
চক্রবৃদ্ধি সুদ শুধু
O WHAT can ail thee, knight-at-arms,
Alone and palely loitering?
The sedge has wither’d from the lake,
And no birds sing।
-La Belle sans Merci (John Keats)
এখানেও এখন পাখির ডাক নেই। শৈবালগুলো এখানেও বিবর্ণ হয়েছে। ইছামতীতে। রাত গভীর হয়ে এসেছে। এখন রাস্তায় কিছু বড় বড় ট্রাক যাতায়াত করছে। সামনের পুলিশ থানাটাও প্রায় নিঝুম। হলঘর থেকে বেরিয়ে গেটের কাছে দাঁড়িয়েছে বোধি। কেউ নেই। একটু আগে লোডশেডিং হয়ে গিয়েছে। এই বাংলোয় সাধারণত এমন হয় না। এটা ভিভিআইপি-দের জন্য। কাজেই এখানে লোডশেডিং হলে সেটা বেশ গুরুতর ব্যাপার। কিন্তু আজকে হচ্ছে ঘনঘন। আজ নাকি কোথাও একটা ওভারহেডের কাজ হচ্ছে। একটু আগে সুমঙ্গল এসেছিল। সে ফোন করে জেনেছে বিদ্যুৎ পর্ষদ থেকে। আরো একঘন্টা থাকবেনা। রাতের আকাশটার দিকে তাকাল বোধি। কলকাতা থেকে এত দূরে আকাশটাও কেমন ভাল লাগে। ঝকঝক করছে আকাশ। কে বলে আকাশে তারা নেই? কলকাতায় তার ফ্ল্যাটের ছাদে দাঁড়ালে আকাশ মানে একটা ধুসর ছোপ রঙের। বিশুদ্ধ অন্ধকারও নেই ওখানে।
বিশুদ্ধ অন্ধকার নেই আর সবখানে,
নেই কোনো বিষ্ময় আর জাগতিক
উন্নতি টাঙিয়েই উড়ালপুলে গাণিতিক
চক্রবৃদ্ধি সুদ শুধু সভ্যতা, ব্যাঙ্ক, বিমানে;
মাথায় ঘুরছিল লাইনগুলো। বোধির হাতে মাঝেসাঝে কবিতা এসে পড়ে। এককালে নিয়মিত লিখতো। আজকাল কালেভদ্রে লেখা হয়। এখন এই ঘন অন্ধকার আকাশের বুকে তারাদের ঝিলমিল দেখে তার কাছে কবিতা এসে বসলো। সামনের গাছটার নীচে বাঁধানো একটা চাতাল আছে। বোধি ধীর পায়ে এগুলো। তাড়া করলেই কবিতাগুলো সব উড়ে যাবে। উড়ে যায় তার থেকে বারেবারে।
চাতালে বসে লাইনগুলো আরো কবার আউড়ে নিল সে। যেন মুখস্ত করছে। কিন্তু লাভ কি? সে তো এই লাইনগুলো লিখবে না কখনো। মেশিনে লেখে সে। মানে কম্প্যুটারে। কিন্তু সেখানেও লিখবে না এই কটা লাইন। হারিয়ে যেতে দেবে। সে জানে। সে নিশ্চিত করে জানে। কতবার কত মানুষকে হারিয়ে যেতে দিল! অথবা এভাবেও বলা যায় হারিয়ে গিয়েছে সে নিজেই।
এইখানে ইছামতী, অন্ধকার হয়ে আছে জল।
জাহাজের নোঙর পড়েনি বল কতকাল?
কতকাল শুধু ফিসফিস করে হাওয়া
বলে গ্যাছে আমাদের শুধু, শুধুই যাওয়া।
ফিরে আসেনাকো কোনো রোদ, প্রকৃত কখনো
বেলা হয়ে গেলে সারসেরা দূর পায়ে বিশ্রামে যেন,
কোন্ রাত্রি এত একা হয়, এইখানে এইখানে ছাড়া
তুমি জেগে থাক বহমান একা একা কালের পাহারা?
সে এখন চাইলেই লিখে ফেলতে পারে। কিন্তু লিখবেনা। যেমন এখন মেয়েটি বসে আছে তার জন্য কিছুটা দূরের ওই ‘ইছামতী’ হোটেলের ঘরে। সে চাইলেই তার সঙ্গে সঙ্গমে রত হতে পারে। তবু যাবেনা সে। তার হারিয়ে যাওয়াই কাজ। কলকাতা থেকে সে যখন এসেছিল এখানে তখনও এক রকম হারিয়েই গিয়েছে। সেই হারিয়ে যাওয়া তার সুতনুকার থেকে। পরমা জানে সে হারিয়ে যেতে এসেছে। পরমা তাকে হারিয়ে যেতে দিয়েছে। জানে না হারালে বড় কষ্ট তার। সুতনুকা, পরমা না। সে এত জানে-বোঝে না। বুঝতে চাওয়ার ইচ্ছেও তার নেই। অথবা বোধি শুধুমাত্র Bundle of contradiction! ইচ্ছে আর অনিচ্ছের দোলাচল।
ইচ্ছে। শব্দটা এই অন্ধকারে তার বেশ লাগলো। একটা আলগা আদর যেন শব্দটার মধ্যে। ইচ্ছে। পায়ে পায়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে এসেছে ব্রীজের উপরে। ছোট্ট ব্রীজ একটা। ক্যান্টিলিভার। মনে পড়তেই তার মনে এল কাইচি ওয়াতানাবে-র কথা। জাপানি এঞ্জিনীয়ার। অনেককাল আগে প্রায় ১৮৮০ সালে স্কটল্যান্ড এবং ইউনাইটেড কিংডমে গিয়েছিলেন পড়তে।বোধির মনে পড়লো ছবিটার কথা। কাইচি মধ্যে বসে আর দুইধারে দুইহাতে এবং পায়ের মধ্যে দড়িদড়া নিয়ে বসা জন ফাউলার আর বেঞ্জামিন বেকার। দুজনকেই ব্রিটেন স্যার উপাধি দিয়েছিল সেই আমলে ফোর্থ রেল ব্রীজ বানানোর জন্য। অনেকদিন আগে বোধি যখন সদ্য সাংবাদিকতা করতে এসেছে তখন সে এই ছবিটা নিয়ে একটা প্রতিবেদন লিখেছিল। তার লেখাটা নিয়ে সে গিয়েছিল অনুজার কাছে। অনুজাকে তখন সে অনুজাদি বলতো। অনুজা লেখাটা খুব গম্ভীর মুখ করে পড়েছিল। পড়া শেষ করে তার দিকে মুখ তুলে চেয়ে বলেছিল,
-তাহলে ছবি দিয়েই ছাপতে হবে তো?
অনুজা ডেস্কে ছিল। তাদের লেখার উপর কলম চালানো-টালানো, কি যাবে না যাবে সে সব খবরদারী করা ছিল তার কাজ। বোধি তখন সদ্য যুবক। লম্বা লম্বা চুল। গালে চিকণ দাড়ি। চোখদুটো খুব ইন্টারেস্টিং ছিল। মেয়েরা এমন বলতো। সে একটু হেসে বলেছিল ছবি না হলে বোঝা যাবে না যে গল্পটা। অনুজা চশমার ফাঁক দিয়ে দেখছিল তার দিকে। কিছুকাল পরে যখন অনুজার ফ্ল্যাটে অনির্বাণদার অনুপস্থিতি তারা দুজনে বিছানাটাকে মত্ত করে তুলেছিল তখন অনুজা তাকে খুব গম্ভীরভাবে বলে,
-এবারে ছবি তোল্।
সে তখন সবে প্রবেশ করেছে অনুজার মধ্যে। তার মধ্যে তুঙ্গ উত্তেজনা। অনুজা দুই হাতে দুই পা ধরে, কোমরের নীচে বালিশ দিয়ে শুয়ে। অনুজার লম্বাটে মুখের ডোলটার মধ্যে একটা চাপা হাসি খেলছিল। সে কোমরটা একটু তুলে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল,
-মানে?
-ছবি ছাড়া ক্যান্টিলিভার বোঝা যাবে?
অনুজা খিলখিল হাসিতে ভেঙে পড়েছিল।
Cantilever Bridge.—A structure at least one portion of which acts as an anchorage for sustaining another portion which extends beyond the supporting pier.
— John Alexander Low Waddell, Bridge Engineering
অনুজার হাতদুটো ওর পা দুটোকে ধরে আছে। এটা দেখতে দেখতে হাসি পেয়ে গেছিল বোধির। ব্রীজের কাছে দাঁড়িয়ে খুব মনে হচ্ছিল অনুজার কথা। অনুজার একঢাল চুল ছিল। আর ছিল একটা সোনালি ফ্রেমের চশমা। অনুজা এখন অনেক দূরে। অনির্বাণদার সঙ্গে ঘরটা ভেঙে গ্যাছে। সে থাকাকালীনই ভাঙছিল। দুজনে দুই দিকে ছুটে চলেছিল। তার সঙ্গে সম্পর্কটা হঠাৎ হয়ে যাওয়া একটা সম্পর্ক। খুব গভীরতা ছিল না প্রথমে। যা ছিল তা হল একটা আদিম টান। বোধির সঙ্গে অফিসের বাইরে দাঁড়িয়ে চা খেতে খেতে দু-একটা কথার কদাচিত ঝলকে যা খুলেছিল তা বাঁধন খুললো সিনেমা হলের অন্ধকারে। বোধির কিছু করতে হয়নি তেমন। শুরুটাও করেছিল অনুজাই। খিদে? অনুজাই তাকে বলেছিল হল থেকে বেরিয়ে বাসে উঠে,
-খিদে পেলে খেতে হয় লজ্জা করতে নেই।
প্রথমে বোধি বোঝেনি। কেন বলছে এমন? তার তো খিদে পায়নি। বোধি একটু বোকার মতন বলে বসেছিল,
-খিদে পায়নি তো!
-তাহলে হলে এতক্ষণ কি হল? আমার বুকটা তো ছিবড়ে হয়ে গেল রে!
বলেই আবার হাসিতে ভেঙে পড়েছিল। বাসের লোকেরা তাকিয়ে ছিল অবাক হয়ে তাদের দিকে। চাপাস্বরে কথা হতে হতে, আচমকা এমন দমফাটা হাসি, তাদের অবাক করেছিল। কিন্তু অনুজা এমনই। বোধিই লজ্জা পেয়েছিল। রাস্তার দিকে মুখ করে বসেছিল খানিকক্ষণ।
খিদে। শব্দটা তাকে ভাবিয়েছিল। সত্যিই খিদে তার ছিল। অনুজা যখন প্রায় লোকহীন হলে তার কোলে উঠে বসলো তার দিকে মুখ করে তখন আর তার ভাবার সময় ছিল না ভুল না ঠিক। তার আজন্মের খিদে ছিল। সেই খিদে মেটাতে পাগলের মতন অনুজার ব্লাউজকে তুলে দিয়ে…। তাকে শীলিত করেছিল অনুজা। তার বন্যতা, বর্বরতাকে থামিয়েছিল অনুজাই। অনির্বাণদার অনুপস্থিতি বা অফিস কেটে রেসর্ট, সবেতেই অনুজা ছিল তার শিক্ষক। ধীরে ধীরে তাকে শরীর চিনিয়েছিল সে। উদ্ভ্রান্তের মতন ঝাঁপিয়ে-লাফিয়ে শরীরকে ঘাঁটতে নেই। ধীরে ধীরে তাকে খুলতে হয়। তাকে সাজাতে হয় আদরে আদরে। আবার কখনো বন্যতাও ভাল লাগে। সেই বন্যতাও এক এক সময় এক এক রকম। বলা যেতে পারে অনুজা ছিল তার বাৎসায়ন। পেটের মতন শরীরের একটা খিদে আছে তা সে জানতো, কিন্তু তাকে মেনে নেওয়ার সাহস তার ছিল না। তাকে তার চারপাশ সে শিক্ষা দেয়নি কখনো। বরং সেই শিক্ষাকে সঙ্গোপনে গোপন করেছে। এর পরে, অনেক পরে বেঁচে থাকতে থাকতে দেখেছে এই শিক্ষা না থাকার ফলে কত কত সর্বনাশ ঘটে চলেছে তার আশেপাশে। আবার কত মানুষ এই শিক্ষাকেই চিহ্নিত করছেন আশেপাশের সমাজ কাঠামো ভেঙে দেওয়ার কারণ হিসেবে। এ এক আজব দুনিয়া। খিদেকে খিদে বলতে এত কষ্ট তার?
অনুজা চলে গিয়েছিল আচমকাই। অনির্বাণদার সঙ্গে সম্পর্কটা ভেঙে যাওয়ার পরে অনুজা তার এক ছোটবেলার বন্ধুর সঙ্গে থাকতে চলে যায় বস্টনে।একদিন আচমকাই তাকে এসে বললো।
-আমি চলে যাচ্ছি সামনের সপ্তাহে।
বিয়েটা ভাঙার পরে গোটা অফিসে ফিসফাসটা জোরদার হচ্ছিল। অনুজা আর তাকে নিয়ে অনেকদিনই একটা কানাকানি ছিল, কিন্তু এবারে এক্কেবারে সামনে এসে দাঁড়াল সেটা। একদিন সে ছুটি নিয়েছিল তার এক আত্মীয়কে দেখতে যাবে বলে। ছুটিটা আচমকাই নেওয়া। সকালে জেনেছিল, উনি অসুস্থ, হাসপাতালে আছেন। সেই জেনে সে ফোন করেছিল অফিসে। কেউ তাকে কিছু বলেনি। কিন্তু হাসপাতালে যাবার পথে তাকে সরাসরি ফোন করেন ভাইস প্রেসিডেন্ট ফিনান্স অ্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন। আগরওয়াল লোকটার নাম। আগে ছিল লোহার কারখানার ম্যানেজার। এখানে সংবাদপত্রের অফিসে তারা আসার সূত্র হল নতুন বোর্ড অফ ডিরেক্টরের মধ্যে আসা একটি চিটফান্ড গ্রুপের মালিকের লোক হওয়া। সাংবাদিক আর কারখানার মজুরের জন্য একই সিস্টেম তার। সে ফোন করে বললো,
-কোথায় আছেন আপনি বোধিবাবু?
