবি এস এফ -এর উচ্চপদস্থরা এঁকে ভরসা করেনপ্রথমত ইনি সদ্বিতীয়ত, ইনি কিছুটা মানবিকতা এখনো বজায় রাখতে পেরেছেনতিনি কিছু তথ্য দিচ্ছিলেনযে হেরোইন চালান হচ্ছে তার দাম বাংলাদেশের কালোবাজারে ভারতীয় মুদ্রায় গ্রাম প্রতি ৮ টাকা ৯৫ পয়সা মতনজাল টাকা আর ডিভিডি ইত্যাদি পাইরেসির বাজার হল ১৪৫৪২,২২,২৫,০০০ কোটি টাকাসে ভেঙে দেখেছিল ডলারকেকারণ ৩২৫ মিলিয়ন ডলার বললে চট করে সংখ্যাটা বোঝা মুশকিল হয়তাদের অভ্যাস হল কোটি বা লক্ষে হিসেবেরএটা পরিসংখ্যানের খেলাও বটেদেশের নানান গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেওয়ার সময় এমন কায়দা করে সরকার বা প্রশাসন২০০০ সালের একটা হিসেব অনুযায়ী বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের আইনি ব্যবসা হচ্ছে তিন বিলিয়ন ডলারের মতআর বেআইনি ব্যবসা হচ্ছে পাঁচ বিলিয়ন ডলারেরসময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটাও বেড়েছে ধরাই যেতে পারে  ভারত থেকে বাংলাদেশে যায় গরু, ফল, মশলা, হিন্দি বা বাংলা সিনেমার ডিভিডি এই সবযায় ফ্যান্সিডিলের মতন ওদেশে নিষিদ্ধ ড্রাগকাশির ওষুধ এটাকিন্তু নেশার জন্য ব্যবহার হয় এরবাংলাদেশকে হাসিনাও ক্ষমতায় এসে ইসলামি দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেনফলে সে দেশে মদ জাতীয় পানীয় নিষিদ্ধ থাকবেসেই মদের অভাব মেটাবে হেরোইন বা ফ্যান্সিডিলকিন্তু এর মানে এটাও না যে এগুলো মদ থাকলে চলতো নাবা মদ দিয়েই এগুলোকে ছাড়াতে হবেআসলে নেশা একটা ব্যবস্থা উন্নতই হোক কি অনুন্নত, সব দেশেই কোনো না কোনো ভাবে এই নেশার ব্যবস্থা করে রাখা আছেএতে হয়তো সুবিধা হয় শাসনব্যবস্থারযুবক-যুবতীরা নেশাগ্রস্ত হয়ে থাকলে কিসের প্রতিবাদ, কিসের প্রশ্ন? বোধির চোখের সামনে কলকাতা শহরের মধ্যে ঝাঁকে ঝাঁকে মদের দোকান বেড়ে চলেছেবিশেষ করে কলকাতার প্রান্তগুলোতেতার পাড়ার কুড়ি-বাইশ বছরের ছেলেরা এখন কম্যুনিটি সেন্টারে বসে মদ খায় সন্ধে হলেইতারা যখন ওদের বয়সী ছিল তখন তারা ওই সময় মুখিয়ে থাকতো খেলবে বলেহয় টেবল টেনিস, নয় ক্যারাম অন্ততসেই টেবল টেনিস বোর্ড জল পড়ে পড়ে নষ্ট হয়েছেতারপরে, এক সময় সেই বোর্ড ছেলেরা পুড়িয়ে দিয়েছে দোলের আগের দিন ন্যাড়াপোড়া করেএই তো অবস্থা

পাড়ার বয়স্করা ওই কম্যুনিটি সেন্টারের সামনে দিয়ে মুখ লুকিয়ে চলে যানএঁদের একাংশ এক সময় পাড়াতে রক এ মদের আসর বসাতেনএখন ওখান থেকে মুখ লুকিয়ে চলে যানবসে থাকেন পাড়ার মোড়েঠিক যেখান দিয়ে বাড়ির মেয়ে-বৌ রা যাতায়াত করেসেখানে কান পাতলে শোনা যায় আলোচনাকার বৌ, কার দিকে তাকায়; কার বাড়িতে কে এসেছিলকে কার সঙ্গে পাড়াতে শোয় থেকে আসলে কার কত টাকা কামাই সব আলোচনা হয়মাঝেমাঝে সিপিএম-টিমসি চলেকখনো কখনো বোধির মনে হয় সে এখানে একদমই খাপ খায়নাএখানে এসে বিশেষ করে তার মনে হচ্ছে, তার আর মন লাগেনা শহরেকিন্তু গ্রাম? সেই বা কি! সেই গ্রাম বলে-টলে অনেকেই খুব আদিখ্যেতা করেন বটেকিন্তু সে করেনা বিভুতিভূষণও করেননিকাল সারারাত জেগে থেকেও আজ সকালে বোধি গিয়েছিল ওনার বাড়ি দেখতেআসলে কাল সীমান্তে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে খুব মনে হচ্ছিল এই সীমান্তটা তো কত হালের বিষয়ঋত্ত্বিক ঘটকের কষ্ট ছিল খুবআরো অন্য অনেক নাম না জানা মানুষের মতন, যাদের দেশ আর তাদের রইলো না তাদের মতনবোধিরও খুব খারাপ লাগা আছে একটাদুই বাংলার আলাদা হয়ে যাওয়াটা আজ-ও তার মানতে কষ্টই হয়তার ঠাকুরদা ছিলেন ওখানে, দাদুওকিন্তু বাবা বা মা ছিলেন না দেশভাগের আগেই তাঁদের এক অংশ চলে এসেছিলেন এ দেশেতবু তার দেশতো বাবার-মায়ের দেশের বাড়ির গল্প, মানে ঢাকা আর যশোর এখনো ঘুরে বেড়ায়তার স্মৃতির অঙ্গ হয়ে গিয়েছেতেমনি বিভূতিভুষণের স্মৃতিতে ছিল এই নদী, ছিল তার তীরের জনপদ

তার মনে আছে এক তুমুল বৃষ্টির দুপুরে নিয়ে বসেছিল ইছামতিপথের পাঁচালি‘-র লেখককে নিয়ে তখনো খুব জানাশোনা ছিল নাবোধি ক্রমে ক্রমে ডুবে গিয়েছিলআধুনিক কাকে বলে আর? নালু পালকে দিয়ে কি সামান্য অবতারণায় শুরু হয়ে যায় একটি জনপদের সৃষ্টি আর ধ্বংসের আবহমান কথাকোথাও কোনো পন্ডিতি নেইআছে স্নিগ্ধতা, আছে এক নির্লিপ্ত শ্লেষআছে এক মরমে মরমে অনুভব করা আখ্যানগ্রাম নিয়ে লিখেছেন অনেকেইবরং শরতবাবুর গ্রামের মধ্যে অনেক বেশী তীক্ষ্ণ মনন আছে, আছে আয়োজনপাঠক যে শহরের সে সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতনতাতারাশঙ্করের রয়েছে কবিত্বসে চোরাবালিওকখনো কখনো ডুবিয়ে দেয়মানিককে প্রথমভাগে অনেক বেশী তাড়িত মনে হয় প্রেম আর সম্পর্কের জটিলতা নিয়েদেশকাল পরের দিকে আসে, কিন্তু কোথাও যেন পরের মানিককে আবার দেশকাল গ্রাস করে নেয়এসব অবশ্য বোধির মনে হওয়া শুধুতার কাছে ইছামতি‘-র বিভুতিভূষণ এক ব্যাতিক্রমসংহত, স্থিতিশীল এক প্রাজ্ঞ নালুর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে পাল মহাশয় হওয়া, গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের লোকমুখে গ্যাং ট্যাং রোড় হয়ে যাওয়া, নীলের কুঠির বৃত্তান্ত, গয়া মেম- সব সব যেন শুধু সময়ের জলছাপআর লেখক খুব নিরাসক্ত অথচ অসম্ভব মনোনিবেশী প্রত্নতাত্ত্বিকের মত সংগ্রহ করে গিয়েছেন এক সভ্যতার আকরিক উপাদানতিনি তাঁর বিপুল ক্যানভাসে গড়ে তুলবেন এক নদী মাতৃক সভ্যতাসভ্যতার নামইছামতিবোধি জানে অমন লেখার জন্য যে জীবনবোধ থাকে, মাটির সঙ্গে সম্পর্ক থাকে তা তার নেইসে শহুরে হয়ে গিয়েছেমফস্বলের থেকে এসে শহর কলকাতায় সে মাটির বিস্তার হারানো বনসাই মাত্রবোধি আপ্রাণ চেষ্টা করছে একটু জমি কিনতে, কলকাতার বাইরেসেখানে চাষবাস হবেজমির সঙ্গে মাটির সঙ্গে তার সম্পর্ক হবেএই শহুরে ফাঁকতালের তাক্ষণিকের লেখা থেকে সে বাঁচবেএখানে এত দ্রুত সব চলে যাচ্ছে যে কোনো কিছুকেই ধরার উপায় নেইকিছুই আসলে চটকদার রাংতা ছাড়া চলেনাযে যেখানে আছে সে সেখান থেকে শুধু আরো আরো উচ্চে উঠতে চায়কোথায় যাবে? কোথায়? কেউ জানেনাসকলেই আসলে সেই এলিয়টের কবিতার মতন,

“We are the hollow men
We are the stuffed men
Leaning together
Headpiece filled with straw. Alas!
Our dried voices, when
We whisper together
Are quiet and meaningless
As wind in dry grass
Or rats’ feet over broken glass
In our dry cellar

Shape without form, shade without colour,
Paralysed force, gesture without motion;

Those who have crossed
With direct eyes, to death’s other Kingdom
Remember us — if at all — not as lost
Violent souls, but only
As the hollow men
The stuffed men.”

—The Hollow Men

হা হা হা হা হা! মাথার মধ্যে স্ট্র ভরা! এই তো, শহর, শহুরে জীবনকত কত আগে এ সব লিখে গিয়েছেন এলিয়টওদের ওখানে তখন যা ঘটছিল এখন এখানে ঘটছেবা ওই ১৯৯০ এর শেষদিক থেকে ঘটতে দেখা যাচ্ছে পরিস্কার করেকোথায় ১৯২৫ আর কোথায় ২০১১সবচেয়ে টানে বোধিকে শেষ কটা লাইনসবাইকেই বোধ হয় টানে

“This is the way the world ends

This is the way the world ends

This is the way the world ends

Not with a bang but a whimper.”

—The Hollow Men

 

 

 

 

 

 

 

 

                   The book of Mormon

“Our stay in Salt Lake City amounted to only two days, and therefore we had no time to make the customary inquisition into the workings of polygamy and get up the usual statistics and deductions preparatory to calling the attention of the nation at large once more to the matter.

I had the will to do it. With the gushing self-sufficiency of youth I was feverish to plunge in headlong and achieve a great reform here””until I saw the Mormon women. Then I was touched. My heart was wiser than my head. It warmed toward these poor, ungainly and pathetically “homely” creatures, and as I turned to hide the generous moisture in my eyes, I said, “No, the man that marries one of them has done an act of Christian charity which entitles him to the kindly applause of mankind, not their harsh censure”and the man that marries sixty of them has done a deed of open-handed generosity so sublime that the nations should stand uncovered in his presence and worship in silence.”

- Mark Twain (Roughing It – Chapter 14, pages 97-98)

মর্মনরা আমেরিকার একটি বিশেষ খ্রীষ্টিয় শাখাএদের উদ্ভব হয়েছিল Later-day-saint-movement-সাধারণ ভাবে ক্যাথলিক বা প্রোটেস্টান্ট চার্চের ধারার বাইরের লোক এরাএই চার্চের আওতায় আমেরিকাতে উনবিংশ শতকে বহু বিবাহের পক্ষে এঁদের নিজেদের মধ্যে প্রচার চলেছেযে কোনো প্রাচীন এবং মধ্যযুগীয় ব্যবস্থায় বহু বিবাহ চলতোখ্রীষ্টানরাও তার ব্যাতিক্রম ছিল না এর স্বপক্ষে-বিপক্ষে নিউ টেস্টামেন্ট-এর সময় থেকেই বিতন্ডা চলেছেকেউ কেউ বলেছেন যেমন ঈশ্বর আদম এবং ইভ কেই বানিয়েছিলেন, আদমের অনেক বৌ নাআবার কেউ কেউ ওল্ড টেস্টামেন্ট দেখিয়ে বিতর্ক তুলছেনমার্টিন লুথার ক্যাথলিক থেকে প্রোটেস্টান্ট ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের সময়ে বলছেন ধর্ম অনুযায়ী কোনো পুরুষ যদি বহুবিবাহ করতে চায় এবং তার বিবেকে কোনো সমস্যা না থাকে তাহলে পৌর কর্তৃপক্ষের কিছু কিছু করার কোনো কারণ নেইতার হস্তক্ষেপের জায়গাও নেই আবার এককালে লুথারের সহযোগী অ্যানা-ব্যাপটিস্ট বার্নহার্ড রথমান এর প্রথমে বিরোধ করলেও পরে নিজেই বহুবিবাহ করে বসেনলুথারের চেয়েও চার্চ এবং মধ্যযুগের সামন্ত-শাসক বিরোধী কৃষকদের নেতা থমাস মুনসরকে ধ্বংস করতে এই বহুবিবাহকে বিশেষ করে পলিজিনি আর পলিয়েন্ড্রিকে প্রশ্রয় দেবার কথাও এসেছে অপরাধ হিসেবেএমন উল্টো-পাল্টা স্রোতের মধ্যে আমেরিকাতে এই মর্মনরা যে কোনো প্রাচীন গোষ্ঠীর মতই নিজেদের সংখ্যা বাড়ানোর জন্যও বহুবিবাহকে তাদের একটি গুরুত্বপূর্ন মত করে নিয়েছিলআবার ওই চার্চের মধ্যে থেকেই এসেছে এর বিরোধীতাআসলে এক সময়ে যে কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠীর দরকার ছিল জনসংখ্যা বাড়িয়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করারসেই সময়ে সকলেই মদত দিয়েছে পলিজিনি-তেধীরে ধীরে বেড়েছে জনসংখ্যায় মানুষক্রমশ এই পুরুষের বহুগামিতা বা পলিজিনির দরকার কমে গিয়েছেপুরুষের বদলে নারী যদি ক্ষমতায় থাকতো তা হলে হত পলিয়েন্ড্রি কিন্তু হতইখুব সাদা চোখে দেখলে দেখা যায় যে কোনো ধর্মেরই একটা জাতিগত চেহারা আছেযে কারণে যে কোনো ধর্মান্তরিতকেই ধর্মান্তরণের সময় নিয়ে আসা হয় জাতিনামের কাঠামোর মধ্যেঅনাদি হয়ে যায় মকবুল মন্ডল, কিম্বা জগাই হয়ে যায় জেমস বিশ্বাসআবার হিন্দুদের মধ্যে সন্ন্যাস নিলে চোখে পড়ে ব্যাপারটা তখন সুকুমারকে হয়ে যেতে হবে অভেদানন্দ জাতীয় কিছুনা হলে তার সন্ন্যাস সম্ভব নাএ এক মজাএইভাবে জাতি থেকে গোষ্ঠীভুক্তিকরণের মাধ্যমে ধর্মীয় ব্যবস্থাও তার শাসন বজাইয় রাখেঅর্থা খুব পরিস্কার করে দেখলে ধর্মের ভূগোলটাও এইভাবে কাজ করেএই যে জাতিগত বৃদ্ধির খেলা এই খেলাতেই বহুগামীতার জায়গা হয়েছেআবার মূলত জনসংখ্যা বাড়ার জন্য, বহুগামিতার জন্য নারীদের উপরে সংঘটিত বহু অত্যাচারকে সামনে রেখে বহুগামিতা রোধ করা হয়েছেনা হলে রোধ হত নানারীদের উপরে অত্যাচার নিয়ে আসলে কোন ধর্মই বা খুব বিব্রত? হলে এতদিন তার কি করছিল? তার চেয়েও বড় কথা হচ্ছে কোনো ধর্মেই পুরোহিত আজও নারী হয় না কেন? যদি সত্যিই নারীদের জন্য ধর্মধ্বজীদের এত সহানুভূতি এবং সন্মান থাকতো তা হলে এই সব ক্ষেত্রগুলোতে শুধু পুরুষের অধিকারই এখন সংরক্ষিত হয়ে আছে কেন? মর্মনদের যে অংশটিকে দেখে এসেছিলেন মার্ক টোয়েন সেই অংশটি শারীরিকভাবে আমেরিকার সৌন্দর্য্যতত্ত্ব অনুযায়ী কুসিতদর্শনতাই না টোয়েন এমন চড়া রসিকতা করতে পেরেছেন? অর্থা সেই শেষে গিয়ে অপর আমার চেয়ে নিকৃষ্ট প্রমাণ করার গল্পযদি এরা সুন্দর হত তাহলে কি টোয়েনের রসিকতা আসতো? বোধির বিরক্ত লাগে ভাবতেবড়সড় মানুষদের বেশ কিছু ছোটপনা থাকে বহু সময়েইআবার ছোট মানুষ, গাঁয়ের মানুষ বা প্রান্তিক মানুষের মধ্যেও থাকে বড়পণাএক্ষুণি একজনের কথা মনে পড়ছে বোধিরতিনি বিভুতিভূষণ

এলিয়টের ওই যে দুনিয়ার ধ্বংসটার কথা, ওটার ঠিক উলটো দিকে দাঁড়িয়ে বিভুতিভূষণ জীবন বুঝেছিলেনমানুষ, মানুষের প্রথা সব নিয়েই ভারী মমতাময় মানুষওই যে কিছুটা আগে তাকে এত ভাবতে হচ্ছিল বহুগামীতা নিয়ে, এত কথা মনে এল, সেখানেও অনবদ্য বিভুতিভূষণতিলু, নীলু আর বিলুকে বিয়ে করেছে ভবানী বাঁড়ুজ্যেসে বিয়ের পরের সংসার আঁকছেন বিভূতি তিন বয়স্থ কুলীনের মেয়েতাদের দাদা, নীলকুঠির দেওয়ান, এক যোগে বিয়ে দিয়ে দিয়েছে এক পাত্রে তিলু, ভবানী বাঁড়ুজ্যের কাছে বসে সংস্কৃত পড়েউপনিষদও পড়ে ফেলেছেসে সারাদিন খেটেখুটে ব্রাহ্মণ-বদ্যিকে আহার করিয়েছেএসে ভবানী বাঁড়ুজ্যেকে বসতে বলছে তার সামনেখানিকক্ষণ, কোলে মাথা দিয়ে থাকবে শুয়ে শুয়ে শুয়েই বলেছে তাকে যেন ভবানী হেয় জ্ঞান না করেসেও দেবীর অংশতাকেও প্রাপ্য সন্মান দিতে হবেতারপরে এক সময়ে বলবে ভবানীকে নিলু-বিলুর ঘরে চলে যেতেনা হলে ওরা ভাববে কি! সারাদিন সেই শুধু দখল করে রাখলে কেমন হবে সেটা? বিলু, নীলুরও তো পেতে ইচ্ছে করে ভবানী বাঁড়ুজ্যেকেবোধি পড়েছিল বহুকাল আগে , আর মানে বুঝেছে যেন এই কদিনে আবারপরমা আর সুতনুকা, পাশাপাশি থাকতে পারেনা তার জীবনেকারণ সেই দিন আর নেইএখন উন্নত বিশ্বএখন স্বাধীনতা নারীর অথচ উলটো দিকে দ্রৌপদীর আখ্যান আছে মহাভারতেসেখানেও অত অত জ্ঞানীগুণি এবং বীর পুরুষ নিজেদের মধ্যে বিদ্বেষ তৈরী করেনি তো দ্রৌপদীকে নিয়ে? বিভূতিভূষণ, মহাভারতের আখ্যানকর্তাদের মতও ননকাউকে মহান-টহান না করেই খুব চুপ কন্ঠে বলে চলেন কথাবলেন মদনমোহন তর্কালঙ্কারের কথাস্ত্রী শিক্ষা নিয়ে তাঁর বা তাঁদের কাজঅন্যদিকে নিয়ে আসেন চৈতন্যভারতীকেভবানীর বন্ধু চৈতন্যতিনি শোনেন হলা পেকে নামের এক ডাকাতের কাছে স্ত্রী শক্তির কথা সদগোপের বাড়িতে তারা ডাকাতি করতে গেছিলসেখানে পুরুষ যখন মারা পড়ছে তখন এক নারী, প্রতিমার মতন তাঁর গড়ন, হর্তেলের মতন রঙ, তিনি চালালেন সড়কিবীরো হাড়ির পেটের থেকে নাড়িভুঁড়ি বের করে দিলেনচৈতন্যভারতী এমন নারীর কথা শুনলে প্রণাম করেনদেশমাতৃকার চেহারা গঠন হচ্ছে কি নিভৃতে! এই নারীই শক্তি হয়েছেন, আদ্যা শক্তিআনন্দমঠে গিয়ে বসেছেনজননীং জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপী গরিয়সীঅথবা সুজলাং সুফলাং মলয়জ শীতলাং…বন্দনা গীত হচ্ছে পুরুষের কন্ঠেযারা প্রাণ নেবে আর প্রাণ দেবে তারা গেয়ে যাচ্ছে এই গানকিন্তু বিভূতির কিচ্ছু লাগছেনানা উপেন ব্রহ্ম, না চারঅধ্যায়এমন নিভৃতে লিখে গিয়েছেন এক বাংলার বৃত্তান্ত শিক্ষা-স্বাস্থ্য-বীরত্ব-বিদ্রোহ-অত্যাচার-বিশ্বাসঘাতকতার আখ্যানওকিন্তু এমন করে কে লিখবে আর? বোধি নিজে? সে তো জানেই না লিখতেশহর তাকে ছাড়তে হবেশহুরে চালাকী বসেছে এসে তার লেখায় এখনসে জানেসে তাই আজকাল বেশী লেখেনালিখতে চায়না

এই যে তার সামনে মহিলাটি বসে বলে চলেছেন তার কথা সে লিখবে কেমন করে? এই কাহিনী সংবাদের পরিভাষায় সফট নিউজমহিলা সময় পেলে কাজ করেন বই-এর দোকানেস্বরস্বতী প্রেসের মালিক তাকে এনেছে এই ব্যবসায়সধবা মহিলা, কিন্তু প্রায় বৈধব্যের মতই দশাতার সঙ্গে সম্পর্ক ছিল আত্মীয়তার এই প্রেস মালিকেরমহিলা বলে চলেছেন সে কথাসহজ, আন্তরিকভাবেই কথা বলছে সেমহিলাও বলে চলেছেন কথা

- আসলে আগে আমি ওর সঙ্গেই শুধু করতামওই টাকা-ঠাকা লাগলে দিতএকদিন ওর মেয়ের একটা অ্যাক্সিডেন্ট হলতারপর থেকে আমাকে বললো, আমি যদি অন্যদের সঙ্গে যাই তাহলে আমারও ভাল, ওর-ও ভাল

ভাল? এমন করে বলছেন মহিলা মনে হচ্ছে যার কথা হচ্ছে সেই যেন ওনার স্বামীনাকি প্রেম? এও প্রেম? বা এমনও প্রেম হয়? মহিলার কথায় কোনো ক্ষোভের আভাস নেই তো! লোকটি ওনাকে যে এই কাজে নিয়ে এসেছে এটাই স্বাভাবিক যেনবোধি আরেকটু বুঝতে চাইছেকলকাতার সোনাগাছি বা কালীঘাটের বস্তিতে বা হাড়কাটায় যাঁরা এ কাজ করেন তাঁদের বেশীরভাগই থাকেন ওখানেইকালেভদ্রে বাড়িতে যানঅবশ্যই যদি বাড়ি বলে কিছু অবশিষ্ট থাকে তা হলেইঅন্যান্য বড় গ্রামের বা মফস্বলের শহরেও এঁরা থাকেন একসঙ্গে বস্তি করেইবেশীরভাগই চালান হয়ে আসেনযেখানে যত টাকা সেখানে তত চালান দামীআসানসোলের কয়লার খনি অঞ্চলে একবার বোধি গিয়েছিলকয়লার অবৈধ খাদান নিয়ে কাজ করতেসেখানে গিয়েও দেখেছিল মাফিয়াদের একটা বড় অংশই কয়লার সঙ্গে সঙ্গেই চামড়ার ব্যবসাও করেচামড়ার ব্যবসা মানে নারী পাচারনেপাল, ভূটান, বাংলাদেশ, তামিলনাড়ু কিম্বা পাঞ্জাব, হরিয়ানা বিবিধ প্রান্ত থেকেই আনা হয় এই নারীদের সেখানেএকেকজন তো মুম্বাই থেকেও আসেন, কয়েকদিনের জন্যএঁরা অনেকেই অন্য সময় মুম্বাইতে মডেলিং করেন, বা বি গ্রেড সিনেমা করেনবিশেষ বিশেষ উসবের দিনে এঁদের আনা হয়টাকার ফোয়ারা ওড়ে তখনহুরী-পরী সবতাকে বলেছিল তার আসানসোলের লিঙ্কম্যান অওধ পান্ডে কদিন থেকে আবার চলে যায় তারাকিন্তু এঁদের বেশীরভাগেরই সংসার থাকেনা কোনো এই মহিলার সংসার না থেকেও আছেগ্রাম বাংলা বা শহর বাংলাতে এই শরীর খাটিয়ে খাওয়া মানুষের সংখ্যা ক্রমশ বেড়ে চলেছেসংসার থেকে বেরিয়ে সংসারে আবার ফিরে আসেন দিনের শেষেবেশীরভাগই ব্যবসা করেন দিনের বেলায়ইনিও তাই করেন রাতের বেলায় না থাকলে গ্রামের লোক ঝামেলা করবে সন্দেহ করেতাই রাতের বেলা সাধারণত  এ কাজে যান নাআজ বোধির কাছে এসেছেন দূরের একটি গ্রামে তাঁর চেনা একজনের বিয়ে আছে বলেবাড়ীতে কেউ না থাকলেও পাড়াতে শ্বশুরবাড়ীর অন্যান্য লোকেরা আছেতারা চোখ রাখেহ্যাঁ, স্বামী পালিয়ে যাবার পরে পেটের বাচ্চাটাকে নিয়ে উনি যখন অকূল পাথারে তখন আলাদা করে কেউ এগিয়ে আসেনি গ্রামের লোকদের চাপে শুরুতে আসতে যখন বাধ্যও হয়েছে তখন খুব একটা খুশী মনে করেনি কিছুতারপরে কিছুদিনেই সব করা শেষযে যার নিজের সংসারের দারিদ্র দেখিয়েই কেটে গিয়েছেসেই থেকে ইনি একা লড়ছেনপ্রথমে এই সরস্বতী প্রেসের মালিকটিই তাঁকে জায়গা দিয়েছিলআলাপ হয়েছিল বনগাঁ হাসপাতালে এসেসেখান থেকেই যোগাযোগ বজায় রেখে চলেছিল প্রেসের মালিকটিকালে কালে কাজ দেবার জন্য ডেকে নিয়েছিলতার বই-এর দোকানের কাউন্টারে বসতে হবেমহিলা পঞ্চম শ্রেণী অবধি পড়েছিলেনঅক্ষর চিনতে পারেন, সংখ্যাও লিখতে পারেনব্যাস! সেই শুরু তারপরে ধীরে ধীরে লোকটি গ্রাস করেছে একেদোকানের কাউন্টার ফাঁকা রেখে সামনের একটা গেস্ট হাউস আছে লোকটার, সেখানে যেতেন তিনিবাথরুম করার নামে যেতেনলোকটাও আসতোকোনোরকমে আধঘন্টা সময় পেতেন দুজনেসেই শুরুআজকে আরো আরো ভাড়া খাটছেন ইনিভাল?

- তা ভাল ব্যবসা হচ্ছে ওনার নিশ্চই?

- না না, অমন করে বলবেন নাও পারলে করতোপারলোনা তো!

- আপনি বিশ্বাস করেন এটা?

মহিলা হাসলেন ম্লান

- কি আসে যায় বলুন তো বিশ্বাসে? আচ্ছা, এই যে আপনি এত সুন্দর, আপনার বৌ-ও সুন্দর না?

- কি হবে জেনে?

- না, বলুন নামানে অসুবিধে না থাকলে!

- থাকলে কি আর না থাকলেই বা কি?

- উমম্‌…থাকলে আপনি আমাকে ডাকলেন, তাই ভাবছি- শখ নিশ্চইহয়কত মানুষের কত রকম শখ

- আর না থাকলে?

- আপনি খুব সুন্দরতবু আপনার বৌ না থাকলে নিশ্চই কোনো দুঃখ আছে

হেসে ফেলে বোধি

- দেবদাস নাকি?

- ঐশ্বর্য্যাকে আমার না ভাল লাগেনিমাধুরীকে কি ভাল লাগছিল না?

- এখনো ওর সঙ্গে করেন এসব?

- করি

- টাকা নিয়ে না না নিয়ে?

- স্বামী হলে কি টাকা নিতাম? ওর নামে সিঁদুর দিই না বলে কি টাকা নিতে হবে? ও আমার স্বামীর মতন

- স্বামী হলে পাঠাতো এ কাজে?

মহিলা একটু সময় নেনতারপরে একটা বড় শ্বাস নিয়ে বলেন,

- আমাদের লাইন আপনি জানেন নাঅভাবে পড়লে স্বামীও পাঠায়অনেককে দেখেছি এমন

বোধির মনে পড়লো তার ছোটবেলার পাড়ার ব্রততী মামীর কথামামীকে সুব্রতমামা তার বন্ধুর সঙ্গে শুতে পাঠিয়েছিলমামার ব্যবসা ডুবছিল তখনব্রততী মামীকে শুইয়ে সুব্রতমামা তার প্রোমোটার বন্ধুর থেকে ব্যবসার ক্যাপিটাল তোলার তালে ছিলব্রততী মামী সেই রাতেই ওই প্রোমোটার বন্ধু ,মানে নন্তু মামাকে বলে তাকে অন্য কোথাও নিয়ে রাখতেসে তারই বাঁধা মেয়েছেল হবেনন্তু মামা তাই করেমামী আর ফেরেনি তাদের পাড়ায়অঞ্চলের অন্য একটি পাড়ায় একটি ফ্ল্যাটে থাকেমেয়ে হয়েছিল মামীরনন্তু মামার নামেই তার পরিচয়নন্তু মামার বৌ জানে সবকি আশ্চর্য্য, আজ এতকাল পরে তার মনে পড়লো সে কথাএতকাল ভুলেই গেছিলএ নিয়ে তাদের বাড়ীতে খুব ঝামেলা হয়েছিলজ্যাঠা বলেছিল নন্তু মামাকে কোনোভাবেই জমি দেওয়া যাবে না প্রোমোটিং-এর জন্যবাড়ির বৌ নিয়ে টানাটানি করে রাস্কেলকাকা বলেছিল সুব্রত, জ্যাঠার দলের লোক হলেই কি সাতখুন মাফ? বৌ বেচেছিল কে? আবার কার কাছে বেচত কে জানে? তার চেয়ে যা হয়েছে ভালইব্রততী মামীর বাপের বাড়িতে জায়গা ছিল নাকোথায় যেত? বাবা কিছু বলেননিশুনছিলেন শুধুএরপরেই লেগে গেল জ্যাঠা-কাকায় ধুন্দুমার কংগ্রেস-সিপিএম লড়াইব্যাস, সে জমিতে আর আজ অবধিও বাড়ী হয়নিজ্যাঠা-কাকা দুজনেই এখনো বেঁচেকিন্তু জমির বিক্রি হবে না আর এই সিদ্ধান্ত হয়ে আছেবোধির এতকাল পরে মনে পড়লো ব্রততী মামী খুব ভাল কবিতা আবৃত্তি করতেনঅন্যমনস্ক হয়ে গেছিল বোধিমহিলা বললেন,

- আমার স্বামী থাকলে হয়তো পাঠাতো নাসিঁদুরের দাম রাখতো

গল্পটা এরকম যে, মহিলাটির স্বামী উন্মাদ ছিলতার বাড়ির লোক বিয়ে দিলে মাথার ঠিক হয়ে যাবে ভেবে বিয়ে দিয়েছিলমহিলার বাড়ীর লোক জানতোকিন্তু জমিতে খুব লোকসান হয়েছিলতাই বিয়ে দিয়েছিল তার সঙ্গেবিয়ের কিছুকাল ভালই ছিল লোকটা এক সন্তানের জন্মও দেয় সেতারপরে পালিয়ে যায় লোকটাআর কোনো খবর নেই মাথায় সিঁদুর নিয়ে সে কাল কাটাচ্ছেকে জানে বেঁচে আছে না মরেছে?

- লোকটা যখন ঠিক ছিল তখন জানেন মাটির মানুষ ছিলএখনো আমি বটঠাকুরতলায় বছরে একবার পূজো দিই ওর নামে

- যে আপনার সঙ্গে থাকলোই না তার জন্যে আবার এত কেন?

-তা বললে হয়হাজার হোক সোয়ামি তোমেয়েছেলের আর কি আছে জীবনে?

-কেন, ইন্সিওরেন্স?

বোধির মুখে এসে গেছিল কথাটাঅসম্ভব তেতো মুখে এসেছিলমহিলা অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলেন তার দিকেএভাবে বলতে চায়নি বোধিকিন্তু কি করবে? তামাশার শেষ নেই কি জীবনের? যে মেয়ে বাজারে বেরিয়ে পড়েছে নিজের জীবনটাকে ভাসিয়ে রাখতে, তার কাজ ইন্সিওরেন্স বেচা? তাকে কে ইনসিওর করেছে? জীবন সে কম দেখেনি সাংবাদিক হয়েকিন্তু সেই দেখা তাকে ক্লান্তুও করেছে ক্রমশআর কত দেখবে? কত দেখলে আর দেখালে মানুষের অন্ধত্ব যাবে? জীবনের মতন রুঢ় শিক্ষক সে দেখেনি আর মাঝেসাঝে মনে হয় তার আর সহ্য হচ্ছে না কিছুই

রক্ষা করো, রক্ষা করো দুটি চোখ
হয়ত তাদের এখনো দেখার কিছু কিছু বাকী আছে
অশ্রুপাত শেষ হলে , নষ্ট করো আঁখি
কুড়িয়ো না ফুল মালা
স্তবক সুগন্ধে আলু থালু প্রিয়কর স্পর্শ
ওর গায়ে লেগে আছে
গঙ্গা জ্বলে ভেসে যেতে দিও ওকে মুক্ত ,স্বেচ্ছাচারী
ও চির প্রনম্য অগ্নি আমাকে পোড়াও।”

আমাকে পোড়াও (শক্তি চট্টোপাধ্যায়)

(ক্রমশঃ)

 
Leave a comment

Posted by চালু করুন অক্টোবর 16, 2011 in উপন্যাস, ধারাবাহিক

 

Tags: , , , , , , , , , , , , , , , , , ,

ইচ্ছামতী (দ্বিতীয়াংশ)

প্রচ্ছদ

 

পিরীতি নগরে

পিরীতি নগরে……………. বসতী করিব
………….পিরীতে বাঁধিবো ঘর
পিরীতি দেখিয়া……………..পড়শী করিবো
………….তাবিনে সকলি পর
পিরীতি ঘরের …………….কপাট করিবো
…………..পিরীতে বাঁধিবো চাল
পিরীতি মজিয়া…………….সদাই থাকিব
…………….পিরীতে গোঙ্গাবো কাল।।
— দ্বিজ চন্ডীদাস
সুতনুকার শেষবার বাপের বাড়ি চলে আসার আগের রাতে তাকে রজত ধর্ষণ করেছিল। অধিকার কায়েম করার জন্য। তার সন্দেহ বৌ অন্যের সঙ্গেই শোয় শুধু, তার সঙ্গে শোয় না। সে যার সঙ্গেই শুয়ে থাকুক না কেন, সুতনুকা কেন শোবে? কেন তার বিছানা শুধু তার জন্যই সংরক্ষিত থাকবে না? এমন অবিচারের প্রতিকার করাটা সে তার পুরুষালী কর্তব্য হিসেবেই নিয়েছিল। তাই ধর্ষণ। সেই আদিকালের পুরুষের ধর্ম। সকালে যখন সুতনুকার ঘুম ভেঙেছিল অসহ্য যন্ত্রণায়, তখন ঘেণ্ণায় তার মরে যেতে ইচ্ছে হয়েছিল। কদিন ধরেই রজতের অত্যাচার বাড়ছিল। কথায় কথায় দুর্ব্যবহার, মারধোর চলছিল। কিন্তু সুতনুকা শ্বশুরবাড়ি ছাড়েনি। ছাড়তে পারেনি। ছেড়ে যাবে কোথায়? বাপের বাড়ি গেলে একই সমস্যা। বাবা মানতে পারবে না। তাকে পাঁকের মধ্যে পড়ে থাকতে হচ্ছে। হোক্‌, কিন্তু তাতে কি? সামাজিক সন্মান আছে না? সেখানে এই বিয়ে ভাঙাকে কে মানবে? তাছাড়া শেষ বললেই হবে? দেশে আইন-কানুন নেই নাকি? অপেক্ষা করতে হচ্ছিল। ম্যাগাজিনের কাজ শেষ করে সেদিন রাতে যখন সুতনুকা বাড়ি ফিরেছিল তখন তার স্বামী তার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। মারের চোটে কানের পাশ দিয়ে রক্ত গড়াচ্ছিল তার।
-খানকী মাগি, কোথায় লাগাচ্ছিলি আজ?
চুপ করে ছিল সুতনুকা। আবার একটা চড় পড়েছিল চোখের পাশে। ছিটকে পড়েছিল খাটের পাশে। চোখটা ফুলে গেছিলো। চোখটায় আর কিছু দেখতে পারছিল না। দেখার কিই বা ছিল?
-চুপ করে কেন, বল্‌?
সুতনুকা কোনো রকমে কান্নাটা চেপে কাত হয়ে পড়েছিল। সে কাঁদবে না। কাঁদলে লোকটার জয়। এই লোকটাকেই একদিন সে বিয়ে করেছিল ভালবেসে।
-আমাকে মিথ্যে বলেছিস কেন? তুই কোথায় কার সঙ্গে ছিলি তা আমি জানিনা?
কি জানার আছে আর? কি বাকী আছে এই সম্পর্কে? ওর সঙ্গে, এই বাড়ির সঙ্গে, কার সঙ্গে আর কি বাকী আছে? এই যে সে ছিটকে পড়ছে গ্লাসটা মেঝেতে পড়েছে। টেবিলে ধাক্কা লেগেছে। ষাঁড়ের মতন চেঁচাচ্ছে রজত। ঠিক দুট ঘর পরেই থাকে রজতের মা। শব্দ পাচ্ছেন না এমন হতে পারে না। কিন্তু এক পাও আসবেন না এগিয়ে। ছেলে বৌ-কে শাসন করছে। এটার মধ্যে অস্বাভাবিক কি আছে? শেষবার সুতনুকাকে আনতে তার বাপের বাড়িতে গিয়ে বলেছিলেন সুতনুকা তাঁর আরেকটা মেয়ে। মেয়ে বলা আর মনে করা কি এতই সহজ? সত্যি মেয়ে হলে এভাবে পড়ে পড়ে মার খেতে হত সুতনুকাকে?
- দাদার সঙ্গে কেসের কাজ করছিলি না? ভেবেছিলি এই সব বলে কলেজ স্ট্রীট-এ নাঙ নিয়ে ফুর্তি করতে গেলে কেউ জানতেও পারবে না, না? আমার লোক দেখেছে রে! খানকী। আর ওই অরিন্দম তোর কোন জন্মের দাদা? মায়ের পেটের ভাই? দাদা মারানো হচ্ছে? শ্লা, জীবনটা বরবাদ হয়ে গেল তোকে বিয়ে করে।
রেজিস্ট্রি করার সময়ে কতই বা বয়স ছিল তার? উনিশ হবে। রজতের ছিল একুশ। তখন যে স্বপ্নগুলো, সেগুলো এমন হবে কে জানতো? অবশ্য সত্যিই কি জানতো না সুতনুকা? টের পায়নি?
রেজিস্ট্রি করার পরে সুতনুকা বাড়িতে লুকিয়ে রজতের সঙ্গে গেছিল দীঘা। দু দিন ছিল। বাড়ীতে বলে গেছিল তার বন্ধু তমালির বিয়ে। তাই যাচ্ছে দুর্গাপুরে। নিয়ম করে ফোনও করেছিল বাড়িতে। সে আমলে কলার আই ডি লাগানো ফোন ছিল না। কাজেই ফোনটা কোথা থেকে করছে তা বোঝার উপায়ও ছিল না। তারপরে দুদিন পরে ফিরে এসেছিল। রজত বলেছিল শুধু সময়ের অপেক্ষা। কদিন পরেই সে ফাইনালের রেজাল্টটা বেরোলেই বাড়িতে জানিয়ে দেবে সে সুতনুকাকে বিয়ে করেছে। সে জানানো হয় নি। কিন্তু গর্ভবতী হয়ে পড়েছিল সুতনুকা। রজত প্রথমে রাগে ফেটে পড়েছিল। তার বক্তব্য সুতনুকা ইচ্ছে করেই পিল খায়নি। এইভাবে তাকে ফাঁসাতে চাইছে। সুতনুকা কিচ্ছু বলেনি। কলেজে পড়াকালীন প্রেম হয়েছিল তাদের। প্রেম? সে যাই হোক। বাড়ি চলে এসেছিল কলেজ থেকে। সুতনুকার বাবা একদিন ধরতে পারলেন। সুতনুকা রাজী হয়নি গর্ভ থেকে সন্তানকে ফেলে দিতে। যথাসময়ের কয়েকদিন আগে, সুতনুকার তখন হাঁটতে চলতে কষ্ট হয় খুব, মাসির বাড়ি যাওয়ার নাম করে তাকে নিয়ে তার বাবা বেরিয়ে গেছিল তাদের শরিকি বাড়ীর থেকে। উঠেছিল বাবার এক দূর সম্পর্কের বোনের বাড়ি। তারপরে নার্সিংহোম। যখন চোখ খুলেছিল তখন সে জানলো তার বাচ্চাটা মারা গিয়েছে। বিশ্বাস হয় নি তার। চোখ দিয়ে একফোঁটা জলও পড়েনি। নার্সরাও বলেছিল এ তো পাষাণ। সে কিন্তু চুপচাপ বাড়ি ফিরে এসেছিল। আর ফিরে এসে একটু সুস্থ হয়েই আবার গেছিল ওই নার্সিংহোমে। যে আয়াটা তাকে দেখভাল করতো তাকে খুঁজে বের করেছিল। কিছু টাকা দিয়েছিল তার হাতে, মুখ খোলানোর জন্য। তার কাছেই শুনেছে সব। নার্সিংহোমটি এক খ্যাতনামা মহিলা ডাক্তারের। তিনি গাইনোকোলোজিস্ট। নার্সিংহোমে তাকে আসলে ভরতি করিয়েছিল রজত। তার বাবা পরে আসেন। আয়া তাকে বলেছিল সুতনুকার বাচ্চা মরেনি। তাকে দিয়ে দেওয়া হয়েছে অন্য এক দম্পতির কাছে। এই নার্সিংহোমে এমন হয়। রজত, তার বাবা, আর যাঁর নার্সিংহোম চালান তারা সকলে মিলেই এ কাজ করেছে। আয়াটা নাক টানতে টানতে বলেছিল,
- তুমাকে বন্নু দিমণি, কিন্তু কেউরে ঝেন বলুনি এ কতা। নইলে আমারে আর বাঁচতি হবে না। তুমি ট্যাকা দিলে। ভাল বেভার করেচিলে। ইয়াঞ্ছাড়া মায়ের পেরাণ তো, তাই…!
রজত এসেছিল একদিন তারপরে বাড়িতে। সন্তান মৃত এমনই ভাব তার। সুতনুকাকে বললো তার বোনের বিয়ে না হলে সে বিয়ে করতে পারবে না নিয়ম মাফিক। এই অবস্থায় সন্তান হলে তার পরিবার আর মুখ দেখাতে পারতো না। সুতনুকার বাবা পাশে বসে বুঝদারের মতন মাথা নেড়ে গেছিলেন। বিয়ে সে করবে, কিন্তু আর কটা দিন পরে! বোনের বিয়ের চেষ্টা চালাচ্ছে পুরোদমে। রজতের মায়েরও ইচ্ছে তাই। রজতের মা একটা বালা পাঠিয়েছেন সুতনুকার জন্য। পুত্রবধূকে না দেখলেও আশীর্বাদ করেছেন। সুতনুকা চোখটা বন্ধ করে নিয়েছিল। তখনই কি তার বোঝা উচিত ছিল না?
- আমি তবু এমন ভাবিনি গো সত্যি!
ফোনে বলতে বলতে চুপ করে গেছিল সুতনুকা। বোধহয়, একটা তীব্র কষ্টকে গিলে নিতে। বোধি সত্যি-মিথ্যে নিয়ে মাথা ঘামায় নি কখনো। কি ঘামাবে? কেনই বা? সে নিজে পরমার সঙ্গে থাকে। ‘লিভ টুগেদার’ হল তাদের সম্পর্কের পোষাকি নাম। তা বলে তা বিয়ের থেকে কম কিছু না সে সাধারণ ভাবে যতই বলা হোক অন্যকথা। প্রেম থেকে দায়িত্ব কোনোটাই কম না। সুতনুকার সঙ্গে তার সম্পর্কের কোনো ব্যাখ্যা নেই সামাজিক। কিন্তু সম্পর্কটা গাঢ় হচ্ছে। শরীর আসা না আসায় সম্পর্ক হয় না। হয় তার গভীরে যাওয়া নিয়ে। তার আজকাল খুব কষ্ট হয় সুতনুকার জন্য। সুতনুকা যেখানে যেভাবে বড় হয়েছে সেখানে সে জানবে না অন্য কোনো জীবন আছে। আইন-কানুনই সব না, সমাজ সব না, মানুষ অনেক বড়। ভালবাসা অনেক বড়। কিন্তু সেই ভালবাসার জন্য জায়গা কই এই শতাব্দীগুলোতে? সুতনুকা চায় নিশ্চিত জীবন। আর একটা বিয়ে হয়তো! অথবা এমন একটা মানুষ যার অন্য কোনো বাঁধন নেই। কিন্তু কেন যে বোধিকে চাইতে গেল কে জানে?
ফোনের ওপারে সুতনুকার নৈঃশব্দের মধ্যে এপারে তার চোয়ালটা শক্ত হয়ে যাচ্ছিল। এককালে বোধির এমন ভদ্রলোকের পোষাক ছিল না। এখনো এই পোষাকটাকে তার মাঝেমাঝে বেশ ঘেণ্ণা হয়। আইন? তার ইচ্ছে করছিল রজতকে একবার উঠিয়ে নিয়ে আসতে। কম বয়সের মতন। মাঝরাতে গিয়ে তুলে নিতে। সঙ্গে ওই মাতালটাকে, যেটা সুতনুকার বাবা। তারপর বুঝে নিত কাকে বলে বরবাদ করা।
- দেখ, আমি সাধারণ মেয়ে। অসাধারণ হবার সাধ নেই। যা হবে তা শুধু আমার হবে, আমি এই জানি।
এই জন্যেই নিজে আইন জানা সত্ত্বেও সুতনুকা রজতের বিরুদ্ধে এফ আই আর করতে সাহস করেনি। সে তো এক সাধারণ মেয়ে। এফ আই আর করলে কেসটা ৪৯৮ এ ধারায় চলবে। সে ক্ষেত্রে রজতকে গ্রেপ্তার করলে জামিন অযোগ্য ধারা এটা। অন্তত ১৪ দিনের পুলিশি হেফাজত। কখনো কখনো সেখানে একটু টাকা-পয়সা খরচ করে নাকি মেরে থেঁতলে দেওয়া হয় অভিযুক্তকে। থার্ড ডিগ্রি দেওয়া হয় স্বীকারোক্তি পাবার জন্য জিজ্ঞাসাবাদের নামে। আবার এই আইন যেহেতু বেশীটাই মেয়েদের দিকে ঝুঁকে বলে কিছু ক্ষেত্রে এর অপব্যবহার হয়েছে। সুপ্রীম কোর্ট-ও বিষয়টি নিয়ে বেশ ওয়াকিবহাল। বিভিন্ন মহল থেকে এর বেশ কিছু সমালোচনা এসেছে। বোধি নিজেও জানে মিথ্যে অভিযোগে এই আইন এবং অন্যান্য ধারার সাহায্য নিয়ে ছেলের পরিবারকে ফাঁসিয়ে দিয়েছে মেয়ের পরিবার। কাজেই এখন কিছুটা হলেও পুলিশ সতর্কতা বজায় রাখে। কারণ এদিক-ওদিক হলে তাদেরই সব চেয়ে বেশী গালাগালি খেতে হবে।
কিন্তু এত গালাগালি খাবার সম্ভাবনা আবার বিচারকদের ক্ষেত্রে থাকেনা। তাঁরা এ ব্যাপারে খুব নিশ্চিত থাকেন। কিছু সমালোচনা করলেই তা আবার বিচারব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবমাননাকর মন্তব্য হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। কি অদ্ভূত ব্যাপার! একটা গণতান্ত্রিক দেশে বিচার ব্যববস্থা চলবে সামন্ততন্ত্রের মতন। কিছুদিন আগেও বাধ্যতামূলক ছিল কালো গাউন পরে বা কোট পরে কোর্ট করা। মানে কি? একটা গ্রীষ্মপ্রধান দেশে এ ব্যবস্থা কলোনীর প্রভু ব্রিটিশরা করে গেছিল বলে স্বাধীনতার পরেও তা চালিয়ে যেতে হবে? বলতে হবে ‘মি লর্ড’? এ দেশে কেউ লর্ড হবে কেন? বিচারক ঢুকলে সবাইকে দাঁড়াতেই হবে, নইলে নাকি সন্মান দেখানো হবে না, সেই কারণে পেয়াদা থাকে। বিচার চলাকালীন বিচারকের দিকে পেছন করে দাঁড়ানো যাবে না, তাতে অসন্মান হবে বিচারকের, এসব প্রথার মানে কি? কেউ যদি ইচ্ছে করে অসন্মান না করে তা হলেই তো হোলো। প্রথা দিয়ে সন্মান-অসন্মান মানানো মানে তো সেই দেখা হলে বড়োদের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতেই হবে এমন ব্যাপার। না হলে সন্মান হয় না? মেরুদন্ড ঝুঁকিয়ে দেওয়াটা ছিল রাজাদের রীতি। সে জন্য তারা বহু সময় দরবারের দরজা এমন উচ্চতায় বানাতো যে সেখানে ঢুকতে গেলে মাথা নামিয়েই ঢুকতে হবে। সেই নীতির মতন এটা না? কেউ যদি শ্রদ্ধা করে, সন্মান করে তবে সে করবে অন্তর থেকেই। তার প্রকাশের রাস্তাও সে খুঁজে নেবে, তাকে বাধ্য করে হয় না সেটা।
বোধির মনে আছে একটা কেসের কথা। তার বন্ধু জয় আর পারমিতার বিচ্ছেদের মামলা। পারমিতা-জয়ের সংসারে গিয়েছে বোধি। একসঙ্গে যখন থাকতো তখন দেখে এসেছে। পারমিতাকে জয়ের মা সত্যি ভীষণ ভালবাসতেন। জয়ের বাবা, একটু পুরোনো আমলের লোক, কিন্তু বৌ-মা’র জন্য তাঁর ভালবাসা খুব একটা লুকোনো থাকতো না। জয়-পারমিতার বিচ্ছেদ নিয়ে জয়কে সব চেয়ে বেশী বিরোধ সইতে হয়েছিল তার বাবা-মা’র। সে সব দিনও বোধি দেখেছে। জয়ের বাবা বোধিকেই ডেকে বলেছিলেন,
- ভেবেছিলাম ছেলে ডাক্তার হয়ে মানুষ হবে, কিন্তু এত দেখি অমানুষ হয়ে গ্যাছে। একটা মেয়ের সব স্বপ্ন বিনা দোষে ভেঙে দিচ্ছে। তোমরা বন্ধুরা কিছু করতে পার না?
করার উপায় ছিল না। আসলে দুজনের বিরোধটা শুধু বাইরের না, অনেকটাই অন্তরের প্রকৃতির বিরোধ। জয় স্বাধীনচেতা, আর পারমিতা বাইরের স্বাধীনতাকে খুব একটা নিতে পারেনি অন্তরে। তাই সিগারেট খাওয়া, অল্প-স্বল্প মদ খাওয়াতে যে আধুনিকতার তথাকথিত বহিঃপ্রকাশ থাকে সেই আধুনিকতা তার অন্তরে কোথাও ছিল না। তাই জয়ের সঙ্গে সব বিষয়েই বিরোধ ক্রমশ বাড়ছিল। একে মেলানো যায় না। এ হল দর্শনের বিরোধ। মেনে নিয়ে গায়ের জোরে চলা যায়, ওই অবধিই। হাজার হাজার বছর এমন হয়ে এসেছে বলে এমনই হতে হবে কেন? তাই বোধি জানে জয়কে বলে লাভ নেই। বরং আজ যা ভাঙছে তা কাল অন্য কোথাও গড়ে উঠলেও উঠতে পারে, কিন্তু এভাবে চললে আর ক’বছর পরে দুটো জীবনই ব্যার্থ হবে।
কিন্তু আদালতে যখন মামলা উঠলো তখন দেখা গেল পারমিতার বাড়ির অভিযোগের কবল থেকে জয়ের বাবা-মা’ও রেহাই পাননি। মানসিক-শারীরিক অত্যাচারের অভিযোগ উঠে এল। বিচারক একটি বেশী বয়স্ক তরুণ। কোর্টে বোধি গেছিল। বিচারকের চাউনি দেখেই তারে মনে হচ্ছিল এটা বেশ সমস্যার জায়গা। তরুণটি প্রথমে ভাল করে দেখে নিল পারমিতাকে, তারপরে জয়কে। পারমিতাকে দেখার সময়ে তার চোখ যা বলছিল তা খুব ভাল কিছু না। আর জয়কে যখন দেখলো তখন তার চোখটা দেখার মতন। বোধি বেরিয়েই জয়কে বলেছিল এ তো শুরুতেই ঠিক করে নিয়েছে কি আদেশ দেবে! উকিল বাসববাবু বলেছিলেন এমনই হয় লোয়ার কোর্টে। খুব কম পসারওয়ালা উকিলরাই এক সময়ে বিচারক হবার চেষ্টা করে। এমনি ব্যবহারজীবিকায় এদের একটা অংশ আসলে ব্যার্থ, তাই বিচারক হবার পরীক্ষা দিয়ে বিচারক হয়ে নিজেদের নিশ্চয়তা খোঁজে। দশ বছর প্র্যাকটিস দেখাতে পারলে এই পরীক্ষায় বসা যায়। সেখানে নানান কল করে বিচারক হয় একাংশ। এরা আইন-কানুন ভাল করে জানেও না। বাঘা উকিলদের সামনে পড়লে এরা কেঁচো, কিন্তু নতুনদের সামনে এরা বাঘ। তাছাড়া আছে নানান দুর্নীতিগ্রস্ততা। আজকে যে নামী ব্যবহারজীবি এবং নাগরিকদের একটা বড় অংশ এবং সুপ্রীম কোর্ট আইন ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে এত ভাবছেন তার কারণ এই। দিস্তে দিস্তে খারাপ জাজমেন্ট-এর রেকর্ডে ভর্তি ভারতের লোয়ার কোর্টগুলো। এই রোগ ক্রমশ হাইকোর্টকেও প্রভাবিত করছে। বিচারকের অভাব রয়েছে। হাইকোর্টে এর সঙ্গেই যুক্ত হচ্ছে রাজনৈতিক প্রভাবের প্রশ্ন। সুপ্রীমকোর্টের এক বিচারপতিকে নিয়ে যে জলঘোলা হচ্ছে তাও কিন্তু এই কারণেই। এবারে যাঁরা সত্যি সত্যি ভাবছেন তাঁরা চান সংস্কার। কিন্তু সে কবে হবে কেউ জানেনা!
বোধি শুনতে শুনতে ভাবে এই ভাবে গণতন্ত্র এবং বিচারব্যবস্থার হত্যা কি করে চলতে পারে! কতদিন চলবে? গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভটি যদি এমন হয় তাহলে কার বা কাদের লাভ? জয় অনেক কষ্টে বেরিয়ে ছিল বিচ্ছেদ নিয়ে। অনেক জলঘোলা হয়েছিল। তার পাড়ায়, তার কাজের জায়গায় প্রচুর নোংরা ছিটেছিল। ইচ্ছে করেই কেউ কেউ এই সুযোগে জয়কে চেপে দেবার চেষ্টা করেছিল। কেউ কেউ মিটিয়ে নিতে চেয়েছিল পুরোনো রাগ। কেউ স্রেফ খোরাক করার জন্যই খোরাক করেছিল, তাদের নিজেদের জীবনের ক্ষত ঢেকে দিতে। কাকু-কাকিমা নিস্প্রভ হয়ে গেছিলেন। এমন করে তাঁদের এত ভালবাসার ফল ফলবে তা তাঁরা ভাবতেও পারেননি। কাকিমা বোধিকে বলেছিলেন,
- আমি রাত জেগে বসে থাকতাম কখন মেয়েটা আসবে, এসে খাবে তাই! কখনো কোনো কিছুতে ওর অভাব রাখতে চাইনি। যাবার সময়েও বলেছিলাম দরকারে জয়কে বের করে দেব, তুই আমার কাছেই থাক মা। বললো শরীর ভাল না, বাড়ীর লোক বেড়াতে নিয়ে যাবে। বলে সেই যে চলে গেল তার শেষ হল এই ভাবে? ও আমাকে বলতে পারলো যে আমি মেরেছি, অত্যাচার করেছি। কি করে পারে রে বোধি? আমার ছেলে যা করেছে, যা ওদের মধ্যে হয়েছে তা আমি জানিনা। তার জন্য যা ভাল হয় করতো, আমার বলার কিছু ছিল না। কিন্তু এত ভালবাসার দাম এই?
মহিলা কাঁদছিলেন। কাকিমাকে ছোটবেলা থেকে দেখে আসছে বোধি। সারাজীবন সংসারের জন্য খেটে গিয়েছেন, নিজের সুখ-সুবিধা নিয়ে মাথা ঘামাননি। কোনোদিন তারা বন্ধুরা জয়ের বাড়িতে গেলে সবার আগে জানতে চেয়েছেন কি খেয়ে এসেছে তারা। দিন বা রাতের যে কোনো সময়েই তারা গিয়েছে, নিজের হাতে খাবার করে এনে দিয়েছেন। না খেলে বকে-ঝকে খাইয়েছেন। কিন্তু কখনো গলা তুলে কথা বলতে দেখেনি ওনাকে কেউ। ইনিও সাধারণ মানুষ। সুতনুকার কথা মতই। তাই এই অপমান খুব গায়ে লেগেছে। পাড়ার লোকের চাউনি, আকার-ইঙ্গিত, তথাকথিত বন্ধুদের মুখ টিপে শুভকামনার বদলে ধাষ্টামো এসব গায়ে লেগেছে ওনার। সুতনুকাও এমন সব কিছুরই ভয় পায়। নিজেদের যারা সাধারণ মানুষ বলে তারা এই সব নোংরা সামাজিক কীট-পতঙ্গের মোকাবিলায় সক্ষম নয়। বা সক্ষম হতে চায় না। তাই ভয়ে ভয়ে জীবন কাটায়। করার কাজ করে না, গুমরে গুমরে মরে।