একটু হালকা টান আছে তার কথায়। না হলে সে যে অবাঙালি তা কথা শুনে বোঝা যেত না।
-আমি রাস্তায়। কেন বলুন তো? কে বলছেন?
-আমি আগরওয়াল বলছি।
বোধি একটু অবাকই হয়েছিল আগরওয়াল? সে তাকে ফোন করেছে কেন? তার সঙ্গে কি দরকার?
-হ্যাঁ, বলুন!
-আপনি আসছেন কখন অফিসে?
-আমি? আমিতো আজকে ছুটি নিয়েছি।
-সে কি? আপনি আসছেন না? আমিতো আজকে এখানে এসেছিলাম আপনাদের সঙ্গে মিটিং করতে!
- মিটিং? কিসের? আমি জানিনা তো!
- আরে আমিও তো জানিনা যে আপনি ছুটি নিয়েছেন। এইচ আর কে বলেননি কিছু।
আসলে এটাই খেলা। হিউম্যান রিসোর্সেসকে না বলে ছুটি নিয়েছে সে। সেটাই আসল কারণ তাহলে। কিন্তু অসীমটা মহা খচ্চর তো! তাকে কিছুই বললো না। একবারও তাকে বলেনি যে অসুবিধে হবে কোনো! এখন সে ছুটি নেবার পরে লাগিয়েছে তাহলে। তাদের মধ্যে একটা অলিখিত নিয়ম আছে। যে কোনো ছুটিই তারা নিজেদের মধ্যেই নিয়ে নেয়। নিজেদের মধ্যেই। ন হলে এখানে ছুটি পাওয়া যায় না। মাইনের বেলায় সাকুল্যে ছ হাজার টাকা। কিন্তু নিয়মের বেলায় সংবাদপত্রের চব্বিশ ঘন্টা ইমার্জেন্সি ডিউটি থাকে। অফিসের আবার সময় কি? মোটা মোটা মাইনে পাওয়া তাদের বিভিন্ন বিভাগীয় প্রধানেরা প্রতিদিন এই সব জ্ঞান তাদের বিতরণ করে থাকে। নিজেরা তিরিশ-চল্লিশ এইসব মাইনে পায়। পায় ফোন থেকে গাড়ি সব কিছু। তার সঙ্গে বেশীরভাগেরই বাড়িতে বৌ-এর সঙ্গে বনেনা। ফলে বাড়িও যাওয়া তাদের কাছে বিড়ম্বনা। যেটা হয়, সেটা হচ্ছে এসব বলে-টলে সন্ধ্যায় আটটার পরে জুনিয়ারদের কাঁধে সব দায়িত্ব ফেলে মদ খেতে চলে যাওয়া প্রেস ক্লাবে। এটাই তাদের বচনের শেষ তাৎপর্য্য। এই সবের জন্য তুলনামূলক নীচু তলার লোকেরা নিজেদের মধ্যে বোঝাবুঝি করে ছুটি নেয়। না হলে ওভারটাইমও নেই আবার ন্যায্য ছুটিও জুটবেনা। বোধিও তাই করেছিল। তার সংবাদপত্র সম্পর্কে কোনো মোহ নেই। বেশীটাই হল ব্যবসায়ী মালিকের নতুন নতুন ধান্দা গোছানোর ব্যাপার। রাজনৈতিক ক্ষমতা বাড়ানো আর সেই সূত্রে নিজেদের ব্যবসাকে ফাঁপিয়ে তোলার কারবার। সে যে কাগজটায় কাজে ঢুকেছিল সেই কাগজটার মালিক গোষ্ঠী চিটফান্ডের লোক। তারা নিজেদের চিটিংবাজীটা ঢেকে রাখতে হাতে একটা কাগজ রেখেছে এখন। সেটা দিয়েই গ্রাম বাংলার বিস্তির্ণ অঞ্চলে তাদের যা যা দুনম্বরী চলে তাকে ঢেকে রাখে। তার সঙ্গে আদায় করে প্রশাসনিক মদত। খবর করার চেয়ে না করার জোর অনেক বেশী। নেতা, মন্ত্রী, এম এল এ, এম পি ফাঁসিয়ে দিয়ে সেই খবর না করে কাজ আদায় করাটাই তাদের আসল কাজ। কাজেই বোধির এইসব পরিস্কার হয়ে যাবার পর থেকে কোনো মোহ নেই আর। গৌরকিশোর ঘোষ কিম্বা ভবানী রায়চৌধুরী হবার দিন আর নেই।
-আপনি এমন যেমন খুশী ছুটি নিলে কি করে চলবে বলুন তো? এভাবে কাজ চালানো যাবে না বোধিবাবু। You must understand that news is our top priority, anything comes later on.
কে বলছে? না যে কাগজের ফাইল সাপ্লাই-এর থেকেও কাট মানি খায়, যে প্রতি সপ্তাহে শেয়ারের বাজারে বিনিয়োগের সুবিধার জন্য কোনো না কোনো বড় শিল্প-গ্রুপের খবর করায় বিশেষ অনুরোধ করে, যে রাত দশটার সময়ও সাংবাদিকদের সাধারণভাবে, এমনকি মহিলাদেরও গাড়ি দিতে অস্বীকার করে। বলে রাতের অত সমস্যা থাকলে আসবেন না চাকরীতে। সে বলছে? তাদের শুরুর দিকের ছ মাসের প্রভিডেন্ট ফান্ড জমা দেয়নি সরকারের ঘরে আগরওয়াল। বারেবারে কোম্পানির কাজের বিবিধ হিসেবে সে জল মেশায়। মিশিয়ে নিজের ভাঁড়ার বাড়ায়। খবর নিয়ে যার একটাই বক্তব্য হচ্ছে যে শুধু দেখবেন যেন টি আর পি থাকে। আর মালিকগোষ্ঠীর উদ্দেশ্য হানি করে এমন খবর যে জান থাকতে ছাপতে দেবে না, সে বলছে এ কথা?
-দেখুন মিস্টার আগরওয়াল, আমি যা নিয়ম চলে সেই নিয়ম মেনে ছুটি নিয়েছি। যাদের বলে নিয়েছি তারা আপত্তি করেননি তখন। এবারে আমাকে যদি বলেন এটা বেনিয়মের ছুটি তাহলে আগে আপনাকে একটা নিয়ম বানাতে হবে। আমার বছরের প্রাপ্য ছুটি আমি বছরে পাইনা। তার জন্য টাকাও পাইনা। সেই ছুটি সব পচে নষ্ট হয়ে যায় বছরের পর বছর। ওভারটাইম পাইনা। পাইনা আলাদা করে মেডিক্যাল বেনিফিট। আগে এগুলো নিয়মে আসুক, তারপরে আমাকে বলবেন, আমি শুনবো। নইলে হঠাৎ করে আমাকেই শুধু বললে আমার মনে হবে যে আমি দেখতে ভাল নই বলে আপনার রাগ হচ্ছে।
বলে সে ফোনটা নামিয়ে রাখে। বন্ধুরা বলেছিল,
-আগরবাল তোকে ছাড়বেনা।
-বাল ছেঁড়া গেল।
তাকে শো কজ থেকে সাসপেন্ড কিছুই করা হয়নি। বছরের শেষে তার মাইনে বেড়েছিল আড়াইশো টাকা। বাকী সকলের গড়ে বেড়েছিল দেড়হাজার টাকা করে। কিন্তু ধাঁধাটা সে আসলে বুঝেছিল পরের দিন। তারই ডিপার্টমেন্ট-এর মাথায় ছিল এক প্রাক্তন বিপ্লবী নেতা কাম সাংবাদিক। তার চোখ ছিল অনুজার দিকে। তারই মাথায় এসেছিল অনুজাও আজকে ছুটি নিয়েছে। তার মানে অনুজার ফ্ল্যাটে ওরা দুজনে ইল্লি করবে। এইতে তার মাথায় আগুণ জ্বলেছিল। সে থাকতে বোধি? তাই আগরওয়ালকে ফোন করে বলেছিল। আর তাতে ইন্ধন দিয়েছিল সুপান্থ। অনেকদিন ধরেই সে তার কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে বসে আছে। শোধ দিচ্ছেনা। দু দিন আগেই তাকে বলেছিল সেই কথা বোধি। সুপান্থর বউ নেই, দাদার পয়সায় খায় এখনো। অসুস্থ দাদার পেনশন তার মাইনের চেয়ে বেশী। কাগজের অফিসের প্রিন্টারের কালি স্টোরের ছেলেটির সঙ্গে হাত মিলিয়ে চুরি করে বাইরে বিক্রি করে। তাও তার খরচ কুলোয় না। আসলে মদ আর মেয়েছেলে তাকে খাচ্ছে। এসব শুনে সুপান্থর রাগ হয়েছিল খুব। সেই রাগটার শোধ এভাবে তুললো। কিন্তু বোধির সামনে যে প্রশ্নটা এসে দাঁড়াল সেটা হল সত্যি তার আর অনুজার কি হবে!
কিছুই হল না। অনুজা তার পরের পরের সপ্তাহে তাকে ফোন করলো রাতে। সে তার দুদিন পরে চলে যাচ্ছে বস্টন। এখন সে আছে কৃষ্ণনগর। ওখান থেকেই কলকাতা আসবে। এসে প্লেন ধরবে। তার সঙ্গে আর দেখা হবেনা। বোধি ফোনটা ধরে খানিকক্ষণ চুপ করেছিল। অনুজা বিয়ে করার জন্য তাড়াহুড়ো করছিল কিছুদিন ধরেই। বোধি একটু দোটানায় ছিল। তখনই বিয়ে করতে গেলে তার কিছু কিছু সমস্যা হত। তাকে থাকার আলাদা জায়গা করতে হবে তাহলে। কিন্তু বোনের বিয়ে বাকী, বাড়ির অবস্থাও খুব ভাল না। সেই মুহুর্তে বোধি আলাদা হয়ে গেলে বাড়ির বাকীদের পক্ষে খুব অসুবিধের ব্যাপার হবে। বোধি জানে সে আলাদা থেকে যদি মায়ের হাতে টাকা দেয় তাহলে মা নেবে না। বাবার তো প্রশ্নই নেই। আবার তাদের বাড়িতে অনুজাকে নিয়ে উঠলে অনুজার সমস্যা হবে। স্পেস নেই তাদের বাড়িতে। অনুজা দীর্ঘ্যকাল একা থাকতে অভ্যস্ত। তার আলাদা ফ্ল্যাট রয়েছে সেই পড়াশোনা করার সময় থেকেই। তখন তার বাবা ভাড়া জোগাতেন। পরে চাকরীর সময়ে প্রথম দিকে অনুজাও কিছু কিছু দিত বাবার টাকার সঙ্গে, পরে অনির্বাণদার সঙ্গে বিয়ে হয়ে যেতে এই ফ্ল্যাটটা তারা কেনে। এখানে দুজনেরই টাকা ছিল। মানে দুজনে মিলেই লোন শোধ করতো। অনির্বাণদা, ডিভোর্সের পরে ফ্ল্যাটটা ছেড়ে দিয়েছে। এখন অনুজাকেই একা টাকা দিতে হচ্ছিল। বোধি থাকলে দুজনে মিলে অসুবিধে হবার কথাও ছিল না। অনুজার শেষ কদিনের সংসার খরচ সেই চালাচ্ছিল। মাইনের টাকা অনুজার হাতে থাকছিল না। তার মায়ের খুব শরীর খারাপ ছিল। অনুজার বাবা কিছুকাল হল গত হয়েছেন। এই টানাপোড়েন চলছিল কিছুদিন ধরেই। এর সঙ্গে ছিল বোধির বাড়ির নিতান্ত মধ্যবিত্ত চরিত্র, যা অনুজার বাড়ির সঙ্গে কোনোভাবেই খাপ খাওয়ানোর না বলেই অনুজার মনে হয়। বোধিও জানে কথাটা ভুল কিছু না। তার বাড়িতে সাতকালে কেউ মদ ছুঁইয়ে দেখেনি, সে ছাড়া। আবার অনুজার বাড়িতে মেয়ে-বাবা-মেয়ের বন্ধুরা একসঙ্গে বসেই মদ খেয়ে থাকে। সাধারণ মধ্যবিত্ত জীবনে মদ এমন একটা বিষয় যে সেখানে এ এক অকল্পনীয় বিষয় আজ-ও। অনুজার বন্ধুরা তার বাড়িতে এলে মদ খাবে এ অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু সেটা বোধির বাড়িতে থাকলে হওয়া সমস্যা। বোধির বাড়িতে তাদের জন্য একটি ঘর বরাদ্দ হতে পারে। সেখানেও দরজা বন্ধ করে মদ খাওয়ার প্রশ্নই নেই। তাতে করে গন্ধ ঠেকানো যাবেনা। বোধির বাবার পক্ষে জীবনের এই শেষভাগে পৌঁছে বিবাহবিচ্ছিন্না পুত্রবধূর সঙ্গে মদ খাবার অধিকার নিয়ে লড়াই-ঝগড়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই। এর পরে আছে চাকরীর সমস্যা। তারা বিয়ে করলে বোধি এবং অনুজার একই কাগজে কাজ করা অসম্ভব। অত্যন্ত নোংরা অফিস- রাজনীতিতে পড়তে হবে। সেই অবস্থায় মাথা ঠান্ডা রেখে চাকরী করাটাই হবে না। এসবের জন্যই বোধি সময় চাইছিল। একে এক করে সমাধান করবে সে। চাকরীটা বদলাবে। বাড়িতে কথা বলে বোনের বিয়েটা অন্তত দিয়ে নেবে। তারপরে কাছাকাছি একটা ফ্ল্যাট দেখবে। ধার করেই কিনবে না হয়। দরকার হলে অনুজার ফ্ল্যাটটা বিক্রি করে দেবে। কিন্তু সব কিছু একদিনে হবে না, হতে পারে না। কিন্তু অনুজার সময় নেই যেন। কোনো এক ভুতে পেয়েছিল তাকে, তাড়া দিচ্ছিল। তার সঙ্গেই ছিল নানান শর্ত। হঠাৎ করে বলতে শুরু করে দিয়েছিল সে বিয়ের পরেও বোধির বাপের বাড়ি যাবে না। বোধিও তার বাড়ির কোনো লোককে তাদের ফ্ল্যাটে আনতে পারবে না। বান্ধবীদের যখন-তখন ফোন কমা দরকার। বোধি বুঝছিল এভাবে হবে না। অনির্বাণদার বাড়ির সঙ্গে অনুজার সমস্যা হচ্ছিল খুব। অনির্বাণদার বান্ধবীদের সঙ্গে অনির্বাণদারও সম্পর্ক নিয়ে অনুজা জানে। তাদের দাম্পত্যে চিড় ধরেছিল অনির্বাণদার হাত দিয়েই। কাজেই সেই সেই বিষয়গুলোকে অনুজা তার জীবনে আর ফিরতে দিতে চায় না। এরজন্য বোধির জীবন, তার পরিবারের জীবন কোন দিকে যাবে তা নিয়েও তার আর মাথাব্যাথা নেই। এসব চলতে চলতেই চলে গেছিল অনুজা তার বাপের বাড়ি।
অফিসে ছুটি নিয়েছিল, কিন্তু বোধিকে জানায়ওনি। চলে যাবারপরে বোধি জেনেছে। তাও অনুজার কাছ থেকে না, জেনেছিল অনুজার সহকর্মিণী তৃষার কাছ থেকে। তৃষা কিছু জানেনা এমন ভাব করে শুরু করেছিল কথা, অনুজা কখন আসবে অফিসে জানতে চেয়ে। বোধিকে শেষে যখন বললো অনুজা কলকাতাতেই নেই, তখন যেন খুব বেশী করে বোধিকে বলে দিল তৃষা যে বোধি এখন আর অনুজার কেউ না। তৃষার টান ছিল তার উপর। বোধি সেইভাবে কোনোদিন গুরুত্ব দেয়নি বলে ঝাল মিটিয়েছিল ওইভাবে। বোধি আর কথা বাড়ায়নি। ফোন করেছিল অনুজাকে। ব্যাস্ত আছে বলে অনুজা ফোন কেটে দিয়েছিল। বলেছিল পরে ফোন করবে। তারপরে রাত্রের ফোন। মায়ের ব্যবস্থা করতে গেছিল, করা হয়ে গ্যাছে। অনুজা ফোনটা রাখার সময়ে বলেছিল বস্টন গিয়ে যে টাকাটা নিয়েছিল বোধির থেকে কয়েকমাস সেই টাকাটা পাঠিয়ে দেবে। অনুজার কাছে টাকা নেই বোধি জানে। অনুজার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট-ও তাকেই সামলাতে হয়। কাজেই টাকার উৎস কি তাও তার বুঝতে অসুবিধে হয়নি। বস্টনে অমিতাভ আছে। অনুজার সঙ্গে নেট-এ আলাপ। কয়েকদিন ধরেই বলছিল অনুজা অমিতাভর কথা। ওখানে অমিতাভ ডাক্তার। অনুজা বস্টনে গিয়েই বিয়ে করবে। চূড়ান্ত একটা রোমান্সের মোড়ক দিয়েছে নিশ্চই অনুজা বিষয়টাকে। অমিতাভ নিশ্চই উৎফুল্ল। নেট-এ প্রেম করে সে একজনকে চাকরী-বাকরী ছাড়িয়ে তাকে বিয়ে করতে উড়িয়ে নিয়ে আসছে এটা একটা বড় অ্যাচিভমেন্ট তার কাছে। তার পৌরুষ নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হচ্ছে এতে। আর যে মেয়েটা এত কিছু করতে পারছে তার দেশে থাকা বন্ধুর কাছে সামান্য ধার শোধ করার ব্যবস্থা সে করবে না তাও হয়? বোধি জানে অনুজা এমন হতে পারে নিজের দরকারে। এমন হয়ও। তেতো লাগে মুখের ভিতরটা। একটা বন্য রাগ, একটা গরগরে রাগ বাড়তে থাকে শরীরে। আর বেশী কথা বোধি বলতে চায়নি। এরপরে আরও কিছু বলতে গেলে সে নিশ্চই খুব খারাপ কিছু কথা বলে ফেলত, যার কোনো মানেই হয় না। যা যাচ্ছে তাকে নিয়ে টানাহেঁচড়া করে লাভ কি? শরীরে যে সম্পর্ক শুরু হয়েছিল, তা শুধু শরীরেই শেষ হয় না। শরীরের যে মন তাতেও তার দাগ পড়ে যায়। বোধিরও দাগ পড়ে গ্যাছে। বোধি শুধু বলেছিল,
-দরকার নেই। আমি ফেরত পাবার জন্য কিছু দিইনা।
অনুজা ফোন রেখে দিয়েছিল। সেই থেকে আজ অবধি তার সঙ্গে অনুজার আর কোনো যোগাযোগ নেই। ভেতরের কিছু ক্ষত এত গভীর হয় যে তা কান্না অবধিও পৌঁছয় না। এটা এমনই এক ক্ষত। কম বয়সে অনুজা তার কাছে প্রেম হয়েই এসেছিল। অনুজার কাছে এটা একটা খেলা হতে পারে, কিন্তু তার কাছে ছিল না। ক’দিন যন্ত্রণায় দম বন্ধ হয়ে এসেছিল। মনে হচ্ছিল সে বুঝি মরেই যাবে। রাস্তা পার হতেও তার ভয় করতো। সব কিছুতেই সংশয় জাগতো। ছুটি নেয়নি অফিস, কথা বাড়বে বলে। তারপরে একটু একটু করে সরে গিয়েছে সব থেকেই। ক্ষতটাকে এত ভেতরে লুকিয়ে ফেলেছে যে আজ সে নিজেও ঠিক টের পায়না আছে কি নেই! হয়তো, হয়তো তার শেষ বয়সে টের পাবে! জানেনা সে। আজ এই ক্যান্টিলিভারটায় উঠে ইছামতীর কালো স্তিমিত জলপ্রবাহ ফুটব্রীজে দাঁড়িয়ে দেখতে দেখতে মনে পড়েছিল আচমকাই অনুজার কথা। একবারই একটা চিঠি এসেছিল। সেই চিঠিটা বোধি পড়েনি। ছিঁড়েও ফেলেনি। গঙ্গার ধারে এসেছিল একদিন, পকেটে চিঠিটা নিয়ে। হাতে ক্যামেরা ছিল। ভোরের গঙ্গার ছবি তুলছিল। পুরোনো ক্যান্টিলিভারের উপরের ফুটব্রীজে দাঁড়িয়ে। ছবি তোলা বারণ। কিন্তু সে তো ব্রীজের, ব্রীজ থেকে নয় নিশ্চই। আর ধরলে তার আইকার্ডটা সে দেখাবে। যা হবার হবে। দেশের নিরাপত্তার স্বার্থ গুগুলের যুগে এভাবে রক্ষা করা যায় না। গুগুল ভারতে ডিটেল স্যাটেলাইট ম্যাপ সাপ্লাই দেয় না, কিন্তু বাইরে দেয়। তাছাড়া চাইলে কি না হয়! যারা ছবি অন্য কারণে তুলবে তারা গাড়িতে যেতে যেতে তুলে নেবে। ব্রীজের মুখে থাকা চারটে পুলিশ কি করবে? ধুর! ছবি তুলতে তুলতে জলে ভাসিয়ে দিয়েছিল চিঠিটা।
তাদের সম্পর্কের কিছু অবশিষ্ট নেই আর। তার এবং অনুজার খিদে ছিল। খেয়েছিল। ব্যাস। হোটেলের থালার কথা মনে রাখার কোনো কারণ নেই। খিদে একটা মৌলিক শব্দ, সে শিখেছিল। খিদে একটা সর্বব্যাপী শব্দ। পেট থেকে নাম, খ্যাতি, পরিচয়, সব মন বা শরীরের খিদে। সে সচেতন হয়েছিল শব্দটা সম্পর্কে। যখন তাকে কদিন আগে তার নতুন কাগজের সম্পাদক বললো, একটা সিরিজ করতে ,এই নিয়ে তখন সে দুবার ভাবেনি। চলে এসেছিল এখানে। বিভুতিভূষণ থেকে দেহব্যবসা, স্মাগলিং থেকে বিনয় মজুমদার যা খুশী তা নিয়েই করতে পারে। বোধি ঠিকই করে রেখেছিল সে জার্নালের মতন করে লিখবে লেখাটা। খিদে আর সবের সম্পর্ক। সাহিত্য থেকে স্মাগলিং সবের সম্পর্ক। তাছাড়া গ্রাম বাংলার কথা হবে, বিশেষ চোখে দেখা হতে হবে। ভাল হয় এ সবের মাঝে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে কিছু করলে। হাসিনার সঙ্গে মনমোহনের বৈঠক হবে সামনেই।
পরমা, হেসে বলেছিল,
- ক্লান্ত হয়ে আছ। যাও, ঘুরে এস। তাহলে দেখবে মন কাজে লাগছে আবার।
ফোনে সুতনুকার গলা শুনে মনে হল, সুতনুকা যেন তার দিকে ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। ম্যাগাজিন বেরিয়ে গিয়েছে। সুতনুকা আজকাল খুব কম আসে। কখনো কখনো ফোনে কথা হয়।
-একা যাচ্ছ? কেন? তোমার শরীরতো ঠিক নেই।
সুতনুকা জানেনা সে একাই যায় সবখানে। সঙ্গে যত মানুষই থাকুক না কেন সে একাই চিরকাল। তার এ নিঃসঙ্গতা যাবার না আর! তার শরীরে কিছু ঘুণ ধরেছে। ডাক্তার ভেবেছিল প্রথমে যক্ষা। লিম্ফনোডের। এখন দেখা যাচ্ছে তা না। কিন্তু কি তাহলে? এরপরে রক্তের হাজারো পরীক্ষা করতে হল। তার সঙ্গে ইসিজি। চেষ্ট এক্স- রে । তাতেও হল না। বুকের কাছে একটা ব্যাথা থাকে সারাক্ষণ। বাড়ে-কমে। কখনো কখনো ছুঁচ ফোটানোর মতন ব্যাথা হয়। হাতটা ফুলে যেতে থাকে বুকের বাঁ দিক থেকে। তখন তার ক্লান্তি বাড়ে, কাজ করতে ইচ্ছে করে না কোনো। শরীর জুড়ে অবসাদ থাকে। এম আর আই করা গেল না। বোধি জীবনে এই প্রথম দেখলো তার ক্লস্টোফোবিয়া আছে। শেষে বাধ্য হল বায়োপসি করতে। এই দীর্ঘ্য পদ্ধতি তাকে ক্লান্ত করে দেয়। ডাক্তারেরা মনে করেন তাঁরা সবজান্তা। অনেক বার ডাক্তার পাল্টাতে হয়েছে এই কারণেই। বোধির ব্যাথায় বোধিকেই তাঁরা বলে দিচ্ছেন কিছুই হয়নি। কিছু না হলে ব্যাথা আসে কোথা থেকে? এই সামান্য কথাটার পরিস্কার জবাব দেন না। জোরাজুরী করলে বলেন মাসল স্প্রেইন। তার ওষুধ দিয়ে দেন। খেয়েছেও বোধি। কোনো লাভ হয়নি। অনেক বছর ধরে যতবারই তার এমনভাবে বুক ফুলেছে কোনো না কোনো ডাক্তার বলে দিয়েছেন তার আসলে মাসল স্প্রেন হয়েছে। কতবার হয়? এত বছর ধরে দেখতে দেখতে এবারে বোধি চেপে ধরেছিল। এ সেই অনেকটা তার পায়ের রোগের মতন। তার পা আজকে বহু বছর ফুলে চলেছে। অনেকটা ইউরিক অ্যাসিডের মতন ভাব। কিন্তু বহুবার পরীক্ষার পরেও কিছুই ধরা পড়েনি। ইউরিক অ্যাসিড তার ঠিকই আছে। অথচ পা ফোলে। কেন? কোনো ব্যাখ্যা নেই। একেক ডাক্তার একেক কথা বলেন। কেউ কেউ বলেনও না। নিয়ম করে পরীক্ষা করতে দেন। তার ফলাফল এলে বলে দেন ইউরিক অ্যাসিড পাওয়া যাচ্ছে না। তাই কোনো চিকিৎসা নেই। এসব তামাশা তার আর ভাল লাগেনা। এবারে যখন শেষমেশ বায়োপসি হল তখন ধরা পড়লো রোগটার নাম লাইপোম্যাটোসিস। এটা নাকি খুব বিরল রোগ। কেন হয় জানা নেই এখনো কারোর! কিন্তু হয়। তার হয়েছে। শরীরটা ভাল থাকে না, ক্লান্তি ছেয়ে আসে সারাটা শরীর জুড়ে। তার মধ্যে টানাপোড়েন চলতে থাকে মনের মধ্যে।
- ক্লান্ত হয়ে আছি সুতনুকা। ঘুরে আসি। আমার আর এখানে ভাল লাগেনা। পারলে আমি বাইরেই থাকবো।
জমি কিনতে চাইছে সে। চাষের জমি। নিজে চাষা না। বংশে কেউ হয়তো ছিল। কিন্তু সে নিজে সে সব কিছুই জানেনা। তবু মনে হচ্ছে জমি কিনে গ্রামের দিকে বাড়ি একটা করবে। আস্তে আস্তে কলকাতা ছেড়ে ফিরে যাবে। একদিন যেমন মফস্বল থেকে এসেছিল, তেমন একদিন আবার ফিরে যাবে গ্রামে। সকলে ফিরবেনা। কিন্তু কেউ কেউ ফিরুক, কারোর কারোর ফেরা উচিত। নইলে একদিন গোটা রাজ্যটাই কলকাতা হয়ে যাবে। এসব সুতনুকা বুঝবে না। সুতনুকা তার জীবনে আসা এক অকাল বসন্ত। এক ঝড়। যে আসবে কেউ জানতো না। এখন যখন এসে পড়েছে তখন ভাবতে হচ্ছে বোধিকে। এমন বারেবারে ঝড় আসে কেন তার জীবনে? এখন সে যে বয়সে পৌঁছেছে তাতে আর আলাদা করে ভাবার কিছু নেই। তার আর আলাদা করে খিদে নেই। শুধু শরীর তাকে ক্লান্ত করে দেয়। অন্য সব ঝড়কে সে এড়িয়ে চলেছে। এসে পরলে কখনো কখনো তাকিয়েছে। কিছুকাল। তারপরে বোধি ক্লান্ত হয়ে গিয়েছে। তার আর ভাল লাগে না। পরমা এসব জানে। সুতনুকা জানেনা।
মেয়েটা, যে বসে আছে তার অপেক্ষায় সেও জানেনা। সে বসে বসে ভাবছে সে খাদ্য আর বোধি খাদক। বসে বসে অপেক্ষা করছে কখন বোধি তাকে খাবে। খেয়ে তাকে ছুটি দেবে। মেয়েটা ভোরে উঠে বাড়ি থেকে বেরিয়েছে। কথায় কথায় বলে ফেলেছে। এই যৌনকর্মের পাশাপাশি তার মূল পরিচয় সে একটি অ-সরকারী বিমা কোম্পানির এজেন্ট। সকাল থেকে অনেক ঘুরেছে আজ। তাই তার মেল আপ করার অবস্থা হয়নি। কোনো রকমে চলে আসতে হয়েছে। দালাল তাকে জোর করেই এনেছে। নইলে এমন বড় পার্টির কাছে সে এমন করে আসেনা। অনেক কথা বলছিল। বোধি কথা থামিয়ে উঠে এসেছে। একটা ফোন এসেছিল। তার কাগজের ফোন। সেই ফোনটা ধরে বাইরে এসেছে। বেশ কিছুক্ষণ হয়ে গিয়েছে। এখনও ফিরতে ইচ্ছে করছে না। মেয়েটাকে এখন আর বাড়ি পাঠানোর কোনো উপায় নেই। অনেক রাত এখন। সব গাড়ি চলাচল থেমে গিয়েছে।
দুই পাড় থাম ও সড়কে বাঁধা
ক্লিন্ন জল, চারপাশে শুধু কোলাহল;
কবে থেকে এত শ্রান্ত তুমি নদী?