তাই সুতনুকা যখন বলে সে যাকে চায় সে শুধু তারই হবে, তখন বোধি ভাবে ঠিকই তো আছে। কেন অন্য কিছু হতে চাইবে সুতনুকা? এই তো বহমান জীবন। তার জীবনে সুতনুকা থাকলে তার ভাল লাগবে, কিন্তু তার জন্য পরমাকেই বা সুতনুকাকে মানতে হবে কেন? আবার সে পরমার সঙ্গে জড়িয়েই বাঁচে। পরমা পরমাই। সে তার স্ত্রী, এই দিয়ে পরমাকে ব্যাখ্যা করা যায় না। তার জীবনের গভীরে রয়েছে পরমা। এই থাকার জন্য অনেক অনেক মূল্য দিয়েছে তারা দুজন। তবেই এক অস্তিত্ত্ব অন্য ছাড়া আজ সম্পূর্ণ হয় না। সেই দাম কে দেবে? অনুজা চলে যাবার পরে বোধি যখন নিজের টুকরোগুলোকে সামলাতে পারছিল না তখন পরমার সঙ্গে তার দেখা। কাগজের অফিসে এসেছিল পরমা। ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকতার জন্য। বোধির সিনিয়র পরেশদার টেবিলে বসেছিল। বোধি তাকে দূর থেকে দেখছিল আর মনে মনে বিরক্ত হচ্ছিল। পরমার গোটা চেহারাটার মধ্যে রয়েছে কৃষ্টির ছাপ। সুন্দরী যে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহই নেই। কিন্তু তার সঙ্গে বাড়তি হল সেই সৌন্দর্য্য স্নিগ্ধ এবং বুদ্ধিদীপ্ত। পরেশদা কলকাতা পাতাটা দেখে। পাক্কা বদ লোক। মেয়েদের কাজ দিতে গেলে তাকে সিনেমা হলে বা রেসর্টে না নিয়ে গেলে পরেশদার হয় না। আর না হলেই লেখার পরিমাণ কমে যায়, লেখার পরে পেমেন্ট পেতে সমস্যা হয়। ছেলেরা ওখানে কাজ পায়ই না। পেলে একমাত্র পায় বড় কোনো মাথার সরাসরি হস্তক্ষেপে। অফিসে সকলেই জানে পরেশ কেমন, কিন্তু তার জন্য কোনোদিনই তাকে নিয়ে ম্যানেজমেন্ট বা বড়সড় কারোর মাথা ব্যাথা দেখেনি বোধি।
বসে বসে এইসব ভাবছিল আর হাতের কপিটা পড়ছিল। সম্পাদনা করতে হবে। লেখাটা একটু বড় হয়ে গ্যাছে। কখন সে মন দিয়ে লেখাটা পড়তে শুরু করেছিল খেয়াল নেই, এর মধ্যেই আচমকা তার টেবিলে এসে দাঁড়াল পরমা।
- একটু বিরক্ত করছি!
- অ্যাঁ! হ্যাঁ বলুন!
বোধি একটু বিব্রত বোধ করে। টাটকা টাটকা মেয়েটাকে নিয়ে ভাবছিল, আর মেয়েটাই তার সামনে হাজির।
- আমাকে অমিত পাঠিয়েছে এখানে। বলেছিল আপনার সঙ্গে দেখা করতে একবার।
অমিত? হিসেব মেলাতে চেষ্টা করে বোধি। সেও তো আরেকজন। এ কি অমিতের নতুন বান্ধবী নাকি? অমিত নতুন বান্ধবী ধরলে সবার আগে এখানে কিছু না কিছু লিখতে পাঠিয়ে দেয়। পরেশ হোক কি অন্য কেউ, কাউকে না কাউকে ম্যানেজ করে একটা লেখা লেখানোর ব্যবস্থা অন্তত করে ফেলে অমিত। তাহলে পরেশের গুড়ে বালি। কিন্তু, অমিত? পরমা কিছু বলছিল, কিন্তু তার কানে যায়নি। তারপরে পরমাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে আবার করে শুনতে চেয়েছিল। পরমার চোখে-মুখে বিরক্তিটা ফুটে উঠেছিল। কিন্তু বোধি পাত্তা দেয়নি। দু-একটা কথা বলে তারপরে বিদায় দিয়েছিল পরমাকে। অমিতই হোক কি পরেশ, যে পথে পা দিচ্ছে তাতে এমনই কেউ না কেউ থাকবে থাবা পেতে। সে কি সবার ঠেকা নিয়েছে যে এত মাথা ঘামাবে? ধুস্‌! সরিয়ে নিয়েছিল মনটাকে। কিন্তু ঘটনাচক্রে তার সঙ্গেই কাজ পড়লো পরমার। কলকাতার রাস্তাঘাট নিয়ে লিখতে হবে। কোন রাস্তার নাম কিভাবে হল, কেন হল এইসব নিয়ে। আর এখন তার অবস্থা কি, সেটাও লিখতে হবে। বোধির কাঁধে পড়লো মূল দায়িত্ব, পরমাকে তার সহকারী হিসেবে দেওয়া হল। ‘কলকাতার পথঘাট’ থেকে শুরু করে শ্রীপান্থর লেখা সব ঘাঁটতে শুরু করলো। অনেকদিন বাদে চললো ন্যাশনাল লাইব্রেরী। সেই সঙ্গে রাস্তাগুলোর এখনকার অবস্থা দেখে আসার জন্যও হাঁটা লাগালো।
সব রাস্তা না, কয়েকটা রাস্তা বেছে নিয়েই সিরিজটা করবে তারা। বোধি প্রথমদিন অফিস থেকে বেরিয়ে কিছু কিছু রাস্তায় ঘুরে এবং দেখে, নোট নিয়ে যখন ন্যাশনাল লাইব্রেরীতে গেল, তখন চা তেষ্টা পেয়েছিল খুব। ঢোকার আগে ক্যান্টিনে চা-এর অর্ডার দিয়ে দুজনে বসেছিল। আচমকাই বোধির মুখ থেকে বেরিয়ে এল কথাগুলো। কদিন ধরেই ভাবছিল। বলেই ফেললো।
- আচ্ছা, এই অশিক্ষিতদের জায়গায় ঠিক কি করতে এসেছেন বলুন তো? গ্ল্যামার নাকি? সাংবাদিক বলতে বেশ লাগে তাই? দিব্বি পড়শোনা করছিলেন তো, গবেষণাও তো করতে পারতেন। কাজে দিত মানুষের কিছু। এসব পাতি দালালি করে জীবন নষ্ট করতে এসেছেন কেন?
হকচকিয়ে গেছিল পরমা। কানটা লাল হয়ে গেছিল। নাকটাও। খুব রেগে গেছিল পরমা। আর খুব রেগে গেলে পরমা কোনো কথা বলতে পারে না। চুপ মেরে যায়। তারপরে দুদিন আসেনি পরমা। তৃতীয়দিন এল। হাতে তার অনেকগুলো নোটস।
- আমার মনে হয় না এটা লেখার জন্য এর বেশী লাগবে।
বোধি কথা না বলে হাত থেকে নিল নোটসগুলো।
- ঠিক আছে। পড়ে জানাবো। তবে কাল আমি দুদিনের জন্য মুর্শিদাবাদ যাচ্ছি। এসেই জানাবো।
- আপনার ইচ্ছে। তবে দরকার হলে আমাকে ফোনেও জানাতে পারেন।
বোধি কখনোই পরমার ফোন নাম্বার চায়নি। পেয়ে সেই রাতেই ফোন করেছিল। অফিস থেকে বাড়ি ফিরেছিল তাড়াতাড়ি। নটায় ফোন করেছিল। বেশ গোছানো কাজ। ভাল হয়েছে বলতে। বলতে বলতে বোধি কখন যে প্রসঙ্গান্তরে চলে গ্যাছে তা মনেই ছিল না। পথ বস্তুটা সভ্যতায় কত গুরুত্বপূর্ণ তা বোঝাতে শুরু করে দিয়েছিল। রোমের রাস্তাই রোমের সাম্রাজ্যকে ধরে রেখেছিল। সেই শিক্ষা শের শাহ সুরী এদেশে কিভাবে কাজে লাগিয়েছিল, কিম্বা তারও আগে কুবলাই খান কিভাবে চীনকে পথ আর দেওয়াল দিয়ে বেঁধে ফেললো, সে সব কথায় চলে গেছিল কখন। ব্রিটিশরা পথের মাহাত্ম্য এত ভাল করে বুঝেছে রোমের ইতিহাস ঘেঁটে। সেই জন্যেই রেল থেকে সড়ক সব নিয়েই তাদের ভাবনা ছিল। আর আজ এই পথই দু ধরণের হয়ে গ্যাছে। একধরণের পথে ট্যাক্স দিয়ে যাওয়ার। আগের আমলে জমিদারেদের বানানো রাস্তার মতন। অন্য ধরণেরটায় ট্যাক্স দিতে হয় না, কিন্তু রাস্তা বলে যা আছে তা রাস্তার ক্যারিকেচার মাত্র। এখন সরকারদের কাজ হচ্ছে শুধু রেল বা সড়কপথ, ব্রীজ, ফ্লাইওভারের জায়গা দিয়ে দেওয়া। টাকা দেবে বিদেশী ব্যাঙ্ক, তাদের পছন্দ মতন বিদেশী প্রযুক্তিতে তৈরী হবে, সব শেষে তারাই নেবে ট্যাক্স। সে সব পথে সাইকেল কি গরুর গাড়ি চলবে না, চলবে বাস, ছোট গাড়ি আর ট্রাক। সেই পথে বা ব্রীজে পদাতিকের ঠাঁই নেই। এইভাবে দেশের মধ্যে বিদেশ তৈরী হচ্ছে। সরাসরি ধনী আর গরীবের আলাদা আলাদা রাস্তা মেপে দেওয়া হচ্ছে। এসব বলতে বলতে থামলো যখন তখন দেখলো ঘড়িতে বাজে সাড়ে এগারোটা। দু দিন পরে মুর্শিদাবাদ থেকে যখন ফিরলো তখন রাতেই বাড়িতে এল পরমার ফোন।
- শুনলাম শরীর খারাপ হয়েছিল আপনার? এখন কেমন আছেন?
সেই শুরু। তারপরে গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়েছে। বোধির সঙ্গে পরমার বন্ধুত্ব নিয়ে কম হইচই হয়নি অফিসে। পরমাও কাজ হারিয়েছিল তাদের কাগজে। টেলিভশনের চাকরী নিয়ে চলে গেছিল দিল্লীতে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন পরমার একটি ছেলের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরী হয়েছিল। অনন্য নাম ছেলেটির। সে একদিন বোধিকে ফোন করে বসলো।
- আপনি থাকলে পরমা আমাকে বিয়ে করবে না। আপনি সরে যান পরমাকে ছেড়ে।
এ কথা শুনে পরমা দিল্লী চলে গেছিল। ছিল দু বছর। কলকাতায় তখন কাজ নেই। আর দিল্লীতে পরমার যা সুখ্যাতি তাতে তার কোম্পানি কিছুতেই তাকে কলকাতায় পাঠাবে না। ন্যাশনাল নিউজেই রাখবে তাকে। থাকতে থাকতে একদিন পরমাও বুঝলো বোধি তার কাছে কি! বোধি বুঝেছিল। কিন্তু তার বলার উপায় ছিল না। পরমার সম্পর্কের কথা সে জানতো। তাকে ভেঙে বেরিয়ে আসতে বলতে চায়নি সে। কাউকে পাওয়ার জন্য কিছু ভাঙা তার ভাল লাগে না। সে অনুজাকে দিয়ে ভাঙনের মানে শিখেছে। দু বছর পরে এসটিডি আর কচ্চিত-কদাচিত যাতায়াতের পরে কলকাতায় কাজ জুটলো পরমার। ফিরে এসে পরমা স্রেফ এককথায় বিদায় নিয়েছিল ছেলেটির কাছ থেকে। বোধি আর পরমা দুজনেই বুঝে গেছিল তাদের জীবনে পরস্পরের জায়গাটা কি ও কেমন! দুই বাড়িতেই ততদিনে বুঝে গিয়েছে যা বোঝার। কিন্তু ফিরে আসার পরেও তারা বিয়ে করেনি। নিয়ম করে বিয়ে করাটা খুব প্রয়োজনীয় ছিল না তাদের। তাছাড়া বোধি এবং পরমার দুজনেরই বিয়ের উদ্দেশ্য নিয়ে অনেকগুলো প্রশ্ন ছিল। যৌনতা, সন্তান উৎপাদন বা সম্পদের চলাচল নিশ্চিত রাখার জন্য তারা বিয়ে করতে রাজী ছিল না। একদিন তারা একসঙ্গে থাকতে শুরু করলো।
বেশীরভাগ মানুষ নিজে কি পেল আর পেল না তাই নিয়ে ব্যাস্ত। পরমা? কি পেল তার হিসেব করলো কখন? কি দেওয়া হল না আর কেন হল না, তাই নিয়ে ভাবতেই তার দিন চলে গেল যে! একে বলে সমর্পণ! বোধির দুনিয়ায় ওই একটাই জায়গা আছে যেখানে কোনো হিসেব-নিকেশ নেই। তার কাছেও পরমা শুধু সমর্পণের ভাবনা। সেও জানে তার কোনো দেওয়াই যথেষ্ট না পরমাকে। আরো আরোর জন্য তারও ভাবনার অন্ত নেই। এ এত স্বাভাবিকভাবে আসে যে এ নিয়ে আলাদা করে বোধহয় এই প্রথমবার ভাবছে বোধি। বোধি জানে পরমা যতটা সহজ করে সুতনুকাকে নিতে পারে তা সুতনুকা পারেনা। সুতনুকার দখল আছে, আবার পরমার প্রতি শ্রদ্ধাও। পরমা ছাড়তে পারে বলে সুতনুকা অবাক হয়। সে নিজে ছাড়ার মানে এখনো শেখেনি। বিয়ে তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। যদিও বিয়ের মধ্যে থেকেই সে বোধির কাছে এসেছে, কিন্তু তাতে তার কোনো অসুবিধে হয়নি। অসুবিধে হয় বিয়ে ছাড়া চলার ভাবনায়। তার কাছে এটা ছাড়ার কোনো মানে নেই। পরমার মতন করে নিশ্চিন্তে সে বোধিকে ছাড়তে পারে না। ছাড়ার অন্য মানে যে পাওয়া তা শেখার দিন তার আজও আসেনি। আসবে কি কখনো? আসুক বা না আসুক তার আর দেখা হবে না বোধহয়। সুতনুকা আর পরমা এমন দুটো বিন্দু যারা কখনো মিলবে না।
হিন্দু বিবাহ আইন একবিবাহের অনুমতি দেয়। বহু বিবাহ রোধ হয়েছে। সমাজ উন্নতিতে গিয়েছে? কারা বললো যে বহুবিবাহ মানেই তা বর্বরতা? যারা বললো সেই সব পাশ্চাত্যের ঔপনিবেশিকরা সভ্যতার নিদর্শন ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখে গিয়েছে তার দেশে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও। তবুও বরাই করে সভ্যতার। বিবাহ শুধুই সম্পদ চলাচলের ব্যবস্থা? তার আর কিছু নেই? এ যেন সেই মানিকের সংলাপ!
–শরীর আর শরীর! তোমার মন নাই কুসুম?
এমনই তো ছিল লেখাটা? কে জানে? হুবহু মনে নেই তার। কিন্তু প্রশ্নটা মনে আছে। মন নাই? শরীর শুধু উৎপাদনের যন্ত্র? পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্য্যা…ইত্যাদি। ব্যাস, মনুস্মৃতির মানেই হল শুধু পুত্র উৎপাদন। বাৎসায়ন, অমন একটা জব্বর কামসূত্র নাম দিয়ে যৌনতার বিজ্ঞান সংকলন করেও বলছেন স্ত্রী সঙ্গমের সময় বেশ্যার মতন আচরণ করলেও সঙ্গম শেষ হলেই আবার সে লজ্জাশীলা হয়ে যাবে। না হলে স্বামীর সন্দেহ হবে সে বহুগামিনী বলে। কি চমৎকার নৈতিকতার কম্প্রোমাইজ! শুধু হরিনাম জপতে জপতে সঙ্গম হয় না। সেটা বাৎসায়ন জানতেন। জানতেন বলেই এমন একটা ছক সাজিয়ে দিয়েছেন স্বামীদের ঘরের সন্তুষ্টি বিধান করতে। তার মানে আচরণও একটা বড় বিষয়। আসে কোথা থেকে আচরণ? মন না থাকলে আসে? অভিনয়-ও যদি হয় তা সক্রিয় মস্তিষ্ক ছাড়া সম্ভব? তাহলে শুধু শরীর আর শরীর থাকছে না! সেই শরীরের আধারে, তার দখলের আধারে, তার উৎপাদনের আধারে নির্মিত এই যে বিবাহ, এতে শুধু শরীর থাকবে, মন থাকবে না?
-শরীর আর শরীর, তোমার মন নাই বিবাহবিধি?
হাসি পায় বোধির। সভ্য সমাজ শুনলে আবার তাকে ছিছিক্কারে ভরিয়ে দেবে কিনা! কিন্তু বহুবিবাহ থামিয়ে দিলেও ভাঙছে না সংসার? সম্পর্ক? মরছে না লোক? কখনো খুন, কখনো আত্মহত্যা, কখনো জীবন্ত কবর সম্পর্কের মধ্যেই। তাহলে? নিয়ম করলেই হবে সব? হা হা হা হা হা! খুব হাসি পায় বোধির। জন্তুর স্বভাব মানুষের। কারণ মানুষ জন্তুই আসলে। অনেকানেক ভাললাগা এবং ভালবাসার প্রশ্ন আছে। সেই ভালবাসা কি হবে? লোভ-আকাঙ্খা-লালসা বাদই দিল না হয়! কারোর জানা নেই। হ্যাঁ, একটা ফাঁক আছে। এক স্ত্রী বা এক স্বামী যদি বাধা না দেন, তাহলে অন্য বিয়েতে সমস্যা নেই। কিন্তু কেউ বাধা দিলে সমস্যা আছে। আইন! এ দিয়ে কি হবে? সে তো ভালবাসে সুতনুকাকে। সে তো ভালবাসে পরমাকে। সুতনুকাও হয়তো আরো কাউকে এমন ভালবাসবে। তাহলে? কি হবে সম্পদের বন্টনের? কি হবে বিয়ের নিয়ম? সমাজে সম্পদের বন্টন না হলে, দখল সুনিশ্চিত না হলে কত মানুষের ঘুম উড়ে যাবে ভাবতেই তার হাসি পায়। কষ্ট করে তে-এঁটে বাঁধন বজায় রেখে, চোখ-কান বন্ধ রেখে সমস্যার সমাধান হচ্ছে। পাশেপাশেই বলা হচ্ছে মানবিক হচ্ছে না মানুষ যথেষ্ট। কি মজা না? ধরা যাক, তার, পরমা আর সুতনুকার মধ্যে যদি কোনো সমস্যা না থাকে এই সম্পর্কের জন্য তাহলে তো সব চেয়ে সভ্য ব্যবস্থা হওয়া উচিত তাতে কারোর নাক না গলানো। কিন্তু তা কি হয়? ধুস্‌! আবার হাসি পায় বোধির। হা হা হা হা হা…!
মানুষের সম্পর্কে শুধু যৌনতা না। তা হবার কথা না। হলে তো সে কাম নগর হয়ে যেত, পিরীতি নগর কি করে হবে? সে নগরের অধিজনেরা জানে সম্পর্ক অনেক গভীর এক অন্বেষণ, শুধু জামাকাপড় খুলে তাকে পাওয়া যায় না। সে তো জামাকাপড় না খুলেই ভালবেসেছে সুতনুকাকে। তার মত করে কে ভালবাসবে সুতনুকাকে? কে ভালবাসবে পরমাকে? ধরা যাক কোনো একদিন যদি পরমা আর সুতনুকা মনে করে যে তার সঙ্গে থাকা যায় একসঙ্গে, তাহলে? সে কি শুধু যৌনতা? সে তো কখনো তেমন করে ছুঁয়ে দেখেনি সুতনুকাকে। পরমাকে জানে একরকম। তাহলে? সুতনুকার প্রতি তার যে টান তা শুধু যৌন না, তার থেকে অনেক বেশী কিছু। যৌনতার সন্ধান সে জীবনে অনেক পেয়েছে। তা নিয়ে তার কোনো আলাদা আকর্ষণ নেই আজ আর। সুতনুকা তাকে কিনেছে সুরের কড়িতে। সুতনুকার কন্ঠে গান বাঁচে। তাকে সুতনুকা কিনেছে অপার এক কন্ঠের মায়ায়। সে মায়ার মানে কি? ধরা যাক, কাল সুতনুকা অন্য কোনো নিয়মমাফিক সম্পর্কের মধ্যে গিয়ে দাঁড়ালো, তাহলে কি হবে? ওই যে জায়গাটা সেটা থাকবে? সন্মানিত হবে? এমন মানুষ আছেন নিশ্চই যিনি সে সন্মান করতে পারবেন। কিন্তু না পারলে? যেভাবে বোধি সুতনুকাকে নিয়ে ভেবে চলেছে সেভাবে যদি কেউ কিছু না ভাবে? কিছু না করে? এর কোনো নিয়ম হয় না। কখনো ছিল না। বলা যায় যে ফর্মুলাটা এমন হবে, এমন হবে না। কিন্তু সে তো শুকনো তাত্ত্বিকের কথা, সে তো ভুয়ো-পন্ডিতের কথা, যে জীবনের মানে বোঝেনা। শুধু যা বোঝে তাকেই মানে হিসেবে দাঁড় করাতে পুলিশ আনে, সৈন্য আনে। জীবনের কথা কে জানে? বোধি জানে না কি করণীয়! সুতনুকা, এই লড়াইটা লড়তে পারবে না। সে এখনি ভেঙে ভেঙে পড়ছে। সেদিনের পর থেকে তাকে এড়িয়েই সে চলেছে। যদিও মুখে তা মানছে না, কিন্তু সেটাই সত্যি। বোধি তার কাছে শুধু দূরের একটা গাছ, যার শাখায় বসে মাঝেসাঝে দোল খাওয়া যায়, বাসা বানানো যায় না। কিন্তু বাসা কে দেবে?
বাপের বাড়ি থেকে চলে গিয়েছে সে। রজতের সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের মামলাটা এখন দু-পক্ষের সম্মতিতেই হবে। কোলাহল হবে না, কথা উঠবে না তেমন। আর কয়েকটা দিন বাকী আছে। অরিন্দম আবার তাকে সাহায্য করতে শুরু করেছে। বোধিদের ম্যাগাজিনের কাজ বা বোধির সাহিত্যচর্চার প্রতিষ্ঠানে আর সে আসেনা, এটা জানার পরেই অরিন্দম আবার নতুন করে সক্রিয় হয়েছেন। এখন তার ভাড়া করা ফ্ল্যাট। সেখানে ঘর নেই, ছাত আছে। সেখানে কোনোরকমে নিজেকে ছুঁড়ে ফেলে বিছানায় ভাবতে থাকে এরপরে কি? রাতটা কি করে কাটবে? ঘুম আসবে? কখনো আসবে ঘুম। বোতল খুলে যায়। যে সুতনুকা তার বাড়ির ত্রিসীমানায় সিগারেটও খায়না সে ওই ফ্ল্যাটে স্বাধীন বলে ভাবে নিজেকে। কি অদ্ভূত স্বাধীনতা। যাকে অন্য সময়ে অস্বীকার করতে হয় সেই স্বাধীনতার মানে কি? তাহলে কি সুতনুকার দ্বন্দ্ব আছে মদ আর সিগারেট নিয়ে? সে কি জানে যে কাজটা সে ঠিক করেনা? এত ভাবার মতন সুতনুকা না। আজকের দিনটাকে কাটিয়ে দিতে পারলে তার কালকের দিন আসে। সেই কালকের দিনের জন্য তার দুর্ভাবনা আছে, কিন্তু পরিস্কার ভাবনা নেই।
বোধি অপেক্ষা করছিল সুতনুকার কথা ভেসে আসার দূরভাষের দূরত্ব পেরিয়ে। তার আর রজতের সম্পর্কটা এমন দিকে যাবে জানতো না বলে চুপ করে গিয়েছে সুতনুকা। বোধির খুব ইচ্ছে হচ্ছিল মাথাটা কোলে নিয়ে শুইয়ে রাখে তাকে। আস্তে আস্তে হাত বুলিয়ে দেয়। গভীর স্নেহ, গভীর মমতা নিয়ে। কিন্তু…!না, থাক। সুতনুকার কাছে রাত মানে, রজতের মার। রজতের গালি। রজতের মাতলামো। অথবা অনেক রাত্রে শালিনীর ফ্ল্যাট থেকে রজতের ফিরে আসার পরে তাকে একতলা থেকে টেনে দোতলায় তুলে এনে জুতো-জামা খুলিয়ে শুইয়ে দেওয়া।
-সোনাগাছিতে ঘর নিলি না কেন রেন্ডী?
সুতনুকার শরীর থেকে উঠে দাঁড়িয়েই সেদিন সুতনুকার কোঁকষায় লাথি মেরেছিল রজত। একটা শব্দ করে ঘুরে পড়েছিল বিছানাতে সুতনুকা। রজত উঠে বাথরুম গেছিল। তারপরে ফিরে এসে খিস্তি করতে করতে চেয়ারেই নেশায় অচেতন হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুমে ঢুলে পড়েনি সারারাত সুতনুকা। ঠায় জেগে বসেছিল। মাথাটা ফাঁকা ছিল। কিচ্ছু, কিচ্ছু আসছিল না মাথায়। সুতনুকা সারারাত জেগে থেকে সকালে উঠে বেরিয়ে এসেছিল এক কাপড়ে। না, থানায় যায়নি। বাপের বাড়িতে গেছিল ফিরে। বাবা অসম্ভব বিরক্তি গোপন রাখেন নি।কিন্তু সুতনুকার আর কোনো রাস্তা ছিল না।
- আমাকে কি ভাল লাগছে না?
-অ্যাঁ?
-বলছি আমাকে কি ভাল লাগছে না? আমি আজ সত্যি একদম সাজতে পারিনি। সকাল থেকে আসলে ইন্সিওরেন্স করে বেড়াচ্ছিলাম। জোর করে আমাকে পাঠালো অনিমেষদা।
বোধহয় অনেকক্ষণ বোধি অন্যমনস্ক ছিল। মহিলা বলে উঠলেন তাই। বোধি একটু হেসে বললো,
-এলেন কেন?
- না এসে উপায় কি? আমাকে কাজ দিয়েছে ও।
-উনি কি করেন?
-উনি? উনি আসলে…! আচ্ছা, আপনি কি করেন? ব্যবসা?
-বলতে পারেন।
-কিন্তু ওখানে বাংলোয় যারা ওঠে তারা সব বড় বড় লোক।
-ব্যবসা যারা করে তারা ছোটলোক?
-না না। মানে বাংলোয় ওঠা লোকেরা বেশ মন্ত্রী-টন্ত্রী, নেতা-টেতা বা অফিসার-টা। সব কেউকেটা!
-আমি ব্যবসা করি।
মহিলার খুব বিশ্বাস হল না। চামড়ার ভাঁজ বলছে সে কথা।
-আসেন আপনি এখানে?
-এখানেই তো আছি।
-না না। মানে প্রতি মাসে আসেন?
-কি হবে এত জেনে?
- না, ইচ্ছে না হলে…! আসলে আপনি এত দেখতে সুন্দর, তাই…!
-তাই? হা হা হা হা…
-হাসছেন? জানেন আমি না যে কারোর সঙ্গে পারিনা। পছন্দ না হলে…! পেটের দায়ে এসেছি। কি যন্ত্রণা কি বলবো! এর আগে একবার আমাকে এখানে আসতে হয়েছিল। মানে আমি তো বনগাঁয় আসিনা! বর্ডার থেকে আসা তো! ভয় করে। এই তো আজ রাতেই ভয় করছিল। বাসটা একদম ফাঁকা ছিল। আমি একা একা আসছিলাম শেষ কটা স্টপেজ। কন্ডাক্টরো নেমে গেছিল। হেল্পারটা আমাকে চেনে। এত রাতে আমি কোথাও যাইনা বলে বারেবারে জানতে চাইছে কোথায় যাব! এর আগে একবারই রাতে এসেছিলাম এখানে। তবে সে বার গাড়িতে এসেছিলাম। সে বারও বেশ মোটা টাকা ছিল। সেই লোকটাও খুব মোটা ছিল। কালো আর চোখগুলো একেবারে জ্বলছে। আমি কোনো রকমে ওর নাম্বার নিয়েছিলাম। সে আবার একেক বেলায় একেকজনকে চায়। আমি নাম্বার নিয়ে ঘরের বাইরে গিয়ে ফোন করেছিলাম। সে বার আমি জামাকাপড় পড়েছিলাম। আমি…