আমার মতন, তুমি আমারই মতন?
প্রকৃত সারস উড়ে যায়
সুস্থ মৃত্তিকার চেয়ে সমুদ্রেরা কত বেশি বিপদসংকুল
তারো বেশি বিপদের নীলিমায় প্রক্ষালিত বিভিন্ন আকাশ,
এ-সত্য জেনেও তবু আমরা তো সাগরে আকাশে
সঞ্চারিত হ’তে চাই, চিরকাল হ’তে অভিলাষী,
সকল প্রকার জ্বরে মাথা ধোয়া আমাদের ভালো লাগে ব’লে |
তবুও কেন যে আজো, হায় হাসি, হায় দেবদারু,
মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়!
-মুকুরে প্রতিফলিত (বিনয় মজুমদার)
বিনয় মজুমদারের লাইন ছিল। মানুষ কাছে এলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়। প্রকৃত সারস? স্রেফ একটা শব্দকে টেনে নিয়ে যাওয়া অনন্তে। এর কোনো কৌশল হয় না। হয় দর্শন। সারসেরা চরে চড়ে বেড়াচ্ছে। একবার পা ফেলে কাছে গেলেই উড়ে যাবে। ছেলেবেলা মফস্বলে কেটেছে তার। সেও জানে কিছুটা নদীকে। সেও দেখেছে। কিন্তু এমন অবিমিশ্র ঘৃণায় রূপান্তরিত করতে পারেনি। মানুষ? কোন মানুষ? ছল-কৌশল-মিথ্যাচার ভরা প্রেমহীন মানুষ তো? সেই মানুষ কাছে এলে থাকা যায়? সেই মানুষ হতে চাওয়া যায়? তার চেয়ে অনেক ভাল নাকি উড়ে যাওয়া? অমন মানুষকে মানুষ বলে নাকি? এর চেয়ে সারস জীবন ঢের ঢের ভাল। সেই সব সারসেরা, সেই সব প্রকৃত মানুষেরা উড়ে যাবেই মানুষ কাছে এলে। মানুষের থেকে উড়ে উন্মত্ততার গভীরে গিয়ে নিশ্চিন্তে বাস করবে। উন্মাদ বিনয় মজুমদার জানতেন, আজকের সভ্যতার থেকে উন্মাদ আশ্রম ঢের ঢের ভাল। কেউ কথা বলবেনা। কোনোদিন জানতে চাইবেনা কেন, কি, কোথায় ইত্যাকার যত্ত অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্নাদি। কুশলাদি জানার ছলে কেউ কাউকে খুন করে যাবেনাকো নিয়মিত। কে কার জন্য? মানুষ, তার সভ্যতা, তার সিস্টেম কার জন্য তৈরী? কেউ তার মানে জানে? কেউ জানেনা একটা ব্যবস্থা যা একদিন তারাই তৈরী করেছিল আজ সেই ব্যবস্থা শাসক হয়ে বসেছে কিভাবে! চাইলেই একজন পুলিশ একজন সৎ মানুষ হবেনা। এই ব্যবস্থাই হতে দেবে না। সে তাকে বানিয়েছেই অসৎ করে।
Friday, July 22, 2011
immoral trafficking, police harassment in west bengal
West Begngal
Particulars of the victim:
Nafija Khatun(name changed), aged about-16 years, residing at village-Kakra, Post Office-Kachua, Police Station-Basirhat, District-North 24 Parganas, West Bengal, India.
Particulars of the perpetrators:
The Officer-in-charge of Basirhat Police station, District-North 24 Parganas
Case Details:
It is revealed during our fact finding that the victim girl was student of class-IX. She is minor by age, only aged about 15 years. On 16.3.2010 one Amena Khatun, aged about 24 years who used to read in the same school where the victim girl was student took the victim girl to her sister’s house. But the victim girl did not return to house. The victim’s family started searching for the victim and they also went to the house of Amena Khatun and asked for the whereabouts of the victim girl and Amena Khatun. Then the brother of Amena Khatun accompanied the family of the victim girl to police station and one information was lodged at police station vide GDE no. 1088/2010 dated 17.3.2010. On the next day (18.3.2010) the victim’s family received information that on 16.3.2010 at about 12.40 pm the said Amena Khatun and the victim girl boarded into a train at Kakra Mirjanagar Railway Station. The train was destined to go to Sealdah Railway Station. On 28.10.2010 the victim’s family received information that the said Amena Khatun returned to her house in Karulia village. The victim’s family went to her house and asked her about the whereabouts of the victim girl. On reply she stated that they got off from train at Sealdah Railway Station and immediately 4/5 men forcibly took away the victim girl upon tying a handkerchief on her mouth. She could not say anything more. On further questioning by the family of the victim girl she stated that she was in Mumbai before she returned to her house. Subsequently the victim’s family came to know from local people that the said Amena Khatun is lady of questionable character and this raised strong suspicion to the family members of the victim girl that the said Amena Khatun immorally trafficked the victim girl.
The victim’s family went to Basirhat Police Station with a written complaint against the said Amena Khatun, but the police refused to take the written complaint and also denied of registering any First Information Report against the accused woman. The victim’s family then lodged written complaint before the Superintendent of Police, North 24 Parganas on 6.6.2011 alleging against the inaction of police of Basirhat Police Station not taking any action against the accused person involved in the abduction and alleged trafficking of the victim girl.
Report By: Kirity Roy
Banglar Manabadhikar Suraksha Mancha (MASUM)
পড়ছিল বোধি একটু আগে। আসার সময়ে নিয়ে এসেছে। মাসুম একটি মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা সংস্থা। একসময় এঁদের বড় অংশটাই জড়িয়ে ছিলেন অল পিপলস্ ডেমোক্রেটিক রাইটস বলে সংগঠনটির সঙ্গে। সংক্ষেপে এপিডিআর। পরে মতভেদ এবং অন্যান্য কারণে একাংশ সেখান থেকে বেরিয়ে এসে গড়ে তোলেন মাসুম। আইনি ক্ষেত্রগুলোতে বেশ কিছুকাল ধরেই কাজ করছেন এঁরা। বোধি এক বন্ধুর থেকে জোগাড় করে এনেছিল এঁদের কিছু রিপোর্ট। নারী ও শিশু পাচার বেশ কিছুকাল যাবত এঁদের কাজকর্মের মধ্যে এসে পড়েছে। আসলে এই সব সংস্থার কাছেই থাকে বেশীরভাগ খবর। এঁরা এলাকায় যাতায়াত করেন, মানুষের থেকে খবর সংগ্রহ করেন এবং সরকারকে জানান, নাগরিককে জানান। কিন্তু কোনো সরকারই খুব একটা সহজ চোখে এঁদের দেখেন না। এর একটা বড় কারণ হল সরকারের প্রশাসনে যে দুর্নীতি তা ভারতের মত দেশে এত সর্বব্যাপক, যে একে রোধ করাটা খুব কঠিন। দুর্নীতি একটি সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। দুর্নীতিগ্রস্ততা একটা বড় গুণ এখন সফল মানুষের। কাজেই সেই দুর্নীতি প্রশাসনে আসবে এতে আর আলাদা কিই বা আছে! কিন্তু যাঁরাই সরকারে আসেন তাঁদের সঙ্গে জড়িয়ে যায় বিবিধ স্বার্থরক্ষার উদ্দেশ্য। বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মানুষ। প্রত্যেক সরকারের আমলে এঁরাই এসে বসেন সরকারের কাছাকাছি। সুতরাং একটা সময় আসে যখন সরকারের প্রশাসনের স্তরে দুর্নীতিকে ঢাকা জরুরী হয়ে পড়ে। সেই দুর্নীতিকে ঢাকতে গেলে এই সব মানুষ বা সংগঠন অপ্রিয় হয়ে ওঠে সরকারের। যে তৎপরতা দিয়ে সরকার এবং প্রশাসন বিবিধ সামাজিক বা রাজনৈতিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করেনা, সেই তৎপরতা দিয়েই এঁদের মত সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে লেগে যান যুদ্ধে। এঁদের বিবিধ বেআইনী প্রক্রিয়ায় দমন করার জন্য ব্যাস্ত হয়ে ওঠেন। সরকারের বা সমাজের ক্ষেত্রে এঁরা যে চোখ হিসেবে কাজ করতে পারতেন সেই চোখটিকেই সবার আগে অন্ধ করার কাজ চলে। বোধির কাগজের মতন কাগজে বা টেলিভিশন চ্যানেলে এঁদের ঠাঁই হয় সবার পরে। সেখানে কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে তাঁদের নিয়ে আসা হয়। তারপরে সেটা ফুরিয়ে গেলেই আর ঠাঁই নেই। বহু বহু গুরুত্বপূর্ণ কাজ ধামাচাপা পড়ে যায় মিডিয়া রিপোর্টেও। বোধি নিজের অভিজ্ঞতা দিয়েই জানে সব।
কিন্তু এঁদেরও সীমাবদ্ধতা আছে। পুলিশ এবং প্রশাসন নিয়ে এঁদের নজর। এঁদের নজর আইনী ব্যবস্থার দিকে। আইন আইনের কাজ করুক এটা এঁদের বাসনা। কিন্তু সে কি এমন ভাবে সম্ভব? এই যে বারাসাত থানার পুলিশের প্রতি এঁদের অভিযোগ, তারা কি আলাদা কিছু? এই কি তাদের শেখানো হয়নি? আমেনা খাতুনকে দাঁড় করালো কারা সামনে? এর জন্য কি সমাজই দায়ী না?
যে মেয়েটি এসেছে তার কাছে তাকে মেয়ে না বলে মহিলা বলাই ভাল। বয়স কম করেও চুয়াল্লিশ হবে। শরীরে বয়স তার চিহ্ন রেখে গিয়েছে। এসে হোটেলেরই একটা ঘরে বসেছিল। শ্যামল আর অর্ণব ছিল ওই ঘরে। ওরা দুজন স্থানীয় ছেলে। শ্যামল দালালী করে। সেই নিয়ে এসেছে একে বাসস্ট্যান্ড থেকে। বোধি ল্যাপটপটা নিয়ে কাজ করছিল তখন। পড়ছিল এবং নোট নিচ্ছিল। সারাদিন যা দেখেছে শুনেছে তার সারসংক্ষেপ এক রকমের। রামের গ্লাসটা তখনো ভর্তি। শ্যামলকে ঘরে বসিয়ে রেখে সুমঙ্গল এসেছিল তার কাছে।
-দাদা, একবার আসবেন না?
-যাব। তোরা শুরু কর। আমি এই কাজটা শেষ করে নিয়ে আসছি।
সুমঙ্গল চলে গিয়েছিল। একটা আড়ষ্টতা কাজ করছিল সুমঙ্গলের, বোধি বুঝতে পারে। সে কখনো এমন কাজে জড়ায়নি। বয়স খুব বেশী হলে ছাব্বিশ-সাতাশ হবে। মেয়ে ভাড়া করে নিয়ে এসে ফুর্তি করার সাহস তার হয়নি। তার পরিবার অঞ্চলের খুব পরিচিত। সেও। কাজেই জানাজানি হয়ে গেলে তার সমস্যা আছে। তাছাড়া ছেলেটি এমনিতে খুব একটা শিক্ষিত না হলেও মনটা আছে। এই ধরণের কাজে তার খুব একটা ইচ্ছে থাকার কথা না। অঞ্চলে ছেলেটির একধরণের প্রভাবও আছে। স্থানীয় স্তরে সাংবাদিকতা করে। একটি বিশিষ্ট কাগজের আঞ্চলিক সাংবাদিক। বোধি ওকেই বলেছিল সূত্র বের করে রাখতে। এবারে সে তার বন্ধুমহল ধরে পৌঁছেছিল মেয়েটির কাছে। শ্যামল, সুমঙ্গলের বন্ধু। শ্যামল সামনে যে কারবার করে সেটা কাপড়ের। কিন্তু আদতে সে যুক্ত এই দালালীর সঙ্গে। বর্ডারের সংলগ্ন অঞ্চলে বাড়ি তার। সেই এইসব মেয়েদের হাল-হদিশ রাখে। কিন্তু সুমঙ্গল জানলেও কখনো এটা নিয়ে কথা বলেনি। আজ বোধির দরকারে সে শ্যামলকে ডেকেছে। এবারে যতক্ষণ মহিলাটি আসেনি ততক্ষণ একরকম ছিল, এখন এসে পড়ায় আরেক রকম হয়েছে। ওই ঘরে শ্যামল আর সেই মহিলাটির মধ্যে বসে তার খুব অস্বস্তি হচ্ছে, বোধি বুঝতে পারছে। এমন অবস্থায় কি করণীয় তা সুমঙ্গল জানেনা।
বোধি উঠে পড়ল। একটু আগে ব্রীজ থেকে ফিরে বাংলোতে গেছিল প্রথমে। ল্যাপটপটা ওখান থেকে নিয়ে এসে যখন সে ‘ইছামতী’ হোটেলের ওর জন্য রাখা ঘরে ঢুকছিল তখনই একবার ওদের ঘরে গেছিল। সেখানে দেখে এসেছে মহিলাটি ম্যাক্সি পড়ে নিয়েছে। মাজা মাজা গায়ের রঙ। নাকটা তীক্ষ্ণ। চোখটা একটু টানা পাহাড়িদের ধাঁচে। মধ্যম উচ্চতা। এখনো যখন সে ঘরে ঢুকলো মহিলাটি তখনো সেই খাটের বাজু ধরেই বসে আছেন। শ্যামল আর সুমঙ্গল বসে আছে সোফাতে। সামনে গ্লাস। সুমঙ্গল খায়না, কিন্তু শ্যামল খাচ্ছিল। তাকে দেখেই দ্রুত গ্লাসে চুমুক মারলো শ্যামল। তাড়াতাড়ি চুমুকটা মেরেই উঠে দাঁড়ালো। সে এবারে যাবে। রাত এগারোটা। তার বৌ নাকি তাকে খুব গালি দেয় নির্দিষ্ট সময়ে না ঢুকলে। ভয়েই হোক আর ভক্তিতেই, সে সময়ের হেরফের করেনা। বোধি তার দিকে হাত বাড়ালো। শ্যামল তার হাতটা আলতো করে ছুঁলো। বোধি দেখেছে যে মানুষের মধ্যে ভরসা কম থাকে সে হাত শক্ত করে ধরেনা কখনো। এও ব্যাতিক্রম না। সুমঙ্গল উঠলো শ্যামলকে এগিয়ে দিয়ে আসতে। ও এসে ওদের সঙ্গেই খাবে। খেয়েদেয়ে চলে থেকে যাবে এই ঘরে। বোধি জানে সুমঙ্গল একটু ঘাবড়ে আছে। বোধির সামনে বেচাল যাতে না হয় সেদিকে সতর্ক নজর তার। বোধিকে সে ভালবাসে দাদার মতই। বোধিই খবরের কাগজের কাজ হাতে ধরে শিখিয়েছে। কলকাতায় কিছুদিন সুমঙ্গল ছিল তাদের কাগজের ডেস্কে। তারপরে অন্য কাগজে চাকরী নিয়ে ফিরে এসেছে নিজের জায়গায়। এখন ও এই বনগাঁ আর গাইঘাটা মহকুমাটা পুরো দেখভাল করে। ওর অধীনে কয়েকটা ছেলে কাজ করে। সুমঙ্গল এখন জেলা স্তরে বেশ প্রভাবশালী রিপোর্টার। সুমঙ্গলরা বেরিয়ে গেলে বোধি সোফায় গিয়ে বসলো।
-হাতের গ্লাসে চুমুক দিচ্ছেন না যে?
-দেব। আমি আস্তে খাই।
মহিলাটি একটু সপ্রতিভ হবার জন্যই কথাগুলো বললেন বোধহয়। এতক্ষণ উনি বোধিকে দেখেছেন, কিন্তু কথা বলেননি। এবারে সকলে চলে যেতে কথা বললেন। বোধিই তো খদ্দের তাঁর।
-আপনি খাবেন না?
-নাহ, আমি খাই না। মাঝেমাঝে একটু বিয়ার হলে খাই। কিন্তু এই সব গন্ধ আমার সহ্য হয় না।
-তো আমি খেলে সমস্যা হচ্ছে নাকি?
-না না। আপনি খান। আপনার ইচ্ছেতেই তো আমি চলবো। আমার ইচ্ছেতে আপনি চলবেন নাকি?
মহিলাটি একটু যেন অবাক হয়ে বললেন কথাটা। বোধির হঠাৎ করে হাসি পেল। কত সত্যি কথা। কোনো ভান বা ভণিতা না করেই বলে দিলেন। টাকা যে কোনো বিষয়কে কি অনায়াস দক্ষতায় সাজিয়ে তোলে। সে টাকা দিচ্ছে, উনি নিচ্ছেন। কাজেই সোজা কথা। কিন্তু একই কথা সুতনুকার জন্য না। সুতনুকার-ও টাকা নিয়ে সমস্যা ছিল। তার সঙ্গে যখন বোধির পরিচয় তখন সে আইনজীবি। কাজ করে কমার্শিয়াল ট্যাক্সের। কিছুকাল আগে অব্দিও সে কাজ করছিল অন্য এক চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের সঙ্গে। এখন সে একা কাজ করতে চায়। নিজের একটা ফার্ম খুলতে চায়। সেখানে সে কাজ করে দেবে। তারপরে তার কোনো পরিচিত চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টকে দিয়ে সই করিয়ে নেবে সেই হিসেবে। টাকার বিনিময়ে একাজ করানো যায় বোধি জানে। বোধির সঙ্গে তার আলাপ হয়েছিল একটি গানের অনুষ্ঠানে। গান গাইতে এসেছিল। গান তার পেশা নয়, নেশাও নয়। বন্ধুর অনুরোধে গান গাইতে আসা। যদিও গায়কী এবং কন্ঠ দুই তার আছে তবুও গান নিয়ে আলাদা করে তার কোনো ভাবনা ছিল না। বোধির সত্যিই খুব ভাল লেগেছিল তার গান। অতি পরিচিত একটি গান দিয়ে শুরু করেছিল সেই ঘরোয়া আসর, সুতনুকা। ‘আমারো পরাণ যাহা চায়’। ছোটবেলা থেকে শুনে শুনে বোধির কান পচে যাওয়ার কথা। বিচিত্র এলানো ভঙ্গীমায় বেশীরভাগ গায়িকারা গানটি গেয়ে থাকেন। কিন্তু সুতনুকা তা করেনি। তার গায়কীতে ছিল এক নিখাদ বিশ্বাস। যেন সে মনের থেকেই বলছে এ কথা। গানটা মুহুর্তে খুব ব্যাক্তিগত হয়ে উঠেছিল বোধির কাছে। তখন বোধির লেখার সূত্রে এবং একটি ম্যাগাজিনের সম্পাদনার সূত্রে সেই বাড়িতে যাতায়াত করছিল। তার বন্ধুর বাড়ি সেটা। তার অফিসের যাবতীয় ব্যাস্ততার মধ্যেই কাজটা করছিল সে। সেদিনও এসেছিল অফিস থেকেই ওই ঘরোয়া আসরে যোগ দিতে।
সুতনুকার সঙ্গে আবার একদিন অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টস-এর সামনে দেখা হয়ে গেল। একটা নাটক দেখতে এসেছিল সে তার বন্ধুদের সঙ্গে। বোধির সঙ্গে ছিল শমীক। শমীকের স্ত্রী-র বন্ধু সুতনুকা। শমীকদের বাড়ীর অনুষ্ঠানেই তাকে গান গাইতে দেখেছে বোধি। ফলত কিছুক্ষণ আড্ডা হল নাটক শেষ হতে। সুতনুকা জানাল সে কাজ করতে চায় ম্যাগাজিনে। বোধির একটু অস্বস্তি হচ্ছিল না যে তা না। কারণ সুতনুকার পেশা বেশ ব্যাস্ততার পেশা। অ্যাকাউন্টসের কাজ করে ম্যাগাজিনের কাজ করা খুব সহজ নয়। কিন্তু সুতনুকার আত্মবিশ্বাস দেখে তার পক্ষেও বলা মুশকিল হচ্ছিল যে কাজটা সুতনুকার পক্ষে খুব সুবিধার হবে না। কাজটা চলতে থাকল। কিছুদিনের মধ্যেই অনেকগুলো বিষয় বোধির কাছে পরিস্কার হতে থাকলো। সুতনুকার মধ্যে একটা টানাপোড়েন চলছে কিছু বিষয়ে। সুতনুকা বিবাহিতা। তার স্বামীর ফার্মও বেশ নাম করা। শ্বশুরের ফার্ম আসলে। তার স্বামী উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে এটা। রমরমে ব্যবসা। কিন্তু সেখানে সুতনুকার কাজ নেই কোনো। তাকে কাজ দেওয়া হবে না। সেখানে তার প্রতিদ্বন্দ্বিনীটি তার স্বামীর এক জুনিয়ার। তার শ্বশুর-বাড়ির নীচেই তাদের চেম্বার। একদিন আচমকাই কাজ সেরে ফিরে এসেছিল সুতনুকা, এক দুপুর বেলায়। ফিরে এসে তার স্বামী রজতের চেম্বারে ঢুকে পরেছিল একটি জরুরী কথা বলতে। সেই চেম্বারে তার সেই শেষ ঢোকা। শালিনী, রজতের জুনিয়ারটি এবং রজত যে অবস্থায় ছিল তাতে আর তাদের মধ্যে কথা হবার কোনো কারণ ছিল না। হয়ওনি। শ্বাশুড়ি বিষয়টাকে খুব গুরুত্ব দিতে চাননি।
রাগ করে বাপের বাড়ী চলে এসেছিল সুতনুকা। কিন্তু থাকতে পারেনি বেশীদিন। তারা বনেদী পরিবার। একসময় তাদের অবস্থা যে কেমন ছিল তা বাড়ির গঠন দেখলেই বুঝতে পারা যায়। সাবেকী বাড়ি। উত্তর কলকাতার শ্যামবাজারে এককালে তাদের বাড়ীতে বাই নেচেছে, বিড়াল-কুকুরের বিয়ে হয়েছে ধুমধাম করে। খেউড়-খেমটা থেকে সংস্কৃত নাটক সবই হয়ে-টয়ে গ্যাছে। সঙ্গে বয়েও গ্যাছে দিন। আর কিছু নেই এখন তালপুকুরে। ঘটি ডোবানো বেশ সমস্যার। অতবড় বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণও বেশ কঠিন কাজ। সুতনুকার বাবা জীবিত। মা তার বিয়ের কিছু পরেই মারা গিয়েছেন। শান্তিতেই মরেছিলেন মেয়ের বিয়ে দিয়ে যেতে পেরেছেন মোটা টাকাওলা পাত্রের সঙ্গে এই ভেবে। ছেলের ঘরের মান-টানও বেশ আছে। সুতনুকার বাবা এককালে একটি বেসরকারী সংস্থার ম্যানেজারের কাজ করতেন। সেই সংস্থাটি ছিল ব্রিটিশ আমলের। সত্তরের দশকের শুরু অব্দিও বেশ রবরবা ছিল এদের। তখনো চেম্বার অব কমার্সের সভাপতিটিও ছিল ইউরোপীয়। কে বলবে এটি একটি স্বাধীন দেশ! তারাই ঠিক করে দিতে চাইতো কি হবে বাজেট, সঙ্গে অবশ্যই থাকতো বড়বাজারের মারোয়ারী গোষ্ঠী। সেই সময় শেষ হল সত্তরে। দেশজুড়ে ব্যাপক অস্থিরতার মধ্যে, নকশালবাড়ির প্রভুত কোলাহলের মধ্যে এদের পুঁজি নিরাপদ নয় এমনই বোধহয় বুঝেছিল এরা। কেটে পড়লো কলকাতা থেকে। শয়ে শয়ে কারখানার মতনই শয়ে শয়ে সওদাগরী প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়ে সে পুঁজি নিয়ে কন্টিনেন্টে কিম্বা নেটিব ব্রিটেনে চলে গেল এরা। সেখানে কান্ট্রিসাইডে অন্তত একটা ম্যানসন হয়ে যাবে ওই টাকায়। যাবার সময়ে সুতনুকার বাবাদের মতন কর্মীদের হাতে কিছু টাকা দিয়ে গেল, যা সে আমলে বেশ ভাল টাকা। এই কর্মীরাই আবার বাকী নীচুস্তরের কর্মীদের প্রাপ্য মারার কাজে সাহায্য করলো সাহেবদের। সাহেবরা কৃতজ্ঞতায় বলে গেলেন,
- Good bye Babu. You had done a splendid job.