 
Leave a comment

Posted by চালু করুন অক্টোবর 13, 2011 in উপন্যাস, ধারাবাহিক

 

Tags: , , , , , , , , , , , , , , , , , ,

ইচ্ছামতী (প্রথমাংশ)

ইচ্ছামতী (প্রথমাংশ)

প্রচ্ছদ

       

                                                                            চক্রবৃদ্ধি সুদ শুধু

O WHAT can ail thee, knight-at-arms,
Alone and palely loitering?
The sedge has wither’d from the lake,
And no birds sing।

-La Belle sans Merci (John Keats)

এখানেও এখন পাখির ডাক নেই।  শৈবালগুলো এখানেও বিবর্ণ হয়েছে। ইছামতীতে। রাত গভীর হয়ে এসেছে। এখন রাস্তায় কিছু বড় বড় ট্রাক যাতায়াত করছে। সামনের পুলিশ থানাটাও প্রায় নিঝুম। হলঘর থেকে বেরিয়ে গেটের কাছে দাঁড়িয়েছে বোধি। কেউ নেই। একটু আগে লোডশেডিং হয়ে গিয়েছে। এই বাংলোয় সাধারণত এমন হয় না। এটা ভিভিআইপি-দের জন্য। কাজেই এখানে লোডশেডিং হলে সেটা বেশ গুরুতর ব্যাপার। কিন্তু আজকে হচ্ছে ঘনঘন। আজ নাকি কোথাও একটা ওভারহেডের কাজ হচ্ছে। একটু আগে সুমঙ্গল এসেছিল। সে ফোন করে জেনেছে বিদ্যুৎ পর্ষদ থেকে। আরো একঘন্টা থাকবেনা। রাতের আকাশটার দিকে তাকাল বোধি। কলকাতা থেকে এত দূরে আকাশটাও কেমন ভাল লাগে। ঝকঝক করছে আকাশ। কে বলে আকাশে তারা নেই? কলকাতায় তার ফ্ল্যাটের ছাদে দাঁড়ালে আকাশ মানে একটা ধুসর ছোপ রঙের। বিশুদ্ধ অন্ধকারও নেই ওখানে।

বিশুদ্ধ অন্ধকার নেই আর সবখানে,

নেই কোনো বিষ্ময় আর জাগতিক

উন্নতি টাঙিয়েই উড়ালপুলে গাণিতিক

চক্রবৃদ্ধি সুদ শুধু সভ্যতা, ব্যাঙ্ক, বিমানে;

মাথায় ঘুরছিল লাইনগুলো। বোধির হাতে মাঝেসাঝে কবিতা এসে পড়ে। এককালে নিয়মিত লিখতো। আজকাল কালেভদ্রে লেখা হয়। এখন এই ঘন অন্ধকার আকাশের বুকে তারাদের ঝিলমিল দেখে তার কাছে কবিতা এসে বসলো। সামনের গাছটার নীচে বাঁধানো একটা চাতাল আছে। বোধি ধীর পায়ে এগুলো। তাড়া করলেই কবিতাগুলো সব উড়ে যাবে। উড়ে যায় তার থেকে বারেবারে।

চাতালে বসে লাইনগুলো আরো কবার আউড়ে নিল সে। যেন মুখস্ত করছে। কিন্তু লাভ কি? সে তো এই লাইনগুলো লিখবে না কখনো। মেশিনে লেখে সে। মানে কম্প্যুটারে। কিন্তু সেখানেও লিখবে না এই কটা লাইন। হারিয়ে যেতে দেবে। সে জানে। সে নিশ্চিত করে জানে। কতবার কত মানুষকে হারিয়ে যেতে দিল! অথবা এভাবেও বলা যায় হারিয়ে গিয়েছে সে নিজেই।

এইখানে ইছামতী, অন্ধকার হয়ে আছে জল।
জাহাজের নোঙর পড়েনি বল কতকাল?
কতকাল শুধু ফিসফিস করে হাওয়া
বলে গ্যাছে আমাদের শুধু, শুধুই যাওয়া।
ফিরে আসেনাকো কোনো রোদ, প্রকৃত কখনো
বেলা হয়ে গেলে সারসেরা দূর পায়ে বিশ্রামে যেন,
কোন্‌ রাত্রি এত একা হয়, এইখানে এইখানে ছাড়া
তুমি জেগে থাক বহমান একা একা কালের পাহারা?

সে এখন চাইলেই লিখে ফেলতে পারে। কিন্তু লিখবেনা। যেমন এখন মেয়েটি বসে আছে তার জন্য কিছুটা দূরের ওই ‘ইছামতী’ হোটেলের ঘরে। সে চাইলেই তার সঙ্গে সঙ্গমে রত হতে পারে। তবু যাবেনা সে। তার হারিয়ে যাওয়াই কাজ। কলকাতা থেকে সে যখন এসেছিল এখানে তখনও এক রকম হারিয়েই গিয়েছে। সেই হারিয়ে যাওয়া তার সুতনুকার থেকে। পরমা জানে সে হারিয়ে যেতে এসেছে। পরমা তাকে হারিয়ে যেতে দিয়েছে। জানে না হারালে বড় কষ্ট তার। সুতনুকা, পরমা না। সে এত জানে-বোঝে না। বুঝতে চাওয়ার ইচ্ছেও তার নেই। অথবা বোধি শুধুমাত্র Bundle of contradiction! ইচ্ছে আর অনিচ্ছের দোলাচল।

ইচ্ছে। শব্দটা এই অন্ধকারে তার বেশ লাগলো। একটা আলগা আদর যেন শব্দটার মধ্যে। ইচ্ছে। পায়ে পায়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে এসেছে ব্রীজের উপরে। ছোট্ট ব্রীজ একটা। ক্যান্টিলিভার। মনে পড়তেই তার মনে এল কাইচি ওয়াতানাবে-র কথা। জাপানি এঞ্জিনীয়ার। অনেককাল আগে প্রায় ১৮৮০ সালে স্কটল্যান্ড এবং ইউনাইটেড কিংডমে গিয়েছিলেন পড়তে।বোধির মনে পড়লো ছবিটার কথা। কাইচি মধ্যে বসে আর দুইধারে দুইহাতে এবং পায়ের মধ্যে দড়িদড়া নিয়ে বসা জন ফাউলার আর বেঞ্জামিন বেকার। দুজনকেই ব্রিটেন স্যার উপাধি দিয়েছিল সেই আমলে ফোর্থ রেল ব্রীজ বানানোর জন্য। অনেকদিন আগে বোধি যখন সদ্য সাংবাদিকতা করতে এসেছে তখন সে এই ছবিটা নিয়ে একটা প্রতিবেদন লিখেছিল। তার লেখাটা নিয়ে সে গিয়েছিল অনুজার কাছে। অনুজাকে তখন সে অনুজাদি বলতো। অনুজা লেখাটা খুব গম্ভীর মুখ করে পড়েছিল। পড়া শেষ করে তার দিকে মুখ তুলে চেয়ে বলেছিল,

-তাহলে ছবি দিয়েই ছাপতে হবে তো?

অনুজা ডেস্কে ছিল। তাদের লেখার উপর কলম চালানো-টালানো, কি যাবে না যাবে সে সব খবরদারী করা ছিল তার কাজ। বোধি তখন সদ্য যুবক। লম্বা লম্বা চুল। গালে চিকণ দাড়ি। চোখদুটো খুব ইন্টারেস্টিং ছিল। মেয়েরা এমন বলতো। সে একটু হেসে বলেছিল ছবি না হলে বোঝা যাবে না যে গল্পটা। অনুজা চশমার ফাঁক দিয়ে দেখছিল তার দিকে। কিছুকাল পরে যখন অনুজার ফ্ল্যাটে অনির্বাণদার অনুপস্থিতি তারা দুজনে বিছানাটাকে মত্ত করে তুলেছিল তখন অনুজা তাকে খুব গম্ভীরভাবে বলে,

-এবারে ছবি তোল্‌।

সে তখন সবে প্রবেশ করেছে অনুজার মধ্যে। তার মধ্যে তুঙ্গ উত্তেজনা। অনুজা দুই হাতে দুই পা ধরে, কোমরের নীচে বালিশ দিয়ে শুয়ে। অনুজার লম্বাটে মুখের ডোলটার মধ্যে একটা চাপা হাসি খেলছিল। সে কোমরটা একটু তুলে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল,

-মানে?

-ছবি ছাড়া ক্যান্টিলিভার বোঝা যাবে?

অনুজা খিলখিল হাসিতে ভেঙে পড়েছিল।

Cantilever Bridge.—A structure at least one portion of which acts as an anchorage for sustaining another portion which extends beyond the supporting pier.

— John Alexander Low Waddell, Bridge Engineering

অনুজার হাতদুটো ওর পা দুটোকে ধরে আছে। এটা দেখতে দেখতে হাসি পেয়ে গেছিল বোধির। ব্রীজের কাছে দাঁড়িয়ে খুব মনে হচ্ছিল অনুজার কথা। অনুজার একঢাল চুল ছিল। আর ছিল একটা সোনালি ফ্রেমের চশমা। অনুজা এখন অনেক দূরে। অনির্বাণদার সঙ্গে ঘরটা ভেঙে গ্যাছে। সে থাকাকালীনই ভাঙছিল। দুজনে দুই দিকে ছুটে চলেছিল। তার সঙ্গে সম্পর্কটা হঠাৎ হয়ে যাওয়া একটা সম্পর্ক। খুব গভীরতা ছিল না প্রথমে। যা ছিল তা হল একটা আদিম টান। বোধির সঙ্গে অফিসের বাইরে দাঁড়িয়ে চা খেতে খেতে দু-একটা কথার কদাচিত ঝলকে যা খুলেছিল তা বাঁধন খুললো সিনেমা হলের অন্ধকারে। বোধির কিছু করতে হয়নি তেমন। শুরুটাও করেছিল অনুজাই। খিদে? অনুজাই তাকে বলেছিল হল থেকে বেরিয়ে বাসে উঠে,

-খিদে পেলে খেতে হয় লজ্জা করতে নেই।

প্রথমে বোধি বোঝেনি। কেন বলছে এমন? তার তো খিদে পায়নি। বোধি একটু বোকার মতন বলে বসেছিল,

-খিদে পায়নি তো!

-তাহলে হলে এতক্ষণ কি হল? আমার বুকটা তো ছিবড়ে হয়ে গেল রে!

বলেই আবার হাসিতে ভেঙে পড়েছিল। বাসের লোকেরা তাকিয়ে ছিল অবাক হয়ে তাদের দিকে। চাপাস্বরে কথা হতে হতে, আচমকা এমন দমফাটা হাসি, তাদের অবাক করেছিল। কিন্তু অনুজা এমনই। বোধিই লজ্জা পেয়েছিল। রাস্তার দিকে মুখ করে বসেছিল খানিকক্ষণ।

খিদে। শব্দটা তাকে ভাবিয়েছিল। সত্যিই খিদে তার ছিল। অনুজা যখন প্রায় লোকহীন হলে তার কোলে উঠে বসলো তার দিকে মুখ করে তখন আর তার ভাবার সময় ছিল না ভুল না ঠিক। তার আজন্মের খিদে ছিল। সেই খিদে মেটাতে পাগলের মতন অনুজার ব্লাউজকে তুলে দিয়ে…। তাকে শীলিত করেছিল অনুজা। তার বন্যতা, বর্বরতাকে থামিয়েছিল অনুজাই। অনির্বাণদার অনুপস্থিতি বা অফিস কেটে রেসর্ট, সবেতেই অনুজা ছিল তার শিক্ষক। ধীরে ধীরে তাকে শরীর চিনিয়েছিল সে। উদ্ভ্রান্তের মতন ঝাঁপিয়ে-লাফিয়ে শরীরকে ঘাঁটতে নেই। ধীরে ধীরে তাকে খুলতে হয়। তাকে সাজাতে হয় আদরে আদরে। আবার কখনো বন্যতাও ভাল লাগে। সেই বন্যতাও এক এক সময় এক এক রকম। বলা যেতে পারে অনুজা ছিল তার বাৎসায়ন। পেটের মতন শরীরের একটা খিদে আছে তা সে জানতো, কিন্তু তাকে মেনে নেওয়ার সাহস তার ছিল না। তাকে তার চারপাশ সে শিক্ষা দেয়নি কখনো। বরং সেই শিক্ষাকে সঙ্গোপনে গোপন করেছে। এর পরে, অনেক পরে বেঁচে থাকতে থাকতে দেখেছে এই শিক্ষা না থাকার ফলে কত কত সর্বনাশ ঘটে চলেছে তার আশেপাশে। আবার কত মানুষ এই শিক্ষাকেই চিহ্নিত করছেন আশেপাশের সমাজ কাঠামো ভেঙে দেওয়ার কারণ হিসেবে। এ এক আজব দুনিয়া। খিদেকে খিদে বলতে এত কষ্ট তার?

অনুজা চলে গিয়েছিল আচমকাই। অনির্বাণদার সঙ্গে সম্পর্কটা ভেঙে যাওয়ার পরে অনুজা তার এক ছোটবেলার বন্ধুর সঙ্গে থাকতে চলে যায় বস্টনে।একদিন আচমকাই তাকে এসে বললো।

-আমি চলে যাচ্ছি সামনের সপ্তাহে।

বিয়েটা ভাঙার পরে গোটা অফিসে ফিসফাসটা জোরদার হচ্ছিল। অনুজা আর তাকে নিয়ে অনেকদিনই একটা কানাকানি ছিল, কিন্তু এবারে এক্কেবারে সামনে এসে দাঁড়াল সেটা। একদিন সে ছুটি নিয়েছিল তার এক আত্মীয়কে দেখতে যাবে বলে। ছুটিটা আচমকাই নেওয়া। সকালে জেনেছিল, উনি অসুস্থ, হাসপাতালে আছেন। সেই জেনে সে ফোন করেছিল অফিসে। কেউ তাকে কিছু বলেনি। কিন্তু হাসপাতালে যাবার পথে তাকে সরাসরি ফোন করেন ভাইস প্রেসিডেন্ট ফিনান্স অ্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন। আগরওয়াল লোকটার নাম। আগে ছিল লোহার কারখানার ম্যানেজার। এখানে সংবাদপত্রের অফিসে তারা আসার সূত্র হল নতুন বোর্ড অফ ডিরেক্টরের মধ্যে আসা একটি চিটফান্ড গ্রুপের মালিকের লোক হওয়া। সাংবাদিক আর কারখানার মজুরের জন্য একই সিস্টেম তার। সে ফোন করে বললো,

-কোথায় আছেন আপনি বোধিবাবু?

একটু হালকা টান আছে তার কথায়। না হলে সে যে অবাঙালি তা কথা শুনে বোঝা যেত না।

-আমি রাস্তায়। কেন বলুন তো? কে বলছেন?

-আমি আগরওয়াল বলছি।

বোধি একটু অবাকই হয়েছিল আগরওয়াল? সে তাকে ফোন করেছে কেন? তার সঙ্গে কি দরকার?

-হ্যাঁ, বলুন!

-আপনি আসছেন কখন অফিসে?

-আমি? আমিতো আজকে ছুটি নিয়েছি।

-সে কি? আপনি আসছেন না? আমিতো আজকে এখানে এসেছিলাম আপনাদের সঙ্গে মিটিং করতে!

- মিটিং? কিসের? আমি জানিনা তো!

- আরে আমিও তো জানিনা যে আপনি ছুটি নিয়েছেন। এইচ আর কে বলেননি কিছু।

আসলে এটাই খেলা। হিউম্যান রিসোর্সেসকে না বলে ছুটি নিয়েছে সে। সেটাই আসল কারণ তাহলে। কিন্তু অসীমটা মহা খচ্চর তো! তাকে কিছুই বললো না। একবারও তাকে বলেনি যে অসুবিধে হবে কোনো! এখন সে ছুটি নেবার পরে লাগিয়েছে তাহলে। তাদের মধ্যে একটা অলিখিত নিয়ম আছে। যে কোনো ছুটিই তারা নিজেদের মধ্যেই নিয়ে নেয়। নিজেদের মধ্যেই। ন হলে এখানে ছুটি পাওয়া যায় না। মাইনের বেলায় সাকুল্যে ছ হাজার টাকা। কিন্তু নিয়মের বেলায় সংবাদপত্রের চব্বিশ ঘন্টা ইমার্জেন্সি ডিউটি থাকে। অফিসের আবার সময় কি? মোটা মোটা মাইনে পাওয়া তাদের বিভিন্ন বিভাগীয় প্রধানেরা প্রতিদিন এই সব জ্ঞান তাদের বিতরণ করে থাকে। নিজেরা তিরিশ-চল্লিশ এইসব মাইনে পায়। পায় ফোন থেকে গাড়ি সব কিছু। তার সঙ্গে বেশীরভাগেরই বাড়িতে বৌ-এর সঙ্গে বনেনা। ফলে বাড়িও যাওয়া তাদের কাছে বিড়ম্বনা। যেটা হয়, সেটা হচ্ছে এসব বলে-টলে সন্ধ্যায় আটটার পরে জুনিয়ারদের কাঁধে সব দায়িত্ব ফেলে মদ খেতে চলে যাওয়া প্রেস ক্লাবে। এটাই তাদের বচনের শেষ তাৎপর্য্য। এই সবের জন্য তুলনামূলক নীচু তলার লোকেরা নিজেদের মধ্যে বোঝাবুঝি করে ছুটি নেয়। না হলে ওভারটাইমও নেই আবার ন্যায্য ছুটিও জুটবেনা। বোধিও তাই করেছিল। তার সংবাদপত্র সম্পর্কে কোনো মোহ নেই। বেশীটাই হল ব্যবসায়ী মালিকের নতুন নতুন ধান্দা গোছানোর ব্যাপার। রাজনৈতিক ক্ষমতা বাড়ানো আর সেই সূত্রে নিজেদের ব্যবসাকে ফাঁপিয়ে তোলার কারবার। সে যে কাগজটায় কাজে ঢুকেছিল সেই কাগজটার মালিক গোষ্ঠী চিটফান্ডের লোক। তারা নিজেদের চিটিংবাজীটা ঢেকে রাখতে হাতে একটা কাগজ রেখেছে এখন। সেটা দিয়েই গ্রাম বাংলার বিস্তির্ণ অঞ্চলে তাদের যা যা দুনম্বরী চলে তাকে ঢেকে রাখে। তার সঙ্গে আদায় করে প্রশাসনিক মদত। খবর করার চেয়ে না করার জোর অনেক বেশী। নেতা, মন্ত্রী, এম এল এ, এম পি ফাঁসিয়ে দিয়ে সেই খবর না করে কাজ আদায় করাটাই তাদের আসল কাজ। কাজেই বোধির এইসব পরিস্কার হয়ে যাবার পর থেকে কোনো মোহ নেই আর। গৌরকিশোর ঘোষ কিম্বা ভবানী রায়চৌধুরী হবার দিন আর নেই।

-আপনি এমন যেমন খুশী ছুটি নিলে কি করে চলবে বলুন তো? এভাবে কাজ চালানো যাবে না বোধিবাবু। You must understand that news is our top priority, anything comes later on.

কে বলছে? না যে কাগজের ফাইল সাপ্লাই-এর থেকেও কাট মানি খায়, যে প্রতি সপ্তাহে শেয়ারের বাজারে বিনিয়োগের সুবিধার জন্য কোনো না কোনো বড় শিল্প-গ্রুপের খবর করায় বিশেষ অনুরোধ করে, যে রাত দশটার সময়ও সাংবাদিকদের সাধারণভাবে, এমনকি মহিলাদেরও গাড়ি দিতে অস্বীকার করে। বলে রাতের অত সমস্যা থাকলে আসবেন না চাকরীতে। সে বলছে? তাদের শুরুর দিকের ছ মাসের প্রভিডেন্ট ফান্ড জমা দেয়নি সরকারের ঘরে আগরওয়াল। বারেবারে কোম্পানির কাজের বিবিধ হিসেবে সে জল মেশায়। মিশিয়ে নিজের ভাঁড়ার বাড়ায়। খবর নিয়ে যার একটাই বক্তব্য হচ্ছে যে শুধু দেখবেন যেন টি আর পি থাকে। আর মালিকগোষ্ঠীর উদ্দেশ্য হানি করে এমন খবর যে জান থাকতে ছাপতে দেবে না, সে বলছে এ কথা?

-দেখুন মিস্টার আগরওয়াল, আমি যা নিয়ম চলে সেই নিয়ম মেনে ছুটি নিয়েছি। যাদের বলে নিয়েছি তারা আপত্তি করেননি তখন। এবারে আমাকে যদি বলেন এটা বেনিয়মের ছুটি তাহলে আগে আপনাকে একটা নিয়ম বানাতে হবে। আমার বছরের প্রাপ্য ছুটি আমি বছরে পাইনা। তার জন্য টাকাও পাইনা। সেই ছুটি সব পচে নষ্ট হয়ে যায় বছরের পর বছর। ওভারটাইম পাইনা। পাইনা আলাদা করে মেডিক্যাল বেনিফিট। আগে এগুলো নিয়মে আসুক, তারপরে আমাকে বলবেন, আমি শুনবো। নইলে হঠাৎ করে আমাকেই শুধু বললে আমার মনে হবে যে আমি দেখতে ভাল নই বলে আপনার রাগ হচ্ছে।

বলে সে ফোনটা নামিয়ে রাখে। বন্ধুরা বলেছিল,

-আগরবাল তোকে ছাড়বেনা।

-বাল ছেঁড়া গেল।

তাকে শো কজ থেকে সাসপেন্ড কিছুই করা হয়নি। বছরের শেষে তার মাইনে বেড়েছিল আড়াইশো টাকা। বাকী সকলের গড়ে বেড়েছিল দেড়হাজার টাকা করে। কিন্তু ধাঁধাটা সে আসলে বুঝেছিল পরের দিন। তারই ডিপার্টমেন্ট-এর মাথায় ছিল এক প্রাক্তন বিপ্লবী নেতা কাম সাংবাদিক। তার চোখ ছিল অনুজার দিকে। তারই মাথায় এসেছিল অনুজাও আজকে ছুটি নিয়েছে। তার মানে অনুজার ফ্ল্যাটে ওরা দুজনে ইল্লি করবে। এইতে তার মাথায় আগুণ জ্বলেছিল। সে থাকতে বোধি? তাই আগরওয়ালকে ফোন করে বলেছিল। আর তাতে ইন্ধন দিয়েছিল সুপান্থ। অনেকদিন ধরেই সে তার কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে বসে আছে। শোধ দিচ্ছেনা। দু দিন আগেই তাকে বলেছিল সেই কথা বোধি। সুপান্থর বউ নেই, দাদার পয়সায় খায় এখনো। অসুস্থ দাদার পেনশন তার মাইনের চেয়ে বেশী। কাগজের অফিসের প্রিন্টারের কালি স্টোরের ছেলেটির সঙ্গে হাত মিলিয়ে চুরি করে বাইরে বিক্রি করে। তাও তার খরচ কুলোয় না। আসলে মদ আর মেয়েছেলে তাকে খাচ্ছে। এসব শুনে সুপান্থর রাগ হয়েছিল খুব। সেই রাগটার শোধ এভাবে তুললো। কিন্তু বোধির সামনে যে প্রশ্নটা এসে দাঁড়াল সেটা হল সত্যি তার আর অনুজার কি হবে!