গ্যাস খেয়ে বেলুন তো ফুললো, কিন্তু আঙুল ফুলে কলাগাছ আর হল না। সাহেবরা চলে গেলেও এঁদের একটা বড় অংশকে নাইটক্লাব, মদ এবং জুয়া ছাড়লো না। অন্য কোনো কোম্পানি, যা খুব কমই গড়ে উঠছিল সেই সময়ে তারা এই বয়স্ক ডাইনোসরদের চাইলো না। প্রথমত এদের দৃষ্টিভঙ্গী যথেষ্ট পুরোনো। দ্বিতীয়ত, এঁরা কেউই ভিশনারী ছিলেন না। হুকুম তামিল করতে দক্ষ ছিলেন এঁরা। তাছাড়া সদাগরী প্রতিষ্ঠানে মাল চালান দিয়ে কাজ ফুরোতো। এখন আর চালান না, এখন শুধু রপ্তানির কাজ না। কিছু কিছু আমদানীও আছে, আছে উৎপাদন। সে কাজের জন্য লাগে অন্য দক্ষতা। সেই দক্ষতা এঁদের ছিল না। তাই ওনাদের বেশীরভাগেরই আর কোনো আজ জুটলো না তেমন। অস্থায়ী কিছু কিছু কাজ করেই কেটে গেল বাকী জীবন। ফলত সুতনুকা কলেজে পড়তে যেত হাঁটতে হাঁটতে। কলেজ শেষ না হতেই শুরু হয়ে গেল টাকা চাই-এর হাঙ্গামা। সুতনুকাও বড় হবার শেষ কটা দিন অভাব দেখে দেখে একটু সমস্যায় পড়ে গেছিল। তার মনে এই নিরাপত্তাহীনতা ছাপ ফেললো। রজতের সঙ্গে তার যখন আলাপ হল তার মনের মধ্যেও কাজ করছিল নিরাপত্তা। রজত তাকে আলাদা করে ভালবাসে কিনা সে প্রশ্ন খুব একটা ভাবায়নি তাকে। আলাপের শুরু থেকেই শরীর এসে গেল তাদের মধ্যে। একসময় যখন রজত তার থেকে দূরে সরে যেতে পারে বলে সে বুঝলো তখন আরো বেশী করেই শরীর দিয়ে জড়িয়ে নিল তাকে। বিয়েটা হল। রজতের বাড়ীর দিক থেকে আলাদা করে খুব একটা প্রশ্রয় ছিল না। তবু হল বিয়ে। বা রজত বিয়ে করতে বাধ্য হল বলা ভাল। বিয়ের পরেই যখন মা মারা গেলেন তখন বাপের বাড়ীর অবস্থা আরো খারাপ। বাবার চিকিৎসা থেকে শুরু করে সব কিছুরই দায় এসে পড়লো তার ঘাড়ে। কিন্তু বিয়ের পরে রজতের থেকে বাপের বাড়ীর জন্য টাকা নেওয়াটা তার পক্ষে আর সহজ রইলো না। টাকা চাইলেই প্রতি কথায় রজতের ঠেস, তার শ্বাশুড়ীর শীতল আচরণ তাকে বেশ অপমানিত করতে থাকলো। সে আর পাঁচজন মেয়ের মতই নিজের সংসার গোছানোর কাজ শুরু করেছে, তার জন্য অল্প-বিস্তর ফন্দি-ফিকিরও করেছে। তা বলে অপমান বোধ থাকবে না এমনও না। ফলে শুরু করতে হল কাজ করা। তারই এক পরিচিতের সুবাদে অন্য একটি ফার্মের এক লইয়ার-কে সাহায্য করতে শুরু করলো কমার্শিয়াল ট্যাক্সের জন্য। সেই কাজ করতে করতেই একদিন আবিস্কার করলো যে রজত-শালিনী অনেকদূর এগিয়ে গিয়েছে। রজত শালিনীকে আলাদা ফ্ল্যাট কিনে দিয়েছে উত্তর কলকাতাতেই। শালিনীও তার অসুস্থ বাবা-মা কে নিয়ে কার্যত রজতের রক্ষিতা হয়েই কাটাচ্ছে। যে নিরাপত্তার জন্য তার বিয়ে করা সেই নিরাপত্তাই তার কাছে কাঁটা হয়ে দাঁড়াল। কিন্তু দাঁড়াল যখন, তখন বাপের বাড়ীতেও তার আর কোনো নিরাপদ আশ্রয় নেই।
তার বাবা ভাবতে রাজী ছিলেন না যে মেয়ে তাঁকে খাওয়াতে পারবে। যদিও এতদিন চলে এসেছেন মেয়ের টাকায় তবুও মনে মনে তাঁর বিশ্বাস ছিল যে আসলে টাকাটা মাসে মাসে নিশ্চিত ভাবে আসে তাঁর জামাই-এর জন্য। সে ছাড়া মেয়ের ক্ষমতা কত তা নিয়ে তিনি সন্দিহান ছিলেন। তাছাড়াও ছিল বনেদী বাড়ীর বদ সংস্কৃতি। মেয়ের টাকায় মদ খেতে সমস্যা হত না তাঁর। আবার মেয়ের বিয়ে নিয়ে কথা হতে শুরু করলে তাঁদের আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে মান যাবে সে জ্ঞানও টনটনে ছিল। সেই জন্যেই বাপের বাড়ীতেও থাকা হল না সুতনুকার। আবার একদিন বাবা এবং শ্বাশুড়ীর মধ্যস্থতায় ফিরে যেতে হল সেই শ্বশুরবাড়ীতেই। ফিরে যাবার পরে রজত তাকে শর্ত দিল সে যখন টাকা দেবে তখন সেই ঠিক করে দেবে কিভাবে সুতনুকা চলবে। সুতনুকার বিছানাও তার চাই। গভীর রাত্রে মদের ঘোরে টলতে টলতে যখন ঢুকতো সে তখন সুতনুকাকে আগের মতনই তার পায়ের জুতো থেকে মোজা খুলে দিতে হবে। তাকে নিয়ে যেতে হবে বিছানায়। আর বিছানায় যখন যাবে তখন যদি সে সুতনুকাকে চায় পাপোশের মতন তখন তাই করতে হবে তাকে। সুতনুকা জানে এসব কথা শোনা ছাড়া তার কোনো রাস্তা নেই অন্য। বাপের বাড়ীতে গিয়ে থাকা তার জোরে কুলোবে না এ কথা বুঝেই গ্যাছে রজত। এবারে তার পূর্ণ সুযোগ নেবে সে। এমনকি একদিন তাকে শালিনী ফোন করলো তার শ্বশুরবাড়ীতেই। ফোন করে বললো,
- শোনো, এসে যখন পড়েছ আবার তখন থাক তোমার মতন। আমিও চাই না একটা মেয়ের মাথার উপর থেকে ছাদ চলে যাক। আমি জানি ছাদ না থাকলে কি হয়! কিন্তু আমার পথে কাঁটা হোয়ো না। তাহলে কিন্তু আমি ছাড়বো না তোমায়। রজতকে দিয়ে পাছায় কষিয়ে লাথ মেরে তাড়াবো। নিশ্চিত থাকতে পার তুমি।
এর পরেও শালিনীর সঙ্গে কোনো অনুষ্ঠানে দেখা হয়ে গেলেও তাকে ভান করতে হয়েছে সে কিছুই জানে না, কিছুই বোঝে না। এমনই চলছিল তার জীবন। এর থেকে বেরোবার রাস্তা কই? ভাবতে ভাবতে একদিন বলেও ফেললো তার সিনিয়ার দাদাটিকে। তিনি বহুদিন ধরেই দেখছেন সুতনুকাকে। কিছু কিছু আন্দাজও করতে পারেন তার সম্পর্কে। সমস্যা যে তার আছে একথা না বোঝার কথা নয় তাঁর। কিন্তু সুতনুকা পরিস্কার করে বলেনি বলে তাঁরও আলাদা করে কিছু বলা হয়ে ওঠেনি। এবারে বললেন।
-তুমি আমার বোনের মতন সুতনুকা। আমি যতদিন আছি চিন্তা কর না।
তিনি দায়িত্ব নিয়ে সুতনুকার জন্য প্রথমে আরো বেশী কাজের ব্যবস্থা করলেন। তাঁর সহকারী ছাড়াও অন্যান্য স্বাধীন কাজের ব্যবস্থাও করলেন। সুতনুকার আয় বাড়তে থাকলো। তার বাপের বাড়িতে আরো কিছু টাকা যাওয়া বাড়তে লাগলো। বন্ধ করে দিল রজতের থেকে টাকা নেওয়া। আর শেষ কাজটা হল সে আবার চলে গেল বাপের বাড়িতে একদিন। এককাপড়েই গেল। বাবা বিরক্তি গোপন করলেন না। কিন্তু সুতনুকা পাত্তা দিল না এবারে। একদিন দুদিন করে মাসখানেক চলে গিয়েছে। তার মাথায় ঘুরছে সে এবারে রজতের থেকে বিবাহবিচ্ছেদ নেবে। বোধিকে বলেওছে। বোধির মত এটাই। যে সম্পর্ক অচল তাকে পাহাড় করে মাথায় বয়ে বেড়ানোর কোনো মানে নেই তার কাছে।
সুতনুকা যখন তুলনামূলক নিশ্চিন্ত তখনই আবার সমস্যা এল। তার সিনিয়র দাদাটি অরিন্দম মুখার্জী। অরিন্দমের বৌ শর্মিষ্ঠা আচমকাই একদিন সুতনুকাকে বলে বসলো তার কাজের জন্য বাড়িতে ফোন করার দরকার নেই। যা কাজের কথা-তথা তা যেন চেম্বারেই সেরে নেয়। সুতনুকার বুঝতে বাকী রইলো না কি হচ্ছে! এর ভুক্তভোগী সে। সে চেষ্টা করলো নীলিমাকে বোঝাতে যে সে সত্যি কাজের জন্যই ফোন করেছে বাড়িতে। হিতে বিপরীত হল। শর্মিষ্ঠা তাকে যা নয় তাই বলে ফোন রেখে দিল। অরিন্দমের বয়স অন্তত সাতচল্লিশ হবে তখন। শর্মিষ্ঠার বেয়াল্লিশ। তাদের সন্তান নেই। দাম্পত্যে সমস্যা রয়েছে এ নিয়ে। শর্মিষ্ঠার ইউটেরাসে সমস্যার জন্যই হতে পারেনি সন্তান। সেই থেকে শর্মিষ্ঠার মধ্যে যে জটিলতা বাড়ছিল তা সুতনুকার বাড়তি ভূমিকায় আরো বেড়ে গ্যাছে। এর আগেও সুতনুকা কাজ করতো অরিন্দমের সঙ্গে, কিন্তু তা ছিল কয়েকটা কেস-এ। এখন সব কেস-এই কাজ করছে। অন্যদিকে অরিন্দম সুতনুকাকে আলাদা কাজ দিচ্ছে স্বাধীনভাবে করার জন্য সেটাও শর্মিষ্ঠা বুঝেছে। কিন্তু এর জন্যে কেন তাদের সম্পর্কে এমন ভাবনা হবে মাথায় এল না সুতনুকার। এল যখন তার আলাপ হল বোধির সঙ্গে। বোধিকে তার ভাল লেগেছিল শুরুতেই। তারপরে বোধির লেখাও পড়েছে। সে লেখাও তার ভাল লেগেছে। সেদিন অ্যাকাডেমিতে ম্যাগাজিনের কথা শুনে তারও খুব ইচ্ছে হয়েছিল এমন কিছু একটার সঙ্গে সে যুক্ত হবে যা তাকে তার বৃত্তের বাইরে থাকতে কিছুটা হলেও সাহায্য করবে। সেই জড়িয়ে পড়া। ধীরে ধীরে বোধির অন্যান্য কাজের সঙ্গেও সে জড়িয়ে পড়তে থাকলো। এর মধ্যেই অরিন্দম তার জন্য একটি চাকরীর ব্যবস্থা করলো। সেই চাকরীর সময়ও খুব বেশী না। এক্কেবারে দশটা-পাঁচটা তার কাজ। আজকের সময়ে যা ভাবাই মুশকিল। বোধির সঙ্গে তার দেখা হওয়াটা খুব বেড়ে গেল। আলাপ হল পরমার সঙ্গেও। কিন্তু তার বোধির সঙ্গে দেখা করা, কথা বলার ইচ্ছেটা কমলো না।
অরিন্দম সব শুনলেন। নিজের মতন বুঝলেন। একদিন রাজারহাটে কাজ ছিল তাঁদের। একটি আইটি প্রতিষ্ঠানের ট্যাক্স নিয়ে কাজ। অরিন্দম কাজ সেরে সুতনুকাকে বললেন তাঁর সঙ্গে একবার চেম্বারে যেতে। সুতনুকা জানতে চাইলো কি কাজ আছে সেখানে! ইদানীং সুতনুকা চেম্বারে যায়না আর। খুব দরকার না হলে সে এড়িয়ে চলে চেম্বার। শর্মিষ্ঠার কথা ভেবেই করে। অরিন্দম খুব বিরক্ত হলেন কাজ জানতে চাওয়ায়। জিজ্ঞেস করলেন সুতনুকাকে,
- তোমারই বা কি এমন কাজ আছে যে কাজ না জেনে যেতে পারবে না চেম্বারে?
- ম্যাগাজিনটার আজকে প্রথম প্রুফ আসবে। প্রেস-এ বসেই দেখে নেওয়া হবে ঠিক আছে। বোধি দাঁড়িয়ে থাকবে।
- ওহ্!
গাড়িটা সল্টলেকের রাস্তাতেই দাঁড় করিয়ে দিলেন আচমকা ব্রেক কসে। পিছনের গাড়িগুলো গালাগাল দিতে থাকলো। দাঁড় করিয়েই সুতনুকার দিকের দরজাটা খুলে দিলেন এক ঝটকায়।
- তুমি একবার করে ভুল করবে আর আমি তার জন্য জীবনপাত করবো তা হবে না। তোমাকে বলেছিলাম বোধি তোমার জন্য না। কথা শোনার দরকার বোধ করনি। এখন বোধিকে পেয়ে আমার দরকার ফুরিয়ে গ্যাছে বলে চেম্বারে যেতে এত কথা। বোধিই এখন তোমাকে খাওয়াবে-পড়াবে, তোমার বাড়ির টাকার যোগান দেবে তো! নেমে যাও। তোমার নাগরের কাছে নিয়ে যাবার জন্য আমার গাড়ি না।
এক রাস্তা লোকের মধ্যে তাকে দাঁড় করিয়ে রেখে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেলেন অরিন্দম। চোখে জল এসে গেছিল সুতনুকার। অপমান্বে মুখটা কালো হয়ে গেছিল। রাস্তার লোকের সামনে কাঁদবে না বলে কোনো রকমে দাঁতে দাঁত চেপে একটা ট্যাক্সি ধরলো সে। ট্যাক্সিটা দাঁড়িয়ে ছিল ওখানেই। এককথায় রাজী হয়ে গেল যেতে। ট্যাক্সিতে উঠে সুতনুকা জানলার দিকে তাকাল। সরে সরে যাচ্ছে পথঘাট। আস্তে আস্তে চোখ ছাপিয়ে জল নামতে থাকলো। সুতনুকা জানলো শর্মিষ্ঠা কেন এত ক্ষিপ্ত। গোটা রাস্তাটা তন্ন-তন্ন করে দেখলো নিজেকে। সে কি কখনো প্রশ্রয় দিয়েছে অরিন্দমকে, একটুও? হয়তো কোথাও দিয়েছে। অরিন্দম যে তার প্রতি দুর্বল, তার সৌন্দর্য্যকে এড়িয়ে চলতে পারেন না বলে দুর্বল, তা সে জানতো। যেমন করে একজন মেয়ে জানে কোন পুরুষ তার প্রতি আকৃষ্ট তেমন করেই। কিন্তু কখনো একে গুরুত্ব দিতে চায়নি। নিজেকেই প্রবোধ দিয়েছে বারেবারে তেমন কিছু না বলে। অরিন্দম তাকে বলেছিল বোনের মতন সে। সে বিশ্বাস করেছিল। কখনো কখনো যে অস্বস্তি হত না এমন না। কিন্তু সেই অস্বস্তিকে গুরুত্ব দেয় নি। নিজেই উড়িয়ে দিয়েছে নিজের মনের মধ্যে সংশয় বলে। এছাড়া তার রাস্তাও ছিল না। যাকেই সে ধরবে কাজের জন্য সেই বিনিময়ে কিছু না কিছু চাইবে। চাইবেই। তাই নিজেকে চোখঠারা দিয়ে চলেছে সে। আজকে তার মনে হল, সত্যি একসময় দিনের পর দিন সে চেম্বারে বসে থেকেছে, এটা-ওটা-সেটা কথা বলে গ্যাছে অরিন্দমের সঙ্গে। অরিন্দম যাতায়াত করতে গিয়ে যখন বারবার ছুঁয়ে গ্যাছে তার শরীর তখনও কিছু হয়নি এমন একটা ভাব নিয়ে চলেছে। যদি সেগুলোকে সে আরেকটু গভীর ভাবে ঠাহর করে দেখত তাহলে তার অনেক আগেই বোঝার কথা ছিল। অরিন্দমের ভেতরে ভেতরে জমেছে তার প্রতি আকর্ষণ। তাই আজকে হঠাৎ করে তার চেম্বারে যাবার অনীহা এত অরিন্দমের ভাল লাগার কথা না। তাছাড়া শর্মিষ্ঠা যখন তাকে এত কথা বলেছে তখন অরিন্দমকে নিশ্চই বাদ দেয়নি। এখন যদি অরিন্দমের মনে হয় সে তাকে ব্যবহার করেছে তাহলে খুব একটা দোষ দেওয়া যায় কি? তাছাড়া বোধি না থাকলে এই অনীহা আসতো কিনা সন্দেহ। আর এলেও তাকে এভাবে কি সে প্রকাশ করতো? সিগন্যালে দাঁড়িয়ে ছিল গাড়িটা। খেয়াল হতেই তাড়াতাড়ি চোখে সানগ্লাস পরে ফেলেছিল সেই বিকেলেই। পাশের গাড়ি থেকে উৎসাহী যুবকের চোখ তার অসহ্য লাগছিল। দোষ তারই সব। বোধিকে বলেছিল সেদিন। প্রেস থেকে একটু তাড়াতাড়ি বেরিয়ে বোধিকে নিয়ে সে দাঁড়িয়েছিল একটি প্রায়ান্ধকার কলেজ স্ট্রীটের গলিতে। বোধি সব শুনেছিল। তারপরে বলেছিল জীবনে মানুষ দেখে শেখে আর ঠেকে শেখে। সে সারাজীবন তাদের রক্ষণশীল বাড়ির পচে যাওয়া পরিবেশে এই দেখেছে যে শরীরকে ব্যবহার করা ছাড়া গত্যন্তর নেই কিছু। তার দিদিরা, বৌদিরা, মা-মাসীরা এই করেই বেঁচেছেন বা মরেছেন। তাই সে একই রাস্তা নিলেও অস্বাভাবিক না। কিন্তু রাস্তাটা বদলাতে গেলে কষ্ট আছে। সুতনুকার এই জীবন প্রবাহ দিয়ে তা হতে পারে না। আরো শিক্ষা চাই, চাই প্রস্তুতি। চাই নিষ্ঠা। চালাকি করে সমস্যার সমাধান হয় না, সমস্যা শুধু বাড়ে মাত্র। সংসার যদি তামাশা হয়ে থাকে তাহলে সেই তামাশা থাকার দরকার কি? কেন সুতনুকা নিজের পায়ে সত্যি সত্যি দাঁড়াবার চেষ্টা করছে না? সুতনুকা ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলেছিল,
- একটা মানুষও কি নিঃস্বার্থভাবে কিছু করতে পারে না?
বোধি তাকিয়ে ছিল তার দিকে। সুতনুকা বুঝে গেছিল বোধির কথা। সে নিজে যখন স্বার্থই দেখবে তখন অন্য মানুষের কাছে স্বার্থহীনতা আশা করে কি করে? ট্যাক্সি ধরেছিল তারা। বোধি তাকে তার শ্বশুরবাড়ির কাছে নামিয়ে দিয়ে চলে গেছিল ট্যাক্সিটা নিয়ে।
রাস্তায় যেতে যেতে ভাবছিল সে এমন মানুষ অনেক দেখলো সে যারা একই যুক্তিতে চলে। সকলের সঙ্গেই এমন ভাবে চলে তারা। বাবা-মা থেকে বন্ধু-বান্ধব কোনো কিছুই তার থেকে বাদ যায় না। তুমি করবেই আমার জন্য, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমি কেন তা নিয়ে ভাববো! আমি দরকারে তোমাকে ভুলে যাব, দরকারে আবার মনে করবো। আসলে এরা জীবনে পেতেই অভ্যস্ত শুধু, দিতে ভাল করে শেখেনি। দিতে গেলে যতটা বড় হতে হয় নিজেকে ততটাই কমাতে হয় নিজের স্বার্থ। অতটা শিক্ষা হয়নি এদের। খুব সামান্য গন্ডির মধ্যেই বসবাস। সেখানেই শুরু ও শেষ। অসামান্য হয়ে উঠতে গেলে আলাদা করে যা লাগে তা হল বোধ আর নিষ্ঠা। দুটোরই অভাব এদের মারে ক্রমাগত। আবার ঠিক উল্টো দিকে যা আছে তা হল যদি আমি করি তাহলে আমার কথাই শুনে চলতে হবে। আমি ছাড়া অন্য কেউ কথা বলবে না বা বললেও তুমি শুনতে পারবে না। সুতনুকার সঙ্গে অরিন্দমের সম্পর্ক এবারে বদলে যাবে। একই ভাবে তার আর সুতনুকার সম্পর্কটাও বদলে যেতে বাধ্য কি? আবার সুতনুকার থেকে অরিন্দম বশ্যতা কেনই বা চায়? সুতনুকা কি বশ্য হতে বাধ্য? কেউ কাউকে আর্থিক বা অন্য সাহায্য করলে কি তার কিছু অধিকার আলাদা করে জন্মায়?
খুব জটিল। একদিক থেকে দেখতে গেলে যে সাহায্য করছে সে নিজের কিছুকে বাদ দিয়েই সাহায্য করছে। সুতরাং, তাকে জানতে হবে যে সাহায্যের ফল যে পাচ্ছে সে তার কি ব্যবহার করছে। যেমন ব্যাঙ্ক ধার দিলেও এখন জানতে চায় কি কারণে লাগবে সে ধার এবং তার কি খরচ হবে তার খতিয়ান। সেই খতিয়ানে সন্তুষ্ট হলে তবে ধার দেবে। কারণ সেই ধারের টাকা শোধ পাবার ব্যাপার আছে। ব্যাক্তি সম্পর্কেও তাই। শোধ পাওয়াটা শুধুমাত্র টাকায় হয়না, কর্মেও হয়। যিনি দিচ্ছেন তিনি এটুকু চাইবেন ভালর দিক থেকেই। তবে চাইলেই যে অন্যে নেবে মেনে তা হবে কেন? ব্যাঙ্ক দেয় ধার আর মানুষ করে সাহায্য, যা সাধারণ মানবিক কাজ। কাজেই ব্যাঙ্ক আর মানুষের সূত্র এক হতে পারেনা। যাকে সাহায্য করা হচ্ছে তার সাহায্য পাওয়ার পরের অবস্থা নিয়ে ভাবনা থাকতে পারে, কিন্তু তা বলে তাকে বাধ্য করা যায় না। করলে বলতে হবে এও এক ধরণের দাসত্ব করানো হচ্ছে। যেমন অনেক কোম্পানি আজকাল করে থাকে। ট্রেনি হিসেবে চাকরীতে নেয়, তারপরে বলে নির্দিষ্ট সময় তুমি আমার কাছে কাজ করতে বাধ্য। আমার কাছে কাজ না করলে তোমার অন্য কোথাও কাজ করা হবে না। অর্থাৎ সে যাকে সাহায্য হিসেবে দেখাচ্ছে তাকে সাহায্য না বলে বিনিয়োগ বলা ভাল। এই চক্করে বেশ কিছু সংবাদমাধ্যমও আছে। এমন কিছু ক্ষেত্রে বোধি জানে সেই সব সংবাদমাধ্যম চেষ্টা করেছে বাধ্য করতে তাদের কর্মচারীদের তাদের গন্ডীতে আটকে থাকতে। কিন্তু বিনিময়ে তাদের কিছুই দেয়নি তেমন। বরং যে সব পুরস্কার দেবার প্রতিশ্রুতি ছিল সেগুলোও সে মানেনি। কারণ তার হাতে আছে অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা। অরিন্দমও কোথাও এমন ভুল করে বসছে। তিনি যেহেতু পাশে থেকেছেন, দরকারে-অদরকারে অর্থনৈতিক সাহায্য করেছেন সুতরাং তাঁর বলাটা শেষ হওয়া দরকার। কারণ সুতনুকা যা ভাবছে তা দিয়েই যে তার ভাল হবে মন্দ হবে না এমন নিশ্চয়তা কই? তার এতে মন্দও হতে পারে তো! বোধি দীর্ঘ্যদিন ধরেই পরমার সঙ্গে রয়েছে। পরমাকে ছেড়ে সে সুতনুকাকে ধরবে কেন? রজতের থেকে ডিভোর্স নিলেই বোধি সুতনুকাকে বিয়ে করবে বলে তার মনে হয়নি। কাজেই সুতনুকা আবার নিজের সময়, এনার্জি বোধির পেছনে নষ্ট করছে এ তিনি মানবেন না। আর সঙ্গে আছে বোধির জন্য তাঁকেও অবহেলা করছে সে রাগও। তিনি তো শুতে চাননি সুতনুকার সঙ্গে এখনো। ইচ্ছে করে থাকলেও তাকে চেপে রেখেছেন। সুতনুকা তাঁকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে এ ভয় থেকেই করেননি প্রস্তাব। তাই দেওয়া-নেওয়া একমাত্রিক। তার সাধারণ ধর্ম ভুলে যাওয়া যায়। তিনি শুধু দেবেন, আর সুতনুকা নেবে, এটাই যেন ধর্ম।
অনেককাল আগের একটা লেখা মনে পড়লো বোধির। রবীন্দ্রনাথের ‘লোকহিত’।
“আমরা পরের উপকার করিব মনে করিলেই উপকার করিতে পারি না। উপকার করিবার অধিকার থাকা চাই। যে বড়ো সে ছোটোর অপকার অতি সহজে করিতে পারে কিন্তু ছোটোর উপকার করিতে হইলে কেবল বড়ো হইলে চলিবে না, ছোটো হইতে হইবে, ছোটোর সমান হইতে হইবে। মানুষ কোনোদিন কোনো যথার্থ হিতকে ভিক্ষারূপে গ্রহণ করিবে না, ঋণরূপেও না, কেবলমাত্র প্রাপ্য বলিয়াই গ্রহণ করিতে পারিবে।
কিন্তু আমরা লোকহিতের জন্য যখন মাতি তখন অনেক স্থলে সেই মত্ততার মূলে একটি আত্মাভিমানের মদ থাকে। আমরা লোকসাধারণের চেয়ে সকল বিষয়ে বড়ো এই কথাটাই রাজকীয় চালে সম্ভোগ করিবার উপায় উহাদের হিত করিবার আয়োজন। এমন স্থলে উহাদেরও অহিত করি, নিজেদেরও হিত করি না।
হিত করিবার একটিমাত্র ঈশ্বরদত্ত অধিকার আছে, সেটি প্রীতি। প্রীতির দানে কোনো অপমান নাই কিন্তু হিতৈষিতার দানে মানুষ অপমানিত হয়। মানুষকে সকলের চেয়ে নত করিবার উপায় তাহার হিত করা অথচ তাহাকে প্রীতি না-করা।”
—লোকহিত (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)
এখন কথা হচ্ছে এত ভারী ভাবনা যে মাথায় আসবে সে মাথা কই? সামান্য দখল নিয়ে আত্মম্ভরীতা যে প্রকারে বেড়েছে তাতে ‘ছোটো হতে হইবে’ এমন কথার মানে বোঝা সহজ কি? নিজেকে ছোটোর জায়গায় বসিয়ে ভাবছে কে? মানুষ তো ভাবছে নিজের বড়ত্ব দিয়েই সব সমস্যার সমাধান করে ফেলবে সে। ছোটো তাকে দেখছে কি করে, আঘাত পাচ্ছে কি পাচ্ছে না, সংশয় হচ্ছে কি হচ্ছে না, পেলে বা হলে কি করণীয় এত ভাবার সময় কই? আমি করেছি বা করছি এই আত্মম্ভরীতায় তো জীবন কাটিয়ে দেওয়া যায়! আর যার জন্য করা হচ্ছে তার এক সময় দম আটকে গিয়ে তার থেকে বিদ্বেষ তৈরী হওয়ার প্রভূত সম্ভাবনা। যে কারণে বিদ্যেসাগরকে একজন যখন গালি দিচ্ছিলেন তখন নাকি তিনি বলেছিলেন,
- ‘আপনি আমাকে গালি দিচ্ছেন কেন? আমি কি আপনার কোনো উপকার করেছি এর আগে?’