কিছুই হল না। অনুজা তার পরের পরের সপ্তাহে তাকে ফোন করলো রাতে। সে তার দুদিন পরে চলে যাচ্ছে বস্টন। এখন সে আছে কৃষ্ণনগর। ওখান থেকেই কলকাতা আসবে। এসে প্লেন ধরবে। তার সঙ্গে আর দেখা হবেনা। বোধি ফোনটা ধরে খানিকক্ষণ চুপ করেছিল। অনুজা বিয়ে করার জন্য তাড়াহুড়ো করছিল কিছুদিন ধরেই। বোধি একটু দোটানায় ছিল। তখনই বিয়ে করতে গেলে তার কিছু কিছু সমস্যা হত। তাকে থাকার আলাদা জায়গা করতে হবে তাহলে। কিন্তু বোনের বিয়ে বাকী, বাড়ির অবস্থাও খুব ভাল না। সেই মুহুর্তে বোধি আলাদা হয়ে গেলে বাড়ির বাকীদের পক্ষে খুব অসুবিধের ব্যাপার হবে। বোধি জানে সে আলাদা থেকে যদি মায়ের হাতে টাকা দেয় তাহলে মা নেবে না। বাবার তো প্রশ্নই নেই। আবার তাদের বাড়িতে অনুজাকে নিয়ে উঠলে অনুজার সমস্যা হবে। স্পেস নেই তাদের বাড়িতে। অনুজা দীর্ঘ্যকাল একা থাকতে অভ্যস্ত। তার আলাদা ফ্ল্যাট রয়েছে সেই পড়াশোনা করার সময় থেকেই। তখন তার বাবা ভাড়া জোগাতেন। পরে চাকরীর সময়ে প্রথম দিকে অনুজাও কিছু কিছু দিত বাবার টাকার সঙ্গে, পরে অনির্বাণদার সঙ্গে বিয়ে হয়ে যেতে এই ফ্ল্যাটটা তারা কেনে। এখানে দুজনেরই টাকা ছিল। মানে দুজনে মিলেই লোন শোধ করতো। অনির্বাণদা, ডিভোর্সের পরে ফ্ল্যাটটা ছেড়ে দিয়েছে। এখন অনুজাকেই একা টাকা দিতে হচ্ছিল। বোধি থাকলে দুজনে মিলে অসুবিধে হবার কথাও ছিল না। অনুজার শেষ কদিনের সংসার খরচ সেই চালাচ্ছিল। মাইনের টাকা অনুজার হাতে থাকছিল না। তার মায়ের খুব শরীর খারাপ ছিল। অনুজার বাবা কিছুকাল হল গত হয়েছেন। এই টানাপোড়েন চলছিল কিছুদিন ধরেই। এর সঙ্গে ছিল বোধির বাড়ির নিতান্ত মধ্যবিত্ত চরিত্র, যা অনুজার বাড়ির সঙ্গে কোনোভাবেই খাপ খাওয়ানোর না বলেই অনুজার মনে হয়। বোধিও জানে কথাটা ভুল কিছু না। তার বাড়িতে সাতকালে কেউ মদ ছুঁইয়ে দেখেনি, সে ছাড়া। আবার অনুজার বাড়িতে মেয়ে-বাবা-মেয়ের বন্ধুরা একসঙ্গে বসেই মদ খেয়ে থাকে। সাধারণ মধ্যবিত্ত জীবনে মদ এমন একটা বিষয় যে সেখানে এ এক অকল্পনীয় বিষয় আজ-ও। অনুজার বন্ধুরা তার বাড়িতে এলে মদ খাবে এ অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু সেটা বোধির বাড়িতে থাকলে হওয়া সমস্যা। বোধির বাড়িতে তাদের জন্য একটি ঘর বরাদ্দ হতে পারে। সেখানেও দরজা বন্ধ করে মদ খাওয়ার প্রশ্নই নেই। তাতে করে গন্ধ ঠেকানো যাবেনা। বোধির বাবার পক্ষে জীবনের এই শেষভাগে পৌঁছে বিবাহবিচ্ছিন্না পুত্রবধূর সঙ্গে মদ খাবার অধিকার নিয়ে লড়াই-ঝগড়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই। এর পরে আছে চাকরীর সমস্যা। তারা বিয়ে করলে বোধি এবং অনুজার একই কাগজে কাজ করা অসম্ভব। অত্যন্ত নোংরা অফিস- রাজনীতিতে পড়তে হবে। সেই অবস্থায় মাথা ঠান্ডা রেখে চাকরী করাটাই হবে না। এসবের জন্যই বোধি সময় চাইছিল। একে এক করে সমাধান করবে সে। চাকরীটা বদলাবে। বাড়িতে কথা বলে বোনের বিয়েটা অন্তত দিয়ে নেবে। তারপরে কাছাকাছি একটা ফ্ল্যাট দেখবে। ধার করেই কিনবে না হয়। দরকার হলে অনুজার ফ্ল্যাটটা বিক্রি করে দেবে। কিন্তু সব কিছু একদিনে হবে না, হতে পারে না। কিন্তু অনুজার সময় নেই যেন। কোনো এক ভুতে পেয়েছিল তাকে, তাড়া দিচ্ছিল। তার সঙ্গেই ছিল নানান শর্ত। হঠাৎ করে বলতে শুরু করে দিয়েছিল সে বিয়ের পরেও বোধির বাপের বাড়ি যাবে না। বোধিও তার বাড়ির কোনো লোককে তাদের ফ্ল্যাটে আনতে পারবে না। বান্ধবীদের যখন-তখন ফোন কমা দরকার। বোধি বুঝছিল এভাবে হবে না। অনির্বাণদার বাড়ির সঙ্গে অনুজার সমস্যা হচ্ছিল খুব। অনির্বাণদার বান্ধবীদের সঙ্গে অনির্বাণদারও সম্পর্ক নিয়ে অনুজা জানে। তাদের দাম্পত্যে চিড় ধরেছিল অনির্বাণদার হাত দিয়েই। কাজেই সেই সেই বিষয়গুলোকে অনুজা তার জীবনে আর ফিরতে দিতে চায় না। এরজন্য বোধির জীবন, তার পরিবারের জীবন কোন দিকে যাবে তা নিয়েও তার আর মাথাব্যাথা নেই। এসব চলতে চলতেই চলে গেছিল অনুজা তার বাপের বাড়ি।

অফিসে ছুটি নিয়েছিল, কিন্তু বোধিকে জানায়ওনি। চলে যাবারপরে বোধি জেনেছে। তাও অনুজার কাছ থেকে না, জেনেছিল অনুজার সহকর্মিণী তৃষার কাছ থেকে। তৃষা কিছু জানেনা এমন ভাব করে শুরু করেছিল কথা, অনুজা কখন আসবে অফিসে জানতে চেয়ে। বোধিকে শেষে যখন বললো অনুজা কলকাতাতেই নেই, তখন যেন খুব বেশী করে বোধিকে বলে দিল তৃষা যে বোধি এখন আর অনুজার কেউ না। তৃষার টান ছিল তার উপর। বোধি সেইভাবে কোনোদিন গুরুত্ব দেয়নি বলে ঝাল মিটিয়েছিল ওইভাবে। বোধি আর কথা বাড়ায়নি। ফোন করেছিল অনুজাকে। ব্যাস্ত আছে বলে অনুজা ফোন কেটে দিয়েছিল। বলেছিল পরে ফোন করবে। তারপরে রাত্রের ফোন। মায়ের ব্যবস্থা করতে গেছিল, করা হয়ে গ্যাছে। অনুজা ফোনটা রাখার সময়ে বলেছিল বস্টন গিয়ে যে টাকাটা নিয়েছিল বোধির থেকে কয়েকমাস সেই টাকাটা পাঠিয়ে দেবে। অনুজার কাছে টাকা নেই বোধি জানে। অনুজার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট-ও তাকেই সামলাতে হয়। কাজেই টাকার উৎস কি তাও তার বুঝতে অসুবিধে হয়নি। বস্টনে অমিতাভ আছে। অনুজার সঙ্গে নেট-এ আলাপ। কয়েকদিন ধরেই বলছিল অনুজা অমিতাভর কথা। ওখানে অমিতাভ ডাক্তার। অনুজা বস্টনে গিয়েই বিয়ে করবে। চূড়ান্ত একটা রোমান্সের মোড়ক দিয়েছে নিশ্চই অনুজা বিষয়টাকে। অমিতাভ নিশ্চই উৎফুল্ল। নেট-এ প্রেম করে সে একজনকে চাকরী-বাকরী ছাড়িয়ে তাকে বিয়ে করতে উড়িয়ে নিয়ে আসছে এটা একটা বড় অ্যাচিভমেন্ট তার কাছে। তার পৌরুষ নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হচ্ছে এতে। আর যে মেয়েটা এত কিছু করতে পারছে তার দেশে থাকা বন্ধুর কাছে সামান্য ধার শোধ করার ব্যবস্থা সে করবে না তাও হয়? বোধি জানে অনুজা এমন হতে পারে নিজের দরকারে। এমন হয়ও। তেতো লাগে মুখের ভিতরটা। একটা বন্য রাগ, একটা গরগরে রাগ বাড়তে থাকে শরীরে। আর বেশী কথা বোধি বলতে চায়নি। এরপরে আরও কিছু বলতে গেলে সে নিশ্চই খুব খারাপ কিছু কথা বলে ফেলত, যার কোনো মানেই হয় না। যা যাচ্ছে তাকে নিয়ে টানাহেঁচড়া করে লাভ কি? শরীরে যে সম্পর্ক শুরু হয়েছিল, তা শুধু শরীরেই শেষ হয় না। শরীরের যে মন তাতেও তার দাগ পড়ে যায়। বোধিরও দাগ পড়ে গ্যাছে। বোধি শুধু বলেছিল,

-দরকার নেই। আমি ফেরত পাবার জন্য কিছু দিইনা।

অনুজা ফোন রেখে দিয়েছিল। সেই থেকে আজ অবধি তার সঙ্গে অনুজার আর কোনো যোগাযোগ নেই।  ভেতরের কিছু ক্ষত এত গভীর হয় যে তা কান্না অবধিও পৌঁছয় না। এটা এমনই এক ক্ষত। কম বয়সে অনুজা তার কাছে প্রেম হয়েই এসেছিল। অনুজার কাছে এটা একটা খেলা হতে পারে, কিন্তু তার কাছে ছিল না। ক’দিন যন্ত্রণায় দম বন্ধ হয়ে এসেছিল। মনে হচ্ছিল সে বুঝি মরেই যাবে। রাস্তা পার হতেও তার ভয় করতো। সব কিছুতেই সংশয় জাগতো। ছুটি নেয়নি অফিস, কথা বাড়বে বলে। তারপরে একটু একটু করে সরে গিয়েছে সব থেকেই। ক্ষতটাকে এত ভেতরে লুকিয়ে ফেলেছে যে আজ সে নিজেও ঠিক টের পায়না আছে কি নেই! হয়তো, হয়তো তার শেষ বয়সে টের পাবে! জানেনা সে। আজ এই ক্যান্টিলিভারটায় উঠে ইছামতীর কালো স্তিমিত জলপ্রবাহ ফুটব্রীজে দাঁড়িয়ে দেখতে দেখতে মনে পড়েছিল আচমকাই অনুজার কথা। একবারই একটা চিঠি এসেছিল। সেই চিঠিটা বোধি পড়েনি। ছিঁড়েও ফেলেনি। গঙ্গার ধারে এসেছিল একদিন, পকেটে চিঠিটা নিয়ে। হাতে ক্যামেরা ছিল। ভোরের গঙ্গার ছবি তুলছিল। পুরোনো ক্যান্টিলিভারের উপরের ফুটব্রীজে দাঁড়িয়ে। ছবি তোলা বারণ। কিন্তু সে তো ব্রীজের, ব্রীজ থেকে নয় নিশ্চই। আর ধরলে তার আইকার্ডটা সে দেখাবে। যা হবার হবে। দেশের নিরাপত্তার স্বার্থ গুগুলের যুগে এভাবে রক্ষা করা যায় না। গুগুল ভারতে ডিটেল স্যাটেলাইট ম্যাপ সাপ্লাই দেয় না, কিন্তু বাইরে দেয়। তাছাড়া চাইলে কি না হয়! যারা ছবি অন্য কারণে তুলবে তারা গাড়িতে যেতে যেতে তুলে নেবে। ব্রীজের মুখে থাকা চারটে পুলিশ কি করবে? ধুর! ছবি তুলতে তুলতে জলে ভাসিয়ে দিয়েছিল চিঠিটা।

তাদের সম্পর্কের কিছু অবশিষ্ট নেই আর। তার এবং অনুজার খিদে ছিল। খেয়েছিল। ব্যাস। হোটেলের থালার কথা মনে রাখার কোনো কারণ নেই। খিদে একটা মৌলিক শব্দ, সে শিখেছিল। খিদে একটা সর্বব্যাপী শব্দ। পেট থেকে নাম, খ্যাতি, পরিচয়, সব মন বা শরীরের খিদে। সে সচেতন হয়েছিল শব্দটা সম্পর্কে। যখন তাকে কদিন আগে তার নতুন কাগজের সম্পাদক বললো, একটা সিরিজ করতে ,এই  নিয়ে তখন সে দুবার ভাবেনি। চলে এসেছিল এখানে। বিভুতিভূষণ থেকে দেহব্যবসা, স্মাগলিং থেকে বিনয় মজুমদার যা খুশী তা নিয়েই করতে পারে। বোধি ঠিকই করে রেখেছিল সে জার্নালের মতন করে লিখবে লেখাটা। খিদে আর সবের সম্পর্ক। সাহিত্য থেকে স্মাগলিং সবের সম্পর্ক। তাছাড়া গ্রাম বাংলার কথা হবে, বিশেষ চোখে দেখা হতে হবে। ভাল হয় এ সবের মাঝে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে কিছু করলে। হাসিনার সঙ্গে মনমোহনের বৈঠক হবে সামনেই।

পরমা, হেসে বলেছিল,

- ক্লান্ত হয়ে আছ। যাও, ঘুরে এস। তাহলে দেখবে মন কাজে লাগছে আবার।

ফোনে সুতনুকার গলা শুনে মনে হল, সুতনুকা যেন তার দিকে ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। ম্যাগাজিন বেরিয়ে গিয়েছে। সুতনুকা আজকাল খুব কম আসে। কখনো কখনো ফোনে কথা হয়।

-একা যাচ্ছ? কেন? তোমার শরীরতো ঠিক নেই।

সুতনুকা জানেনা সে একাই যায় সবখানে। সঙ্গে যত মানুষই থাকুক না কেন সে একাই চিরকাল। তার এ নিঃসঙ্গতা যাবার না আর! তার শরীরে কিছু ঘুণ ধরেছে। ডাক্তার ভেবেছিল প্রথমে যক্ষা। লিম্ফনোডের। এখন দেখা যাচ্ছে তা না। কিন্তু কি তাহলে? এরপরে রক্তের হাজারো পরীক্ষা করতে হল। তার সঙ্গে ইসিজি।  চেষ্ট এক্স- রে । তাতেও হল না। বুকের কাছে একটা ব্যাথা থাকে সারাক্ষণ। বাড়ে-কমে। কখনো কখনো ছুঁচ ফোটানোর মতন ব্যাথা হয়। হাতটা ফুলে যেতে থাকে বুকের বাঁ দিক থেকে। তখন তার ক্লান্তি বাড়ে, কাজ করতে ইচ্ছে করে না কোনো। শরীর জুড়ে অবসাদ থাকে। এম আর আই করা গেল না। বোধি জীবনে এই প্রথম দেখলো তার ক্লস্টোফোবিয়া আছে। শেষে বাধ্য হল বায়োপসি করতে। এই দীর্ঘ্য পদ্ধতি তাকে ক্লান্ত করে দেয়। ডাক্তারেরা মনে করেন তাঁরা সবজান্তা। অনেক বার ডাক্তার পাল্টাতে হয়েছে এই কারণেই। বোধির ব্যাথায় বোধিকেই তাঁরা বলে দিচ্ছেন কিছুই হয়নি। কিছু না হলে ব্যাথা আসে কোথা থেকে? এই সামান্য কথাটার পরিস্কার জবাব দেন না। জোরাজুরী করলে বলেন মাসল স্প্রেইন। তার ওষুধ দিয়ে দেন। খেয়েছেও বোধি। কোনো লাভ হয়নি। অনেক বছর ধরে যতবারই তার এমনভাবে বুক ফুলেছে কোনো না কোনো ডাক্তার বলে দিয়েছেন তার আসলে মাসল স্প্রেন হয়েছে। কতবার হয়? এত বছর ধরে দেখতে দেখতে এবারে বোধি চেপে ধরেছিল। এ সেই অনেকটা তার পায়ের রোগের মতন। তার পা আজকে বহু বছর ফুলে চলেছে। অনেকটা ইউরিক অ্যাসিডের মতন ভাব। কিন্তু বহুবার পরীক্ষার পরেও কিছুই ধরা পড়েনি। ইউরিক অ্যাসিড তার ঠিকই আছে। অথচ পা ফোলে। কেন? কোনো ব্যাখ্যা নেই। একেক ডাক্তার একেক কথা বলেন। কেউ কেউ বলেনও না। নিয়ম করে পরীক্ষা করতে দেন। তার ফলাফল এলে বলে দেন ইউরিক অ্যাসিড পাওয়া যাচ্ছে না। তাই কোনো চিকিৎসা নেই। এসব তামাশা তার আর ভাল লাগেনা। এবারে যখন শেষমেশ বায়োপসি হল তখন ধরা পড়লো রোগটার নাম লাইপোম্যাটোসিস। এটা নাকি খুব বিরল রোগ। কেন হয় জানা নেই এখনো কারোর! কিন্তু হয়। তার হয়েছে। শরীরটা ভাল থাকে না, ক্লান্তি ছেয়ে আসে সারাটা শরীর জুড়ে। তার মধ্যে টানাপোড়েন চলতে থাকে মনের মধ্যে।

- ক্লান্ত হয়ে আছি সুতনুকা। ঘুরে আসি। আমার আর এখানে ভাল লাগেনা। পারলে আমি বাইরেই থাকবো।

জমি কিনতে চাইছে সে। চাষের জমি। নিজে চাষা না। বংশে কেউ হয়তো ছিল। কিন্তু সে নিজে সে সব কিছুই জানেনা। তবু মনে হচ্ছে জমি কিনে গ্রামের দিকে বাড়ি একটা করবে। আস্তে আস্তে কলকাতা ছেড়ে ফিরে যাবে। একদিন যেমন মফস্বল থেকে এসেছিল, তেমন একদিন আবার ফিরে যাবে গ্রামে। সকলে ফিরবেনা। কিন্তু কেউ কেউ ফিরুক, কারোর কারোর ফেরা উচিত। নইলে একদিন গোটা রাজ্যটাই কলকাতা হয়ে যাবে। এসব সুতনুকা বুঝবে না। সুতনুকা তার জীবনে আসা এক অকাল বসন্ত। এক ঝড়। যে আসবে কেউ জানতো না। এখন যখন  এসে পড়েছে তখন ভাবতে হচ্ছে বোধিকে। এমন বারেবারে ঝড় আসে কেন তার জীবনে? এখন সে যে বয়সে পৌঁছেছে তাতে আর আলাদা করে ভাবার কিছু নেই। তার আর আলাদা করে খিদে নেই। শুধু শরীর তাকে ক্লান্ত করে দেয়। অন্য সব ঝড়কে সে এড়িয়ে চলেছে। এসে পরলে কখনো কখনো তাকিয়েছে। কিছুকাল। তারপরে বোধি ক্লান্ত হয়ে গিয়েছে। তার আর ভাল লাগে না। পরমা এসব জানে। সুতনুকা জানেনা।

মেয়েটা, যে বসে আছে তার অপেক্ষায় সেও জানেনা। সে বসে বসে ভাবছে সে খাদ্য আর বোধি খাদক। বসে বসে অপেক্ষা করছে কখন বোধি তাকে খাবে। খেয়ে তাকে ছুটি দেবে। মেয়েটা ভোরে উঠে বাড়ি থেকে বেরিয়েছে। কথায় কথায় বলে ফেলেছে। এই যৌনকর্মের পাশাপাশি তার মূল পরিচয় সে একটি অ-সরকারী বিমা কোম্পানির এজেন্ট। সকাল থেকে অনেক ঘুরেছে আজ। তাই তার মেল আপ করার অবস্থা হয়নি। কোনো রকমে চলে আসতে হয়েছে। দালাল তাকে জোর করেই এনেছে। নইলে এমন বড় পার্টির কাছে সে এমন করে আসেনা। অনেক কথা বলছিল। বোধি কথা থামিয়ে উঠে এসেছে। একটা ফোন এসেছিল। তার কাগজের ফোন। সেই ফোনটা ধরে বাইরে এসেছে। বেশ কিছুক্ষণ হয়ে গিয়েছে। এখনও ফিরতে ইচ্ছে করছে না। মেয়েটাকে এখন আর বাড়ি পাঠানোর কোনো উপায় নেই। অনেক রাত এখন। সব গাড়ি চলাচল থেমে গিয়েছে।

দুই পাড় থাম ও সড়কে বাঁধা
ক্লিন্ন জল, চারপাশে শুধু কোলাহল;
কবে থেকে এত শ্রান্ত তুমি নদী?
আমার মতন, তুমি আমারই মতন?
                     

 

 

 

 

 

                                                        প্রকৃত সারস উড়ে যায়

সুস্থ মৃত্তিকার চেয়ে সমুদ্রেরা কত বেশি বিপদসংকুল
তারো বেশি বিপদের নীলিমায় প্রক্ষালিত বিভিন্ন আকাশ,
এ-সত্য জেনেও তবু আমরা তো সাগরে আকাশে
সঞ্চারিত হ’তে চাই, চিরকাল হ’তে অভিলাষী,
সকল প্রকার জ্বরে মাথা ধোয়া আমাদের ভালো লাগে ব’লে |
তবুও কেন যে আজো, হায় হাসি, হায় দেবদারু,
মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়!

                                                                -মুকুরে প্রতিফলিত (বিনয় মজুমদার)

বিনয় মজুমদারের লাইন ছিল। মানুষ কাছে এলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়। প্রকৃত সারস? স্রেফ একটা শব্দকে টেনে নিয়ে যাওয়া অনন্তে। এর কোনো কৌশল হয় না। হয় দর্শন। সারসেরা চরে চড়ে বেড়াচ্ছে। একবার পা ফেলে কাছে গেলেই উড়ে যাবে। ছেলেবেলা মফস্বলে কেটেছে তার। সেও জানে কিছুটা নদীকে। সেও দেখেছে। কিন্তু এমন অবিমিশ্র ঘৃণায় রূপান্তরিত করতে পারেনি। মানুষ? কোন মানুষ? ছল-কৌশল-মিথ্যাচার ভরা প্রেমহীন মানুষ তো? সেই মানুষ কাছে এলে থাকা যায়? সেই মানুষ হতে চাওয়া যায়? তার চেয়ে অনেক ভাল নাকি উড়ে যাওয়া? অমন মানুষকে মানুষ বলে নাকি? এর চেয়ে সারস জীবন ঢের ঢের ভাল। সেই সব সারসেরা, সেই সব প্রকৃত মানুষেরা উড়ে যাবেই মানুষ কাছে এলে। মানুষের থেকে উড়ে উন্মত্ততার গভীরে গিয়ে নিশ্চিন্তে বাস করবে। উন্মাদ বিনয় মজুমদার জানতেন, আজকের সভ্যতার থেকে উন্মাদ আশ্রম ঢের ঢের ভাল। কেউ কথা বলবেনা। কোনোদিন জানতে চাইবেনা কেন, কি, কোথায় ইত্যাকার যত্ত অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্নাদি। কুশলাদি জানার ছলে কেউ কাউকে খুন করে যাবেনাকো নিয়মিত। কে কার জন্য? মানুষ, তার সভ্যতা, তার সিস্টেম কার জন্য তৈরী? কেউ তার মানে জানে? কেউ জানেনা একটা ব্যবস্থা যা একদিন তারাই তৈরী করেছিল আজ সেই ব্যবস্থা শাসক হয়ে বসেছে কিভাবে! চাইলেই একজন পুলিশ একজন সৎ মানুষ হবেনা। এই ব্যবস্থাই হতে দেবে না। সে তাকে বানিয়েছেই অসৎ করে।

Friday, July 22, 2011

immoral trafficking, police harassment in west bengal

West Begngal

Particulars of the victim:

Nafija Khatun(name changed), aged about-16 years, residing at village-Kakra, Post Office-Kachua, Police Station-Basirhat, District-North 24 Parganas, West Bengal, India.

Particulars of the perpetrators:

The Officer-in-charge of Basirhat Police station, District-North 24 Parganas

Case Details:

It is revealed during our fact finding that the victim girl was student of class-IX. She is minor by age, only aged about 15 years. On 16.3.2010 one Amena Khatun, aged about 24 years who used to read in the same school where the victim girl was student took the victim girl to her sister’s house. But the victim girl did not return to house. The victim’s family started searching for the victim and they also went to the house of Amena Khatun and asked for the whereabouts of the victim girl and Amena Khatun. Then the brother of Amena Khatun accompanied the family of the victim girl to police station and one information was lodged at police station vide GDE no. 1088/2010 dated 17.3.2010. On the next day (18.3.2010) the victim’s family received information that on 16.3.2010 at about 12.40 pm the said Amena Khatun and the victim girl boarded into a train at Kakra Mirjanagar Railway Station. The train was destined to go to Sealdah Railway Station. On 28.10.2010 the victim’s family received information that the said Amena Khatun returned to her house in Karulia village. The victim’s family went to her house and asked her about the whereabouts of the victim girl. On reply she stated that they got off from train at Sealdah Railway Station and immediately 4/5 men forcibly took away the victim girl upon tying a handkerchief on her mouth. She could not say anything more. On further questioning by the family of the victim girl she stated that she was in Mumbai before she returned to her house. Subsequently the victim’s family came to know from local people that the said Amena Khatun is lady of questionable character and this raised strong suspicion to the family members of the victim girl that the said Amena Khatun immorally trafficked the victim girl.

The victim’s family went to Basirhat Police Station with a written complaint against the said Amena Khatun, but the police refused to take the written complaint and also denied of registering any First Information Report against the accused woman. The victim’s family then lodged written complaint before the Superintendent of Police, North 24 Parganas on 6.6.2011 alleging against the inaction of police of Basirhat Police Station not taking any action against the accused person involved in the abduction and alleged trafficking of the victim girl.

Report By: Kirity Roy
Banglar Manabadhikar Suraksha Mancha (MASUM)

পড়ছিল বোধি একটু আগে। আসার সময়ে নিয়ে এসেছে। মাসুম একটি মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা সংস্থা। একসময় এঁদের বড় অংশটাই জড়িয়ে ছিলেন অল পিপলস্‌ ডেমোক্রেটিক রাইটস বলে সংগঠনটির সঙ্গে। সংক্ষেপে এপিডিআর। পরে মতভেদ এবং অন্যান্য কারণে একাংশ সেখান থেকে বেরিয়ে এসে গড়ে তোলেন মাসুম। আইনি ক্ষেত্রগুলোতে বেশ কিছুকাল ধরেই কাজ করছেন এঁরা। বোধি এক বন্ধুর থেকে জোগাড় করে এনেছিল এঁদের কিছু রিপোর্ট। নারী ও শিশু পাচার বেশ কিছুকাল যাবত এঁদের কাজকর্মের মধ্যে এসে পড়েছে। আসলে এই সব সংস্থার কাছেই থাকে বেশীরভাগ খবর। এঁরা এলাকায় যাতায়াত করেন, মানুষের থেকে খবর সংগ্রহ করেন এবং সরকারকে জানান, নাগরিককে জানান। কিন্তু কোনো সরকারই খুব একটা সহজ চোখে এঁদের দেখেন না। এর একটা বড় কারণ হল সরকারের প্রশাসনে যে দুর্নীতি তা ভারতের মত দেশে এত সর্বব্যাপক, যে একে রোধ করাটা খুব কঠিন। দুর্নীতি একটি সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। দুর্নীতিগ্রস্ততা একটা বড় গুণ এখন সফল মানুষের। কাজেই সেই দুর্নীতি প্রশাসনে আসবে এতে আর আলাদা কিই বা আছে! কিন্তু যাঁরাই সরকারে আসেন তাঁদের সঙ্গে জড়িয়ে যায় বিবিধ স্বার্থরক্ষার উদ্দেশ্য। বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মানুষ। প্রত্যেক সরকারের আমলে এঁরাই এসে বসেন সরকারের কাছাকাছি। সুতরাং একটা সময় আসে যখন সরকারের প্রশাসনের স্তরে দুর্নীতিকে ঢাকা জরুরী হয়ে পড়ে। সেই দুর্নীতিকে ঢাকতে গেলে এই সব মানুষ বা সংগঠন অপ্রিয় হয়ে ওঠে সরকারের। যে তৎপরতা দিয়ে সরকার এবং প্রশাসন বিবিধ সামাজিক বা রাজনৈতিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করেনা, সেই তৎপরতা দিয়েই এঁদের মত সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে লেগে যান যুদ্ধে। এঁদের বিবিধ বেআইনী প্রক্রিয়ায় দমন করার জন্য ব্যাস্ত হয়ে ওঠেন। সরকারের বা সমাজের ক্ষেত্রে এঁরা যে চোখ হিসেবে কাজ করতে পারতেন সেই চোখটিকেই সবার আগে অন্ধ করার কাজ চলে। বোধির কাগজের মতন কাগজে বা টেলিভিশন চ্যানেলে এঁদের ঠাঁই হয় সবার পরে। সেখানে কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে তাঁদের নিয়ে আসা হয়। তারপরে সেটা ফুরিয়ে গেলেই আর ঠাঁই নেই। বহু বহু গুরুত্বপূর্ণ কাজ ধামাচাপা পড়ে যায় মিডিয়া রিপোর্টেও। বোধি নিজের অভিজ্ঞতা দিয়েই জানে সব।

কিন্তু এঁদেরও সীমাবদ্ধতা আছে। পুলিশ এবং প্রশাসন নিয়ে এঁদের নজর। এঁদের নজর আইনী ব্যবস্থার দিকে। আইন আইনের কাজ করুক এটা এঁদের বাসনা। কিন্তু সে কি এমন ভাবে সম্ভব? এই যে বারাসাত থানার পুলিশের প্রতি এঁদের অভিযোগ, তারা কি আলাদা কিছু? এই কি তাদের শেখানো হয়নি? আমেনা খাতুনকে দাঁড় করালো কারা সামনে? এর জন্য কি সমাজই দায়ী না?