জানেনা বোধি বিদ্যাসাগরের নামের এ গল্প সত্য কি মিথ্যা, তবে মানুষ এক সময় সাধারণভাবে উপকারীর প্রতি অত্যন্ত বিমুখ হয়ে ওঠে এটা সেও দেখেছে। এমনকি তার আজকাল মনে হয় বোধহয় অনুজার সঙ্গে সম্পর্কটাও ক্রমশ এই উপকারী আর উপকৃতের সম্পর্কে দাঁড়িয়ে যাচ্ছিল। অনুজার বাড়ি ভাড়া চাই, বোধি ব্যবস্থা করবে। অনুজার বাড়িতে খাট নেই, বোধি ব্যবস্থা করবে। অনুজার জলের কল খারাপ হয়ে গিয়েছে, বোধি দেখে দেবে লোক। অনুজার ব্যাঙ্কে সমস্যা হচ্ছে, কি তার মোবাইল হারিয়ে গিয়েছে বোধি বুঝে নেবে কি করতে হবে! এই ভাবেই ক্রমশ সম্পর্কটার মধ্যে একটা একমুখীতা চলে আসছিল। অনুজার তার জন্য কিছুই করার নেই যেন! যা করবে সব বোধি। বোধিও একদিন এই করার আনন্দে ভেসে গিয়ে মনে করতে শুরু করেছিল অনুজার জীবনের সবকিছুর মধ্যেই তার মাথা গলাবার বিশেষ অধিকার আছে। সেই ঠিক করে দেবে বিয়ে বাড়িতে গেলে অনুজা কি শাড়ি পড়বে থেকে এই চাকরী ছেড়ে অন্য কাগজে অনুজা চাকরী নেবে কিনা! এই করতে করতে উভমুখীতা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। বোধি অনুজার জীবনে হেডমাস্টার হয়ে উঠেছিল। তাই যা হবার তাই হয়েছে। একদিন অনুজার অসহ্য লেগেছে সব বোধহয়। তাই ডানা মেলে দিয়েছে। দেওয়া আর নেওয়া শুধু বাণিজ্য নয়, পারস্পরিক সন্মাননার পন্থাও বটে। যখন মুদ্রা ছিল না সভ্যতায় তখনো মানুষ বিনিময় করেছে। দেওয়া-নেওয়া করেছে। এবং কে না জানে যে কোনো একটি নদী অনন্তকাল একই খাতে নির্বিকার বয়ে যেতে পারে না। বোধিও বড় হতে হতে একদিন ছোট হবার রহস্য ভুলে গিয়েছে। ভুলে গিয়েছে ছোটর কাছেও ছোট হয়ে চাইলে সে আনন্দ পায়। নির্মল দেবার আনন্দ। অনুজা আনন্দ পাচ্ছিল না। সে যে চলে গিয়েছে তার পিছনে এটাও একটা বড় কারণ। বোধি যখন বুঝেছে তখন অনেক দেরী হয়ে গিয়েছে। কিন্তু তবু তো বুঝেছে! যারা এই দেওয়া-নেওয়ার রহস্য বুঝলো না তাদের কি হবে?
সুতনুকা লেখে নিজেও। কবিতা লেখার চেষ্টা করে বলাই ভাল। অল্প-বিস্তর বাঙালীর শখ আর কি! কিন্তু লেখা বা গানকে সে পেশা হিসেবে নেবে না। কি অসুবিধে আছে তাহলে সে যদি ম্যাগাজিনের কাজটা না করে? সে তো কমার্সিয়াল ট্যাক্সকেই জীবন বলে দাবী করে। সেখানে কাজ করতে গেলে নিয়মিত যে পড়াশোনা দরকার তা তার নেই। শুধু সময় নয়, ইচ্ছের অভাবও আছে। পড়াশোনা নিয়ে তার খুব একটা ভাল লাগা নেই। তাহলে এ পেশায় তার উন্নতি হবে কোথা থেকে? আরো হাজার জনের মধ্যে সে একজন হয়ে থাকবে। ভাবিয়েছে।একদিন তার জীবনেও এসেছিল যখন তাকে বেছে নিতে হয়েছিল। কবিতা না চাকরী? শিল্পচর্চার কোনো বিশুদ্ধ চেহারা হয় না। সেও ঠোকর খেতে খেতে বুঝেছে। তবু সে কিন্তু জানতো তার চাকরীটা আসলে কবিতার বা সামগ্রিক লেখালিখির চর্চার জন্য। সে জানে কোনো একদিন ঠিক সে ছেড়ে দেবে এই চাকরী। চর্চা ছাড়েনি তাই কখনো। হাজারো কাজের মাঝেও চালিয়ে গিয়েছে। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে এসেও রাত্রে বসে গিয়েছে পড়তে বা লিখতে। তারপরে কোনো রকমে তিন বা চার ঘন্টা ঘুমিয়ে আবার দৌড়। ক্লান্ত হয়েছে, কিন্তু থামেনি। একদিন থামাবে চাকরীটা। পরমাও তাই চায়। পরমা জানে এ সব। এখন সে কষ্ট করে অর্থ জমাচ্ছে। চাকরী ছেড়ে সে শুধু লেখালিখির চর্চাই করবেনা, সে একটা ইন্সটিটিউট বানাবে। সেখানে নিখরচায় শেখাবে ছেলেমেয়েদের। কিভাবে লেখা আসে! কিভাবে জন্মায় ভাষা। এ সব কিছুই আকাশ থেকে পড়েনা। এর পদ্ধতি আছে, প্রস্তুতি আছে। তাদের দেশের মতন দেশে যেখানে ব্যাক্তিকেই লড়ে জায়গা করে নিতে হয় সেখানে এই ধরণের চর্চার কথা ভাবাই হয় না। লেখার আবার শিক্ষা কি? সে যার হয় তার হয়, যার হয় না তার হয় না। আসলে ঈশ্বরবাদী এবং ভাগ্যবাদী একটা সমাজের এমনই হবার কথা তো! বোধি জানে। বিভূতি-তারাশঙ্কর-মানিক কি কমলকুমার-জীবনানন্দ-সন্দীপন-শক্তি হয়ে ওঠা যায় না এমনি এমনি। প্রত্যেকের প্রস্তুতি পর্ব আছে। রবীন্দ্রনাথেরও। বিদ্যালয় না পড়লেই পড়াশোনা হয় না এমন না। পড়তে হয় জানতে হয়। তার সঙ্গে ব্যাক্তি বা সামাজিক জীবনের অভিজ্ঞতাকে সংশ্লেষ করে তৈরী হয় সাহিত্য। মিলটন-টেনিসন-জয়েস কেউই তাঁর সময়-সমাজ-জীবন এবং জ্ঞানের সংশ্লেষণ-বিশ্লেষণ ছাড়া তৈরী হয় না। শিল্পের অন্যান্য সকল শাখাতেই শিক্ষার ব্যবস্থা আছে যথাযথ, শুধু লেখার জন্যই নেই? বললেই কিছু লোক বোকার মতন বলবেন সাহিত্য চর্চা করতে এসব লাগেনা। সাহিত্য মঙ্গলগ্রহ থেকে কেউ কেউ পায় নাকি? ক্লান্তিকর কথা সব। বোধির আজকাল এ নিয়ে কথা বলতে ভাল লাগেনা। যদি এই সব নাই লাগতো তাহলে পৃথিবীর অর্থসম্পদে উন্নত দেশগুলোর এই কোর্স বানানোর দরকার ছিল না। বাকী সব শিখতে হয়, আর লেখা এমনি আসে এই সব কথার মধ্যে অন্ধত্ব আছে একধরণের। তার মোকাবিলার জন্য বোধির কথা বলে লাভ নেই। হাতে কলমে দেখিয়ে দেবে সে। আর যাঁরা জানেন এই সব কৌশল তাঁদের ডাকবেন ছেলেমেয়েদের রাস্তা দিতে।
বোধির কম বয়সে বিভিন্ন আড্ডায় পাওয়া সূত্র থেকে সে এগিয়েছে। এখন আর সেই সব আড্ডা নেই। এখন কাফকা-কামু-সার্ত্র বা উদয়ন ঘোষ-অমিয়ভূষণ-ফাল্গুণি নিয়ে আড্ডা দেয় না তেমন। কমে গিয়েছে সেই সব আড্ডা। মার্কেজ-বোর্হেস-কুন্দেরা কিম্বা আফ্রিকার চিনুয়া আচেবে, কি কোয়েটজু তবু খবরের কাগজে এসে পড়েন, কিন্তু ওকরি বেন বা গ্যালগুত দামোন-কে চিনবে কি করে এ দেশের লোক? অনুবাদ ও নেই বাংলায়। কিন্তু মণিমাণিক্য ছড়াচ্ছেন আফ্রিকার বিশাল মহাদেশ জুড়ে। মানব সভ্যতার ধাত্রীভূমির কথা জানলে নিজেদের অতীতের দিকেও একবার তাকানো যায়, আর জানা যায় ঠিক কোথায় এলাম। বোধি ভাবে সত্যি সত্যি যাদবপুরের কম্পারেটিভ লিটারেচারের বৃত্ত থেকে সাধারণ সাহিত্য চর্চার কতটা দূরত্ব এখনো। এই সব নিয়েই তার একদিন কাজ করার কথা। সে জন্য একটা একটা করে টাকা জমাচ্ছে। পরমা তার পাশে দাঁড়িয়েই লড়ে চলেছে। বোধি লেখে কম, কিন্তু পড়ে চলেছে। কারণ পড়া এবং মাঝেসাঝে লিখে দেখাটাই তার অনুশীলন। তার জন্য বর্ষা-খরা হয় না। এমন কোনো দিন নেই যে দিন বোধি তার বেড়ে চলাকে বাদ দিতে পারে। তার কাজকে বাদ দিতে পারে। এ সব কিছুই তাকেও করতে হয় সমস্ত কাজ সেরেই। সংসার তার কম না। পরমা আর তার সংসারের মধ্যে তাদের রক্ত সম্পর্কিত মানুষ ছাড়াও আছে আরো অনেক। তারা তার ছাত্র-ছাত্রীর দল। যাদের সে এখন ধীরে ধীরে কাজ শেখাচ্ছে। প্রতিষ্ঠান তার এখনো হয়নি বলে তো কাজ বন্ধ থাকতে পারে না! এদের জন্য সংসারের রক্ত-সম্পর্কিত বাকীদের সমান চিন্তা থাকে তার আর পরমার, থাকে সহযোগিতা। আত্মীয় তারাও। রক্ত না হলেই কি আত্মীয় হয় না? কিন্তু সুতনুকা এ সব বুঝতে চায় না খুব একটা। উড়ে চলেছে তার মন। গানের বা লেখার অনুশীলন নেই তার। নেই আরো গভীরে ডুবে যাবার ইচ্ছেও। এভাবে হয় না। কষ্ট, বিক্ষেপ, একাকিত্ব থাকবেই। মানুষ যত বড় হয় তত সে একা। তার চিন্তনের জটিল প্রক্রিয়ায় কেউ নেই আর। তার কষ্ট, শোক সবের ধরণ বদলে যায়। সে সব শুধু ব্যাক্তিগতই হয় না, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, বিশ্বমানবিক অথবা প্রাকৃতিক-ও হয়ে দাঁড়ায়। কোন কষ্ট, কোন আনন্দ কোথা থেকে আসে তার হদিশ অন্য লোকে জানবে কি করে? কারোর নিজের জীবন আর চারপাশের প্রতি দায়বদ্ধতাই তার শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধতাও। সেই জীবন যেমন তেমন তার শিল্প হবে। সেই দায়বদ্ধতার সবটা দিয়েই ব্যাক্তিগত বিক্ষেপকে দমন করতে হয়। নিজেকে তৈরী করতে হয়। উন্মুখ রাখতে হয় সেই জমির মত, যে জানে বর্ষার জল পড়লেই তার বীজ ধারণ করতে হবে। অমন সরল, অমন উন্মুখ হতে হয় সমর্পণে। তবে শিল্প কিছু দিলেও দিতে পারে। নইলে সে বড় অকরুণ। তামাশা করেই চলে যাবে গালে ঠোনা মেরে। প্রেমের মতই। সমর্পণ না থাকলে প্রেম হয় না। সেই সমর্পণ না হলে? তখন বাণিজ্য আসে।
এই যেমন তার পাশের ঘরে বসে থাকা মহিলাটির জীবনে সে বাণিজ্য। ক্রেতা সে। সেই বাধ্যতায় সমর্পণ থাকে। এই ক্রেতা-বিক্রেতার সম্পর্ক কখনো কখনো সরে আসে বাড়ির অন্দরেও। স্ত্রী-টি সমর্পণ করে বসে আছেন স্বামীকে সকল। তাঁর জীবনে যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। আগেও ছিল না। তাঁকে তৈরীই করা হয়েছে এই ভাবে যে জীবনের এক পর্যায় আসবে যখন তাঁকে চলে যেতে হবে অন্য ঘরে। সংসারের ছেলেটি যাবেনা। অন্য ঘরে তিনি গিয়ে সেই ঘরের উপযোগী করে নিজেকে গড়ে তুলবেন। সেই উপযোগের একটা বড় কারণ হল তাঁর সমাজে অচল অবস্থা। তিনি, স্বামী পছন্দ না হলে চাইলেই চলে যেতে পারবেন না। হ্যাঁ, এখনো, ২০১১ সালেও, এটাই সত্যি। সুতনুকা, ইংরেজী মাধ্যমে পড়া মেয়ে। গাড়ি চালাতে পারে, গান গাইতে পারে, নাচতে পারে। যে চাকরীতে সম্প্রতি যোগ দিয়েছে সেখানেও সে সাফল্য পাচ্ছে, পাবেও। তবু তার বাবা কিন্তু মনে করে যে সে ভুল করছে। তার উচিত কাজ স্বামীর ঘরে চলে যাওয়া। দরকারে সে তার স্বতন্ত্র জীবন ছেড়ে দিক। সংসার এমন শুধু সুতনুকাকেই বলে না, বলে আরো অনেক অনেক মানুষকে। সে নিজেই দেখেছে। বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা থেকে, শিল্পী, কিম্বা সাংবাদিক-ও। যাঁরা এই সব সহ্য করেও থেকে যান সংসারে, সরতে পারেন না, তাঁরা একটু একটু করে চোরাবালিতে ডুবে যান। মেয়ে, সে যাই করুক, সে প্লেনই চালাক কি রিসেপশনেই বসুক, তার কাজ দিনের শেষে ঘর দেখাশোনা করা আর রাতের বিছানাটাকে গরম করে রাখা পুরুষটির জন্য। পুরুষটি একদিন তার গর্ভে সন্তান উৎপাদন করে ধন্য করে দেবে তাকে। রাসেলের কথা মনে পড়ে গেল বোধির।
“The total amount of undesired sex endured by women is probably greater in marriage than in prostitution.”
-Bertrand Russell
(ক্রমশঃ)