যে মেয়েটি এসেছে তার কাছে তাকে মেয়ে না বলে মহিলা বলাই ভাল। বয়স কম করেও চুয়াল্লিশ হবে। শরীরে বয়স তার চিহ্ন রেখে গিয়েছে। এসে হোটেলেরই একটা ঘরে বসেছিল। শ্যামল আর অর্ণব ছিল ওই ঘরে। ওরা দুজন স্থানীয় ছেলে। শ্যামল দালালী করে। সেই নিয়ে এসেছে একে বাসস্ট্যান্ড থেকে। বোধি ল্যাপটপটা নিয়ে কাজ করছিল তখন। পড়ছিল এবং নোট নিচ্ছিল। সারাদিন যা দেখেছে শুনেছে তার সারসংক্ষেপ এক রকমের। রামের গ্লাসটা তখনো ভর্তি। শ্যামলকে ঘরে বসিয়ে রেখে সুমঙ্গল এসেছিল তার কাছে।

-দাদা, একবার আসবেন না?

-যাব। তোরা শুরু কর। আমি এই কাজটা শেষ করে নিয়ে আসছি।

সুমঙ্গল চলে গিয়েছিল। একটা আড়ষ্টতা কাজ করছিল সুমঙ্গলের, বোধি বুঝতে পারে। সে কখনো এমন কাজে জড়ায়নি। বয়স খুব বেশী হলে ছাব্বিশ-সাতাশ হবে। মেয়ে ভাড়া করে নিয়ে এসে ফুর্তি করার সাহস তার হয়নি। তার পরিবার অঞ্চলের খুব পরিচিত। সেও। কাজেই জানাজানি হয়ে গেলে তার সমস্যা আছে। তাছাড়া ছেলেটি এমনিতে খুব একটা শিক্ষিত না হলেও মনটা আছে। এই ধরণের কাজে তার খুব একটা ইচ্ছে থাকার কথা না। অঞ্চলে ছেলেটির একধরণের প্রভাবও আছে। স্থানীয় স্তরে সাংবাদিকতা করে। একটি বিশিষ্ট কাগজের আঞ্চলিক সাংবাদিক। বোধি ওকেই বলেছিল সূত্র বের করে রাখতে। এবারে সে তার বন্ধুমহল ধরে পৌঁছেছিল মেয়েটির কাছে। শ্যামল, সুমঙ্গলের বন্ধু। শ্যামল সামনে যে কারবার করে সেটা কাপড়ের। কিন্তু আদতে সে যুক্ত এই দালালীর সঙ্গে। বর্ডারের সংলগ্ন অঞ্চলে বাড়ি তার। সেই এইসব মেয়েদের হাল-হদিশ রাখে। কিন্তু সুমঙ্গল জানলেও কখনো এটা নিয়ে কথা বলেনি। আজ বোধির দরকারে সে শ্যামলকে ডেকেছে। এবারে যতক্ষণ মহিলাটি আসেনি ততক্ষণ একরকম ছিল, এখন এসে পড়ায় আরেক রকম হয়েছে। ওই ঘরে শ্যামল আর সেই মহিলাটির মধ্যে বসে তার খুব অস্বস্তি হচ্ছে, বোধি বুঝতে পারছে। এমন অবস্থায় কি করণীয় তা সুমঙ্গল জানেনা। 

বোধি উঠে পড়ল। একটু আগে ব্রীজ থেকে ফিরে বাংলোতে গেছিল প্রথমে। ল্যাপটপটা ওখান থেকে নিয়ে এসে যখন সে ‘ইছামতী’ হোটেলের ওর জন্য রাখা ঘরে ঢুকছিল তখনই একবার ওদের ঘরে গেছিল। সেখানে দেখে এসেছে মহিলাটি ম্যাক্সি পড়ে নিয়েছে। মাজা মাজা গায়ের রঙ। নাকটা তীক্ষ্ণ। চোখটা একটু টানা পাহাড়িদের ধাঁচে। মধ্যম উচ্চতা। এখনো যখন সে ঘরে ঢুকলো মহিলাটি তখনো সেই খাটের বাজু ধরেই বসে আছেন। শ্যামল আর সুমঙ্গল বসে আছে সোফাতে। সামনে গ্লাস। সুমঙ্গল খায়না, কিন্তু শ্যামল খাচ্ছিল। তাকে দেখেই দ্রুত গ্লাসে চুমুক মারলো শ্যামল। তাড়াতাড়ি চুমুকটা মেরেই উঠে দাঁড়ালো। সে এবারে যাবে। রাত এগারোটা। তার বৌ নাকি তাকে খুব গালি দেয় নির্দিষ্ট সময়ে না ঢুকলে। ভয়েই হোক আর ভক্তিতেই, সে সময়ের হেরফের করেনা। বোধি তার দিকে হাত বাড়ালো। শ্যামল তার হাতটা আলতো করে ছুঁলো। বোধি দেখেছে যে মানুষের মধ্যে ভরসা কম থাকে সে হাত শক্ত করে ধরেনা কখনো। এও ব্যাতিক্রম না। সুমঙ্গল উঠলো শ্যামলকে এগিয়ে দিয়ে আসতে। ও এসে ওদের সঙ্গেই খাবে। খেয়েদেয়ে চলে থেকে যাবে এই ঘরে। বোধি জানে সুমঙ্গল একটু ঘাবড়ে আছে। বোধির সামনে বেচাল যাতে না হয় সেদিকে সতর্ক নজর তার। বোধিকে সে ভালবাসে দাদার মতই। বোধিই খবরের কাগজের কাজ হাতে ধরে শিখিয়েছে। কলকাতায় কিছুদিন সুমঙ্গল ছিল তাদের কাগজের ডেস্কে। তারপরে অন্য কাগজে চাকরী নিয়ে ফিরে এসেছে নিজের জায়গায়। এখন ও এই বনগাঁ আর গাইঘাটা মহকুমাটা পুরো দেখভাল করে। ওর অধীনে কয়েকটা ছেলে কাজ করে। সুমঙ্গল এখন জেলা স্তরে বেশ প্রভাবশালী রিপোর্টার। সুমঙ্গলরা বেরিয়ে গেলে বোধি সোফায় গিয়ে বসলো।

-হাতের গ্লাসে চুমুক দিচ্ছেন না যে?

-দেব। আমি আস্তে খাই।

মহিলাটি একটু সপ্রতিভ হবার জন্যই কথাগুলো বললেন বোধহয়। এতক্ষণ উনি বোধিকে দেখেছেন, কিন্তু কথা বলেননি। এবারে সকলে চলে যেতে কথা বললেন। বোধিই তো খদ্দের তাঁর।

-আপনি খাবেন না?

-নাহ, আমি খাই না। মাঝেমাঝে একটু বিয়ার হলে খাই। কিন্তু এই সব গন্ধ আমার সহ্য হয় না।

-তো আমি খেলে সমস্যা হচ্ছে নাকি?

-না না। আপনি খান। আপনার ইচ্ছেতেই তো আমি চলবো। আমার ইচ্ছেতে আপনি চলবেন নাকি?

মহিলাটি একটু যেন অবাক হয়ে বললেন কথাটা। বোধির হঠাৎ করে হাসি পেল। কত সত্যি কথা। কোনো ভান বা ভণিতা না করেই বলে দিলেন। টাকা যে কোনো বিষয়কে কি অনায়াস দক্ষতায় সাজিয়ে তোলে। সে টাকা দিচ্ছে, উনি নিচ্ছেন। কাজেই সোজা কথা। কিন্তু একই কথা সুতনুকার জন্য না। সুতনুকার-ও টাকা নিয়ে সমস্যা ছিল। তার সঙ্গে যখন বোধির পরিচয় তখন সে আইনজীবি। কাজ করে কমার্শিয়াল ট্যাক্সের। কিছুকাল আগে অব্দিও সে কাজ করছিল অন্য এক চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের সঙ্গে।  এখন সে একা কাজ করতে চায়। নিজের একটা ফার্ম খুলতে চায়। সেখানে সে কাজ করে দেবে। তারপরে তার কোনো পরিচিত চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টকে দিয়ে সই করিয়ে নেবে সেই হিসেবে। টাকার বিনিময়ে একাজ করানো যায় বোধি জানে। বোধির সঙ্গে তার আলাপ হয়েছিল একটি গানের অনুষ্ঠানে। গান গাইতে এসেছিল। গান তার পেশা নয়, নেশাও নয়। বন্ধুর অনুরোধে গান গাইতে আসা। যদিও গায়কী এবং কন্ঠ দুই তার আছে তবুও গান নিয়ে আলাদা করে তার কোনো ভাবনা ছিল না। বোধির সত্যিই খুব ভাল লেগেছিল তার গান। অতি পরিচিত একটি গান দিয়ে শুরু করেছিল সেই ঘরোয়া আসর, সুতনুকা। ‘আমারো পরাণ যাহা চায়’। ছোটবেলা থেকে শুনে শুনে বোধির কান পচে যাওয়ার কথা। বিচিত্র এলানো ভঙ্গীমায় বেশীরভাগ গায়িকারা গানটি গেয়ে থাকেন। কিন্তু সুতনুকা তা করেনি। তার গায়কীতে ছিল এক নিখাদ বিশ্বাস। যেন সে মনের থেকেই বলছে এ কথা। গানটা মুহুর্তে খুব ব্যাক্তিগত হয়ে উঠেছিল বোধির কাছে। তখন বোধির লেখার সূত্রে এবং একটি ম্যাগাজিনের সম্পাদনার সূত্রে সেই বাড়িতে যাতায়াত করছিল। তার বন্ধুর বাড়ি সেটা। তার অফিসের যাবতীয় ব্যাস্ততার মধ্যেই কাজটা করছিল সে। সেদিনও এসেছিল অফিস থেকেই ওই ঘরোয়া আসরে যোগ দিতে।

সুতনুকার  সঙ্গে আবার একদিন অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টস-এর সামনে দেখা হয়ে গেল। একটা নাটক দেখতে এসেছিল সে তার বন্ধুদের সঙ্গে। বোধির সঙ্গে ছিল শমীক। শমীকের স্ত্রী-র বন্ধু সুতনুকা। শমীকদের বাড়ীর অনুষ্ঠানেই তাকে গান গাইতে দেখেছে বোধি। ফলত কিছুক্ষণ আড্ডা হল নাটক শেষ হতে। সুতনুকা জানাল সে কাজ করতে চায় ম্যাগাজিনে। বোধির একটু অস্বস্তি হচ্ছিল না যে তা না। কারণ সুতনুকার পেশা বেশ ব্যাস্ততার পেশা। অ্যাকাউন্টসের কাজ করে ম্যাগাজিনের কাজ করা খুব সহজ নয়। কিন্তু সুতনুকার আত্মবিশ্বাস দেখে তার পক্ষেও বলা মুশকিল হচ্ছিল যে কাজটা সুতনুকার পক্ষে খুব সুবিধার হবে না। কাজটা চলতে থাকল। কিছুদিনের মধ্যেই অনেকগুলো বিষয় বোধির কাছে পরিস্কার হতে থাকলো। সুতনুকার মধ্যে একটা টানাপোড়েন চলছে কিছু বিষয়ে। সুতনুকা বিবাহিতা। তার স্বামীর ফার্মও বেশ নাম করা। শ্বশুরের ফার্ম আসলে।  তার স্বামী উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে এটা।  রমরমে ব্যবসা।  কিন্তু সেখানে সুতনুকার কাজ নেই কোনো। তাকে কাজ দেওয়া হবে না। সেখানে তার প্রতিদ্বন্দ্বিনীটি তার স্বামীর এক জুনিয়ার। তার শ্বশুর-বাড়ির নীচেই তাদের চেম্বার। একদিন আচমকাই কাজ সেরে ফিরে এসেছিল সুতনুকা, এক দুপুর বেলায়। ফিরে এসে তার স্বামী রজতের চেম্বারে ঢুকে পরেছিল একটি জরুরী কথা বলতে। সেই চেম্বারে তার সেই শেষ ঢোকা। শালিনী, রজতের জুনিয়ারটি এবং রজত যে অবস্থায় ছিল তাতে আর তাদের মধ্যে কথা হবার কোনো কারণ ছিল না। হয়ওনি। শ্বাশুড়ি বিষয়টাকে খুব গুরুত্ব দিতে চাননি।

রাগ করে বাপের বাড়ী চলে এসেছিল সুতনুকা। কিন্তু থাকতে পারেনি বেশীদিন। তারা বনেদী পরিবার। একসময় তাদের অবস্থা যে কেমন ছিল তা বাড়ির গঠন দেখলেই বুঝতে পারা যায়। সাবেকী বাড়ি। উত্তর কলকাতার শ্যামবাজারে এককালে তাদের বাড়ীতে বাই নেচেছে, বিড়াল-কুকুরের বিয়ে হয়েছে ধুমধাম করে। খেউড়-খেমটা থেকে সংস্কৃত নাটক সবই হয়ে-টয়ে গ্যাছে। সঙ্গে বয়েও গ্যাছে দিন। আর কিছু নেই এখন তালপুকুরে। ঘটি ডোবানো বেশ সমস্যার। অতবড় বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণও বেশ কঠিন কাজ। সুতনুকার বাবা জীবিত। মা তার বিয়ের কিছু পরেই মারা গিয়েছেন। শান্তিতেই মরেছিলেন মেয়ের বিয়ে দিয়ে যেতে পেরেছেন মোটা টাকাওলা পাত্রের সঙ্গে এই ভেবে। ছেলের ঘরের মান-টানও বেশ আছে। সুতনুকার বাবা এককালে একটি বেসরকারী সংস্থার ম্যানেজারের কাজ করতেন। সেই সংস্থাটি ছিল ব্রিটিশ আমলের। সত্তরের দশকের শুরু অব্দিও বেশ রবরবা ছিল এদের। তখনো চেম্বার অব কমার্সের সভাপতিটিও ছিল ইউরোপীয়। কে বলবে এটি একটি স্বাধীন দেশ! তারাই ঠিক করে দিতে চাইতো কি হবে বাজেট, সঙ্গে অবশ্যই থাকতো বড়বাজারের মারোয়ারী গোষ্ঠী। সেই সময় শেষ হল সত্তরে। দেশজুড়ে ব্যাপক অস্থিরতার মধ্যে, নকশালবাড়ির প্রভুত কোলাহলের মধ্যে এদের পুঁজি নিরাপদ নয় এমনই বোধহয় বুঝেছিল এরা। কেটে পড়লো কলকাতা থেকে। শয়ে শয়ে কারখানার মতনই শয়ে শয়ে সওদাগরী প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়ে সে পুঁজি নিয়ে কন্টিনেন্টে কিম্বা নেটিব ব্রিটেনে চলে গেল এরা। সেখানে কান্ট্রিসাইডে অন্তত একটা ম্যানসন হয়ে যাবে ওই টাকায়। যাবার সময়ে সুতনুকার বাবাদের মতন কর্মীদের হাতে কিছু টাকা দিয়ে গেল, যা সে আমলে বেশ ভাল টাকা। এই কর্মীরাই আবার বাকী নীচুস্তরের কর্মীদের প্রাপ্য মারার কাজে সাহায্য করলো সাহেবদের। সাহেবরা কৃতজ্ঞতায় বলে গেলেন,

- Good bye Babu. You had done a splendid job. 

গ্যাস খেয়ে বেলুন তো ফুললো, কিন্তু আঙুল ফুলে কলাগাছ আর হল না। সাহেবরা চলে গেলেও এঁদের একটা বড় অংশকে নাইটক্লাব, মদ এবং জুয়া ছাড়লো না। অন্য কোনো কোম্পানি, যা খুব কমই গড়ে উঠছিল সেই সময়ে তারা এই বয়স্ক ডাইনোসরদের চাইলো না। প্রথমত এদের দৃষ্টিভঙ্গী যথেষ্ট পুরোনো। দ্বিতীয়ত, এঁরা কেউই ভিশনারী ছিলেন না। হুকুম তামিল করতে দক্ষ ছিলেন এঁরা। তাছাড়া সদাগরী প্রতিষ্ঠানে মাল চালান দিয়ে কাজ ফুরোতো। এখন আর চালান না, এখন শুধু রপ্তানির কাজ না। কিছু কিছু আমদানীও আছে, আছে উৎপাদন। সে কাজের জন্য লাগে অন্য দক্ষতা। সেই দক্ষতা এঁদের ছিল না। তাই ওনাদের বেশীরভাগেরই আর কোনো আজ জুটলো না তেমন। অস্থায়ী কিছু কিছু কাজ করেই কেটে গেল বাকী জীবন। ফলত সুতনুকা কলেজে পড়তে যেত হাঁটতে হাঁটতে। কলেজ শেষ না হতেই শুরু হয়ে গেল টাকা চাই-এর হাঙ্গামা। সুতনুকাও বড় হবার শেষ কটা দিন অভাব দেখে দেখে একটু সমস্যায় পড়ে গেছিল। তার মনে এই নিরাপত্তাহীনতা ছাপ ফেললো।  রজতের সঙ্গে তার যখন আলাপ হল তার মনের মধ্যেও কাজ করছিল নিরাপত্তা। রজত তাকে আলাদা  করে ভালবাসে কিনা সে প্রশ্ন খুব একটা ভাবায়নি তাকে। আলাপের শুরু থেকেই শরীর এসে গেল তাদের মধ্যে। একসময় যখন রজত তার থেকে দূরে সরে যেতে পারে বলে সে বুঝলো তখন আরো বেশী করেই শরীর দিয়ে জড়িয়ে নিল তাকে। বিয়েটা হল। রজতের বাড়ীর দিক থেকে আলাদা করে খুব একটা প্রশ্রয় ছিল না।  তবু হল বিয়ে। বা রজত বিয়ে করতে বাধ্য হল বলা ভাল। বিয়ের পরেই যখন মা মারা গেলেন তখন বাপের বাড়ীর অবস্থা আরো খারাপ। বাবার চিকিৎসা থেকে শুরু করে সব কিছুরই দায় এসে পড়লো তার ঘাড়ে। কিন্তু বিয়ের পরে রজতের থেকে বাপের বাড়ীর জন্য টাকা নেওয়াটা তার পক্ষে আর সহজ রইলো না। টাকা চাইলেই প্রতি কথায় রজতের ঠেস, তার শ্বাশুড়ীর শীতল আচরণ তাকে বেশ অপমানিত করতে থাকলো। সে আর পাঁচজন মেয়ের মতই নিজের সংসার গোছানোর কাজ শুরু করেছে, তার জন্য অল্প-বিস্তর ফন্দি-ফিকিরও করেছে। তা বলে অপমান বোধ থাকবে না এমনও না। ফলে শুরু করতে হল কাজ করা। তারই এক পরিচিতের সুবাদে অন্য একটি ফার্মের এক লইয়ার-কে সাহায্য করতে শুরু করলো কমার্শিয়াল ট্যাক্সের জন্য। সেই কাজ করতে করতেই একদিন আবিস্কার করলো যে রজত-শালিনী অনেকদূর এগিয়ে গিয়েছে। রজত শালিনীকে আলাদা ফ্ল্যাট কিনে দিয়েছে উত্তর কলকাতাতেই। শালিনীও তার অসুস্থ বাবা-মা কে নিয়ে কার্যত রজতের রক্ষিতা হয়েই কাটাচ্ছে। যে নিরাপত্তার জন্য তার বিয়ে করা সেই নিরাপত্তাই তার কাছে কাঁটা হয়ে দাঁড়াল। কিন্তু দাঁড়াল যখন, তখন বাপের বাড়ীতেও তার আর কোনো নিরাপদ আশ্রয় নেই।

তার বাবা ভাবতে রাজী ছিলেন না যে মেয়ে তাঁকে খাওয়াতে পারবে। যদিও এতদিন চলে এসেছেন মেয়ের টাকায় তবুও মনে মনে তাঁর বিশ্বাস ছিল যে আসলে টাকাটা মাসে মাসে নিশ্চিত ভাবে আসে তাঁর জামাই-এর জন্য। সে ছাড়া মেয়ের ক্ষমতা কত তা নিয়ে তিনি সন্দিহান ছিলেন। তাছাড়াও ছিল বনেদী বাড়ীর বদ সংস্কৃতি। মেয়ের টাকায় মদ খেতে সমস্যা হত না তাঁর। আবার মেয়ের বিয়ে নিয়ে কথা হতে শুরু করলে তাঁদের আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে মান যাবে সে জ্ঞানও টনটনে ছিল। সেই জন্যেই বাপের বাড়ীতেও থাকা হল না সুতনুকার। আবার একদিন বাবা এবং শ্বাশুড়ীর মধ্যস্থতায় ফিরে যেতে হল সেই শ্বশুরবাড়ীতেই। ফিরে যাবার পরে রজত তাকে শর্ত দিল সে যখন টাকা দেবে তখন সেই ঠিক করে দেবে কিভাবে সুতনুকা চলবে। সুতনুকার বিছানাও তার চাই। গভীর রাত্রে মদের ঘোরে টলতে টলতে যখন ঢুকতো সে তখন সুতনুকাকে আগের মতনই তার পায়ের জুতো থেকে মোজা খুলে দিতে হবে। তাকে নিয়ে যেতে হবে বিছানায়। আর বিছানায় যখন যাবে তখন যদি সে সুতনুকাকে চায় পাপোশের মতন তখন তাই করতে হবে তাকে। সুতনুকা জানে এসব কথা শোনা ছাড়া তার কোনো রাস্তা নেই অন্য। বাপের বাড়ীতে গিয়ে থাকা তার জোরে কুলোবে না এ কথা বুঝেই গ্যাছে রজত। এবারে তার পূর্ণ সুযোগ নেবে সে। এমনকি একদিন তাকে শালিনী ফোন করলো তার শ্বশুরবাড়ীতেই। ফোন করে বললো,

- শোনো, এসে যখন পড়েছ আবার তখন থাক তোমার মতন। আমিও চাই না একটা মেয়ের মাথার উপর থেকে ছাদ চলে যাক। আমি জানি ছাদ না থাকলে কি হয়! কিন্তু আমার পথে কাঁটা হোয়ো না। তাহলে কিন্তু আমি ছাড়বো না তোমায়। রজতকে দিয়ে পাছায় কষিয়ে লাথ মেরে তাড়াবো। নিশ্চিত থাকতে পার তুমি।

এর পরেও শালিনীর সঙ্গে কোনো অনুষ্ঠানে দেখা হয়ে গেলেও তাকে ভান করতে হয়েছে সে কিছুই জানে না, কিছুই বোঝে না। এমনই চলছিল তার জীবন। এর থেকে বেরোবার রাস্তা কই? ভাবতে ভাবতে একদিন বলেও ফেললো তার সিনিয়ার দাদাটিকে। তিনি বহুদিন ধরেই দেখছেন সুতনুকাকে। কিছু কিছু আন্দাজও করতে পারেন তার সম্পর্কে। সমস্যা যে তার আছে একথা না বোঝার কথা নয় তাঁর। কিন্তু সুতনুকা পরিস্কার করে বলেনি বলে তাঁরও আলাদা করে কিছু বলা হয়ে ওঠেনি। এবারে বললেন।

-তুমি আমার বোনের মতন সুতনুকা। আমি যতদিন আছি চিন্তা কর না।

তিনি দায়িত্ব নিয়ে সুতনুকার জন্য প্রথমে আরো বেশী কাজের ব্যবস্থা করলেন। তাঁর সহকারী ছাড়াও অন্যান্য স্বাধীন কাজের ব্যবস্থাও করলেন। সুতনুকার আয় বাড়তে থাকলো। তার বাপের বাড়িতে আরো কিছু টাকা যাওয়া বাড়তে লাগলো। বন্ধ করে দিল রজতের থেকে টাকা নেওয়া। আর শেষ কাজটা হল সে আবার চলে গেল বাপের বাড়িতে একদিন। এককাপড়েই গেল। বাবা বিরক্তি গোপন করলেন না। কিন্তু সুতনুকা পাত্তা দিল না এবারে। একদিন দুদিন করে মাসখানেক চলে গিয়েছে। তার মাথায় ঘুরছে সে এবারে রজতের থেকে বিবাহবিচ্ছেদ নেবে। বোধিকে বলেওছে। বোধির মত এটাই। যে সম্পর্ক অচল তাকে পাহাড় করে মাথায় বয়ে বেড়ানোর কোনো মানে নেই তার কাছে।

সুতনুকা যখন তুলনামূলক নিশ্চিন্ত তখনই আবার সমস্যা এল। তার সিনিয়র দাদাটি অরিন্দম মুখার্জী। অরিন্দমের বৌ শর্মিষ্ঠা আচমকাই একদিন সুতনুকাকে বলে বসলো তার কাজের জন্য বাড়িতে ফোন করার দরকার নেই। যা কাজের কথা-তথা তা যেন চেম্বারেই সেরে নেয়। সুতনুকার বুঝতে বাকী রইলো না কি হচ্ছে! এর ভুক্তভোগী সে। সে চেষ্টা করলো নীলিমাকে বোঝাতে যে সে সত্যি কাজের জন্যই ফোন করেছে বাড়িতে। হিতে বিপরীত হল। শর্মিষ্ঠা তাকে যা নয় তাই বলে ফোন রেখে দিল। অরিন্দমের বয়স অন্তত সাতচল্লিশ হবে তখন। শর্মিষ্ঠার বেয়াল্লিশ। তাদের সন্তান নেই। দাম্পত্যে সমস্যা রয়েছে এ নিয়ে। শর্মিষ্ঠার ইউটেরাসে সমস্যার জন্যই হতে পারেনি সন্তান। সেই থেকে শর্মিষ্ঠার মধ্যে যে জটিলতা বাড়ছিল তা সুতনুকার বাড়তি ভূমিকায় আরো বেড়ে গ্যাছে। এর আগেও সুতনুকা কাজ করতো অরিন্দমের সঙ্গে, কিন্তু তা ছিল কয়েকটা কেস-এ। এখন সব কেস-এই কাজ করছে। অন্যদিকে অরিন্দম সুতনুকাকে আলাদা কাজ দিচ্ছে স্বাধীনভাবে করার জন্য সেটাও শর্মিষ্ঠা বুঝেছে। কিন্তু এর জন্যে কেন তাদের সম্পর্কে এমন ভাবনা হবে মাথায় এল না সুতনুকার। এল যখন তার আলাপ হল বোধির সঙ্গে। বোধিকে তার ভাল লেগেছিল শুরুতেই। তারপরে বোধির লেখাও পড়েছে। সে লেখাও তার ভাল লেগেছে। সেদিন অ্যাকাডেমিতে ম্যাগাজিনের কথা শুনে তারও খুব ইচ্ছে হয়েছিল এমন কিছু একটার সঙ্গে সে যুক্ত হবে যা তাকে তার বৃত্তের বাইরে থাকতে কিছুটা হলেও সাহায্য করবে। সেই জড়িয়ে পড়া। ধীরে ধীরে বোধির অন্যান্য কাজের সঙ্গেও সে জড়িয়ে পড়তে থাকলো। এর মধ্যেই অরিন্দম তার জন্য একটি চাকরীর ব্যবস্থা করলো। সেই চাকরীর সময়ও খুব বেশী না। এক্কেবারে দশটা-পাঁচটা তার কাজ। আজকের সময়ে যা ভাবাই মুশকিল। বোধির সঙ্গে তার দেখা হওয়াটা খুব বেড়ে গেল। আলাপ হল পরমার সঙ্গেও। কিন্তু তার বোধির সঙ্গে দেখা করা, কথা বলার ইচ্ছেটা কমলো না।

অরিন্দম সব শুনলেন। নিজের মতন বুঝলেন। একদিন রাজারহাটে কাজ ছিল তাঁদের। একটি আইটি প্রতিষ্ঠানের ট্যাক্স নিয়ে কাজ। অরিন্দম কাজ সেরে সুতনুকাকে বললেন তাঁর সঙ্গে একবার চেম্বারে যেতে। সুতনুকা জানতে চাইলো কি কাজ আছে সেখানে! ইদানীং সুতনুকা চেম্বারে যায়না আর। খুব দরকার না হলে সে এড়িয়ে চলে চেম্বার। শর্মিষ্ঠার কথা ভেবেই করে। অরিন্দম খুব বিরক্ত হলেন কাজ জানতে চাওয়ায়। জিজ্ঞেস করলেন সুতনুকাকে,

-         তোমারই বা কি এমন কাজ আছে যে কাজ না জেনে যেতে পারবে না চেম্বারে?

-         ম্যাগাজিনটার আজকে প্রথম প্রুফ আসবে। প্রেস-এ বসেই দেখে নেওয়া হবে ঠিক আছে। বোধি দাঁড়িয়ে থাকবে।

-         ওহ্‌!

 গাড়িটা সল্টলেকের রাস্তাতেই দাঁড় করিয়ে দিলেন আচমকা ব্রেক কসে। পিছনের গাড়িগুলো গালাগাল দিতে থাকলো। দাঁড় করিয়েই সুতনুকার দিকের দরজাটা খুলে দিলেন এক ঝটকায়।

-         তুমি একবার করে ভুল করবে আর আমি তার জন্য জীবনপাত করবো তা হবে না। তোমাকে বলেছিলাম বোধি তোমার জন্য না। কথা শোনার দরকার বোধ করনি। এখন বোধিকে পেয়ে আমার দরকার ফুরিয়ে গ্যাছে বলে চেম্বারে যেতে এত কথা। বোধিই এখন তোমাকে খাওয়াবে-পড়াবে, তোমার বাড়ির টাকার যোগান দেবে তো! নেমে যাও। তোমার নাগরের কাছে নিয়ে যাবার জন্য আমার গাড়ি না।

এক রাস্তা লোকের মধ্যে তাকে দাঁড় করিয়ে রেখে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেলেন অরিন্দম। চোখে জল এসে গেছিল সুতনুকার। অপমান্বে মুখটা কালো হয়ে গেছিল। রাস্তার লোকের সামনে কাঁদবে না বলে কোনো রকমে দাঁতে দাঁত চেপে একটা ট্যাক্সি ধরলো সে। ট্যাক্সিটা দাঁড়িয়ে ছিল ওখানেই। এককথায় রাজী হয়ে গেল যেতে। ট্যাক্সিতে উঠে সুতনুকা জানলার দিকে তাকাল। সরে সরে যাচ্ছে পথঘাট। আস্তে আস্তে চোখ ছাপিয়ে জল নামতে থাকলো। সুতনুকা জানলো শর্মিষ্ঠা কেন এত ক্ষিপ্ত। গোটা রাস্তাটা তন্ন-তন্ন করে দেখলো নিজেকে। সে কি কখনো প্রশ্রয় দিয়েছে অরিন্দমকে, একটুও? হয়তো কোথাও দিয়েছে। অরিন্দম যে তার প্রতি দুর্বল, তার সৌন্দর্য্যকে এড়িয়ে চলতে পারেন না বলে দুর্বল, তা সে জানতো। যেমন করে একজন মেয়ে জানে কোন পুরুষ তার প্রতি আকৃষ্ট তেমন করেই। কিন্তু কখনো একে গুরুত্ব দিতে চায়নি। নিজেকেই প্রবোধ দিয়েছে বারেবারে তেমন কিছু না বলে। অরিন্দম তাকে বলেছিল বোনের মতন সে। সে বিশ্বাস করেছিল। কখনো কখনো যে অস্বস্তি হত না এমন না। কিন্তু সেই অস্বস্তিকে গুরুত্ব দেয় নি। নিজেই উড়িয়ে দিয়েছে নিজের মনের মধ্যে সংশয় বলে। এছাড়া তার রাস্তাও ছিল না। যাকেই সে ধরবে কাজের জন্য সেই বিনিময়ে কিছু না কিছু চাইবে। চাইবেই। তাই নিজেকে চোখঠারা দিয়ে চলেছে সে। আজকে তার মনে হল, সত্যি একসময় দিনের পর দিন সে চেম্বারে বসে থেকেছে, এটা-ওটা-সেটা কথা বলে গ্যাছে অরিন্দমের সঙ্গে। অরিন্দম যাতায়াত করতে গিয়ে যখন বারবার ছুঁয়ে গ্যাছে তার শরীর তখনও কিছু হয়নি এমন একটা ভাব নিয়ে চলেছে। যদি সেগুলোকে সে আরেকটু গভীর ভাবে ঠাহর করে দেখত তাহলে তার অনেক আগেই বোঝার কথা ছিল। অরিন্দমের ভেতরে ভেতরে জমেছে তার প্রতি আকর্ষণ। তাই আজকে হঠাৎ করে তার চেম্বারে যাবার অনীহা এত অরিন্দমের ভাল লাগার কথা না। তাছাড়া শর্মিষ্ঠা যখন তাকে এত কথা বলেছে তখন অরিন্দমকে নিশ্চই বাদ দেয়নি। এখন যদি অরিন্দমের মনে হয় সে তাকে ব্যবহার করেছে তাহলে খুব একটা দোষ দেওয়া যায় কি? তাছাড়া বোধি না থাকলে এই অনীহা আসতো কিনা সন্দেহ। আর এলেও তাকে এভাবে কি সে প্রকাশ করতো? সিগন্যালে দাঁড়িয়ে ছিল গাড়িটা। খেয়াল হতেই তাড়াতাড়ি চোখে সানগ্লাস পরে ফেলেছিল সেই বিকেলেই। পাশের গাড়ি থেকে উৎসাহী যুবকের চোখ তার অসহ্য লাগছিল। দোষ তারই সব। বোধিকে বলেছিল সেদিন। প্রেস থেকে একটু তাড়াতাড়ি বেরিয়ে বোধিকে নিয়ে সে দাঁড়িয়েছিল একটি প্রায়ান্ধকার কলেজ স্ট্রীটের গলিতে। বোধি সব শুনেছিল। তারপরে বলেছিল জীবনে মানুষ দেখে শেখে আর ঠেকে শেখে। সে সারাজীবন তাদের রক্ষণশীল বাড়ির পচে যাওয়া পরিবেশে এই দেখেছে যে শরীরকে ব্যবহার করা ছাড়া গত্যন্তর নেই কিছু। তার দিদিরা, বৌদিরা, মা-মাসীরা এই করেই বেঁচেছেন বা মরেছেন। তাই সে একই রাস্তা নিলেও অস্বাভাবিক না। কিন্তু রাস্তাটা বদলাতে গেলে কষ্ট আছে। সুতনুকার এই জীবন প্রবাহ দিয়ে তা হতে পারে না। আরো শিক্ষা চাই, চাই প্রস্তুতি। চাই নিষ্ঠা। চালাকি করে সমস্যার সমাধান হয় না, সমস্যা শুধু বাড়ে মাত্র। সংসার যদি তামাশা হয়ে থাকে তাহলে সেই তামাশা থাকার দরকার কি? কেন সুতনুকা নিজের পায়ে সত্যি সত্যি দাঁড়াবার চেষ্টা করছে না? সুতনুকা ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলেছিল,

-         একটা মানুষও কি নিঃস্বার্থভাবে কিছু করতে পারে না?

বোধি তাকিয়ে ছিল তার দিকে। সুতনুকা বুঝে গেছিল বোধির কথা। সে নিজে যখন স্বার্থই দেখবে তখন অন্য মানুষের কাছে স্বার্থহীনতা আশা করে কি করে? ট্যাক্সি ধরেছিল তারা। বোধি তাকে তার শ্বশুরবাড়ির কাছে নামিয়ে দিয়ে চলে গেছিল ট্যাক্সিটা নিয়ে।

রাস্তায় যেতে যেতে ভাবছিল সে এমন মানুষ অনেক দেখলো সে যারা একই যুক্তিতে চলে। সকলের সঙ্গেই এমন ভাবে চলে তারা। বাবা-মা থেকে বন্ধু-বান্ধব কোনো কিছুই তার থেকে বাদ যায় না। তুমি করবেই আমার জন্য, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমি কেন তা নিয়ে ভাববো! আমি দরকারে তোমাকে ভুলে যাব, দরকারে আবার মনে করবো। আসলে এরা জীবনে পেতেই অভ্যস্ত শুধু, দিতে ভাল করে শেখেনি। দিতে গেলে যতটা বড় হতে হয় নিজেকে ততটাই কমাতে হয় নিজের স্বার্থ। অতটা শিক্ষা হয়নি এদের। খুব সামান্য গন্ডির মধ্যেই বসবাস। সেখানেই শুরু ও শেষ। অসামান্য হয়ে উঠতে গেলে আলাদা করে যা লাগে তা হল বোধ আর নিষ্ঠা। দুটোরই অভাব এদের মারে ক্রমাগত। আবার ঠিক উল্টো দিকে যা আছে তা হল যদি আমি করি তাহলে আমার কথাই শুনে চলতে হবে। আমি ছাড়া অন্য কেউ কথা বলবে না বা বললেও তুমি শুনতে পারবে না। সুতনুকার সঙ্গে অরিন্দমের সম্পর্ক এবারে বদলে যাবে। একই ভাবে তার আর সুতনুকার সম্পর্কটাও বদলে যেতে বাধ্য কি? আবার সুতনুকার থেকে অরিন্দম বশ্যতা কেনই বা চায়? সুতনুকা কি বশ্য হতে বাধ্য? কেউ কাউকে আর্থিক বা অন্য সাহায্য করলে কি তার কিছু অধিকার আলাদা করে জন্মায়?

খুব জটিল। একদিক থেকে দেখতে গেলে যে সাহায্য করছে সে নিজের কিছুকে বাদ দিয়েই সাহায্য করছে। সুতরাং, তাকে জানতে হবে যে সাহায্যের ফল যে পাচ্ছে সে তার কি ব্যবহার করছে। যেমন ব্যাঙ্ক ধার দিলেও এখন জানতে চায় কি কারণে লাগবে সে ধার এবং তার কি খরচ হবে তার খতিয়ান। সেই খতিয়ানে সন্তুষ্ট হলে তবে ধার দেবে। কারণ সেই ধারের টাকা শোধ পাবার ব্যাপার আছে। ব্যাক্তি সম্পর্কেও তাই। শোধ পাওয়াটা শুধুমাত্র টাকায় হয়না, কর্মেও হয়। যিনি দিচ্ছেন তিনি এটুকু চাইবেন ভালর দিক থেকেই। তবে চাইলেই যে অন্যে নেবে মেনে তা হবে কেন? ব্যাঙ্ক দেয় ধার আর মানুষ করে সাহায্য, যা সাধারণ মানবিক কাজ। কাজেই ব্যাঙ্ক আর মানুষের সূত্র এক হতে পারেনা। যাকে সাহায্য করা হচ্ছে তার সাহায্য পাওয়ার পরের অবস্থা নিয়ে ভাবনা থাকতে পারে, কিন্তু তা বলে তাকে বাধ্য করা যায় না। করলে বলতে হবে এও এক ধরণের দাসত্ব করানো হচ্ছে। যেমন অনেক কোম্পানি আজকাল করে থাকে। ট্রেনি হিসেবে চাকরীতে নেয়, তারপরে বলে নির্দিষ্ট সময় তুমি আমার কাছে কাজ করতে বাধ্য। আমার কাছে কাজ না করলে তোমার অন্য কোথাও কাজ করা হবে না। অর্থাৎ সে যাকে সাহায্য হিসেবে দেখাচ্ছে তাকে সাহায্য না বলে বিনিয়োগ বলা ভাল। এই চক্করে বেশ কিছু সংবাদমাধ্যমও আছে। এমন কিছু ক্ষেত্রে বোধি জানে সেই সব সংবাদমাধ্যম চেষ্টা করেছে বাধ্য করতে তাদের কর্মচারীদের তাদের গন্ডীতে আটকে থাকতে। কিন্তু বিনিময়ে তাদের কিছুই দেয়নি তেমন। বরং যে সব পুরস্কার দেবার প্রতিশ্রুতি ছিল সেগুলোও সে মানেনি। কারণ তার হাতে আছে অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা। অরিন্দমও কোথাও এমন ভুল করে বসছে। তিনি যেহেতু পাশে থেকেছেন, দরকারে-অদরকারে অর্থনৈতিক সাহায্য করেছেন সুতরাং তাঁর বলাটা শেষ হওয়া দরকার। কারণ সুতনুকা যা ভাবছে তা দিয়েই যে তার ভাল হবে মন্দ হবে না এমন নিশ্চয়তা কই? তার এতে মন্দও হতে পারে তো! বোধি দীর্ঘ্যদিন ধরেই পরমার সঙ্গে রয়েছে। পরমাকে ছেড়ে সে সুতনুকাকে ধরবে কেন? রজতের থেকে ডিভোর্স নিলেই বোধি সুতনুকাকে বিয়ে করবে বলে তার মনে হয়নি। কাজেই সুতনুকা আবার নিজের সময়, এনার্জি বোধির পেছনে নষ্ট করছে এ তিনি মানবেন না। আর সঙ্গে আছে বোধির জন্য তাঁকেও অবহেলা করছে সে রাগও। তিনি তো শুতে চাননি সুতনুকার সঙ্গে এখনো। ইচ্ছে করে থাকলেও তাকে চেপে রেখেছেন। সুতনুকা তাঁকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে এ ভয় থেকেই করেননি প্রস্তাব। তাই দেওয়া-নেওয়া একমাত্রিক। তার সাধারণ ধর্ম ভুলে যাওয়া যায়। তিনি শুধু দেবেন, আর সুতনুকা নেবে, এটাই যেন ধর্ম।

অনেককাল আগের একটা লেখা মনে পড়লো বোধির। রবীন্দ্রনাথের ‘লোকহিত’।

“আমরা পরের উপকার করিব মনে করিলেই উপকার করিতে পারি না। উপকার করিবার অধিকার থাকা চাই। যে বড়ো সে ছোটোর অপকার অতি সহজে করিতে পারে কিন্তু ছোটোর উপকার করিতে হইলে কেবল বড়ো হইলে চলিবে না, ছোটো হইতে হইবে, ছোটোর সমান হইতে হইবে। মানুষ কোনোদিন কোনো যথার্থ হিতকে ভিক্ষারূপে গ্রহণ করিবে না, ঋণরূপেও না, কেবলমাত্র প্রাপ্য বলিয়াই গ্রহণ করিতে পারিবে।

কিন্তু আমরা লোকহিতের জন্য যখন মাতি তখন অনেক স্থলে সেই মত্ততার মূলে একটি আত্মাভিমানের মদ থাকে। আমরা লোকসাধারণের চেয়ে সকল বিষয়ে বড়ো এই কথাটাই রাজকীয় চালে সম্ভোগ করিবার উপায় উহাদের হিত করিবার আয়োজন। এমন স্থলে উহাদেরও অহিত করি, নিজেদেরও হিত করি না।

হিত করিবার একটিমাত্র ঈশ্বরদত্ত অধিকার আছে, সেটি প্রীতি। প্রীতির দানে কোনো অপমান নাই কিন্তু হিতৈষিতার দানে মানুষ অপমানিত হয়। মানুষকে সকলের চেয়ে নত করিবার উপায় তাহার হিত করা অথচ তাহাকে প্রীতি না-করা।”

—লোকহিত (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

এখন কথা হচ্ছে এত ভারী ভাবনা যে মাথায় আসবে সে মাথা কই? সামান্য দখল নিয়ে আত্মম্ভরীতা যে প্রকারে বেড়েছে তাতে ‘ছোটো হতে হইবে’ এমন কথার মানে বোঝা সহজ কি? নিজেকে ছোটোর জায়গায় বসিয়ে ভাবছে কে? মানুষ তো ভাবছে নিজের বড়ত্ব দিয়েই সব সমস্যার সমাধান করে ফেলবে সে। ছোটো তাকে দেখছে কি করে, আঘাত পাচ্ছে কি পাচ্ছে না, সংশয় হচ্ছে কি হচ্ছে না, পেলে বা হলে কি করণীয় এত ভাবার সময় কই? আমি করেছি বা করছি এই আত্মম্ভরীতায় তো জীবন কাটিয়ে দেওয়া যায়! আর যার জন্য করা হচ্ছে তার এক সময় দম আটকে গিয়ে তার থেকে বিদ্বেষ তৈরী হওয়ার প্রভূত সম্ভাবনা। যে কারণে বিদ্যেসাগরকে একজন যখন গালি দিচ্ছিলেন তখন নাকি তিনি বলেছিলেন,

- ‘আপনি আমাকে গালি দিচ্ছেন কেন? আমি কি আপনার কোনো উপকার করেছি এর আগে?’

জানেনা বোধি বিদ্যাসাগরের নামের এ গল্প সত্য কি মিথ্যা, তবে মানুষ এক সময় সাধারণভাবে উপকারীর প্রতি অত্যন্ত বিমুখ হয়ে ওঠে এটা সেও দেখেছে। এমনকি তার আজকাল মনে হয় বোধহয় অনুজার সঙ্গে সম্পর্কটাও ক্রমশ এই উপকারী আর উপকৃতের সম্পর্কে দাঁড়িয়ে যাচ্ছিল। অনুজার বাড়ি ভাড়া চাই, বোধি ব্যবস্থা করবে। অনুজার বাড়িতে খাট নেই, বোধি ব্যবস্থা করবে। অনুজার জলের কল খারাপ হয়ে গিয়েছে, বোধি দেখে দেবে লোক। অনুজার ব্যাঙ্কে সমস্যা হচ্ছে, কি তার মোবাইল হারিয়ে গিয়েছে বোধি বুঝে নেবে কি করতে হবে! এই ভাবেই ক্রমশ সম্পর্কটার মধ্যে একটা একমুখীতা চলে আসছিল। অনুজার তার জন্য কিছুই করার নেই যেন! যা করবে সব বোধি। বোধিও একদিন এই করার আনন্দে ভেসে গিয়ে মনে করতে শুরু করেছিল অনুজার জীবনের সবকিছুর মধ্যেই তার মাথা গলাবার বিশেষ অধিকার আছে। সেই ঠিক করে দেবে বিয়ে বাড়িতে গেলে অনুজা কি শাড়ি পড়বে থেকে এই চাকরী ছেড়ে অন্য কাগজে অনুজা চাকরী নেবে কিনা! এই করতে করতে উভমুখীতা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। বোধি অনুজার জীবনে হেডমাস্টার হয়ে উঠেছিল। তাই যা হবার তাই হয়েছে। একদিন অনুজার অসহ্য লেগেছে সব বোধহয়। তাই ডানা মেলে দিয়েছে। দেওয়া আর নেওয়া শুধু বাণিজ্য নয়, পারস্পরিক সন্মাননার পন্থাও বটে। যখন মুদ্রা ছিল না সভ্যতায় তখনো মানুষ বিনিময় করেছে। দেওয়া-নেওয়া করেছে। এবং কে না জানে যে কোনো একটি নদী অনন্তকাল একই খাতে নির্বিকার বয়ে যেতে পারে না। বোধিও বড় হতে হতে একদিন ছোট হবার রহস্য ভুলে গিয়েছে। ভুলে গিয়েছে ছোটর কাছেও ছোট হয়ে চাইলে সে আনন্দ পায়। নির্মল দেবার আনন্দ। অনুজা আনন্দ পাচ্ছিল না। সে যে চলে গিয়েছে তার পিছনে এটাও একটা বড় কারণ। বোধি যখন বুঝেছে তখন অনেক দেরী হয়ে গিয়েছে। কিন্তু তবু তো বুঝেছে! যারা এই দেওয়া-নেওয়ার রহস্য বুঝলো না তাদের কি হবে?

সুতনুকা লেখে নিজেও। কবিতা লেখার চেষ্টা করে বলাই ভাল। অল্প-বিস্তর বাঙালীর শখ আর কি! কিন্তু লেখা বা গানকে সে পেশা হিসেবে নেবে না। কি অসুবিধে আছে তাহলে সে যদি ম্যাগাজিনের কাজটা না করে? সে তো কমার্সিয়াল ট্যাক্সকেই জীবন বলে দাবী করে। সেখানে কাজ করতে গেলে নিয়মিত যে পড়াশোনা দরকার তা তার নেই। শুধু সময় নয়, ইচ্ছের অভাবও আছে। পড়াশোনা নিয়ে তার খুব একটা ভাল লাগা নেই। তাহলে এ পেশায় তার উন্নতি হবে কোথা থেকে? আরো হাজার জনের মধ্যে সে একজন হয়ে থাকবে। ভাবিয়েছে।একদিন তার জীবনেও এসেছিল যখন তাকে বেছে নিতে হয়েছিল। কবিতা না চাকরী?  শিল্পচর্চার কোনো বিশুদ্ধ চেহারা হয় না। সেও ঠোকর খেতে খেতে বুঝেছে। তবু সে কিন্তু জানতো তার চাকরীটা আসলে কবিতার বা সামগ্রিক লেখালিখির চর্চার জন্য। সে জানে কোনো একদিন ঠিক সে ছেড়ে দেবে এই চাকরী। চর্চা ছাড়েনি তাই কখনো। হাজারো কাজের মাঝেও চালিয়ে গিয়েছে। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে এসেও রাত্রে বসে গিয়েছে পড়তে বা লিখতে। তারপরে কোনো রকমে তিন বা চার ঘন্টা ঘুমিয়ে আবার দৌড়। ক্লান্ত হয়েছে, কিন্তু থামেনি। একদিন থামাবে চাকরীটা। পরমাও তাই চায়। পরমা জানে এ সব। এখন সে কষ্ট করে অর্থ জমাচ্ছে। চাকরী ছেড়ে সে শুধু লেখালিখির চর্চাই করবেনা, সে একটা ইন্সটিটিউট বানাবে। সেখানে নিখরচায় শেখাবে ছেলেমেয়েদের। কিভাবে লেখা আসে! কিভাবে জন্মায় ভাষা। এ সব কিছুই আকাশ থেকে পড়েনা। এর পদ্ধতি আছে, প্রস্তুতি আছে। তাদের দেশের মতন দেশে যেখানে ব্যাক্তিকেই লড়ে জায়গা করে নিতে হয় সেখানে এই ধরণের চর্চার কথা ভাবাই হয় না। লেখার আবার শিক্ষা কি? সে যার হয় তার হয়, যার হয় না তার হয় না। আসলে ঈশ্বরবাদী এবং ভাগ্যবাদী একটা সমাজের এমনই হবার কথা তো! বোধি জানে। বিভূতি-তারাশঙ্কর-মানিক কি কমলকুমার-জীবনানন্দ-সন্দীপন-শক্তি হয়ে ওঠা যায় না এমনি এমনি। প্রত্যেকের প্রস্তুতি পর্ব আছে। রবীন্দ্রনাথেরও। বিদ্যালয় না পড়লেই পড়াশোনা হয় না এমন না। পড়তে হয় জানতে হয়। তার সঙ্গে ব্যাক্তি বা সামাজিক জীবনের অভিজ্ঞতাকে সংশ্লেষ করে তৈরী হয় সাহিত্য। মিলটন-টেনিসন-জয়েস কেউই তাঁর সময়-সমাজ-জীবন এবং জ্ঞানের সংশ্লেষণ-বিশ্লেষণ ছাড়া তৈরী হয় না। শিল্পের অন্যান্য সকল শাখাতেই শিক্ষার ব্যবস্থা আছে যথাযথ, শুধু লেখার জন্যই নেই? বললেই কিছু লোক বোকার মতন বলবেন সাহিত্য চর্চা করতে এসব লাগেনা। সাহিত্য মঙ্গলগ্রহ থেকে কেউ কেউ পায় নাকি? ক্লান্তিকর কথা সব। বোধির আজকাল এ নিয়ে কথা বলতে ভাল লাগেনা। যদি এই সব নাই লাগতো তাহলে পৃথিবীর অর্থসম্পদে উন্নত দেশগুলোর এই কোর্স বানানোর দরকার ছিল না। বাকী সব শিখতে হয়, আর লেখা এমনি আসে এই সব কথার মধ্যে অন্ধত্ব আছে একধরণের। তার মোকাবিলার জন্য বোধির কথা বলে লাভ নেই। হাতে কলমে দেখিয়ে দেবে সে। আর যাঁরা জানেন এই সব কৌশল তাঁদের ডাকবেন ছেলেমেয়েদের রাস্তা দিতে।

বোধির কম বয়সে বিভিন্ন আড্ডায় পাওয়া সূত্র থেকে সে এগিয়েছে। এখন আর সেই সব আড্ডা নেই। এখন কাফকা-কামু-সার্ত্র বা উদয়ন ঘোষ-অমিয়ভূষণ-ফাল্গুণি নিয়ে আড্ডা দেয় না তেমন। কমে গিয়েছে সেই সব আড্ডা। মার্কেজ-বোর্হেস-কুন্দেরা কিম্বা আফ্রিকার চিনুয়া আচেবে, কি কোয়েটজু তবু খবরের কাগজে এসে পড়েন, কিন্তু ওকরি বেন বা গ্যালগুত দামোন-কে চিনবে কি করে এ দেশের লোক? অনুবাদ ও নেই বাংলায়। কিন্তু মণিমাণিক্য ছড়াচ্ছেন আফ্রিকার বিশাল মহাদেশ জুড়ে। মানব সভ্যতার ধাত্রীভূমির কথা জানলে নিজেদের অতীতের দিকেও একবার তাকানো যায়, আর জানা যায় ঠিক কোথায় এলাম। বোধি ভাবে সত্যি সত্যি যাদবপুরের কম্পারেটিভ লিটারেচারের বৃত্ত থেকে সাধারণ সাহিত্য চর্চার কতটা দূরত্ব এখনো। এই সব নিয়েই তার একদিন কাজ করার কথা। সে জন্য একটা একটা করে টাকা জমাচ্ছে। পরমা তার পাশে দাঁড়িয়েই লড়ে চলেছে। বোধি লেখে কম, কিন্তু পড়ে চলেছে। কারণ পড়া এবং মাঝেসাঝে লিখে দেখাটাই তার অনুশীলন। তার জন্য বর্ষা-খরা হয় না। এমন কোনো দিন নেই যে দিন বোধি তার বেড়ে চলাকে বাদ দিতে পারে। তার কাজকে বাদ দিতে পারে। এ সব কিছুই তাকেও করতে হয় সমস্ত কাজ সেরেই। সংসার তার কম না। পরমা আর তার সংসারের মধ্যে তাদের রক্ত সম্পর্কিত মানুষ ছাড়াও আছে আরো অনেক। তারা তার ছাত্র-ছাত্রীর দল। যাদের সে এখন ধীরে ধীরে কাজ শেখাচ্ছে। প্রতিষ্ঠান তার এখনো হয়নি বলে তো কাজ বন্ধ থাকতে পারে না! এদের জন্য সংসারের রক্ত-সম্পর্কিত বাকীদের সমান চিন্তা থাকে তার আর পরমার, থাকে সহযোগিতা। আত্মীয় তারাও। রক্ত না হলেই কি আত্মীয় হয় না? কিন্তু সুতনুকা এ সব বুঝতে চায় না খুব একটা। উড়ে চলেছে তার মন। গানের বা লেখার অনুশীলন নেই তার। নেই আরো গভীরে ডুবে যাবার ইচ্ছেও। এভাবে হয় না। কষ্ট, বিক্ষেপ, একাকিত্ব থাকবেই। মানুষ যত বড় হয় তত সে একা। তার চিন্তনের জটিল প্রক্রিয়ায় কেউ নেই আর। তার কষ্ট, শোক সবের ধরণ বদলে যায়। সে সব শুধু ব্যাক্তিগতই হয় না, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, বিশ্বমানবিক অথবা প্রাকৃতিক-ও হয়ে দাঁড়ায়। কোন কষ্ট, কোন আনন্দ কোথা থেকে আসে তার হদিশ অন্য লোকে জানবে কি করে? কারোর নিজের জীবন আর চারপাশের প্রতি দায়বদ্ধতাই তার শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধতাও। সেই জীবন যেমন তেমন তার শিল্প হবে। সেই দায়বদ্ধতার সবটা দিয়েই ব্যাক্তিগত বিক্ষেপকে দমন করতে হয়। নিজেকে তৈরী করতে হয়। উন্মুখ রাখতে হয় সেই জমির মত, যে জানে বর্ষার জল পড়লেই তার বীজ ধারণ করতে হবে। অমন সরল, অমন উন্মুখ হতে হয় সমর্পণে। তবে শিল্প কিছু দিলেও দিতে পারে। নইলে সে বড় অকরুণ। তামাশা করেই চলে যাবে গালে ঠোনা মেরে। প্রেমের মতই। সমর্পণ না থাকলে প্রেম হয় না। সেই সমর্পণ না হলে? তখন বাণিজ্য আসে।

এই যেমন তার পাশের ঘরে বসে থাকা মহিলাটির জীবনে সে বাণিজ্য। ক্রেতা সে। সেই বাধ্যতায় সমর্পণ থাকে। এই ক্রেতা-বিক্রেতার সম্পর্ক কখনো কখনো সরে আসে বাড়ির অন্দরেও। স্ত্রী-টি সমর্পণ করে বসে আছেন স্বামীকে সকল। তাঁর জীবনে যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। আগেও ছিল না। তাঁকে তৈরীই করা হয়েছে এই ভাবে যে জীবনের এক পর্যায় আসবে যখন তাঁকে চলে যেতে হবে অন্য ঘরে। সংসারের ছেলেটি যাবেনা। অন্য ঘরে তিনি গিয়ে সেই ঘরের উপযোগী করে নিজেকে গড়ে তুলবেন। সেই উপযোগের একটা বড় কারণ হল তাঁর সমাজে অচল অবস্থা। তিনি, স্বামী পছন্দ না হলে চাইলেই চলে যেতে পারবেন না। হ্যাঁ, এখনো, ২০১১ সালেও, এটাই সত্যি। সুতনুকা, ইংরেজী মাধ্যমে পড়া মেয়ে। গাড়ি চালাতে পারে, গান গাইতে পারে, নাচতে পারে। যে চাকরীতে সম্প্রতি যোগ দিয়েছে সেখানেও সে সাফল্য পাচ্ছে, পাবেও। তবু তার বাবা কিন্তু মনে করে যে সে ভুল করছে। তার উচিত কাজ স্বামীর ঘরে চলে যাওয়া। দরকারে সে তার স্বতন্ত্র জীবন ছেড়ে দিক। সংসার এমন শুধু সুতনুকাকেই বলে না, বলে আরো অনেক অনেক মানুষকে। সে নিজেই দেখেছে। বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা থেকে, শিল্পী, কিম্বা সাংবাদিক-ও। যাঁরা এই সব সহ্য করেও থেকে যান সংসারে, সরতে পারেন না, তাঁরা একটু একটু করে চোরাবালিতে ডুবে যান। মেয়ে, সে যাই করুক, সে প্লেনই চালাক কি রিসেপশনেই বসুক, তার কাজ দিনের শেষে ঘর দেখাশোনা করা আর রাতের বিছানাটাকে গরম করে রাখা পুরুষটির জন্য। পুরুষটি একদিন তার গর্ভে সন্তান উৎপাদন করে ধন্য করে দেবে তাকে। রাসেলের কথা মনে পড়ে গেল বোধির।

“The total amount of undesired sex endured by women is probably greater in marriage than in prostitution.”

                                     -Bertrand Russell

(ক্রমশঃ)

 
Leave a comment

Posted by চালু করুন অক্টোবর 7, 2011 in উপন্যাস, ধারাবাহিক

 

Tags: , , , , , , , , , , , , , , , , , ,

Regarding ‘ইচ্ছামতী’

On the insistence of the publisher of certain periodical and a few of my well-wishers,I had to take the task of writing it again.As I had some commitments towards them which I can not fail, I started rewriting it again. It will be available soon, but with a revised content and all.
 

Some of my readers too were my great strength in this period of inconsistency and I thank them sincerely for being such nice friends and followers of an inconsequent writer like myself.

Soon we will have our publication showcased on this blog page and till then thank you again.

 
Leave a comment

Posted by চালু করুন সেপ্টেম্বর 28, 2011 in আমাদের কথা

 

মহাভারতঃ একটি ঘোষণা

নানান কাজের মাঝে বাধা পড়ে গ্যাছে এই লেখায়। আপাতত পূজো সংখ্যার লেখা চলছে। কিছুদিন সেই সব লেখাগুলোই রাখবো এইখানে। তারপরে আবার শুরু করবো মহাভারত। ততদিন, পাঠক, কিছুটা ধৈর্য্য ধরে সহযোগিতা করুন। আর পড়তে থাকুন এবারের পূজোর লেখাগুলো। যদি ভাল লাগে, কাজে আসে, তাহলে আনন্দ পাব। আগাম শুভেচ্ছা সকলকেই।

 
Leave a comment

Posted by চালু করুন অগাষ্ট 8, 2011 in আমাদের কথা

 

মহাভারত(ধারাবাহিক বুধ ও রবিবার)/২৬

।।২১।।

যাদবদের শাখাটি রাজা পুরুর বংশের মধ্যে সবচেয়ে আলাদা।তারা দীর্ঘ্যকাল সর্বগ্রাসী রাজতন্ত্রের আওতায় আসেনি।তারা রাজা নির্বাচন করেছে,কিন্তু যিনি প্রজার অনুরঞ্জন করেন সেই অর্থটি বজায় রেখেছে।কংসের পিতা উগ্রসেন রাজা ছিলেন,কিন্তু কংসের মত সর্বময় কর্তৃত্ব তাঁর ছিল না।তিনি শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন,ভীতিপ্রদ না।কংসের উচ্ছেদে তাঁর পূনর্প্রতিষ্ঠা ঘটেছে।যারা এই কান্ড ঘটিয়েছে তারা দুই কিশোর,বলরাম এবং কৃষ্ণ।এই দুই কিশোর শূরের এবং ভোজকন্যা মহিষীর পুত্র বসুদেবের সন্তান।বসুদেব সৌন্দর্য্যের জন্য বিখ্যাত।তাঁর অন্য নাম আনকদুন্দুভি।কথিত তাঁর জন্মকালে দুন্দুভি নিনাদে বিশ্বপরিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।ভোজ বংশীয় রাজা আহুক অন্ধক গোষ্ঠীর কুকুর-পুত্র।তাঁর বাহিনীর প্রসিদ্ধি এককালে উত্তরাখন্ডে প্রভূত।আহুকের দুই পুত্র,দেবক এবং উগ্রসেন।দেবকের চারপুত্র এবং সাতকন্যা জন্মায়।দেবকী,শান্তিদেবা,সন্দেবা,দেবরক্ষীতা বৃকদেবী,উপদেবী ও সুনাম্নী এই সাতকন্যার  বিবাহ হয়েছিল বসুদেবের সঙ্গে।বসুদেবের আরো ছয় পত্নী ছিলেন পুরুবংশীয়। রোহিণী,মদিরা,ধরা,বৈশাখী,ভদ্রা ও সুনামা।দুই পরিচারিকা সুতনু এবং বড়বা-ও তাঁর পত্নীরূপে পরিগণিত হয়।বসুদেবের জ্যেষ্ঠা পত্নী পুরুবংশীয় রোহিণীর পুত্র রাম বা বলরাম।আর কৃষ্ণ ভোজ বংশীয় দেবকীর সন্তান।ব্যাসদেব মনোনিবেশ করে এদের বংশবৃত্তান্ত শুনছিলেন।পুরু,ভোজ এই দুই বংশের সঙ্গেই এদের সম্পর্ক আছে।আবার বৃষ্ণি এদের বংশনাম।পুরাণখ্যাত কার্ত্যবীর্য্যার্জুনের হৈহয় বংশের সঙ্গে এদের সম্পর্ক আছে বংশ সূচক যাজ্ঞিক ক্রোষ্টার জন্য।ক্রোষ্টা,যদু পুত্র হৈহয় বংশস্রষ্টা সহস্রদের ভ্রাতা।

দীর্ঘ্য বিস্তির্ণ বংশলতিকা মন দিয়ে শুনছিলেন ব্যাসদেব।এই বংশলতিকার মধ্যেই লুকিয়ে আছে তাঁর ভাবনার উপাদান। এই দোয়াবের শাসক যারা তারা সকলেই বংশধারা সূত্রে জড়িত।কিন্তু বিবেচ্য সেটা না,বিবেচ্য হল রাজনৈতিক স্বার্থ।যদু বংশের ক্ষেত্রে তাঁর আগ্রহের পিছনে আরেকটি সূত্র আছে।কুন্তিভোজের পালিতা কন্যা কুন্তী আসলে বসুদেবের পিতা শূরের কন্যা।রাজা উগ্রসেনের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা দেবকের জামাতা বসুদেব তাঁর ভগ্নী সম্পর্কে কতটা উৎসাহী সেটাও বিবেচ্য।পান্ডব যুধিষ্ঠির হস্তিনাপুরের সিংহাসনের ন্যায্য উত্তরাধিকারী,এ বিষয়ে তাঁর কোনো সন্দেহ নেই।গাঙ্গেয় যতই অপেক্ষার পক্ষপাতী হোন না কেন,ব্যাস জানেন যদি ভবিষ্যৎ নিদারুণ কোনো দুর্দিন না আনে তাহলে কুরু বংশের রাজত্বের ধারা বইবে পান্ডব নদীখাত ধরে।কৃষ্ণ-বলরাম আজ দুই কিশোর।কিন্তু তারা যে কান্ড করেছে তাতে তাদের যদু-নায়কত্বে উত্তীর্ণ হওয়াটা শুধুমাত্র সময়ের অপেক্ষা।পান্ডব এবং এই দুই বার্ষ্ণেয় ভ্রাতাস্থানীয়। কেমন হবে এদের সম্পর্ক?কংসের পতনের পরে জরাসন্ধের মুঠি আলগা হয়েছে নিঃসন্দেহে।ভোজ,অন্ধক,বৃষ্ণিরা আবার জরাসন্ধের গ্রাসে যেতে চাইবেনা।তারা রুখে দাঁড়াবে।জরাসন্ধও জানেন যে এই যাদবেরা আদতে অত্যন্ত স্বাধীনচেতা।কংস তাদেরই একজন ছিল।তার শাসনকে এরা তবু একরকম ভাবে নিয়েছিল,কিন্তু সরাসরি জরাসন্ধের শাসনের চেয়ে মৃত্যুও এরা শ্রেয় জ্ঞান করবে।তাছাড়া জরাসন্ধের সরাসরি হস্তক্ষেপ এখন কুরুদের পক্ষেও মেনে নেওয়া সহজ হবেনা।জরাসন্ধের মিত্রদের অনেকেরই কোনো না কোনো বৈবাহিক সম্পর্ক আছে যাদবদের ঘরের কন্যাদের সঙ্গে।তাদের পক্ষেও সহজ হবেনা অন্তঃপুরকে অতিক্রম করে জরাসন্ধের যুদ্ধ প্রচেষ্টায় সায় দেওয়া।তাহলে?

ব্যাসদেব যে হস্তিনাপুর ছেড়ে এসেছিলেন সেই হস্তিনাপুর আজ নিশ্চই আরো জটিল আবহাওয়া ধারণ করেছে।এই খবর নিশ্চই পৌঁছেছে কুন্তী,ভীষ্ম,বিদুর এবং সর্বোপরি ধৃতরাষ্ট্রের কাছে।তারা কি ভাবছেন?কুন্তীর এই শক্তিবৃদ্ধি পান্ডবদের লাভ।ধৃতরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া কি এখন? কদম বিশ্রাম নিতে গিয়েছেন রাত্রির দ্বিতীয় যামে,তিনি এখনো বিরামহীন।আশ্রমে আসার পথে দীর্ঘ্য রথযাত্রার ধকল তাঁকে ক্লান্ত করেছিল,কিন্তু এখন সেই শ্রান্তিও টের পাচ্ছেন না উত্তেজনায়।আশ্রমের চতুর্দিকে অগাধ শান্তি।সকলেই বিশ্রাম রত।প্রহরায় রয়েছে কিছু বনবাসী।এঁরা তাঁর আশ্রমের অন্নে প্রতিপালিত।প্রহরা এবং গোধন প্রতিপালন এদের কাজ।জঙ্গলের কাঠের ঢিবি করে আগুণ জ্বলছে আশ্রমের প্রান্ত ঘেঁষে।শ্বাপদ এবং রক্ষদের আক্রমন ঠেকাতে এই ব্যবস্থা।সেই আলোয় দেখা যাচ্ছে কিছুটা।তিনি উঠে পড়লেন তাঁর বিশ্রামাসন ছেড়ে।এখনই একবার চতুরকে চাই তাঁর। হস্তিনাপুরে দূত পাঠাতে হবে।

 

(ক্রমশঃ)

 
Leave a comment

Posted by চালু করুন মার্চ 26, 2011 in উপন্যাস, ধারাবাহিক

 

Tags: , , , , , , , , , , , , , , , ,

মহাভারত(ধারাবাহিক বুধ ও রবিবার)/২৫

।।২০।।
একটি অভ্যুত্থানের পিছনে কত বিস্তৃত পরিকল্পনা থাকতে পারে তা মহর্ষি গর্গের এই কান্ড সম্পর্কে না জানলে সত্যি বোঝা সম্ভব না।মহর্ষি গর্গ কণাদপন্থী।পরমাণুবাদী দার্শনিক।বিশ্ব পরমাণু দ্বারা গঠিত এবং বিশ্বের স্রষ্টা কোনো চেতন অস্তিত্ত্ব নয়,এই ছিল তাঁদের মতবাদ।তর্কের শাখার মধ্যে এটিও একটি জোরালো শাখা ছিল।কণাদ,এই শাখার উদ্গাতা,এককালে ছিলেন অন্নব্রহ্মবাদী বলেই মনে হয়।এমনই শ্রুতি ছিল।তিনি একদিন অন্নগ্রহণের সময় দেখলেন যে অন্ন থেকে ক্ষুদ্রাংশ তিনি ফেলে দিচ্ছেন এবং সেই ক্ষুদ্রাংশকে আর ভাগ করা যাচ্ছেনা।তখন তাঁর মনে হয় তাহলে ব্রহ্মান্ডও এমন কণা-সমূহ দ্বারা গঠিত যাতে এমন অবিভাজ্য কণা রয়েছে।আর সেই কণা প্রতিটি পদার্থে রয়েছে সীমিত পরিমাণেই।একটি তর্কের থেকেই এই ভাবনার উৎপত্তি হয়েছে।ধরা যাক,একটি পাথরের মধ্যেও রয়েছে অনন্ত সংখ্যক পরমাণু এবং হিমালয় পর্বতেও রয়েছে তাই।তাহলে কি হবে?কারণ পাথরের মধ্যেকার পরমাণু দিয়ে তাহলে হিমালয় তৈরী করে ফেলা যাবে,যা অসম্ভব।সুতরাং কণাদবাদীরা মনে করতেন এই পরিমাণ অবশ্যই সীমিত।
এর সঙ্গেই ছিল আরেকটি প্রশ্ন।সেই প্রশ্নের অভিমূখ ছিল স্রষ্টার দিকেই।এর স্রষ্টা কে?কণাদের বৈশেষিক দর্শনের ভাবনা ছিল পরমাণু অবিভাজ্য এবং সে অক্ষয়ও।কাজেই এর স্রষ্টার প্রশ্ন থাকতে পারেনা।মহর্ষি গর্গের সময়ে এই ধারণার পরিবর্তন ঘটতে শুরু করেছিল।প্রাথমিক বৈশেষিকরা যেমন নিজেদের প্রত্যক্ষ এবং অনুমানের উপরেই শুধু নির্ভর ছিলেন তেমন আর থাকা গেল না।বিশ্ব পঞ্চভূতের অবদান।এই পঞ্চভূত হল পৃত্থ্বী, ব্যোম, তেজ, অপ,আকাশ।এই ছিল কণাদের ভাবনা।সঙ্গে কালে কালে যুক্ত হয়েছিল স্থান,কাল।কিন্তু এই ভাবনাকে রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়ছিল,যাজ্ঞ্যবল্কবাদীদের এবং অন্যান্য বেদবাদীদের আক্রমণের মুখে।পরমাণু অচেতন।তাহলে বিশ্বে চেতনের স্রষ্টা কে?এই প্রশ্নের উত্তরে ব্রহ্মবাদীদের ছিল পরমব্রহ্ম।পরমাণুবাদী বৈশেষিকদের হাতে ছিল না এর উত্তর।তাঁরা পদার্থের দ্রব্য,গুণ,কর্ম,সমন্বয়(সাধারণ অবস্থা),বিশেষ(বিশেষ অবস্থা),সমবায়(কণাদ একে কার্য-কারণ সম্পর্ক হিসেবেই ধরেছিলেন) নিয়ে কাজ করতেন।কিন্তু পদার্থর স্রষ্টা কে,এই প্রশ্ন তাঁদের একাংশকে ক্রমশ দুর্বল করে দিল।আসলে কণাদবাদকে রক্ষা করতে গিয়ে মহর্ষি গর্গও দেখেছেন যে সমস্যা হচ্ছে এই ভাবনাটির প্রত্যক্ষ প্রমাণ অনুপস্থিত।এটি শুধুমাত্র তর্কের ক্ষেত্রেই প্রমাণিত হচ্ছে, অন্যান্য ক্ষেত্রে না।সেখানেই বিরোধ এল।গর্গের সময়েই একদল ন্যায়ের সঙ্গে এর মৈত্রী গড়ে তুললেন।তাঁরা বললেন এর সৃষ্টিতে আছে সর্বময়ের ইচ্ছা।তাঁরা পদার্থের সকল গুণের সঙ্গে যুক্ত করলেন অভাব(অনস্তিত্ত্ব)-কে।তার ফলে পদার্থ গঠনের উপাদান হিসেবে এল আত্মা এবং মন।
গর্গ চোখের সামনে দেখলেন ক্রমশ ক্রমশ তাঁর অধীত কণাদবাদ যা বৈশেষিক নামে পরিচিত তা চলে যাচ্ছে ন্যায়বাদীদের কব্জায়। আত্মা,মন ইত্যাকার বুদ্ধিজাত অ-পদার্থ এসে বেদের মতই একেও ক্রমশ ঈশ্বর মুখাপেক্ষী করে তুলছে।যাঁরা একে মেনে নিচ্ছেন তাঁরা সকলেই ধনাঢ্য হয়ে উঠছেন কংসের কল্যাণে।আর যাঁরা বিরোধ করছেন তাঁরা কংসের রাজত্বে চিহ্নিত হচ্ছেন উপদ্রবকারী হিসেবে।আশ্রম ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে রাতের অন্ধকারে।মথুরা এবং সংলগ্ন অঞ্চলের লোকেরাই প্রধানত দ্বারকা বাসী কণাদকে পিছে ফেলে দিচ্ছেন তাঁরই মতবাদে।গর্গ তখন শিক্ষান্তে আশ্রম করেছেন একটি।সেই আশ্রমে তিনি একটি পাঠ পড়াতেন কণাদের রাবণভাষ্যের।কথিত,লঙ্কারাজ রাবণ,এই ভাষ্য রচনা করেছিলেন কণাদের বৈশেষিকের।একরাত্রে তাঁর আশ্রমও আক্রান্ত হল।কংসের লোকেরা জানিয়ে গেল এই পাঠ পড়ানো যাবেনা।এর আগে তিনি কংসের অত্যাচার সম্বন্ধে অবহিত ছিলেন,কিন্তু প্রত্যক্ষভাবে তার ফল ভোগ করেননি।এবারে করলেন!সেই রাত্রেই আশ্রম ছাড়েন গর্গ।কণাদ তাঁর সর্বার্থে গুরু।তাঁর মতবাদ যেখানে আক্রান্ত সেখানে কোনো কিছুই নিরাপদ না।কংস এবং বেদপন্থীরা জোট বেঁধেছে।ন্যায়,সাংখ্যের লোকেরাও আছে সেখানে।
কংস নিজে বেদাচারী না।তার শ্বশুর জরাসন্ধ তার বেদাচারী হওয়াকে সমর্থন করবে না।কিন্তু বেদবাদীদের বিরোধের অজুহাতে একে একে বিরোধী মতবাদ দমনের কাজে সে অত্যন্ত সক্রিয়।অভিযোগ ছিল বেদাচারীদের আক্রমণের উদ্দেশ্যে আশ্রমে অস্ত্র-শস্ত্রাদি জমিয়ে রাখছে বৈশেষিক পন্থীরা।এবং গর্গ তাঁদের অন্যতম।আসলে মহর্ষি গর্গকে তর্কযুদ্ধে পরাস্ত করার মত কেউই ছিল না অঞ্চলে।তিনি বেদবাদীদের জন্য কঠিন প্রশ্ন রেখেছিলেন,যার উত্তর তাদের কাছে ছিল না।তিনি জানতে চেয়েছিলেন যদি ঈশ্বর সর্বগুণনিরপেক্ষ হন তাহলে তাঁর সৃষ্টিতে বিবিধ গুণ এবং দোষ আসে কেন?যদি ঈশ্বর শুধুমাত্র সৎ হয়ে থাকেন তাহলে অসৎ আসে কোথা থেকে?যদি ঈশ্বর ভাল ছাড়া অন্য কোনো গুণের অধিকারী না হয়ে থাকেন বা সৃষ্টির ভাল করাই তাঁর কাজ হয়ে থাকে তাহলে সৃষ্টিতে কেন মন্দ জোটে কারোর?জন্মান্তরের কর্মও তো শুরু হয়েছে কোথাও!সেই শুরুতেই বা তাহলে মন্দ এসেছিল কেন?স্রষ্টা যদি নাই চাইতেন মন্দকে তাহলে সৃষ্টি মন্দ করে কি করে?যদি করে তাহলে কি স্রষ্টার সৃষ্টির উপরে অধিকার নেই?নানান এমন প্রশ্নে জেরবার হয়ে যেত বেদবাদী ব্রহ্মবাদীরা তর্কসভায়।
ন্যায়ের লোকেরাও ছাড় পেত না।শব্দকে প্রমাণ হিসেবে ধরে নেওয়াটাকেই প্রশ্ন করতেন গর্গ।কেন মানা হবে একে প্রমাণ হিসেবে?প্রাচীন যে সঠিক তা কিভাবে মানা যাবে,যখন পৃথিবীর সকল পরিবর্তনের অধীন?এত গায়ের জোরে মানানো হচ্ছে।যেমন নাকি যাজ্ঞ্যবল্ক গার্গীকে থামিয়ে দিয়েছিলেন অতিপ্রশ্নের কথা বলে তেমন তাঁকে থামানো যায় নি।গর্গ ছিলেন যথেষ্ট শক্তিশালী পুরুষ।খ্যাতি ছিল তাঁর শস্ত্র চালনাতেও।তিনি নিজেই হেসে বলতেন যাজ্ঞ্যবল্ক তাঁকে এভাবে ভয় দেখালে তিনি বুঝে নিতেন তার ক্ষমতা।সাংখ্যবাদীরাও কপিলের যে বিকৃতি ঘটিয়েছিল তাকেও ছাড়েননি তিনি।প্রকৃতিই যদি ক্রিয়াশীল হয় তাহলে পুরুষের কি প্রয়োজন?আর পুরুষ সেখানে প্রধান হবে কেন?এভাবে ক্রমশ তাঁর শত্রু বেড়েছে।তর্কসভায় পরাস্ত হতে হতে শিষ্য কমেছে অন্যান্য শাখার লোকদের।তিনি আরো অপ্রিয় হয়েছেন।সেই সব শোধ উঠিয়েছে তারা কংসকে দিয়েই।আর কংসও তার শাসনের পাশে অনুগত মুনি,ঋষি,বিদ্বান জড় করার অভিলাষে আক্রমণ করেছে গর্গকে এবং কণাদপন্থীদের।অনেকেই সন্ধি করে নিয়েছে।গর্গ করলেন না।
সেই শুরু।তারপরে দীর্ঘ্য সময় গর্গ ভ্রমণ করেছেন মথুরা রাজ্যের প্রতিটি অংশ।যাদবদের রাজনীতি কেন্দ্রীভূত ছিল গণসভার অস্তিত্বের মধ্যে।সেই অস্তিত্বকে যখন কংস উপড়ে ফেলে দিল,রাজা উগ্রসেনকে বন্দী করলো,বন্দী করলো নিজ ভগিনী দেবকী এবং বান্ধব বসুদেবকে তখন মথুরা নগরে কোনো বিরোধী কেন্দ্র রইলো না।কংস ভেবেছিল বসুদেব তাকে সমর্থন করবে।কিন্তু তা না হওয়ায় সে ক্ষিপ্ত হয়।এই সূত্রটা ধরলেন গর্গ।বসুদেবের মিত্রতা ছিল গোপেদের সঙ্গেও।সে স্বভাব বশতই মিষ্টভাষী।শ্বশুর উগ্রসেন রাজা থাকাকালীন গোপেদের রাজনৈতিক এবং অন্যান্য সুযোগ সুবিধার প্রতিনিধিত্ব সেই করতো মথুরাপুরে।প্রথমে গর্গ গোপেদের মধ্যে নিজের অবস্থান শক্ত করলেন।তারপরে মথুরাপুরে খুঁজে বের করলেন কংস বিরোধী গণসভ্যদের।দ্বিতীয় কাজে তাঁর সাহায্য করেছেন কদম।যেহেতু কংসের নজর বেশী থাকবে গর্গের উপরে,তাই তিনি রাজধানীতে আসতেন না।আসতো কদম।অক্রুর,পৌল সাত্যকীরা ধীরে ধীরে মেনে নিয়েছেন একমাত্র উপায় অভ্যুত্থান।কিন্তু সামরিক অভ্যুত্থান হওয়া অসম্ভব।কংস নিজের হাতে রেখেছে সৈন্যবাহিনীকে।তাদের প্রতিপালনে সে যথেষ্ট মনোযোগীও।সাধারণ মানুষ সেই বাহিনীর সঙ্গে সমরবিদ্যায় পেরে উঠবে না।তাহলে?
শুনছিলেন ব্যাস।আর মনে মনে প্রণাম জানাচ্ছিলেন মহর্ষি গর্গ-কে।সবচেয়ে আশ্চর্য্যের বিষয়,এর আগে কোনো ঋষি সমাজবিপ্লবে অংশ নিয়েছেন এমন তাঁর জানা নেই।রাজনীতিতে তাঁদের অংশগ্রহণ আছে অবশ্যই।কিন্তু এভাবে নিজের সাধনা,নিজের পঠন-পাঠন সব শিকেয় তুলে রেখে এভাবে এত দীর্ঘ্যকাল একটি মাত্র রাজাকে ক্ষমতাচ্যুত করার উদ্দেশ্যে এত দীর্ঘ্য লড়াই কেউ করেননি।এ এক নতুন ব্যাপার।তিনি এত মন দিয়ে বহুকাল প০রে কিছু শুনছেন।তাঁকে জানতে হবে এর সংগঠন হয়েছে কেমন করে!এই সংগঠন যদি অমিত শক্তিশালী জরাসন্ধকে,যাকে এই দেবখন্ড বা উত্তরাখন্ডের রাজ-রাজেন্দ্ররাও সমীহ করে চলে,গাঙ্গেয় যাকে উপেক্ষা করেন না,তাকে উপেক্ষা করে তার জামাতাকে ক্ষমতাচ্যুত করাই না শুধু,হত্যাও করতে পারে,এমন শক্তির সংগঠন না জানাটা একটা অপরাধই।দুপুর পেরিয়ে গিয়েছে বিকেলে।কদম বলে চলেছেন,তিনি শুনছেন।তিনি শুনবেন।দরকার হলে আজ সারাদিন-সারারাত।

(ক্রমশঃ)

 
Leave a comment

Posted by চালু করুন মার্চ 6, 2011 in উপন্যাস, ধারাবাহিক

 
 
Follow

Get every new post delivered to your Inbox.

Join 49 other followers